Home প্রবন্ধ রোজা ও ঈদ

রোজা ও ঈদ

অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমান#

মহান স্রষ্টা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সমগ্র বিশ্বজগৎ সৃষ্টির পর তা সঠিকভাবে পরিচালনা, সংরক্ষণ, প্রতিপালন ও নিয়ন্ত্রণ করে চলেছেন। এ কারণে সমগ্র বিশ্বে কোথাও কোন বিশৃঙ্খলা নেই। সবকিছু সুষ্ঠু-সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। বিশ্বজগতের কোন কিছ্ইু আল্লাহর নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়। মানবসৃষ্টির পর মহান আল্লাহ্ মানুষকে সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য একটি নিয়ম বা বিধান দিয়েছেন। এ বিধানের নাম ইসলাম। যুগে যুগে দেশে দেশে অসংখ্য নবী-রাসূলের মাধ্যমে আল্লাহ্ দুনিয়ায় তাঁর বিধান কায়েম রেখেছেন।
ইসলামের মূল শিক্ষা তৌহিদ বা একত্ববাদ। এর অর্থ এক আল্লাহর ওপর ঈমান এনে তাঁর নির্দেশ বা বিধান অনুযায়ী জীবনযাপন করা। মানুষের জীবনকে সুন্দর ও কল্যাণময় করার জন্যই এ বিধান। এ বিধান পালনের মাধ্যমেই প্রকৃত শান্তি ও কল্যাণ লাভ সম্ভব। আল্লাহর বিধান সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে আসমানি কিতাবে। বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন নবী-রাসূলের মাধ্যমে এ কিতাব নাজিল হয়েছে। আখিরি বা সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা. এর ওপর সর্বশেষ নাজিলকৃত গ্রন্থ আল কুরআন। আল কুরআনে বর্ণিত মহান স্রষ্টার নির্দেশনা পালন ও আখিরি নবীর জীবনাদর্শ অনুসরণের মাধ্যমেই মানবজাতি প্রকৃত শান্তি, কল্যাণ ও মুক্তি পেতে পারে।
আল্লাহর বিধানের পাঁচটি মূল স্তম্ভ। ঈমান, নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাত। তবে এখানে ইসলামের পাঁচটি মূলস্তম্ভ নয়, শুধুমাত্র রোজা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করার প্রয়াস পাবো। আরবিতে ‘সওম’ বা ‘রোজা’ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। কারণ স্বয়ং আল্লাহ্ রোজা পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহর নির্দেশ পালনই ইবাদত। প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ওপর এটি ফরজ বা অবশ্য পালনীয়। যার ওপর নামাজ ফরজ তার ওপর রোজাও ফরজ। তবে রমজান মাসে কেউ অসুস্থ হলে বা সফরে থাকলে সে ঐ সময় রোজা না রেখে অন্য যেকোনো সময় তা আদায় করতে পারে। অন্যথায়, সকল অবস্থায় প্রত্যেক সাবালক ব্যক্তির জন্য রোজা যথাসময়ে অর্থাৎ রমজান মাসে আদায় করা ফরজ। রোজা সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা বলেন : “হে ঈমানদারগণ, তোমাদের জন্য রোজা ফরজ করা হয়েছে যেমন তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের প্রতি ফরজ করা হয়েছিল।” (সূরা বাকারা, আয়াত : ১৮৩)
এর দ্বারা প্রমাণ হয় যে, মানবজাতির শুরু থেকে প্রত্যেক জাতির ওপর রোজা রাখার বিধান ছিল। আজো হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান প্রভৃতি প্রাচীন ও বড় বড় ধর্মে উপবাস করার রীতি প্রচলিত রয়েছে। হিন্দু, বৌদ্ধ, ইহুদি, খ্রিষ্টান এরা সকলেই বছরের একটা নির্দিষ্ট সময়ে তাদের স্ব স্ব ধর্মীয় নিয়ম অনুযায়ী উপবাস ব্রত পালন করে থাকে। ইহুদিদের উপবাস হলো প্রায়শ্চিত্ত করার উদ্দেশ্যে। ইহুদিগণ নিজেদেরকে মূসা আ:-এর অনুসারী হিসেবে দাবি করে। মূসা আ: সিনাই পর্বতের চূড়ায় আরোহণ করেছিলেন আল্লাহর সাথে দিদার বা সাক্ষাৎ লাভের উদ্দেশ্যে। সিনাই পর্বত বর্তমান মিসর দেশে অবস্থিত। মূসা আ:-এর জন্ম মিসরে। সিনাই পর্বতের চূড়ায় আরোহণের পর আল্লাহর নির্দেশে তিনি সেখানে একাদিক্রমে চল্লিশ দিন রোজা রাখেন। আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা পরম পবিত্র ও মহান। তাই তাঁর দিদার লাভের জন্য মূসা আ: দীর্ঘ চল্লিশ দিন যাবৎ রোজা রেখে দেহ, মন ও আত্মার পবিত্রতা সাধন করেন। এর দ্বারা বুঝা যায় যে, রোজা দেহ-মনের পবিত্রতা সাধনের উপযুক্ত মাধ্যম।
এক হাদিসে আছে, রোজাদারদেরকে পরকালে মহান রাব্বুল আলামিন যে সমস্ত নেয়ামত দান করবেন তার মধ্যে একটি হলো আল্লাহর দিদার। মূসা আ: দুনিয়ায় আল্লাহর দিদার লাভের ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন। আল্লাহ্ তাঁর নবীর বাসনা পূরণের জন্য তাঁকে সিনাই পর্বতে আরোহণ করার নির্দেশ দেন। সেখানে মূসা আ: একাদিক্রমে চল্লিশ দিন পর্যন্ত রোজা রেখে দেহ-মনের পবিত্রতা সাধন ও সংযম ধারণের শক্তি অর্জন করে আল্লাহর দিদার লাভের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেন। এরপর মূসা আ: আল্লাহর নূরের তাজাল্লি দর্শন করেন। সিনাই পর্বত থেকে অবতরণ করে তাঁর অনুসারীদের নিকট ফিরে এসে দেখেন, তারা সকলেই তৌহিদের শিক্ষা ভুলে মূর্তিপূজা শুরু করে দিয়েছে। সিনাই পর্বতে আরোহণের পূর্বে মূসা আ: তাঁর ছোট ভাই হারুন আ:-কে তাঁর অনুসারীদের নেতা বানিয়ে গিয়েছিলেন এবং তাদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন হারুন আ:-কে অনুসরণ করে চলার জন্য। কিন্তু মূসা আ:-এর অবর্তমানে হারুন আ:-এর অবাধ্য হয়ে তাঁদের অনুসারীরা গাভীর মূর্তি বানিয়ে পূজা করতে শুরু করে। এটা ছিল স্পষ্টত শিরক্ এবং ইসলামের শিক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত।eid1
তাই মূসা আ: তাঁর অনুসারীদের বিপথগামী হওয়া দেখে ক্ষুব্ধ হন। তিনি তাদেরকে অনেক ভর্ৎসনা করেন এবং তওবা করে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতে বলেন। তাঁর অনুসারীরা তাদের ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্তচিত্তে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করেন। এরপর মূসা আ: তাঁদের কৃতকর্মের প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য এক নাগাড়ে চল্লিশ দিন পর্যন্ত রোজা রাখার নির্দেশ দেন। এ ছাড়া, সিনাই পর্বতের চূড়া থেকে আল্লাহর নিকট থেকে প্রাপ্ত যেসব ধর্মীয় বিধানাবলি তিনি লাভ করেছিলেন তাও তাঁর অনুসারীদেরকে মেনে চলার নির্দেশ দেন। ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থ Old Testament বা তাওরাতে এ নির্দেশাবলিকে Twelve Commandments বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এভাবে মূসা আ:-এর অনুসারীদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়। তখন রোজা রাখার পদ্ধতিও ছিল কিছুটা ভিন্ন। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাঁরা মাত্র একবার খানা খেতেন। ঈসা আ: এর অনুসারীদের (খ্রিষ্টান) মধ্যেও রোজা রাখার নিয়ম প্রচলিত রয়েছে। খ্রিষ্টানদের ধর্মগ্রন্থ বাইবেল বা New Testament-এ উল্লেখ আছে : ÒAnd when he (Jesus) had fasted forty days and forty nights, he was afterward unhungered.” (Mathew- 4: 2). অর্থাৎ ঈসা আ: চল্লিশ দিন ও চল্লিশ রাত্রি রোজা রেখে তারপর রোজা ভঙ্গ বা ইফতার করতেন।
রোজাদারদের সম্পর্কে বাইবেলে ঈসা আ:-এর উক্তি এভাবে উল্লেখিত হয়েছে : ÒBlessed are they which do hunger and thirst after righteousness : for they shall be filled” (Mathew-5 : 6). অর্থাৎ তারাই ভাগ্যবান যারা সৎকর্ম সাধনের পর রোজা রেখে ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কষ্ট ভোগ করে। তাদেরকে অবশ্যই (পরকালে) তৃপ্তিসহকারে আহার ও তৃষ্ণা নিবারণের ব্যবস্থা করা হবে।
রোজা রাখা সম্পর্কে ঈসা আ: যে ধরনের নির্দেশ দিয়েছেন, ইসলামের রীতিনীতির সাথে তা বহুলাংশে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বাইবেলের বর্ণনা : ÒMoreover when ye fast, be not, as the hypocrites, of a sad contenance : for they disfigure their faces, that they appear unto men to fast. Verily I say unto you, They have their reward.
But thou, when thou fastest, anoint thy head, and wash thy face” (Mathew- 6: 26-27).
এভাবে দেখা যায়, ইহুদি ও খ্রিষ্টান উভয় ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেই পূর্ব থেকে রোজার বিধান চালু আছে। মহানবীর সা. আবির্ভাবের পূর্বে আরব দেশেও উপবাস করার রেওয়াজ ছিল। বিভিন্ন সময় শোক পালনের জন্য, কোন দুর্যোগ-দুর্ঘটনা বা মহামারী থেকে রক্ষা পাওয়ার আশায় অথবা কল্পিত দেব-দেবীর অভিশাপ থেকে পরিত্রাণ লাভের উদ্দেশ্যে তারা উপবাস করতো। এভাবে অনুশোচনা বা প্রায়শ্চিত্ত করার উদ্দেশ্যে অথবা অকল্যাণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তারা উপবাস করতো।
প্রাচীনকাল থেকে হিন্দুদের মধ্যেও উপবাস করার পদ্ধতি চালু আছে। বিভিন্ন পর্ব উপলক্ষে তারা উপবাস করে থাকে। বিশেষত, বিধবা হিন্দু রমণীরা এভাবে উপবাস করে থাকে। এটাকেও বলা যায় এক ধরনের প্রায়শ্চিত্ত।
এভাবে দেখা যায়, পৃথিবীর সব বড় বড় ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে রোজা বা উপবাসের প্রচলন ছিল বা এখনো কোন না কোনভাবে তা বিদ্যমান আছে। এর দ্বারা এটা ধারণা করা চলে যে, সব ধর্মই আদিতে ছিল ইসলাম বা আল্লাহতায়ালার নাজিলকৃত ধর্ম। কালক্রমে তা বিকৃত হয়ে বিভিন্ন নাম পরিগ্রহ করেছে। তাদের ধর্মীয় বিধি-বিধানও তারা ইচ্ছামত বদলে ফেলেছে। আল্লাহর প্রেরিত সকল নবী-রাসূল একমাত্র দ্বীন ইসলাম প্রচার করেছেন। পরবর্তীকালে তাঁদের অনুসারীগণ ধর্মের বিধিবিধান ইচ্ছামত বিকৃত করেছে। যেমন মূসা আ: ইহুদিদের নিকট পরিচিত হয়েছেন মোজেজ (Mosses) নামে এবং তাঁর প্রচারিত ধর্ম বর্তমানে ইহুদি ধর্ম নামে পরিচিত। তাঁর ওপর নাজিলকৃত ঐশী গ্রন্থ ‘তাওরাত’ বর্তমানে বিকৃত আকারে Old Testament নামে পরিচিত। অনুরূপভাবে, ঈসা আ: খ্রিষ্টানদের নিকট যীশুখ্রিষ্ট নামে পরিচিত এবং তাঁর প্রচারিত ধর্ম বিকৃত হয়ে খ্রিষ্টান ধর্ম নামে এবং তাঁর ওপর নাজিলকৃত পবিত্র ইঞ্জিল গ্রন্থ বর্তমানেNew Testamentবা বাইবেল নামে প্রচলিত হয়েছে।
প্রাচীন হিন্দু ও বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কেও একই কথা বলা চলে। ধারণা করা হয় যে, আদিতে এসব ধর্ম-প্রচারকগণও ছিলেন কোন নবী বা রাসূল। হয়তো তাঁদের ওপর নাজিলকৃত ধর্মগ্রন্থও ছিল আসমানি কিতাব। কিন্তু যুগে যুগে তা নানাভাবে বিকৃত হয়েছে এবং ধর্মীয় মূল বিধিবিধানও পরিবর্তিত হয়েছে। তবে ইসলামের মূল শিক্ষা কোন না কোনভাবে এখনও এসব প্রাচীন ধর্মে কিছু কিছু বিদ্যমান রয়েছে। রোজা বা উপবাস পালনের যে প্রথা বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীগণ পালন করে থাকে, এটা তারই প্রমাণ।
সব ধর্মেই রোজা বা উপবাসের প্রচলন থাকলেও তার সংখ্যা ও পালনের পদ্ধতির ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম পরিলক্ষিত হয়। যেমন ইহুদিদের ওপর চল্লিশ দিন রোজা রাখার নির্দেশ ছিল এবং তারা দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র একবার খাদ্য গ্রহণ করতো। ঈসা আ: চল্লিশ দিন রোজা রেখেছেন এবং তাঁর অনুসারীদেরকেও রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। খ্রিষ্টানদের অনেকেই এখনো চল্লিশ দিন, আবার কেউ কেউ পঞ্চাশ দিন পর্যন্ত রোজা রাখেন। এভাবে রোজার সংখ্যার মধ্যে তারতম্য থাকলেও রোজার প্রচলন যে আদিকাল থেকেই রয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। eid2
আখিরি নবী মুহাম্মদ সা:-এর মাধ্যমে আল্লাহতায়ালা ইসলামের পূর্ণতা সাধন করেছেন এবং সর্বকাল ও সমগ্র মানবজাতির জন্য তা একমাত্র অনুসরণীয় আদর্শ হিসেবে মনোনীত করেছেন। আখিরি নবীর শরিয়তে রোজাকে ফরজ ইবাদত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে এবং রোজা পালনের সুনির্দিষ্ট বিধিবিধান প্রদান করা হয়েছে। যেমন পুরা রমজান মাস রোজা রাখা, সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে ইফতার করা এবং সূর্যোদয়ের পূর্ব পর্যন্ত পানাহার করার অনুমতি রয়েছে। বিশেষত, ইফতার ও সেহেরি সম্পর্কে মহানবী সা: বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। দিনের বেলায় রোজা রাখা অবস্থায় পানাহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, স্ত্রী সাহচর্য পরিত্যাগ, মিথ্যা কথা বলা, গিবত করা ও অন্যান্য সকল প্রকার পাপ ও গর্হিত কাজ থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে রোজা রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। রোজা রাখার উদ্দেশ্য হলোÑ আল্লাহর নির্দেশ পালন এবং এর মাধ্যমে দেহ-মনের পবিত্রতা সাধন ও সংযম শিক্ষা। অন্য সময়ে যা হালাল বা জায়েজ, রোজা অবস্থায় আল্লাহর নির্দেশে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সেগুলোও নিষিদ্ধ। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, রোজা রাখা শুধু নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম-কানুন বা আনুষ্ঠানিকতা পালন করা নয়, আল্লাহর নির্দেশ পালন করাই প্রধান উদ্দেশ্য। আল্লাহর নির্দেশ পালনের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা হয়। আল্লাহর ওপর ঈমান আনার পর আল্লাহর নির্দেশ পালন করা মু’মিনের দায়িত্ব। রোজা রাখার মাধ্যমে রোজাদার সে দায়িত্ব পালন করে এবং আল্লাহর অনুগত বান্দা হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়।
রোজা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সা:-এর কয়েকটি প্রসিদ্ধ হাদিস নিচে উদ্ধৃত হলো : “যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও কাজ পরিত্যাগ করে না, তার শুধু খানাপিনা পরিত্যাগ করায় আল্লাহর কোনই প্রয়োজন নেই।” (বোখারী শরিফ)
“অনেক রোজাদার এমন আছে কেবল ক্ষুধা আর পিপাসা ছাড়া তাদের ভাগ্যে অন্য কিছুই জোটে না। তেমনি রাত্রিতে ইবাদতকারী অনেক মানুষও এমন আছে, যাদের রাত্রি জাগরণ ছাড়া আর কিছুই লাভ হয় না।”
“রোজা ঢালস্বরূপ। তোমাদের কেউ কখনো রোজা রাখলে তার মুখ থেকে যেন খারাপ কথা বা গালিগালাজ বের না হয়। কেউ যদি তাকে গাল-মন্দ করে বা ঝগড়া-বিবাদে প্ররোচিত করে তবে সে যেন বলে, আমি রোজাদার।” (বোখারী ও মুসলিম শরিফ)
“যে ব্যক্তি ঈমান ও ইহ্তিসাবের (আত্মবিশ্লেষণ) সাথে রমজানে রোজা রাখল সে পূর্বকৃত সকল গুনাহ্ মাফ করিয়ে নিলো। যে ব্যক্তি ঈমান ও ইহ্তিসাবের সাথে রমজানের দীর্ঘ সালাত (তারাবি) আদায় করলো সে পূর্বকৃত গুনাহ মাফ করিয়ে নিলো।” (বোখারী ও মুসলিম)
মোট কথা, আত্মসংযম ও আল্লাহ-সচেতনতা অর্জন হলো রোজার মূল শিক্ষা। এ শিক্ষা শুধু রমজান মাসের জন্য নয়, বছরের বাকি এগারোটি মাস তথা সমগ্র জীবনই এ শিক্ষা অনুযায়ী চলা বাঞ্ছনীয়। কোন মু’মিন যখন কঠোর ত্যাগ ও কৃচ্ছ্র সাধনার মাধ্যমে রমজানে বিশেষ কতগুলো গুণ অর্জন করে, রমজান মাস শেষ হলেই সেসব গুণাবলি সে পরিত্যাগ করবে এটা অকল্পনীয়। কোন মু’মিনের পক্ষে তা সম্ভব নয়। যদি কেউ তা করে তাহলে সে প্রকৃত মু’মিন নয় অথবা রোজার গুরুত্ব ও তাৎপর্য সে মোটেই উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়নি। প্রকৃতপক্ষে, রমজানে মানবীয় গুণাবলি অর্জনের জন্য এমনভাবে ট্রেনিং দেয়া হয়, যেন রোজাদার সারা বছর বা সারাজীবন তা অনুসরণ করে কল্যাণময় সুন্দর জীবনের অধিকারী হয়।
রোজার উদ্দেশ্য হলো সব রকম অন্যায়-অবিচার-অনাচার, লোভ-লালসা, পাপ ও গর্হিত কাজ থেকে নিজেকে বিরত রেখে শুধুমাত্র আল্লাহ্র হুকুম পালনার্থে ত্যাগ, সংযম, আত্মবিশ্লেষণ ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে উন্নত মানবীয় গুণাবলি অর্জন করা। এর দ্বারা রোজাদার একদিকে যেমন প্রকৃত ইনসানে কামিল বা উন্নত মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে অন্য দিকে তেমনি সমাজ ও পৃথিবীকেও সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও কল্যাণময় আদর্শ সমাজ রূপে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। রোজার প্রকৃত উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য এটাই। কারণ মানুষ নিয়েই সমাজ গঠিত। মানুষ চরিত্রবান ও উত্তম গুণাবলির অধিকারী হলেই সমাজ সুন্দর হয়, আর মানুষ চরিত্রহীন ও মানবীয় গুণাবলি বিবর্জিত হলে সমাজ বসবাসের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে।
রমজান মাসে মানবজাতির হিদায়াতের জন্য আল্লাহতায়ালা আল কুরআন নাজিল করেন। মহান আল্লাহ্ বলেন : “রমজান মাস- এ মাসেই মানুষের দিশারি এবং সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারী রূপে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা এ মাস পাবে তারা যেন এ মাসে রোজা রাখে।” (সূরা বাকারা, আয়াত : ১৮৫)
উপরোক্ত আয়াত থেকে স্পষ্ট হয় যে, রমজানে কুরআন শরিফ নাজিল হয়েছে। মানবজাতিকে সঠিক পথ নির্দেশনা দানের জন্যই আল্লাহর পক্ষ থেকে এ মহাগ্রন্থ নাজিল করা হয়। শুধু আল কুরআনই নয়; অন্যান্য আসমানি কিতাবও এ মাসেই নাজিল হয়। রাসূল সা:-এর একটি হাদিস : “ইবরাহিম আ:-এর সহীফাসমূহ রমজান মাসের প্রথম রাত্রিতে নাজিল হয়। তাওরাত কিতাব রমজানের ৬ তারিখ দিবাগত রাতে, ইঞ্জিল রমজানের ১৩ তারিখে এবং কুরআন শরিফ রমজানের ২৪ তারিখে নাজিল হয়েছে।”
এ মাসে একটি মহিমান্বিত রজনী রয়েছে, যার নাম ‘লাইলাতুল কদর’। এ কদরের রাত্রিতেই আল-কুরআন নাজিল হয় এবং এ রাত্রির মর্যাদাকে হাজার মাসের অধিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেন : “কদর (মহিমান্বিত) রাত্রি হাজার মাস অপেক্ষাও উত্তম।” (সূরা কদর, আয়াত : ৩)
কদরের রাত্রিতে নাজিলকৃত কুরআন মজিদ সম্পর্কে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন : “এ কিতাবে (কুরআনে) কোনই সন্দেহ নেই, এটা মুত্তাক্বি (পরহেজগার) লোকদের জন্য সুস্পষ্ট হিদায়াত (সঠিক পথ-প্রদর্শনকারী)।”
আল কুরআন হচ্ছে মানবজাতির জন্য এক পরিপূর্ণ হিদায়াত গ্রন্থ তথা গাইড বুক। আল্লাহর পক্ষ থেকে ফেরেশতার মাধ্যমে মহানবীর সা: কাছে ওহি হিসেবে এটি অবতীর্ণ হয়েছে। মানুষের ব্যক্তিগত জীবন থেকে নিয়ে পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক তথা বৈশ্বিক জীবনের সকল দিক ও বিভাগের এক পরিপূর্ণ, নির্ভুল ও সর্বোত্তম গাইড বুক হলো আল কুরআন। একমাত্র এ গাইড লাইন অনুসরণ করেই জীবনে শান্তি, কল্যাণ ও সাফল্য অর্জন সম্ভব। এ গাইড লাইন ব্যতিরেকে অন্য কোন দর্শন, জ্ঞান ও প্রযুক্তিই পৃথিবীতে শান্তি ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠায় সক্ষম নয়। তাই এ আসমানি কিতাবকে ধারণ, উপলব্ধি ও সঠিকরূপে অনুসরণের জন্য এ রমজান মাসকেই নির্দিষ্ট করা হয়েছে। কেননা এ মাসে কঠোর সিয়াম-সাধনার দ্বারা মানুষ যে মানবীয় গুণাবলি (তাকওয়া) অর্জন করে, সে গুণাবলি ব্যতীত আল-কুরআন সম্যক উপলব্ধি ও অনুসরণ করা সম্ভব নয়। এটা ব্যতীত আমরা দুনিয়ায় সঠিক পথের সন্ধান পেতাম না। তাই আল-কুরআন মানবজাতির জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত। সে জন্য যে রাত্রিতে আল কুরআন নাজিল হয়েছে সে রাত্রির মর্যাদা এত বেশি এবং যে মাসে এ বরকতপূর্ণ রজনী ও মহাগ্রন্থ আল কুরআন নাজিল হয়েছে, সে মাসও অন্য সকল মাসের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাবান।
অতএব, রমজান মাস মানবজাতির নিকট অতি গুরুত্বপূর্ণ মাস। মহান আল্লাহ্র অপরিসীম নিয়ামতে পূর্ণ এ মাস। এ মাসে রোজা রেখে রোজাদারগণ মানবীয় সর্বোত্তম গুণাবলি (তাক্ওয়া) অর্জন করে। এ মাসে মানবজাতির পথনির্দেশনার জন্য মহান স্রষ্টা মহাগ্রন্থ আল-কুরআন নাজিল করেছেন। রমজান মাসের এ প্রাপ্তিকে জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি বলা যায়। কারণ মানবীয় সর্বোচ্চ গুণাবলি অর্জনের চেয়ে জীবনে বড় কোন প্রাপ্তি নেই এবং মানবজাতির পথপ্রদর্শনের জন্য মহাগ্রন্থ আল কুরআনের চেয়ে বড় কোন নিয়ামত নেই। মানবীয় গুণাবলি অর্জন ও আল কুরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী জীবনযাপন করে মানুষ ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বা সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ রূপে গণ্য হতে এবং দুনিয়া ও আখিরাতে মুক্তি ও কল্যাণ লাভে সক্ষম হয়।
সকল প্রাপ্তির মধ্যেই আনন্দ রয়েছে। রমজানের অফুরন্ত নিয়ামত প্রাপ্তির পর রোজাদারের মন স্বভাবতই অনাবিল আনন্দে উদ্ভাসিত হয়। রমজানের শেষে তাই শাওয়ালের প্রথম দিনে রোজাদারগণ ঈদ উৎসব পালন করে। ‘ঈদ’ মানে আনন্দ। রমজানে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মানুষ সর্বোচ্চ মানবীয় গুণাবলি অর্জন করে। এ মাসে নাজিলকৃত আল-কুরআনের আলোকে মানবজাতি পৃথিবীতে চলার সঠিক দিকনির্দেশনা পেয়েছে। এ মাসে জাকাত, ফিত্রা ও সদ্কা বিতরণের মাধ্যমে গরিব-দুঃখী বা সমাজের ভাগ্যবিড়ম্বিত অসহায় মানুষদের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব হয়। সকলে একসাথে মিলে ঈদ উৎসব পালন করে।
তাই ঈদের আনন্দ অন্যসব আনন্দের মতো নয়। এটা মহাপ্রাপ্তির আনন্দ। এ মাসে স্রষ্টার নির্দেশ পালনার্থে মানুষ রোজা রাখে। আল্লাহর নির্দেশ পালনের ফলে আল্লাহ্ খুশি হন, বান্দার প্রতি তিনি অপরিসীম রহমত, দয়া ও প্রশান্তি নাজিল করেন। আখিরাতে জান্নাত দান করবেন। রোজা রেখে বান্দা দেহ-মনের পবিত্রতা অর্জন করে, কঠোর কৃচ্ছ্রতা অবলম্বন, ত্যাগ ও সংযম সাধনার মাধ্যমে মানবীয় মহত্তম গুণাবলি অর্জন করে। মানবীয় মহত্তম গুণাবলি অর্জনের চেয়ে জীবনে বড় কোন সাফল্যের কথা চিন্তাও করা যায় না। রমজান মাসে দান-খয়রাত-সদকা প্রদান, ইফতারি বিতরণ, রোজাদারদের আপ্যায়ন ইত্যাদির মাধ্যমে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান অনেকাংশে মোচন হয়, পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব-মমত্ব, সহমর্মিতা ও সহানুভূতি বৃদ্ধি পায়। সমাজে শান্তির অনাবিল আনন্দময় পরিবেশ তৈরি হয়। ফলে ঈদের আনন্দ হয় সুগভীর। এ আনন্দ ব্যক্তি থেকে সমষ্টি তথা সমগ্র চরাচরে ছড়িয়ে পড়ে। তাই ঈদের আনন্দ সর্বব্যাপী ও সর্বজনীন।

SHARE

Leave a Reply