Home গল্প রুহীর রোজার বয়ান

রুহীর রোজার বয়ান

দেলোয়ার হোসেন#

সূর্যটা ডুবতে না ডুবতেই রুহীদের ছাদে ভিড় জমে উঠলো। পশ্চিম আকাশে সাদা আর একটু লালচে মেঘের ফাঁকে-ফাঁকে পল্কহীন জোড়া জোড়া চোখের দৃষ্টি তখন আতি-পাতি করে খুঁজছে রমজানের নতুন বাঁকা চাঁদ। কিন্তু কেউই খুঁজে পাচ্ছে না। হঠাৎ রুহী তার মামাকে বললো, সামি মামা তোমার দূরবীনটা নিয়ে আসো- তা’হলে ঠিক দেখতে পাবে। সামি গম্গম কণ্ঠে বলে উঠলো-
– লাগবে না, আমার চোখ দুটোই তো দূরবীন।  রুহী বললো-
মোটা মানুষের দৃষ্টি চাঁদের কাছে যাবে না।
তুমি তো ট্যান-টেনে- বাতাসী  মার্কা। তুমি কি দেখতে পেয়েছো?
মামা ভাগনীর কথার এমনই ঝাঁজ। রুহীর বয়স ছয় বছর। এলোমেলো কথার ধার ধারে না সে। যুক্তি দিয়ে চমৎকার কথা বলে। একমাত্র মামার বয়স বারো। শরীর স্বাস্থ্য  মাস্আল্লাহ। তাকে একটু রাগাতে পারলেই এলোমেলো কথা ফোটে তার মুখে। যার অর্থ পরিষ্কার বোঝা যায় না। মামা ভাগনীর ঝগড়া লেগেই থাকে। আবার কেউ কারো ছেড়ে  বেশীক্ষণ দূরেও থাকতে পারে না।
হঠাৎ পাশের বাড়ির ছাদ থেকে ছেলে-মেয়েরা চিৎকার করে উঠলো। ঐ-যে ঢেউ ঢেউ মেঘের নীচে- বাবা-রে বাবা,  কি চিকন চাঁদ উঠেছে। সবাই বলো-
একটি বছর পরে
রোজা এলো ঘরে,
নামাজ পড়ো, রোজা রাখো
যাকাত করো দান,
সারা বছর থাকবে ভালো
রোজাদারের প্রাণ।
ঘরে এসে রুহী তার নানাকে বললো, নানাভাই, আমি কিন্তু সবগুলো রোজাই রাখবো। নানা কিছু বলার পূর্বেই সামি বললো, হুঁ- একটা রোজাই রাখতে পারবে না আবার—। মোট কয়টা রোজা জানো? রুহী উত্তরটা না দিয়ে চুপ হয়ে গেলো। নানা বললেন, রমজান মাস হয় ত্রিশ দিনে। কখনো আবার ঊনত্রিশ দিনেও হয়ে থাকে। আরবী মাসগুলোর সম্পর্ক চাঁদের সাথে। আমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখতে শুরু করি। আবার নতুন চাঁদ দেখে রোজা রাখা বন্ধ করি। ইংরেজী অথবা বাংলা মাসের সাথে সমান তালে এ মাস চলে না। যে কারণে গ্রীষ্মকালেও রোজা হয়, শীতকালেও রোজা হয়, আবার বর্ষাকালেও রোজা হয়। মোটকথা তিনশত পঁয়ষট্টি দিনের মধ্যেই রমজান মাস ঘুরতে থাকে। তোমাদের একটা মজার গল্প বলি।
গল্পের কথা শুনে সবাই আনন্দে হই-হই করে উঠলো। নানা বললেন, এক বিদেশী, মুসলমানদের রোজা রাখতে দেখে বলেছিলো মুসলমানেরা এতো কষ্ট করে গরমের মধ্যে কী করে রোজা রাখে। গরমে পানি পিপাসায় প্রতিটি জীবের বুক শুকিয়ে যায়। আর এদের চোখে-মুখে কষ্টের কোনো ছাপই পড়ে না। এ-কথার উত্তরে একজন মুসলমান বলছিলো সবই আল্লাহ্্র রহমত। সাত-আট বছরের ছেলেমেয়েরাও রোজা রেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়। কোনো কষ্টই তাদের ছুঁতে পারে না। মুসলমানদের শান্তির জন্য ছয়টা ঋতুর মধ্যে এই মাস আল্লাহ্পাক বন্টন করে দিয়েছেন।
সামি বললো, আব্বু তাহলে তো শীতের সময়ের রোজাই ভালো। অমনি রুহী বলে উঠলো না, বৃষ্টির সময়ের রোজাই ভালো। দু’জনের কথা শুনে নুরউদ্দিন সাহেব হাসতে-হাসতে বললেন, সব সময়ের রোজাই ভালো।  তবে আল্লাহ্ তার প্রিয় বান্দাদের শান্তির জন্য এমন ব্যবস্থা করেছেন। একটি সত্য কথা বলো তো তোমরা।
প্রতিদিন একই রকম খাবার যদি তোমাদের দেয়া হয়, তাহলে কি তোমাদের ভালো লাগবে? সামি বললো, প্রতিদিন একই রকম খাবার আর ভালো লাগে না। রুহী বললো, নানাভাই প্রতিদিন আমার খাবারের মেনু এক রকম থাকে না। কোনদিন সব্জি, কোনদিন মাছ, আবার কোনদিন গোশত। নানা মৃদু হেসে বললেন, ঠিক বলেছো। আমরা সারা বছর কত রকম ফল খাই কিন্তু সব ফল একই সময়ে পাই না। তোমরা বড় হয়ে নিজেরাই অনেক কিছু বুঝতে পারবে। এখন যে-যার কাজে যাও আর শোনো, আজ রাতেই সেহরি খেয়ে রোজা রাখতে হবে। আর আগামীকাল সন্ধ্যায় প্রথম ইফতারি খেতে বসবো আমরা।
রোজা শুরু হওয়ার আগেই নুরউদ্দিন সাহেব ভেবে রেখেছিলেন যে, রোজার মধ্যে বেশি ভাজাপোড়া খাওয়া ঠিক হবে না। এ কথা মনে রেখেই অফিস থেকে ফেরার পথে কিছু ফল নিয়ে এলেন বাসায়। তিনি জানেন বাসায় ছোলা ছাড়াও কিছু পিঁয়াজু আর  টাট্্কা মুড়ি তো থাকবেই। সে যাই হোক মাগরিবের  আজানের আগেই সবাই অজু করে মেঝেতে বসেছে গোল হয়ে। সামনে নানান রকমের ইফতারি। বড়দের বরফকুচি দ্বারা তৈরি লেবুর শরবত, রুহী বসেছে তার নানার কোল ঘেঁষে। হঠাৎ সে একজন বিচক্ষণ পরিদর্শকের মতো ধীরে-সুস্থে বলে উঠলো, নানাভাই- তুমি তো অনেক বড় একটা ভুল করে ফেলেছো। কথা শুনে সবার দৃষ্টি তখন রুহীর দিকে। সবাই ভাবছে- এই টরটরানি মেয়েটা কি বলে বসবে তা কে জানে। নানা বললেন, ছোটখাটো ভুল হতেই পারে কিন্তু কী এমন বড় ভুল করলাম !
তুমি আমার নাম জানো না?
জানবো না কেন- তুমি রুহী সামারা অনঘ।
তাহলে আমার শরবত কোথায়?
এই তো জগ্ ভরা রয়েছে।
আ-হা, এই শরবত না। রুহআবজা কোথায়? তুমি জানো না, রুহী রুহআবজার শরবত খায়।
এমন বড় ভুল করার জন্য নানা অনুতপ্ত হয়ে বললেন, সত্যি তো, এ কথা যে আমার মনেই আসেনি। নাতনী বললো, নানাভাই তুমি বুড়া হচ্ছো আর ভুল-ভালও বেশি করছো। আগের বছরের কথা তোমার মনে নেই? নানা আর কথা না বাড়িয়ে তখনই দোকানে ফোন করলেন একটা রুহআবজার বোতল বাসায় পৌঁছে দেয়ার জন্য।
নুরুদ্দীন সাহেবের ছোট্ট সংসার কিন্তু সমস্যার শেষ নেই। বৃদ্ধ বয়সে তিনি এ কথাই ভাবেন যে, সুখ ও শান্তি আমার জন্য নয়। সৃষ্টিকর্তা আমাকে অশান্তি সহ্য করার জন্যই সৃষ্টি করেছেন। এই অশান্তির মধ্যেও ছোট্ট নাতনীর শ্রুতিমধুর কথার আলোকে কখনো কখনো তার মনটা বৃষ্টি ধোয়া পাতাবাহার হয়ে যায়। তো রমজান মাসের মাঝামাঝি এক সন্ধ্যায় ইফতারি শেষ হওয়ার পর রুহী তার নানাকে বললো, নানাভাই তুমি কি হিসেব করেছো  আমার কয়টা রোজা হলো?  নানা বললেন, আজ পনেরো রোজা যাচ্ছে।
– আমার কিন্তু পনেরো রোজার বেশিই হয়েছে।
রুহীর কথা  শেষ না হতেই দু’একজন খুক্খুক করে হেসে উঠলো। নানীও হাসছে দেখে বিরক্ত হয়ে রুহী বললো, নানী তোমার ছেলেকে হাসতে মানা করো। সে তো সারাদিন পানির বোতল বোগলে করেই রাখে। আমাকে দেখলেই বালিশের নিচে লুকায়। এমন অপবাদ সামি কিছুতেই মেনে নিতে পারলো না। সে বললো, এই বাতাসী- সেদিন কি আমি রোজা ছিলাম? আর তোমার তো একটা রোজাও ঠিক হয়নি। তার উপর পনেরো রোজারও বেশি- হুঁ। রুহী তার মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো, মাম- আমি তিন দিন দুপুরবেলা খেজুর আর রুহআবজা খেয়ে ইফতার করেছি না? তা’হলে পনেরোটার বেশি হলো না? সমস্যার সমাধান করতে নানা বললেন, ছোটদের একদিনে দু’টো রোজাও হয়। রুহী খুশি হয়ে নানাকে বললো, নানা ভাই, তোমার তো এখন কিছুই মনে থাকে না। আমার ঈদের জামা কিন্তু তুমি কিনতে যেও না। তোমার পছন্দ ভালো না।
– কেন?
– তুমি পছন্দ করে একটা পচা নানী এনেছো। দেখতেও ভালো না আবার সুন্দর করে কথাও বলতে পারে না। তুমি আমার ভাগের টাকাটা দিয়ে দিও। আমি মামের সাথে মার্কেটে গিয়ে চয়েজ করে নিয়ে আসবো।
নানী একটু মজা করার জন্য বললো, আমাকেও সঙ্গে নিও। এমন কথা শুনে নাতনী যেনো অনেক বড় সমস্যায় পড়ে যায়। প্রায় কাঁদ-কাঁদ হয়ে মামকে বললো, মাম- নানী মার্কেটে গেলে আমি কিন্তু যাবো না। মা মেয়েকে সান্ত্বনা দিয়ে বললো, তোমার নানীকে আমরা নিবো না। আমরা চুপি-চুপি চলে যাবো, তোমার নানী বুঝতেও পারবে না
তারপর ইফতারের সময় রুহীকে দু’দিন না দেখে নুরুদ্দীন সাহেব বললেন, আমার নানুকে তো দেখছি না। সে কোথায়? রুহীর নানী বললো, তার ইফতারি উপরে দেয়া হয়েছে। সে এখানে আসবে না।
কেন?
সে কথা সেই জানে।
শেষে অনেক বুঝিয়ে তাকে ছয়তলা থেকে পাঁচতলায় আনা হলো। নানা বললেন, কী ব্যাপার নানাভাই, তুমি নিচে আস না কেন? তুমি না এলে আমি বাসায় না এসে অফিসেই থাকবো। তখন রুহী খুব গম্ভীর হয়ে বললো, শোন নানাভাই, আমাকে যদি নিচে দেখতে চাও তাহলে আমার মামাকে আর মারতে পারবে না, বকতেও পারবে না।
আমি তো তোমার মামাকে কিছু বলিনি!
তুমি বলো নাই কিন্তু তুমি বাসায় না থাকলে নানী তো মামাকে  পিটান দেয় -বকাবকি করে।
নানা তখন বললেন, স্যরি! আমি এখনই তোমার নানীকে বলে দিচ্ছিÑ সে যেনো সামির গায়ে আর হাত না তোলে।
এমন হাসি আনন্দের মধ্য দিয়েই একদিন রমজান মাস শেষ হয়। আবার সাওয়ালের বাঁকা চাঁদ উঁকি দেয় আকাশে। খুশির বন্যায় ভাসে সারা পৃথিবী। ঈদের দিন নতুন জামা পরে রুহী নানাকে সালাম করে বললো, নানাভাই আমাকে কেমন দেখাচ্ছে? নানা অনেকক্ষণ চেয়ে থেকে বললেন, পরীর মতো। রুহী এক ঝলক হাসি ছড়িয়ে নাচতে-নাচতে চলে গেলো সমবয়সীদের সাথে। নুরুদ্দীন সাহেব মনে মনে ভাবতে লাগলেন, সারাটা বছর যদি এমন আনন্দে কাটতো জীবনে আর কিছু চাওয়ার থাকতো না।

SHARE

Leave a Reply