Home খেলার চমক ভারত বিধ্বস্ত নতুন অধ্যায়ে বাংলাদেশের ক্রিকেট

ভারত বিধ্বস্ত নতুন অধ্যায়ে বাংলাদেশের ক্রিকেট

হাসান শরীফ#

বিশ্বকাপে বাংলাদেশের পারফরম্যান্সকে যারা নিছক ব্যতিক্রম ভেবেছিল, তাদের জন্য জবাব ছিল পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করা। তবে তাতেও সব সমালোচকের মুখ বন্ধ হয়নি। কেউ কেউ বলতে থাকল, পাকিস্তান দলের নিয়মিত অনেক খেলোয়াড় না থাকায় বাংলাদেশ এমন জয় পেয়েছে। এ সমালোচনার জবাবও দেয়ার দরকার ছিল। আর সেটা দেয়া হলো ভারতকে শোচনীয়ভাবে হারিয়ে। পাকিস্তান-ঘটনার পর ভারতীয়রা বেশ সচেতন হয়ে পড়েছিল। বাংলাদেশে আসার ব্যাপারে মহেন্দ্র সিং ধোনি, বিরাট কোহলিরা অনীহা প্রকাশ করেছিল। তারা বলতে চেয়েছিল, বাংলাদেশ কী এমন দল। আগেও তো ‘বি’ দল গিয়ে হোয়াইটওয়াশ করে এসেছে। তবে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড ঝুঁকি নিতে চায়নি। তারা পূর্ণ শক্তির দল পাঠিয়েছিল। সেই পূর্ণ শক্তির দলকে পর্যুদস্ত করেছে টাইগাররা। গত বিশ্বকাপে কূটকৌশলে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়া ঠেকিয়েছিল ভারত। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে একের পর এক সিদ্ধান্ত দিয়ে ভারতকে জিতিয়েছিলেন আম্পায়াররা। পেছন থেকে কলকাঠি নেড়েছিলেন আইসিসির চেয়ারম্যান শ্রীনিবাসন। বাংলাদেশের নিশ্চিত জয় তুলে দেয়া হয়েছিল ভারতের হাতে। এর বদলা নেয়ার সময় হয়ে এসেছিল। টাইগাররা সেটা বেশ ভালোমতোই করেছে। ভারতীয়দের দম্ভ পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে।
এ রিপোর্ট যখন লেখা হচ্ছিল, তখনো তৃতীয় একদিনের ম্যাচটি বাকি। তখন হোয়াইটওয়াশের হাতছানি দিচ্ছিল। তবে এর আগেই প্রথম দু’টি ম্যাচে জিতে সিরিজ জয় করে নিয়েছে টাইগাররা। ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং এবং উদ্ভাবন- সব দিকেই চমক সৃষ্টি করে শোচনীয়ভাবে বিধ্বস্ত করেছে ধোনিদের। একটা বিভাগেও তারা সমান তালে লড়তে পারেনি। আর  মোস্তাফিজুর রহমান নামে এক পুচকে খেলোয়াড় তাদের এমনভাবে নাস্তানাবুদ করেছে, যা তারা কল্পনাও করতে পারেনি। এক ইতিহাস রচিত হলো। এমন ইতিহাস আগে কখনো কেউ লেখেনি।cr1
বাংলাদেশের এই জয়ের পেছনে বুদ্ধির খেলাও কম কাজ করেনি। সিরিজ শুরু হয়েছিল একমাত্র টেস্ট দিয়ে। তাতে মাত্র একজন পেসার নামিয়েছিল বাংলাদেশ। তাতে সবাই সমালোচনামুখর হয়েছিল। এখানেই ছিল কৌশল। বাংলাদেশ জানত, টেস্ট ম্যাচে জয়ের সম্ভাবনা খুবই কম। ফলে কোনোমতে ঠেকাতে পারলেই চলে। একজন পেসার নামিয়ে বাংলাদেশ আসলে ভারতকে আসল অস্ত্র আড়ালে রেখেছিল। তারপর প্রথম একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে নামানো হলো চার পেসার। অবিশ্বাস্য। এ প্রথম এক ম্যাচে বাংলাদেশের চার পেসার খেলল। ভারতীয়রা বিশ্বাসই করতে পারেনি। একেক পেসার একেক রকম। ফলে যে ছক কষে খেলতে নেমেছিল ধোনি বাহিনী, সেটা গুলিয়ে যায়। মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে জিতে যায় বাংলাদেশ। প্রথম ম্যাচে পরাজয়ের পর মানসিকভাবে যে আঘাত খায় ধোনিরা, সেটাই কাজে লাগানো হয় দ্বিতীয় ম্যাচে। প্রথম ম্যাচে  মোস্তাফিজকে ধোনি যে গুঁতা দিয়েছিলেন, তাতে তাদের হতাশাই ফুটে উঠেছিল। ক্রিকেট খেলতে হয় বুদ্ধি দিয়ে। ষাঁড়ের মতো গুঁতা দিয়ে নয়। সেটা করতে গিয়েই খেলা থেকেই ধাক্কা খেয়ে হারিয়ে যায় ধোনি অ্যান্ড কোং।cr2
প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশ প্রথমে ব্যাট করেছিল। তখন বলা হয়েছিল, পরে ব্যাট করার কারণে তারা সমস্যায় পড়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয় ম্যাচে টসে জিতে ব্যাট করতে নেমে একই পরিস্থিতির মুখে পড়ে তারা। একবারের জন্যও জয়ের সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারেনি।
এই সিরিজে বাংলাদেশ একসাথে অনেক অর্জন করে। এই প্রথম ভারতকে একদিনের সিরিজে পরাজিত করল। পরপর দু’টি গুরুত্বপূর্ণ দলের বিরুদ্ধে সিরিজ জয় হলো। সেইসাথে ২০১৭ সালে অনুষ্ঠেয় চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে খেলার যোগ্যতা অর্জন করল। প্রতিটিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।
এটা কি বাংলাদেশ ক্রিকেটের স্বর্ণযুগ? স্বর্ণযুগ আসবে আরো পরে। আরো বড় সাফল্যের মাধ্যমে। এটা বাংলাদেশ ক্রিকেটের নতুন অধ্যায়। এই সিরিজে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি যেটা পেয়েছে তা হলো কাউকে ভয় না করার আত্মবিশ্বাস। যেকোনো দলকে এখন বাংলাদেশ হারাতে পারে। জুলাই মাসে দক্ষিণ আফ্রিকাও এমন অবস্থায় পড়বে আশা করা যায়।cr3
এই সিরিজে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার  মোস্তাফিজুর রহমান। সাতক্ষীরার এই ১৯ বছরের কিশোর এখন বাংলাদেশের নয়, বিশ্বের সেরা বোলার। ক্যারিয়ারের দুই ম্যাচে ১১টি উইকেট নিয়ে বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন। তার আগে জিম্বাবুয়ের ভিটোরি দুই ম্যাচে ১০টি উইকেট নিয়েছিলেন।  মোস্তাফিজ তাকেও ছাড়িয়ে গেছেন। ভিটোরি ৫টি করে উইকেট নিয়েছিলেন বাংলাদেশের বিপক্ষে। আর  মোস্তাফিজ উইকেট নিয়েছেন ভারতের মতো দুর্ধর্ষ দলের বিপক্ষে। মহেন্দ্র সিং ধোনি, সুরেশ রায়না, রোহিত শর্মার মতো বিশ্বসেরা ব্যাটসম্যানকে আউট করে। দুই ম্যাচেই তিনি হ্যাটট্রিক করার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন। অল্পের জন্য পারেননি। এই সিরিজে এটাই তার একমাত্র অপ্রাপ্তি।
মোস্তাফিজকে কিভাবে খেলবে, দু’টি ম্যাচ খেলেও ভারতীয়রা বুঝতে পারছে না। প্রথম ম্যাচের পর তার কাটারগুলোর প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিল সবাই। দ্বিতীয় ম্যাচের পর ভারত অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি বললেন, ‘ওর স্লোয়ারটা অন্য বোলারদের চেয়ে একটু জোরে হয়ে যায়। নিচু না হয়ে বলটা উইকেটকিপার পর্যন্ত চলে যায়।’ অর্থাৎ মোস্তাফিজের ভান্ডারে এখন অনেক অস্ত্র। আর সবই ব্যতিক্রম, আগে কেউ দেখেনি। আগামী দিনগুলোতে এসব অস্ত্র আরো ধারালো হবে নিঃসন্দেহে।
প্রথম ম্যাচের পরই অনেকে তাকে ‘জাতীয় বীর’ হিসেবে অভিহিত করেছিল। কারো কারো কাছে তিনি ‘সাতক্ষীরা এক্সপ্রেস’। কিন্তু কোনোটাই যুৎসই মনে হচ্ছে না। তাকে নতুন কোনো উপাধিতে ভূষিত করতে হবে।
এই মোস্তাফিজের উঠে আসাটাও একটা বড় ঘটনা। প্রত্যন্ত এলাকার এই ছেলেটি টেনিস বল দিয়ে ক্রিকেট শুরু করেছিলেন। সেখান থেকে একটা প্রতিভার বিশ্বমঞ্চে আত্মপ্রকাশ বলে দিচ্ছে, সারা বাংলাদেশ এখন ক্রিকেটখনি। ফলে প্রতিভার ঘাটতি আর কখনো হবে না। কেবল দরকার তাদের ঠিকমতো পরিচর্যা।

SHARE

Leave a Reply