Home নাটিকা ফুল ফোটার সময়

ফুল ফোটার সময়

হুসনে মোবারক#

দৃশ্য-১
(একদল শ্রমিকের শ্লোগান দিতে দিতে মঞ্চে প্রবেশ।)
শ্লোগান : কেউ খাবে কেউ খাবে না
তা হবে না তা হবে না।
শ্রমের ন্যায্য মূল্য
দিতে হবে দিতে হবে।
শ্রমের দাম শ্রমিকের মান
সবার আগে সবার আগে।
(শ্লোগান দিতে দিতে মঞ্চ থেকে বের হয়ে যাবে।)
ঠিকাদার : এই নাও এক শ’ টাকা, তুমি এক শ’ টাকা, নাসিম মিয়া তোমার টাকা, শাহজান মিয়া নাও, পিংকি সত্তর টাকা…।
পিংকি : সত্তর টাকা ক্যান, আমি তো সমান ডিউটি করছি..।
ঠিকাদার : বেশি কথা বলো, তুমি মাইয়্যা মানুষ। মাইয়্যা মানুষের সত্তর টাকা। বুঝে খাটলে করো, না খাটলে ফুট…। এই নাও তোমার পঞ্চাশ টাকা।
দবিরুল : এ্যা আল্লাহ, এইডা কী করছেন! এই ডা তো পঞ্চাশ টেকার নোট। আফনের চশমার ফাওর কি কইম্যা গ্যাছে নাকি!
ঠিকাদার : চশমার ফাওর ঠিকই আছে, পুইসকা কোথাকার। ভাগ এইখান থেইক্যা। ছোট মানুষ, পঞ্চাশ টাকাই তো বেশি।
দবিরুল : ছোড কি মানুষ না! আমি আরো পঞ্চাশ টাকা পামু।
ঠিকাদার : বেশি কতা কইলে এইডাও রাইখ্যা দিমু, যা ভাগ।
দবিরুল : কইলেই অইলো রাইখ্যা দিমু।
(দবিরুল ঠিকাদারের হাত থেকে এক শ’ টাকার একটা নোট কেড়ে নিয়ে দৌড়ে পালায়।)
ঠিকাদার : ওই পুইসকা, ওই অরে ধর, আমার টাকা নিয়া গেলো। এই দস্যি ছেলেকে আমি ছাড়বো না বলে দিচ্ছি। কত বড় সাহস। পালিয়ে যাবে কোথায়। বস্তির ডেরা থেকে ধরে নিয়ে আসবো।

দৃশ্য-২
(দবিরুলদের বস্তি। অসুস্থ মা। দবিরুলের ৯ বছরের বোন রেশমী।)
দবিরুল : খাও মা, ওষুধটা খাইয়্যা লও। আর একদিন কাম করলেই বাকি ওষুধ নিয়া আসতে পারমু। তুমি কোনো চিন্তা কইরো না মা।
রেশমী : ভাই, আমি আর স্কুলে যামু না। তুর লগে কামে যামু। কাম করুম।
দবিরুল : বেশি কথা কওনের কাম নাই। বড় বড় কতা কয়, কাম করমু। কামে যাওয়ার দরকার নাই। স্কুলে যাবি। পড়ালেহা করবি। অনেক বড় হইতে অইবো।
রেশমী : মায় যদি না বাঁচে, তয় বড় অইয়া কী অইবো। তুমিতো মায়ের ওষুধ কিনতা পারো না। মায়ও কামে যাইতে পারে না…।
দবিরুল : কান্দিস না বইন। কান্দিস না। আমি ঠিকই কাইল ওষুধ কিইন্যা নিয়া আইমু। মারে আমি মরতে দিমু না। মায় ছাড়া আমাগো আর কে আছে।
দবিরুলের মা : আমার লাইগ্যা চিন্তা করিস না। তোগরে একটা ভালো কামে লাগাইতে পারলে আমি মইরাও শান্তি পামু।
(দবিরুলদের বস্তিতে ঠিকাদারের প্রবেশ।)
ঠিকাদার : দবিরুল!
দবিরুল : ভুল অইয়্যা গ্যাছে স্যার! মায়ের অসুখ তো। টেকা না পাইলে ওষুধ কিনতে পারুম না। আমারে মাফ কইরা দেন স্যার!
দবিরুলের মা :  কে আইছেরে দবি! কার কাছে মাফ চাস? ওনারে বসতে দে।
ঠিকাদার : না না, ঠিক আছে। বসতে হবে না। তোমাকে দেখে আমি অবাক হচ্ছি দবিরুল। মায়ের অসুখ, বোনের পড়ালেখা। সত্যিই তুমি ভুল করোনি। আমিই তোমার ন্যায্য পাওনা না দিয়ে ভুল করেছি। তোমাকে আমার পুরো টাকাই দেয়া উচিত ছিলো।
দবিরুল : তাইলে স্যার আমি এখন থেইক্যা পুরা টেকা পামু?
ঠিকাদার : হ্যাঁ, পুরো টাকাই পাবে। কিন্তু এই বয়সে তোমার তো স্কুলে থাকার কথা। আর তা ছাড়া শিশুশ্রম তো নিষিদ্ধ।
দবিরুল : আমি স্কুলে গেলে আমার মায়ের অসুখ ভালা অইবো ক্যামনে স্যার!
দবিরুল : তোমার মায়ের অসুখ ভালো হবে ইনশাআল্লাহ। এই নাও, এই টাকা দিয়ে ওষুধ কিনবা। আর এখন থেকে তোমাদের দুই ভাইবোনের পড়ালেখার খরচ আমি দিবো। তোমরা স্কুলে যাবা। পড়ালেখা করবা। অনেক বড় হবা। এই বয়সে স্কুলটাই তোমাদের আসল জায়গা। আসল কাজ পড়ালেখা। শিশুশ্রমের কারণে অঙ্কুরেই বিনষ্ট হতে পারো না তোমরা। ফুল ফোটার সময়েই তোমরা ঝরে পড়তে পারো না।
(ঠিকাদার আবেগাপ্লুত হয়ে যান। চশমার ফাঁক দিয়ে গাল গড়িয়ে দুই ফোঁটা পানি বেরিয়ে আসে।)

SHARE

1 COMMENT

  1. অসাধারণ গল্প,খুবই ভালো লাগলো।গল্পটি পড়তে গিয়ে আমার চোখ দিয়ে অস্রু চলে আসে।

Leave a Reply