Home সাক্ষাৎকার জ্ঞানের কোনো ক্ষয় নেই

জ্ঞানের কোনো ক্ষয় নেই

শাহ আব্দুল হান্নান#

কিশোরকণ্ঠ : বাংলাদেশের বর্তমান সাংস্কৃতিক ধারাকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?
শাহ আব্দুল হান্নান : সংস্কৃতি একটি জাতির পরিচয় বহন করে। সংস্কৃতির সংজ্ঞা নিয়ে নানা বিতর্ক থাকলেও মানুষের সামগ্রিক জীবনাচারকেই আমরা সংস্কৃতি হিসেবে বুঝে থাকি। বাংলাদেশের বর্তমান সংস্কৃতির মধ্যে বিভিন্ন ট্রেড রয়েছে। একটি হচ্ছে আবহমান কাল ধরে চলে আসা সংস্কৃতি। এখানে মুসলমানরা যখন আসে এ আবহমান সংস্কৃতিই দু’ভাগ হয়ে যায়। এক ভাগে হিন্দুরা আবহমান সংস্কৃতিকেই মোটামুটি ধরে রাখে। আরেকটিতে মুসলমানরা তাদের মতো করে আবহমান সংস্কৃতিকে বহন করলো। কারণ মুসলমানগণ প্রধানত এ এলাকারই মানুষ ছিল। সেখানে মুসলমানরা আবহমান সংস্কৃতির যেটুকু ধরে রাখার ধরে রাখলো; আর ইসলামের আলোকে, তৌহিদের আলোকে যেটুকু ছেড়ে দেয়ার ছেড়ে দিল। তাহলে আমরা সংস্কৃতিতে দু’টি ধারা পেলাম। একটি আবহমান সংস্কৃতি যা মূলত হিন্দুদের মধ্যে থেকে যায় এবং অন্যটি আবহমান উপাদানের সাথে কিছু যোগ বিয়োগ করে পরিণত হওয়া মুসলিম সংস্কৃতি। এখানে এ কথাও বলা দরকার যে মুসলিম সংস্কৃতি প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ হচ্ছে। ইসলামের ভেতরে রিফর্মের একটি আন্দোলন আছে তা ‘আমর বিল মারুফ, নেহি আনিল মুনকার’ এর মাধ্যমে। মুসলিম সংস্কৃতিকে ক্রমাগতভাবে বিশ্লেষণ করে তাকে ইসলামের নিকটবর্তী করা বা খাঁটি করার ভেতরগত একটি আন্দোলন সবসময় আছে। অর্থাৎ মুসলিম সংস্কৃতি আমাদের দেশে ক্রমাগতভাবে রিফাইন্ড হয়ে ইসলামের নিকটতর হচ্ছে। বিগত দেড় শ’ দুই শ’ বছর ধরে আমাদের দেশে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটে তৃতীয় আরেকটি ধারার সৃষ্টি হয়েছে। এর প্রভাব আমাদের বিভিন্ন সামাজিক আচার অনুষ্ঠান, ভাষায় পড়ছে। ফলে আমাদের সংস্কৃতি পাশ্চাত্য দ্বারা কিছুটা প্রভাবিত হয়েছে।
কিশোরকণ্ঠ : আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির সাথে কি অন্যান্য বা ইসলামি সংস্কৃতির সংঘাত আছে বলে আপনি মনে করেন?
শাহ আব্দুল হান্নান : আমাদের দেশে সাংস্কৃতিক সংঘাত রয়েছে। এ সংঘাত আদর্শিক; এ সংঘাত ইসলামর সাথে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির। আবার ইসলামি সংস্কৃতি ও হিন্দু সংস্কৃতির মধ্যে একটি দ্বন্দ্ব আছে। এ দ্বন্দ্বকে সংঘাতে পরিণত করার দরকার নেই। ইসলামের লক্ষ্য হচ্ছে তার নিজের সংস্কৃতিকে রক্ষা করা, ইসলামের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলা, মানুষকে বড় করা এবং মহিমান্বিত করে তোলা। কিন্তু যে সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব আমাদের রয়েছে তার ভেতর রাজনীতি বড় আকারে প্রবেশ করছে। যেমন যারা ইসলামের বিরুদ্ধে সরাসরি না দাঁড়িয়ে প্রাচীন বাংলার সংস্কৃতির স্লোগান তোলেন তারা আসলে ওটারও তেমন সমর্থক নন। কিন্তু ইসলামর বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর জন্য তারা এটিকে ব্যবহার করে থাকেন। প্রয়োজনে পশ্চিমা মূল্যবোধকে দাঁড় করান। এর মাধ্যমে সরাসরি না করে তারা ঘুরিয়ে ইসলামের বিরোধিতা করে থাকেন। এ সংঘাত আমাদের দেশে রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এটি কোনোভাবেই তাদের ভালো কাজ নয়। বাংলাদেশের ৯০ ভাগ মুসলিম তাদের সংস্কৃতিকে ইসলামের আলোকে গড়ে তুলবে বা বিচার করবে এটি খুবই স্বাভাবিক কথা। এতে তাদের কষ্ট পাওয়ার কিছু নেই। তারাও তো নামে মুুুসলিম। আদতে যদি ইসলামের সংস্কৃতি খারাপ কিছু হয় তাহলে এক কথা, কিন্তু তা তো সত্য নয়। প্রকৃতপক্ষে মুসলিম সংস্কৃতি হচ্ছে সত্য, শ্লীল। আসল সত্য হচ্ছে এটি তৌহিদের প্রতিনিধিত্ব করে। এটি এক আল্লাহর দুনিয়া তার সঙ্গে শিরককে না মেশানোয় বিশ্বাস করে। এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে অশ্লীলতা। অশ্লীলতাকে পরিহার করা। এটি তো মানুষের জন্য সবচেয়ে কল্যাণকর এবং এতে ক্ষতিকর কিছু নেই। আবার এ সংস্কৃতি নাস্তিকতাকে বাতিল করে দেয়। এটিও সঠিক যে নাস্তিকতা কোনোভাবেই মানুষ তৈরি করে না। নাস্তিকতা হচ্ছে আল্লাহর ওপর বিশ্বাস না থাকা। মানুষ দায়িত্বজ্ঞানহীন নয়। যে সমস্ত ইন্টেলেকচুয়াল ইসলামের মূল সংস্কৃতির বিরোধিতা করে তারা সঠিক পথে আছে বলে আমি মনে করি না।
কিশোরকণ্ঠ : সাংস্কৃতিক কৌশল নির্ধারণ কতটুকু জরুরি বলে আপনি মনে করেন?
শাহ আব্দুল হান্নান : সংস্কৃতি সম্পর্কে সার্বিক কৌশল প্রশ্নে আমি বলবো সংস্কৃতি অত্যন্ত গভীর একটি ব্যাপার। সংস্কৃতিকে আমি সবসময় বলি এটি আইনের চেয়ে গভীর। একটি সংস্কৃতিকে, এমনকি তার কিছু অংশকেও বদলে ফেলা যুগ যুগের ব্যাপার। এটি সবাইকে বুঝতে হবে। সংস্কৃতি একটি সেনসিটিভ বিষয়। সে জন্য সংস্কৃতি নিয়ে কথাবার্তা, পরীক্ষ-নিরীক্ষা সবাই সাবধানে করতে হবে। যেমন আমরা ১৯৫২তে দেখেছি ভাষার ব্যাপারটি কত সেনাসিটিভ হয়ে গিয়েছিল এবং মুসলিম লীগের ব্যর্থতার পেছনে ছিল এ সেনসিটিভিটিকে বুঝতে ব্যর্থ হওয়া। তারা একটি ভুলের কারণে ক্ষমতা হারালো। তারা লোক হিসেবে কোনো অংশে খারাপ ও অযোগ্য লোক ছিল না। তাদের ভেতরও দেশপ্রেম ছিল। কিন্তু যে কোনো কারণে তারা ভাষা ও সংস্কৃতির স্পর্শকাতরতা বুঝতে ব্যর্থ হলো।
কিশোরকণ্ঠ : বিশ্বাস ও মূল্যবোধের আঘাত এবং এ ক্ষেত্রে তরুণদের করণীয় কী?
শাহ আব্দুল হান্নান : আমাদের সবচেয়ে গভীর জিনিস কোনটি? বিশ্বাস। মানুষ যদি গভীরভাবে কোনো জিনিস বিশ্বাস করে তাহলে সে সেভাবেই কাজ করবে। কারণ মানুষের কাজ নির্গত হয় তার বিশ্বাস থেকে। অর্থাৎ বিশ^াসের ভিত্তিতেই কাজ হয়। এ জন্য আমাদের মূল কাজ হচ্ছে কুরআন সুন্নাহর জ্ঞান ছড়িয়ে দেয়া। এটিকে আরো সংক্ষেপ করে বলবো, তৌহিদের জ্ঞান ছড়িয়ে দেয়া। ইসলামের পিলার হচ্ছে তৌহিদ। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আর গোটা কুরআনের ব্যাখ্যা। এ জন্য আমাদের খুব সুন্দরভাবে মানবজাতিকে তৌহিদ বোঝাতে হবে। গভীরভাবে তৌহিদ ও শিরকের পার্থক্য বোঝাতে হবে।
কিশোরকণ্ঠ : সাংস্কৃতিক আগ্রাসন যুবকরা কিভাবে মোকাবেলা করবে?
শাহ আব্দুল হান্নান : আর আগ্রাসন শব্দটিকে ঠিকই ধরা হয়েছে। এক গ্রুপ পাশ্চাত্য থেকে সংস্কৃতি আমদানিকে নিজেদের সমৃদ্ধির জন্য সঠিক ভাবতে পারে। কিন্তু সে ধারণা ঠিক নয়। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ আমাদের জন্য আগ্রাসন। আমরা মুসলিম এবং ইসলামে বিশ^াসী বলে এর বিপরীত কোনো জিনিস আমাদের পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব নয়। আমরা ইসলাম ও তৌহিদ বিরোধী এবং শিরক মনোভাবসম্পন্ন কোনো জিনিসকে আমাদের কালচারে আসতে দিতে পারি না। এটিকে যদি আগ্রাসন নাও বলি তবুও এর মোকাবেলার দায়িত্ব আমাদের। এটি মোকাবেলা বা প্রতিরোধ করার জন্য যেসব ব্যবস্থা নেয়া দরকার তা নেয়া উচিত। জনগণকে এ ব্যাপারে কাজ করা উচিত। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ইসলামের চেতনা বৃদ্ধি না করে এটি কখনো করা সম্ভব নয়। মানুষ যদি অসচেতন হয় তাহলে একটি বদ্ধ ঘরে সব দরজা জানালা খুলে দিলে বাতাস যেমন হু হু করে ঢুকে পড়ে আমাদের সংস্কৃতিতেও তেমনি নানাজাতীয় উপাদান ঢুকে পড়বে। কিন্তু আমাদের ঘর যদি বাতাসে ভরা থাকে তাহলে সেটি হবে না। অথবা যদি এভাবে বলি আমরা যদি ইসলামের জ্ঞানে জ্ঞানী হই, ইসলামের সত্য, ইসলামের সৌন্দর্য, মহত্ত্ব, শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে যদি আমরা সচেতন হই বা সচেতনতা বাড়াই তাহলে আমি মনে করি পাশ্চাত্য কালচার আমাদের কিছু করতে পারবে না।
কিশোরকণ্ঠ : ছাত্রছাত্রীদের প্রতি আপনার উপদেশ কী?
শাহ আব্দুল হান্নান: সবাইকে পড়ার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। আমি তাদের কুরআন পড়তে বলছি, হাদিস পড়তে বলেছি। সাহিত্য পড়তে বলছি। অগ্রসর (অফাধহপব) লিটারেচার পড়তে বলছি। একটু যারা বড় তাদেরকে ইসলামি অ্যাডভান্স লিটারেচার মানে গত একশত বছরের যারা উচ্চমানে ইসলামি সাহিত্য রচনা করেছেন তাদের সাহিত্য পড়ত বলছি। মনে হয়তো প্রশ্ন জাগতে পারে এক শ’ বছরের কথা কেন বললাম। আগের যুগের লোকেরা যে খুব বড় কথা বলেছেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তাতে তাদের যুগেরই প্রতিফলন ঘটেছে। উদাহরণগুলো সেই যুগের। যে বিষয়গুলো তাদের বইতে ব্যবহার করেছেন সেটিও সেই যুগের। ফলে গত এক শ’ বছরে যারা অ্যাডভান্সড বই লিখেছেন ইসলামের ওপর, আমি তাদের পড়তে বলেছি।
কিশোরকণ্ঠ : এ ক্ষেত্রে কার কার বই পড়তে আপনি উপদেশ দেবেন?
উত্তর : এ যুগের যারা শ্রেষ্ঠ স্কলার যেমন মাওলানা মওদূদী (রহ:), সাইয়েদ কুতুব, ড. তাহা জাবিরুল আলওয়ানি, জামাল বাদামি, মোহাম্মদ আল গাজ্জালী, ড. ইউসুফ আল কারযাভি, আমিন আহসান ইসলাহি, আবুল হাসান আল নাদভি এ ধরনের যারা বড় লেখক তাদেরসহ সমকালীন আরো যারা লিখেছেন সেগুলো পড়তে হবে।
কিশোরকণ্ঠ : অধ্যয়নের ক্ষেত্রে আপনার পরামর্শ কী?
শাহ আব্দুল হান্নান : আমি এই বয়সে গড়ে চার পাঁচ ঘণ্টা পড়ি এটি অত্যন্ত জরুরি। পড়ার কোনো বিকল্প নেই। ছাত্ররা তো আরো বেশি পড়বে। এ প্রসঙ্গে একটি কথা বলে দেয়া ভালো যে, আমরা সময় পাচ্ছি না বলি কিন্তু একজন মানুষ যদি গভীরভাবে পরিকল্পনা করে তবে সে তার সময়কে ভাগ করে নিতে পারে। ক্লাসের বাইরে পুরো সময়টা ভাগ করে নিতে হবে। ছয় ঘণ্টার বেশি ঘুমানো উচিত নয়। পারলে আরো কম। এর বাইরে পুরো সময়টাই নানান ধরনের পড়াশুনায় কাটাতে হবে।
টেবিলে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি অন্যান্য বইও রাখতে হবে। পাঠ্যবই ভালো লাগছে না তো সাহিত্য, গল্প, জীবনী, কবিতা ইত্যাদি পড়তে হবে। পড়া ভালো লাগছে না লিখতে হবে।
এ ধরনের আরো আরো কাজ যেগুলো অধ্যয়নের সহযোগী নিজেকেই খুঁজে বের করে জ্ঞানচর্চা বাড়াতে হবে। মনে রাখতে হবে জানার কোনো বিকল্প নেই। জ্ঞানের কোনো ক্ষয় নেই।

SHARE

Leave a Reply