Home গল্প জলপ্রপাতের জীবন্তিকা

জলপ্রপাতের জীবন্তিকা

শাহনাজ পারভীন #

সময়টা গড়িয়ে যায় নদীর স্রোতের মত বাঁধভাঙা জোয়ারের সাথে তাল মিলিয়ে। সূর্য উদয়-অস্ত কেমন বয়ে যায় সমতল মাঠের হাওয়ার সাথে, লু-হাওয়ার উষ্ণ পরশে। হিজল, তমাল, বকুল, ছাতিমের গন্ধ ছাপিয়ে। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টাতে গেলে দিন মাস বছর দশক ঝরে ঝরে পড়ে অথচ শিলু দিব্য দৃষ্টিতে দেখে এই তো সেদিন। মনে হয় যেন এই মাত্রই ঘটে গেল চোখের সামনে। চোখের পাপড়িরা এখনো পলক ফেলেনি। অথচ সেই ঊনসত্তরের এক আটাশ রোজার বিশেষ বিকেলের ঘটনা, প্রায়ই মনের আয়নায় ছায়া ফেলে নিজের। সে ছায়ায় আবছা হয় বর্তমানের দিনলিপি, আনন্দ, চেতনা, বিশ্বাস।
মিলুর বয়স তখন কত? ও তখন চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ে। এই রোজার ঈদে বায়না ধরেছে সবার মত সেও হাত রাঙাবে মেহেদিতে। ঘরে ঘরে ধুম পড়েছে মেহেদি বাটার। ফুল, লতাÑ পাতা, বিভিন্ন চিত্রসহ নিজের নাম এঁকে এঁকে হাতে দেয়ার। তখন তো এখনের মত টিউব মেহেদির প্রচলন ছিল না। কত দূর-দূরান্ত থেকে মেহেদি পাতা সংগ্রহ করা হতো। কিশোর-কিশোরী বয়স্কা নির্বিশেষে শবেকদরের পরদিন মেহেদি হাতে দেবেই দেবে। ঐ দিনটা যেন মেহেদি দেয়ার বিশেষ বার্ষিক অনুষ্ঠানের দিন। ধারণা করা হতো যদি শবেকদরের দিনে দেয়া মেহেদি হজের দিন পর্যন্ত কারো হাতে থাকে, তাহলে অশেষ সওয়াবের ভাগীদার হওয়া যায়। যেমন ধারণা করা হয় কোরবানির  গোশত মুহররমের ১০ তারিখে যদি খাওয়া যায় তাহলেও সওয়াব হয়। শিলু অবশ্য এসবের ধর্মীয় ব্যাখ্যা জানে না। তবে ছোট ভাই বোন বিশেষ করে মিলুর আকাক্সক্ষায় ও অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে সে আশপাশের অনেক বাড়িতে গিয়েছে, কিন্তু মেহেদি পাতা জোগাড় করতে পারেনি। এ পাড়ায় যে ক’টা গাছ আছে তা আগেই পাতাশূন্য হয়ে শুধু ডালপালা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ও কি বড় গাছের মগডাল থেকে পাতা ছিঁড়তে পারে? হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। বাড়ি ফিরেই মিলু, নিলু, মলি, প্লাবনের কান্না থামাতে ব্যস্ত। ও কিভাবে থামাবে এতগুলো মাতৃহীন শিশুর কান্না?
গত বছর মায়ের মৃত্যুতে ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়–য়া শিলুর ওপর ছোট ভাই বোনদের সব দায়িত্ব। ওদের পাড়ার সব মায়েরা কিভাবে রোজার দিনের অলস সারা দুপুর পাটা পেতে পেতে মেহেদি বাটছেন। তাদের মেয়েদের হাতে ফুল এঁকে এঁকে মেহেদি দিচ্ছেন। ওরই বয়সী রিজু, বিউটি, কাকলী, সোমা কি আনন্দে তাদের মায়েদের কাছে আবদার করছে মেহেদি বেঁটে দাও। হাতে ফুল করে দাও। ওর চোখ ছল ছল করে ওঠে। বারবার দুধের সরের মত মায়ের স্মৃতি ওর চোখের ওপর ভেসে বেড়ায়। মাখনের মত গভীর মমতায় জড়িয়ে থাকে ওর দু’চোখে। অনেক বোঝাতে চেষ্টা করে শিলুÑ
– কেঁদো না  আপু, কেঁদো না ভাইয়া। আব্বু আসুক। আব্বুকে বলব রহিম চাচার বাড়ি থেকে আমাদের জন্য মেহেদি আনতে। তখন সবাই মিলে হাতে দেবো।
কিছুতেই কিছু হয় না। ও অন্যদের কী বোঝাবে? বেণি দুলিয়ে পিঁড়িতে বসে ও নিজেই কখন যেন বিউটি হয়ে যায়। ওর হাতে মেহেদি দিতে থাকে ওর মা। ওর নাকে ভুরভুর করে ওর মায়ের আঁচলের সুবাস। ছুঁয়ে দেখতে চায় মায়ের হাত, আঙুল, কপোল, সমস্ত অবয়বের সাহচর্য। ও পরম স্নেহে অফুরন্ত আনন্দের সে দৃশ্য চলচ্চিত্রের মত উপভোগ করতে থাকে। ওর কাঁধ নেড়ে যখন নিলু ডাকে-
– আপা ভাত দাও। ক্ষিধে লেগেছে আমার। আপা খাবার দাও।
বাস্তবে পা রেখে মনটা খারাপ হয়ে যায়। কী সুন্দর কল্পনা, কী সুন্দর স্বপ্নটা ভেঙে দিলো নিলু। ইস্ যদি অনন্তকাল দেখতে পারত এই স্বপ্নটা, ইস্ যদি এ স্বপ্নটা কখনোই আর শেষ না হতো? হাত ধরে এক পাশে সরিয়ে রাখে  সে নিলুকে।
– আমি কোথায় পাবো ভাত? নিজেই তো নড়তে পারছি না।
নিলুর মুখে ভাত শব্দটা শুনে ওর পেটে ঝিমানো ক্ষুধা ভাবটা পাক মেরে ওঠে। মনে করতে পারে না কখন ও ভাত খেয়েছে। আস্তে আস্তে সূর্য উদয়ের মতো আলোকিত হয়।
গতকাল বাজার এসেছিল রাত করে। যে মা ঘরে আছেন তিনি একাই রান্না করেছিলেন। শিলুকে হাত লাগাতে হয়নি। নিলুকে ঘুম পাড়াতে যেয়ে ক্ষুধার্ত দেহটা নিয়ে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিল। মাঝরাতে আব্বুর ডাকে ঘুম ভাঙে।
ঘুম ঘুম চোখে শক্ত ভাত, ডাল, আলু ভর্তা খেয়েছিল। সেহেরি খেয়েছিল, না খায়নি তা আর মনে করতে পারে না শিলু।
প্লাবন দৌড়ে আসে। দৌড়ে আসে আসে মলিও।
-আপা, রিজু আপাদের ঈদের নতুন জামা এনেছে। আমাদের আনবে না? আমাদের জামা আনো, জুতা আনো, টুপি আনো।
-ফিতা আনো, চুড়ি আনো। আব্বু এখনো আসছে না কেন?
বিষন্ন দেহে ওরা যেন মরিয়া হয়ে ওঠে।  এরই মধ্যে আকাশ কাঁপিয়ে মায়ের চিৎকার শোনা যায়।
Ñকী করে এদের দায়িত্ব পালন করব আমি? জিনিসপত্র রাখলেই থাকে না। এই মিলু খেয়েছিস, বাটিতে মিষ্টি ছিল?
-আমি খাইনি।
– ফের মিথ্যে কথা?
– আমি খাইনি।
বলেই চুপ করে একপাশে দাঁড়িয়ে থাকে মিলু। মিলুকে নিশ্চুপ দেখে মায়ের রাগ দ্বিগুণ হয়। রেগে গিয়ে মা মিলুর কান ধরে টানতে গেলে মিলুও রাগে সটান সরে দাঁড়ায়।
-বলছি তো আমি খাইনি। দেখিউনি কোথায় মিষ্টি ছিল।
মায়ের রাগ চতুর্গুণ হয়। ছড়িয়ে যায় বাড়ির অলিতে গলিতে।
রাগের লাটাই ধরতে ব্যর্থ শিলু মিলুকে দেয় কয়েক চড় থাপ্পড়। তারপর বড় অসহায় হয়ে নিজেই কাঁদতে থাকে গুমড়ে গুমড়ে। কিছুক্ষণ কান্নাকাটি করার পর অদূরে আঙিনায় বসে থাকা মিলু নিলু মলিকে বুকে জড়িয়ে শ্রাবণের বারিধারায় অন্তর ভিজে যায়।
এভাবে কতক্ষণ বিশ্ব চরাচর তার গতি থামিয়েছিল শিলু এখন আর তা মনে করতে পারে না। তবে অদূরে দাঁড়ানো নতুন ব্যাগভর্তি জামা, জুতা, স্যান্ডেল, ফিতা হাতে আব্বুর চকমকে কণ্ঠস্বর শিলুকে ভাসিয়ে নিয়েছিল নায়াগ্রা জলপ্রপাতের গতির থেকেও দ্রুত গতিতে, দ্রুত লয়ে।

SHARE

Leave a Reply