Home তোমাদের গল্প জান্নাতের গুলবাগ

জান্নাতের গুলবাগ

হান্না জামান#

উদাস দুপুর। বড় একটা আমগাছের নিচে বসে আছে সামাদ আনমনে, ভীষণ একা। চারিদিকে নির্জন। মানুষের কোন সাড়া-শব্দ নেই। ওদের বাড়িটিও যেন মরে গেছে নিঃশব্দে। সামাদের মা রোকেয়া আজ সকালে বাবার বাড়ি গেছেন। সাথে গেছে ছোট দুই ভাই আহাদ আর আজাদ। সামাদের যমজ দু’টি বোন হাসনা-হেনা এখন স্কুলে। ওদের স্কুল ছুটি হয় ৪টায়। ওরা বাড়ি ফেরার আগেই মা নিশ্চয় ফিরে আসবেন।
গতকাল সামাদের দাখিল পরীক্ষার ফলাফল বেরিয়েছে। এ প্লাস পেয়েছে সে। প্রথমে সে তো বিশ্বাসই করতে পারেনি। এই অনাকাক্সিক্ষত ফলাফলের সময় হতবাক হয়ে কতক্ষণ দাঁড়িয়েছিলো নিজেই জানে না। বন্ধুদের করতালি আর মারহাবা মারহাবা ধ্বনিতে সামাদ নিজের মাঝে ফিরে আসে। সমস্ত জামেয়াজুড়ে বইছে যেন খুশির বন্যা। তারা যতজন পরীক্ষা দিয়েছে, সবাই কৃতকার্য হয়েছে। ছোট ক্লাসের ছেলেরা মিষ্টি বিতরণ করছে। ঝটপট দুটি মিষ্টি গিলে দ্রুত বাড়ি ফিরে আসে সে। মা তখন জায়নামাজে, দুই হাত তুলে দোয়া করছিলেন। ঠিক তখনই পেছন থেকে তাঁকে জড়িয়ে ধরে সামাদ সুসংবাদটা জানায়। রোকেয়া খানম ছেলের কপালে চুমু খেয়ে সিজদায় লুটিয়ে পড়েন। এই সুসংবাদে তিনি যতটা না খুশি হয়েছেন, তার চেয়ে বেশি হয়েছেন চিন্তিত। কিভাবে ওর লেখাপড়ার খরচ জোগাবেন, ভালো মাদরাসায় ভর্তি করাবেন তা ভেবে পাচ্ছিলেন না। স্বামীর কথা মনে পড়লো তার। আজ যদি তিনি বেঁচে থাকতেন, তাহলে কত খুশি হতেন। ছেলেমেয়েকে নিয়ে কত স্বপ্ন দেখতেন, ওরা মানুষের মতো মানুষ হবে, সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে, সোনালি সমাজ গড়ায় অংশ নেবে, কিন্তু না। তিনি তাঁর স্বপ্নগুলো বাস্তব রূপ দেখে যেতে পারলেন না। অন্যায়ের প্রতিবাদ করার জন্য সন্ত্রাসীদের হাতে নির্মমভাবে খুন হলেন প্রফেসর উমার আলী হায়দার।
আর ভাবতে পারলেন না তিনি। টুপ করে দুই ফোঁটা অশ্রু তার কোলের ওপর ঝরে পড়লো।
মাকে কাঁদতে দেখে অবাক হলো সামাদ। এতো খুশির দিনে মা কাঁদছেন! আজ একটি দিন যদি ক্ষণিকের জন্য দুঃখগুলো ভুলে থাকা যায়, তাহলে কি হয় না? ছোট ভাই বোনগুলো খুশিতে আত্মহারা। পাড়া-পড়শি সবাই খুশি। তবু মা কাঁদছেন। এতো খুশির মাঝে মায়ের এই কান্না তার মন বিষণœ করে দিলো। সেই থেকে কিছুই ভালো লাগছে না। তাই সকাল থেকে এখানেই বসে আছে জোহরের আজান শুনে উঠে দাঁড়ালো সে। চুপচাপ হাঁটতে লাগলো মসজিদের দিকে।
নামাজ শেষ করে মসজিদের ভেতর বসে রইলো সামাদ। এই জায়নামাজের বুকে যতটা শান্তি আছে, পৃথিবীর আর কোথাও ততটা নেই। তাই মসজিদে এলেই ওর মনটা শান্ত হয়ে যায়। সমস্ত দুঃখ ভুলে, পার্থিব এক আনন্দে হৃদয় মন সবকিছু ভরে ওঠে। সামাদের মনে হয় বিষণ পৃথিবীতে মসজিদই যেন জান্নাতের গুলবাগ।
গভীর রাত, ঘুমন্ত পৃথিবী। কোথাও কোন সাড়া-শব্দ নেই। চাঁদটা দ্রুত দৌড়ে আসছে পূর্ব থেকে পশ্চিমে, অগণিত তারা জ্বলছে মিটি মিটি। দোলন-চাপার মিষ্টি সুবাসে মোহিত বাতাস। বাগানে অস্থিরভাবে পায়চারি করছে সামাদ। কেন জানি ঘুম আসছে না। সারাক্ষণ মনটা অশান্ত থাকে। এলোমেলো ভাবনা ঘুরতে থাকে মাথায়। সবার কথা ভাবে সে। মায়ের কথা, বাবার কথা, দেশের কথা… কোনকিছুই বাদ যায় না।
তাদেরকে ছোট রেখে বাবা মারা গেছেন সেই কবে। মা কত কষ্ট করে লেখাপড়ার খরচ যোগাচ্ছেন। একটি সেলাই মেশিন মায়ের আয়ের উৎস। মাঝে মাঝে মামার বাড়ি থেকে কিছু টাকা পয়সা আসে তাতে সংসারের খরচ ঠিকমতো চলে না। আর এখনতো জিনিসপত্র সবকিছুর দামই তো আকাশছোঁয়া। গরিবের জন্য পেট পুরে ভাত খাওয়া হয়েছে অসম্ভব। মায়ের বোঝা একটু কমানোর জন্য একটি স্টেশনারি দোকানে কাজ করে সামাদ। মাসে পায় পঁচিশ শো টাকা। দোকানের মালিক যা কড়া। একটু এদিক সেদিক হলে মাইনে কেটে রাখে। প্রথমে মা আপত্তি করেছিলেন, সামাদের জেদের কাছে অবশেষে হার মানেন। নিয়মিত মাদরাসায় যেতে পারেনি। সেই কাজের ফাঁকে ফাঁকে পড়াশুনা করে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছিলো। তারপরও ভালো রেজাল্ট করেছে সে। এবার ভালো একটি কামিল মাদরাসায় ভর্তি হতে হবে।
রিস্টওয়াচের মৃদু ঝঙ্কারে ওর ধ্যান ভাঙলো। চমকে উঠলো সামাদ… ইয়া আল্লাহ …. এতো রাত হয়ে গেছে! আড়াইটা বাজে। সময় যে কিভাবে চলে গেলো, ভেবেই পায় না সে। দুপদাপ পা ফেলে নিজের রুমে চলে এলো। ঝপ করে ঝাঁপিয়ে পড়লো বিছানায়।
বিছানায় শুলেও ঘুম এলো না। ছটফট করতে লাগলো কড়িকাঠের দিকে শূন্যদৃষ্টি মেলে চেয়ে রইলো অনেকক্ষণ। হঠাৎ করেই মনে পড়লো একটি কথা। কবিতার কথা। অনেকদিন থেকে লেখেনি সামাদ। এক সময় সোনালি দিগন্তে তার কবিতা নিয়মিত ছাপা হতো। কত গল্প, কত কবিতা লেখেছে সে। এখন আর লেখার সময় পায় না। আগে পেটের ভাত জোগাড় করতে হবে, তারপর লেখালেখি, সারাদিন এতো ব্যস্ত থাকে যে, পড়ার টেবিলে বসার ফুরসত মিলে না। আজ লিখতে ইচ্ছে হলো। ঘুমের চিন্তা বাদ দিয়ে খাতা-কলম টেনে নিলো। কী লিখবে? কবিতা না গজল। অবশেষে ঠিক হলো গজল লিখবে। নিজের লেখা গজল গেয়ে অসংখ্য পুরস্কার জিতেছে সে। ছন্দগুলো ভারী দুষ্টু! সারাক্ষণ মাথায় ভূতের মতো চেপে থাকে। ধীরে ধীরে লিখতে শুরু করলো সে-
তাদের জীবন প্রভু করো সুবাসিত
তোমার সুবাস থেকে যারা বঞ্চিত
যাদের বাগানে প্রভু ফুটে নাগো ফুল
পদে পদে যারা করে শত শত ভুল
তাদের বাগান ফুলে ভরে দাও
গোলাপ কলি, তুমি করো বিকশিত।
যাদের বুক ভরা ব্যথায় সাগর
দুঃখ সয়ে সয়ে যারা হয়েছে পাথর
যাদের আকাশে কভু ওঠেনি গো চাঁদ
তাদের মন তুমি করো আলোকিত।
যাদের মনখানি শুধু যে আঁধার
প্রাণপাখি সদা যার করে চিৎকার
তাদের জীবনে তুমি সুখ এনে দাও
এ ধরাতে যারা আজ চির লাঞ্ছিত।
লেখা শেষ করে ৩-৪ বার পড়লো সামাদ। হয়েছে, সে যেরকম লিখতে চেয়েছিলো; সে রকই হয়েছে। তৃপ্তির একটা নিঃশ্বাস ফেলে বালিশে এলিয়ে দিলো মাথা।
সোবহে সাদিক। অদ্ভুত এক মিষ্টি স্বপ্ন দেখতে ব্যস্ত সামাদ। জামেয়ার সবুজ ঘাসের ওপর বসে আছে ওরা কয়েকজন। আশিক, সাদিক, হেলাল, নিশাম, রুবেল, জাহিদ, আনোয়ার আর ওর প্রিয় বন্ধু মিজান। সবাই গোল হয়ে বসেছে। ওপরে দিগন্ত বিস্তৃত নীল আকাশ; যেন উপুড় হয়ে ওদেরকেই দেখছে। জারুল গাছে চমৎকার ফুল ফুটেছে। অদূরে এক জলপাই গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে রেদোয়ান। ইশারায় রেদোয়ানকে কাছে ডাকলো সামাদ। কাছে এলো সে ঘাসের ওপর দু’পা ছড়িয়ে বসলো। সামাদ লক্ষ্য করলো ওর মনটা বিষণ। কাঁধে হাত রেখে জানতে চাইলো,
– কি হে বন্ধ্ কী হয়েছে? এমন জম্পেশ আড্ডা রেখে তুমি কেন দূরে?
হতাশ একটা নিঃশ্বাস ফেললো রেদোয়ান। কাঁদো কাঁদো গলায় বললো- আমার কিছুই ভালো লাগে না। সারাক্ষণ মনটা বিষণ থাকে। পৃথিবীকে অসহ্য মনে হয়।
– তাই নাকি সবার হয়েছে ঐ একই রোগ। ভালো লাগে না, ভালো লাগে না। কিছুই ভালো লাগে না…। কিন্তু কেন?
– জানি না, ক্লান্ত রেদোয়ানের জবাব।
– এসো বন্ধুরা, আমরা সেই রহস্যটা উদঘাটন করি, যার জন্য আমাদের কিছুই ভালো লাগে না। প্রস্তাব দিলো হেলাল। উত্তম প্রস্তাব। সবার পক্ষ থেকে জবাব দিলো জাহিদ।
– হিশামের কাছ থেকে আমরা কয়েকটা টিপস শুনতে চাই, মৃদু হেসে বললো : আনোয়ার।
আকাশের দিকে তাকালো হিশাম। আকাশটা যেন উন্মুখ হয়ে আছে ওর কথা শুনার জন্য। ধীর গলায় বলতে শুরু করলো সে…।
কানে ভেসে এলো মুয়াজ্জিনের মিষ্টি মধুর সুর- ‘আসসালাতু খাইরুম মিনান নাওম’। খুলে গেলো দু’টি চোখ। চোখ মেলে দেখে পৃথিবীটা। সত্যিই পাল্টে গেছে যেন আজকের দিনটা। প্রতিটি মানুষ পরিণত হয়েছে এক একটি সুখের পায়রায়। দুনিয়াটা আর জাহান্নাম নয়। এটা এখন থেকে জান্নাত! মহাবিশ্বের প্রতিটি ঘর যেন এক একটা জান্নাতের গুলবাগ। পাশ ফেরে সামাদ।
চট করেই বিছানা ছাড়ে সামাদ। টুপি হাতে ছুটে যায় মসজিদের দিকে। দৌড়ে যেতে চায় জান্নাতের গুলবাগে, তবে একা নয়, সব্বাইকে সাথে নিয়ে..।

SHARE

Leave a Reply