Home প্রচ্ছদ রচনা পরিবেশ ঠিক না থাকলে ভারসাম্য হারাবে পৃথিবী

পরিবেশ ঠিক না থাকলে ভারসাম্য হারাবে পৃথিবী

মো: হারুন অর রশীদ #

আমাদের সবার বসবাসের জায়গা এই সুন্দর পৃথিবী। শুধু কি আমরা মানুষরা এই পৃথিবীর বাসিন্দা? অবশ্যই না। আমাদের পায়ের নিচের সবুজ দূর্বাঘাস। দিনের আকাশের সূর্য রাতের চাঁদ-তারা। জানালার পাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা লম্বা নারকেল গাছ। নারকেলের পাশের আম, জাম, লিচু, জামরুল গাছ। বাগানে সুবাস ছড়ানো ফুল। ফুলের ওপর বসা রঙিন প্রজাপতি। জামরুলের ডালে বসা পাখি। দাদুর বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে চলা ছোট্ট নদী। নদীর ছোট বড় মাছ, কাঁকড়া, সাপ, ব্যাঙ। বনের বাঘ, সিংহ, ভাল্লুক, বিশাল হাতি আরও কত কী! আমাদের চারপাশে ওরা সবাই মিলে-মিশে আছে। এই যে দেখছো কালো কুৎসিত কাক, সে-ও আমাদের এই পৃথিবীর বাসিন্দা। সবাইকে নিয়ে আমাদের পরিবেশ। একজনকে ছাড়া আরেকজন অচল। যেমন ধরো, কুৎসিত ঐ কাক যদি না থাকে মরা পশু-পাখি ময়লা আবর্জনায় ভরে যাবে সুন্দর poribas1নগর-বন্দর আর গ্রাম। তাই পরিবেশের প্রয়োজনেই কাককে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। জানালার পাশের কিংবা বনের সবুজ গাছ কেটে শেষ করলে বৃষ্টি হবে না। প্রকৃতি শ্যামলিমা হারিয়ে মরুভূমিতে পরিণত হবে। মাটির নিচের পানির স্তর নিচে নেমে গিয়ে ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়ে সব কিছু মাটির সাথে মিশে যাবে। আর নদী সে তো মানবসভ্যতার প্রাণ। তাই তো পৃথিবীর সব বড় বড় শহর গড়ে উঠেছে নদীর কোলে। এই যেমন; বুড়িগঙ্গার কোলে ঢাকা, টেমসের কোলে লন্ডন।
জেনে হোক না বুঝে হোক নগরসভ্যতার বিকাশের নামে শিল্প-কলকারখানা গড়তে গিয়ে আমরা মানুষরা প্রতিনিয়ত নষ্ট করছি পরিবেশের ভারসাম্য। এভাবে চলতে থাকলে মানবসভ্যতা শুধু বিপন্ন নয়, হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও অমূলক নয়। এই কথা মাথায় রেখেই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গণ-সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সম্মিলিত কার্যকর বৈশ্বিক পদক্ষেপ গ্রহণের লক্ষ্যে সর্বপ্রথম বড় আকারের আয়োজন হয় ১৯৭২ সালে। সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে ১৯৭২ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে পরিবেশবিষয়ক এক আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। প্রতি বছরের ৫ জুন ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। প্রথম ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালন করা হয় ১৯৭৩ সালে।
জাতিসংঘ পরিবেশ প্রোগ্রাম (ইউএনইপি) প্রতি বছর ৫ জুন সংস্থার সদস্য দেশগুলোতে বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালন করে থাকে। United Nations Environment Programme (ইউনাইটেড ন্যাশনস ইনভায়রনমেন্ট  প্রোগ্রাম)  এর শ্লোগান হলো environment  for  development  (উন্নয়নের জন্য পরিবেশ)। সংস্থাটির পক্ষ থেকে প্রতি বছর পরিবেশ দিবসে এটিকে সামনে রেখে নতুন নতুন প্রতিপাদ্য ঠিক করা হয়। সংস্থার ওয়েবসাইটে (http://www.unep.org/wed/2015_slogan/)দেখা poribas2poribas3যায় ২০১৫ লিখে তার নিচে লেখা: টাইম ফর গ্লোবাল অ্যাকশন ফর পিপল অ্যান্ড প্ল্যানেট। প্রতিপাদ্য : Seven Billion Dreams. One Planet./ Consume with Care. অর্থাৎ ৭ শ’ কোটি মানুষের স্বপ্ন একটাই পৃথিবী, যতেœর সাথে ভোগ করিÑ এর ওপর ভোট নেয়া হচ্ছে। অনেকে এই শ্লোগানকে এর সংক্ষেপ করে বলছেন,sustainable lifestyles. অর্থাৎ টেকসই জীবনধারা। অর্থাৎ আসুন, দীর্ঘ দিন টিকে বা বেঁচে থাকার মতো করে পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন করি।
পরিবেশের সাথে মানবসভ্যতার সম্পর্ক কতটা নিবিড় তা ফুটে উঠেছে আজ থেকে ১৬০ বছর আগে আমেরিকার ১৪তম প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাংকলিন পিয়ার্সের কাছে আমেরিকার এক নাম না জানা রেড ইন্ডিয়ান সরদারের লেখা একটি চিঠিতে।  ১৮৫৪ সালে আমেরিকার তৎকালীন রাষ্ট্রপতি সিয়াটলে বসবাসরত রেড ইন্ডিয়ানদের নির্দেশ দেন  তারা যেন তাদের নিজেদের বসতি (সিয়াটল) ছেড়ে চলে যায়। কারণ সেখানে একটি আধুনিক সভ্য শহর গড়ে তোলা হবে। তখন সিয়াটলের সেই রেড ইন্ডিয়ান সর্দার আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে আবেগময়ী ভাষায় যে চিঠিটি লিখেছিলেন সেখানে সরদার নিজেকে লাল মানুষ আর আমেরিকানদের সাদা মানুষ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এর শিরোনাম ছিলো : ওয়াশিংটনের বড় সাদা সরদারের কাছে সিয়াটল উপজাতি প্রধানের চিঠি। পরিবেশবাদী লেখক বিপ্রদাশ বড়ুয়ার তাঁর এক লেখায় চিঠিটির যে বাংলা অনুবাদ তুলে ধরেছেন তা হলো :
“কী  করে তোমরা বেচাকেনা করবে আকাশ, ধরিত্রীর উষ্ণতা? আমরা তোমাদের চিন্তা বুঝতে পারি না। বাতাসের সতেজতা, জলের ঝিকমিক  আমরা তো এগুলোর মালিক নই, তবে তোমরা আমাদের থেকে এগুলো কিনবে কী করে? এই ধরিত্রীর প্রতিটি অংশই আমাদের লোকদের কাছে পবিত্র। পাইন গাছের প্রত্যেকটি চকচকে ডগা, বালুকাময় প্রতিটি সমুদ্রতট, অন্ধকার বনভূমিতে জমে থাকা কুয়াশা, প্রতিটি প্রান্তর, পতঙ্গের গুনগুন আমার লোকদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও স্মৃতিতে পবিত্র। প্রতিটা বৃক্ষের ভেতর দিয়ে যে বৃক্ষরস প্রবাহিত হচ্ছে তারা লাল মানুষদের স্মৃতি বয়ে নিয়ে চলেছে। সাদা মানুষদের মৃতেরা তাদের নিজেদের দেশকে ভুলে দূর আকাশের তারার কাছে স্বর্গে চলে যায়, আমাদের মৃতেরা এই সুন্দর পৃথিবীকে কখনও ভোলে না, কেননা এই পৃথিবী লাল মানুষদের মা। আমরা এই ধরিত্রীর অংশ, এও আমাদের অংশ। সুগন্ধ ফুলগুলো আমাদের বোন, হরিণ, ঘোড়া, বিশাল ঈগল পাখিÑ এরা সবাই আমাদের ভাই। পাহাড়ের পাথুরে সব গহবর, সরস মাঠ, ঘোড়ার বাচ্চার গায়ের যে-উষ্ণতা আর মানুষ সবকিছু মিলে আমাদের একই পরিবার। তোমরা আমাদের বল যে তোমরা আমাদের  দেশ নেবে আর বিনিময়ে আমাদের বাস করার জন্য একটা রিজার্ভ অঞ্চল দেবে যেখানে আমরা আরামে থাকব। আমরা তোমাদের কথা বিবেচনা করে দেখব। কিন্তু এটা এত সহজ নয়।porib4 এই ভূমি আমাদের কাছে পবিত্র। যদি আমরা এই ভূমি তোমাদের দিয়ে দিই তাহলে তোমাদের মনে রাখতে হবে যে এই ভূমি পবিত্র। তোমরা তোমাদের ছেলেমেয়েদেরও নিশ্চয়ই করে শেখাবে এর পবিত্রতার কথা। তাদের শিখিও যে এখানকার হ্রদগুলোর পরিষ্কার জলের মধ্যে দেখতে পাওয়া যে কোন রহস্যময় ছায়াই আমাদের মানুষদের জীবনের কোন না কোন ঘটনার স্মৃতি। ঝরণাগুলোর জলের মর্মরে আমার বাবার ও তার পিতৃপুরুষদের স্বর শোনা যায়।
নদীরা আমাদের ভাই, তারা আমাদের তৃষ্ণা মেটায়। নদীরা আমাদের ক্যানো (নৌকা) বয়ে নিয়ে যায়, আমাদের ছেলেমেয়েদের মুখে খাবার জোগায়। যদি আমরা আমাদের দেশ তোমাদের দিই তাহলে তোমরা মনে রেখো, তোমাদের ছেলেমেয়েদের শিখিও  যে নদীরা মানুষের ভাই সুতরাং তোমরা নদীদের সে রকমই যতœ করো, যেমন তোমরা তোমাদের ভাইদের করো। আমরা জানি সাদা মানুষেরা আমাদের ধরনধারণ বোঝে না। তার কাছে পৃথিবীর এক অংশের সঙ্গে অন্য অংশের কোন তফাৎ নেই। কেননা সে ভিনদেশী রাত্রির অন্ধকারে আসে, নিজের যা দরকার মাটির কাছ থেকে  কেড়েকুড়ে নিয়ে চলে যায়। এই ধরিত্রী তার আত্মীয় নয়, তার শত্রু। সে একে জয় করে, তারপর ফেলে দিয়ে যায়। সে পেছনে ফেলে দিয়ে যায় তার নিজের পিতার কবর, কিছুই মনে করে না। নিজের সন্তানদের কাছ থেকে পৃথিবীকে সে চুরি করে, কিছুই তার মনে হয় না। সাদা মানুষদের শহরে কোথাও শান্ত নিরিবিলি জায়গা নেই যেখানে বসে বসন্তকালে পাতার কুঁড়িগুলোর খুলে যাওয়ার শব্দ শোনা যায়।poribas6 অবশ্য হয়তো আমরা জংলী বলেই আমাদের এ রকম মনে হয়। জীবনের কী মূল্য আছে একজন লোক যদি জলের ঘূর্ণির মধ্যে আপন মনে একাকী গুনগুন করার শব্দ শুনতে না পায়? আমি একটা লাল মানুষ, আমি তোমাদের শহরের কিছু বুঝতে পারি না।
আমরা, লাল লোকেরা ছোট পুকুরের জল ছুঁয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসের হালকা শব্দ শুনতে ভালোবাসি, ভালোবাসি দুপুরের বৃষ্টিতে ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে যাওয়া বাতাসের নিজস্ব গন্ধ, পাইন বনের গন্ধ। আমরা তোমাদের দিয়ে যাবো আমাদের জমি, আমাদের বাতাস। মনে রেখো, এই বাতাস, এই জমি আমাদের কাছে মূল্যবান, কেননা জন্তু, গাছ, মানুষ সবার নিশ্বাস এই একই বাতাসের মধ্যে ধরা আছে। যে বাতাস আমাদের পূর্ব-পুরুষের বুকে তার প্রথম বাতাসটি দিয়েছিল, সেই তার শেষ নিঃশ্বাসটিকে ধরে রেখেছে। তোমরা তোমাদের সন্তানদের শিখিও যে তাদের পায়ের তলায় যে মাটি, তাতে আছে তাদের পিতৃপুরুষের দেহাবশেষ, তাই মাটিকে যেন তারা শ্রদ্ধা করে। তোমাদের সন্তানকে শিখিও এই মাটিতে আছে তাদের পূর্বজদের ছাই। আমাদের স্বজনদের প্রাণ মাটিতে মিশে একে সমৃদ্ধ করেছে। এ কথা আমরা জানি যে পৃথিবী মানুষের সম্পত্তি। মানুষই পৃথিবীর। আমরা এ কথা জানি। প্রতিটি জিনিসই একে অন্যের সাথে বাঁধা যেমন রক্তের সম্পর্কে একটা পরিবারের লোকদের বেঁধে রাখে। সবকিছুই একে অন্যের সাথে বাঁধা। এই পৃথিবীর যা হবে পৃথিবীর সন্তানদেরও তাই হবে। জীবনের এই ছড়ানো জাল, মানুষ একে  বোনেনি সে কেবল একটা সুতো মাত্র। এই জালটিকে সে যা করবে তার নিজেরও হবে ঠিক তাই। এমনকি সাদা লোকেরা, যাদের ঈশ্বর বন্ধুর মত তাদের সাথে চলাফেরা করেন, কথা বলেন, তারাও সকলে এই সাধারণ নিয়তির বাইরে নয়। শেষ অবধি হয়ত দেখা যাবে যে আমরা সকলেই একে অন্যের ভাই।poribas5 যে কথা আমি জানি, হয়ত একদিন সে কথা সাদারা বুঝতে পারবে যে আমাদের ঈশ্বর আসলে একই।”
সিয়াটলের রেড ইন্ডিয়ান সরদার এক শতাব্দী আগে পরিবেশের সাথে মানবসভ্যতার যে সম্পর্ক উপলব্ধি করেছিলেন আজকের এই বস্তুবাদী সভ্যতাগর্বী আধুনিক মানুষরা কি তা উপলব্ধি করতে পারছে? অবশ্যই পারছে না। যদি পারত তাহলে আমাদের বুড়িগঙ্গা নর্দমায় পরিণত হতো না, শীতলক্ষ্যা হতো না কেমিক্যালের বিষে নীল, তুরাগ আর বালু নদীর বুকে গড়ে উঠতো না আকাশছোঁয়া অট্টালিকা।
তিতাস হতো না একটি মরা নদীর নাম, আন্তর্জাতিক সম্পত্তি গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্রের উজানে ৫৪টি বাঁধ দিয়ে কোন আগ্রাসী শক্তি মানুষ আর জীববৈচিত্র্যের ঘাতকে পরিণত হতো না। নৌপথ বানিয়ে নষ্ট করা হতো তা বিশ্ব জীবনবৈচিত্র্যের মূল্যবান সম্পদ সুন্দরবন।
আমাদের সবাইকে বুঝতে হবে নিজের লাভটাকে সবার ওপরে স্থান দিয়ে আগ্রাসী জীবনযাপন করলে পরিবেশ বাঁচবে না। পরিবেশ না বাঁচলে পৃথিবী টিকবে না। পৃথিবী না থাকলে আমরা কেউ বাঁচবো। আমাদের আগামী প্রজন্ম হারিয়ে যাবে। হারিয়ে যাবে মানবসভ্যতা। আর এ জন্যই আমাদের সবার দায়িত্ব পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন করে মানবসভ্যতাকে টিকিয়ে রাখা।

SHARE

Leave a Reply