Home স্মরণ জায়ান্ট অব হিস্টরি

জায়ান্ট অব হিস্টরি

রাশেদুল হাসান রানা#

খুব কম রাষ্ট্রনায়কই আছেন, যারা কিংবদন্তি হতে পেরেছেন। রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন অথচ জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সমানভাবে জনপ্রিয় থেকেছেন সে সংখ্যা কিন্তু খুব বেশি নয়। ক্ষুদ্র নগররাষ্ট্র সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা লি কুয়ান ইউর কথা বলছি, যিনি গত ২৩ মার্চ ২০১৫ মারা গেছেন। তিনি একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক, অন্তত আজকের সিঙ্গাপুরের রূপকার হিসেবে এই কথা বলা যায় নির্দ্বিধায়। যখন তিনি মারা যান তখন তার বয়স ৯১ বছর। একটি ছোট বন্দর নগর সিঙ্গাপুরকে এশিয়ার অন্যতম সমৃদ্ধ অর্থনীতির দেশে রূপান্তর এবং আধুনিকায়নে লি কুয়ান ইউর অবদান বিশাল। যদিও তিনি দীর্ঘদিন ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের জন্য যৎসামান্য সমালোচনার মুখেও পড়েছিলেন।
জন্ম
১৯২৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর লি কুয়ানের জন্ম। তখন তাঁর বাবার বয়স ছিল ২০ বছর। ব্রিটিশ সা¤্রাজ্য শক্তি অজেয় এমন ধারণার মধ্যেই তিনি বেড়ে ওঠেন। তবে ইউরোপীয় শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা ধূলিসাৎ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি বাহিনী খুব সহজেই ব্রিটিশ বাহিনীকে হারিয়ে সিঙ্গাপুর দখল করে নিলে তিনি প্রচন্ড ধাক্কা খান।
শিক্ষাজীবন
শৈশবে লেখাপড়া শুরু করেন তেলোক কুরা প্রাইমারি স্কুলে। এ সময় তিনি ছিলেন অতি দরিদ্র এক ছাত্র। এরপর তিনি পড়ালেখা করতে যোগ দেন র‌্যাফলস ইনস্টিটিউটে। যদিও সেখানের পরিবেশের সঙ্গে তিনি মানিয়ে নিতে খুব সঙ্কটে পড়েন, কারণ ঐ প্রতিষ্ঠানে পড়াশুনা করতে সিঙ্গাপুরের সেরা ১৫০ জন ছাত্র গিয়েছিলেন। তিনি আত্মবিশ্বাস নিয়ে সফলতা অর্জনের চেষ্টা করেন। যোগ দেন স্কাউটসে। খেলতেন ক্রিকেট, টেনিস, দাবা, করতেন বিতর্ক। ক্যামব্রিজে জুনিয়র হিসেবে পড়ালেখা করার সময় তিনি বেশ কয়েকটা বৃত্তিও লাভ করেন। অর্জন করেন ব্যাপক সফলতা। এক পর্যায়ে সিঙ্গাপুর ও মালয়ে তিনি সেরা ছাত্র হয়ে ওঠেন। ১৯৪২ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে তার পড়ালেখা বিলম্বিত হয়ে পড়ে, এ সময় তিনি জাপানি ভাষা শিখতে শুরু করেন। ১৯৪৬-৫০ সাল পর্যন্ত তিনি লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিস্ট ও পলিটেকনিক্যাল সায়েন্সে পড়াশুনা করেন। ইউনিভার্সিটি অব ক্যামব্রিজে।
রাজনৈতিক ক্যারিয়ার
১৯৫০ সাল থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত আইন বিষয়ে চর্চা করেন। একটি ট্রেড ইউনিয়নের লিগ্যাল অ্যাডভাইজার হন। নীতিনির্ধারণী কাউন্সিল বা লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে সিঙ্গাপুরের মানুষের কথা সীমিত হওয়ায় তিনি হতাশা প্রকাশ করেন। তাই তিনি সক্রিয় রাজনৈতিক আন্দোলনের কথা ভাবতে থাকেন। ১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন পিপলস অ্যাকশন পার্টি। ১৯৫৫ সালে পার্লামেন্ট নির্বাচনে তিনি বিজয়ী হন। ১৯৫৯ সালের জাতীয় নির্বাচনে তিনি পিপলস পার্টিকে নেতৃত্ব দিয়ে বিজয়ী করেন। এবং ৩৫ বছর বয়সে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ১৯৬৩ সালে সিঙ্গাপুর, মালয় ও সাবাহ মালয়েশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়। এ সময়ে মালয়েশিয়াকে স্বাধীনতা দেয় ব্রিটেন। ১৯৬৫ সালে মালয়েশিয়া থেকে স্বাধীন হয় সিঙ্গাপুর।
স্বাধীন সিঙ্গাপুর
সিঙ্গাপুর স্বাধীন হয়েছে এমন ঘোষণায় কেঁদে ফেলেন লি। তিনি প্রতিষ্ঠা করেন স্বরাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। মাত্র ৫০ কর্মকর্তা আছে এমন দু’টি ব্যাটালিয়ন, ১০০০ সদস্য ও দু’টি জাহাজ নিয়ে সিঙ্গাপুর স্বাধীন হয়। তখনও ছিল না বিমানবাহিনী। আর এখন চীন, জাপান ও যুক্তরাজ্যের চাইতেও সামরিক খাতে বেশি ব্যয় করে সিঙ্গাপুর। ১৯৬৭ সালে শুরু হয় ন্যাশনাল সার্ভিস। ১৯৬৮ সালে সিঙ্গাপুর যাত্রা শুরু করে ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক অব সিঙ্গাপুর, বর্তমানে এই ব্যাংকটি হলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সর্ববৃহৎ ব্যাংক। ১৯৭২ সালে যাত্রা শুরু হয় সিঙ্গাপুর এয়ার লাইনসের, বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ততম বিমানবন্দর হচ্ছে সিঙ্গাপুর বিমানবন্দর। দায়িত্ব গ্রহণের পর লি সিঙ্গাপুরকে ক্রমশ এক আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পরিণত করেন। এশিয়ার সবচেয়ে সমৃদ্ধ, নিরাপদ ও স্থিতিশীল সমাজে পরিণত হয় সিঙ্গাপুর। জনশক্তি ঘাটতি পূরণ করতে দক্ষভাবে বিদেশী শ্রমিক কাজে লাগান। উন্নয়নের মডেল হিসেবে তিনি দেশে-বিদেশে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হন। বিশেষ করে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হয়ে অন্যরা যখন সংঘাত, অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনায় আক্রান্ত, তখন লি কুয়ান সিঙ্গাপুরের ব্যাপক উন্নতি ঘটান। তিনি দেশটিতে ব্যাপক শিল্পায়নের উদ্যোগ নেন। এবং বিদেশী বিনিয়োগকে উৎসাহিত করেন। সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করেই ঘুরতে থাকে অর্থনীতির চাকা। তাঁর ছেলে লি সিয়েন লুংই বর্তমানে সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী।
জায়ান্ট অব হিস্টরি
আধুনিক সিঙ্গাপুরের জনক বলা হতো লি কুয়ানকে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাই তাকে জায়ান্ট অব হিস্টরি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। কারণ বিশ্ব নেতারা তার পরামর্শ শুনতেন এবং মানতেন। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন তাকে আখ্যায়িত করেছেন বিশ্বরাজনীতির প্যান্ট্রিয়াক হিসেবে। চীনের প্রেসিডেন্ট সি- জিনপিং বলেছেন, লি কুয়ান ইউ ছিলেন বিশ্বব্যাপী একজন সম্মানিত ব্যক্তি ও রাষ্ট্রনায়ক। ১৯৫৯ সালে তিনি সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী হন এবং ১৯৯০ সালে তিনি পদত্যাগ করেন।
বাংলাদেশ থেকে মাত্র ৬ বছর আগে স্বাধীন হওয়া অত্যন্ত দারিদ্র্যপীড়িত এই দেশটি আজ পৃথিবীর মানচিত্রে সমৃদ্ধির কত বড় জায়গা দখল করে আছে যার উল্লেখযোগ্য অবদান লি কুয়ান ইউর। সে জন্যই তাকে আধুনিক সিঙ্গাপুরের জনকও বলা হয়ে থাকে। দেশপ্রেম এবং দুর্নীতিমুক্ত একটি সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন লি।

SHARE

Leave a Reply