Home প্রতিবেদন শিশুশ্রম রাষ্ট্রীয় অবহেলায় অনিশ্চিত গন্তব্যে

শিশুশ্রম রাষ্ট্রীয় অবহেলায় অনিশ্চিত গন্তব্যে

আব্দুল হাদী আল-হেলালী#

আগেই বলে রাখি, ‘শিশুশ্রম’ শব্দটি এখন সমাজের জন্য এক ধরনের উপদ্রব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার মানে বলছি না, সামাজিকভাবে শিশুশ্রম বন্ধে আমরা পুরোপুরি ব্যর্থ। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে বিশাল পার্থক্য থাকায় শিশুশ্রম থেকে মুক্তি মিলছে না। গত এক দশকে বহু পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলেও ভাগ্য ফেরেনি কোনো শিশুশ্রমিকের। এমনকি বর্তমানে দেশে শিশুশ্রমিকের সংখ্যা কত তারও কোনো হিসাব নেই।
শিশু অধিকারের পক্ষে আন্দোলনকারীরা বলছেন, সঙ্কট নিরসনে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না থাকায় এবং নিজেদের সামাজিক বাস্তবতার কারণে শিশুরা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শ্রম দিতে বাধ্য হচ্ছে। শোচনীয় অবস্থায় যেসব শিশু কাজ করতে বাধ্য হয় তাদের পুনর্বাসন করা ছাড়া উপায় নেই। যারা শিশুদের দিয়ে কাজ করাচ্ছেন তারাও বলছেন গত এক দশকে পরিস্থিতির তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি।
ধোলাইখালের ব্যবসায়ী হাশেম সরদারের দোকানে ১০ শিশু কাজ করে। হাশেম সরদার জানান, এসব শিশুর সুন্দর ভবিষ্যৎ তিনিও চান। কিন্তু তিনি যদি তাদের অর্থ উপার্জনের সুযোগ না দেন তাহলে এই শিশুদের না খেয়ে থাকতে হবে। যারা শিশুশ্রম নিরসনে কাজ করছেন তারা আসলে কোনো দিন এসব শিশুর সঙ্গে কথা বলেননি। এমনকি এসব শিশু কী চায় তাও তারা জানেন না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শিশু অধিকার নিয়ে যেসব সংগঠন কাজ করছে তাদের মধ্যেও রয়েছে ভিন্নমত। কেউ কেউ শিশুশ্রমিকদের শিক্ষা দেয়ার জন্য জোর দিলেও অন্যরা শিশুশ্রমই বিলীন করার পক্ষে। এদের পুনর্বাসনে যদিও কার্যকর কোনো কর্মসূচি আজও প্রণীত হয়নি।
১১ বছর বয়স থেকে রায়হান প্রায় ১০০ শিশুর সঙ্গে এক ট্যানারিতে কাজ শুরু করে। এখন তার ১৯ বছর। সে জানাল, খুব খারাপ কাজের পরিবেশের মধ্য দিয়ে আট বছর ধরে কাজ করছে পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতার জন্য। তাকে বেশ কয়েকবার অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণের জন্য বলা হলেও সে এ সুযোগ গ্রহণ করেনি। তার কথায়, ‘যেখানে দেশে এতো বেশি বেকার সেখানে রাস্তার শিক্ষা দিয়ে কেউ তাকে চাকরি দেবে না।’
দশ বছরের টুটুলের ঘটনা অন্যরকম। সে আগে একটি ব্যাটারি পুনঃনবায়ন কারখানায় কাজ করতো। সুযোগ পাওয়া মাত্র টুটুল অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করে। দেড় বছরের মাথায় শিক্ষক জানান তার পড়া শেষ। হতাশ টুটুল অসম্পূর্ণ শিক্ষা আর প্রচন্ড পরিশ্রমের কাজে ফিরতে না চাওয়ার ইচ্ছা থেকে এখন মাদক ব্যবসায়ী।
অনেক শিশুশ্রমিক জানিয়েছে, কেউই তাদের কোনো বিকল্প দিতে পারছে না বলে স্বেচ্ছায় তারা কাজ করছে।
মানবাধিকারকর্মীরা মনে করেন, শিশুদের জন্য কার্যকর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে শিশুশ্রম বন্ধ করে দিলে অনেক শিশুর জীবন বিপন্ন হয়ে পড়বে। বিশিষ্ট অধিকারকর্মীর মতে, ‘যদি আমরা সীমিত সময়ের জন্য নিরাপদ পরিবেশে শিশুদের কাজ করাই তাহলে তা তাদের এবং পরিবারের কাজে লাগবে। লোকজন যদি শিশুদের অভিজ্ঞতার কথা শোনে এবং কাজের নিরাপদ নিশ্চিত করে তাহলে শিশুদের বিপথগামী হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করা যাবে।’
রাজধানীর শ্রমঘন এলাকায় প্রায় ৫০ হাজার শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। অথচ এদের থাকার কথা ছিলো ‘অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা এবং দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ ‘ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম নিরসন’ কর্মসূচিতে। এ কর্মসূচি ২০১০ সালে শুরু হয়। সব শিশুশ্রমিককে এ কর্মসূচির আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। যারা কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছে তাদেরকেও নিজেদের ব্যবসা শুরুর জন্য পর্যাপ্ত সহায়তা করা হয়নি। এ প্রকল্পের আওতায় শিশুদের বিউটি পার্লার,  মোবাইল এবং কম্পিউটার সার্ভিসিং, মোটরমেকানিক, রিকশা মেরামত এবং সেলাই  মেশিনের অপারেটরের কাজ  শেখানো হয়।
প্রকল্পে অংশ নেয়া নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কিশোরী জানায়, যারা প্রশিক্ষণ দিয়েছে তারা যদি একটি সেলাই  মেশিন না দেয় তাহলে কিভাবে এ শিক্ষা দিয়ে আয় করা সম্ভব? গার্মেন্টগুলোতে অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়েদের কাজ দেয়া হয় না বলেও জানায় সে। ২০০৩ সালের সর্বশেষ জরিপ অনুসারে দেশে ৩.২ মিলিয়ন শিশুশ্রমিক আছে। যাদের বয়স ৫ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে। ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত প্রায় ১.৩ মিলিয়ন শিশুর মধ্যে ছেলের সংখ্যা শতকরা ৯১ শতাংশ। বারবার প্রতিশ্রুতি দেয়ার পরও সরকার গত দশ বছরে নতুন শিশুশ্রম জরিপ করতে পারেনি।

SHARE

Leave a Reply