Home গল্প মূল্যায়ন

মূল্যায়ন

আশরাফ জামান#

এক দেশের কথা।
দেশের বাদশাহ ও তার প্রধানমন্ত্রী উভয়েই ছিলেন যেমন বুদ্ধিমান তেমনি জনহিতৈষী। দেশের জনগণ বাদশাহকে সম্মান করতো এবং ভালোবাসতো। বাদশাহও প্রজার দুঃখ-দুর্দশার আশু প্রতিকার করতেন। যে কোন রকমের অসুবিধায় দৃষ্টি দিতেন।
বাদশাহর ছিল এক বুদ্ধিমান মন্ত্রী। যাকে তিনি মন্ত্রীদের প্রধান হিসেবে মর্যাদা দিতেন। নানা প্রয়োজনে তার বুদ্ধি পরামর্শ মেনে নিতেন বাদশাহ। বাদশাহর মনে একদিন এক খেয়াল চাপলো। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে ডেকে বললেন, আচ্ছা মন্ত্রী বলো দেখি অর্থ বা সম্পদের মূল্য বেশি না জ্ঞান বা বিদ্যার মূল্য বেশি?
মন্ত্রী চুপ করে রইলেন। তাৎক্ষণিক কোন উত্তর তিনি দিলেন না। একটু ভেবে জবাব দিলেন, জাঁহাপনা! এর জবাব এক কথায় দেয়া যায় না। তবে সাধারণভাবে বলতে পারি অর্থ বা সম্পদের মূল্য কোথাও বেশি আবার কোথাওবা জ্ঞান বা পান্ডিত্যের মূল্য অধিক।
বাদশাহ সন্তুষ্ট হতে পারলেন না। রাগতস্বরে বললেন, মন্ত্রী এভাবে প্রশ্ন এড়ালে চলবে না। তোমাকে একটি দিক গ্রহণ করে যুক্তি দেখিয়ে উত্তর দিতে হবে। যদি বল অর্থ বা সম্পদের মূল্য বেশি তাহলে তার ওপর যুক্তি দেবে আর যদি বিপরীত মত গ্রহণ কর তবুও তার ওপর তোমাকে যুক্তি দেখাতে হবে। তোমাকে সাতদিন সময় দেয়া হলো যথার্থ জবাব না দিতে পারলে শাস্তি হবে মৃত্যুদন্ড।
এবার মন্ত্রীর টনক নড়লো। মন্ত্রীর চোখে ঘুম নেই, শান্তি নেই মনে। আরাম আয়েশ সব বিসর্জন দিয়েছেন। অনেক ভাবতে ভাবতে একটা উপায় খুঁজে বের করলেন মন্ত্রী। পরদিন দরবারে বাদশাহকে গিয়ে জানালেন তার চিন্তাধারার কথা। তিনি বললেন জাঁহাপনা! আমি চিন্তা করে খুঁজে পেয়েছি এর সঠিক উত্তর।
বাদশাহ বললেন, বল তোমার কথা? মন্ত্রী বললেন, জাঁহাপনা! অর্থ বা সম্পদের তুলনায় জ্ঞান বা বিদ্যা অনেক বেশি মূল্যবান।
এমনকি একটার সঙ্গে অপরটার তুলনাই করা যায় না।
বাদশাহ বললেন, যুক্তি দিয়ে তোমাকে প্রমাণ করতে হবে নইলে আমি মেনে নেবো না।
মন্ত্রী বললেন, হুজুর আগামী কাল দরবারে জনসমক্ষে যুক্তি প্রমাণ দ্বারা আমি তা দেখিয়ে দেবো।
পরদিন রাজ্যে ঢোল পেটানো হলো।
ঘোষণায় দেশের বড় বড় ধনবান ও সম্পদশালী ব্যক্তিদের শাহি দরবারে আসবার জন্য নির্দেশ দেয়া হলো। আরো আসার জন্য নির্দেশ দান করা হলো দেশের বিজ্ঞ পন্ডিত ও জ্ঞানী বা বিদ্বান ব্যক্তিবর্গের।
নির্দিষ্ট দিনে সকাল থেকে লোকজন আসতে লাগলো রাজদরবারে। রাজ্যের অনেক লোক এসে বাইরেও জমায়েত হলো এ দৃশ্য দেখাার জন্য।
দেশের শত শত পন্ডিত ও জ্ঞানতাপস এসে আসন গ্রহণ করলেন রাজদরবারের একদিকে। অপর দিকে দেশের বড় ধনশালী ব্যক্তিরা এসে আসন গ্রহণ করলেন।
বাদশাহ সকল ব্যক্তিবর্গ বা আমন্ত্রিত অতিথিদের সম্মানে খানাপিনার ব্যবস্থাও করেছেন। সকলের খানাপিনা ও সম্মান প্রদর্শনের পর আলোচনা শুরু হলো। বাদশাহ সকলের উদ্দেশে সম্মান জানিয়ে আলোচনার বিষয়টি পুনরায় অবগত করালেন এবং উপস্থিত ব্যক্তিদের উদ্দেশে ও সকলকে যুক্তিতর্কের মাধ্যমে স্ব-স্ব পক্ষের বক্তব্য রাখার সুযোগ দিলেন।
প্রথমে অর্থবানদের স্বপক্ষে বলার সুযোগ দেয়া হলো। অর্থবান বা সম্পদশালী ব্যক্তিরা কেউবা কোটিপতি আবার কেউবা অগাধ সম্পত্তি বা মিলকারখানার মালিক। এদের মধ্য থেকে একজন উঠে গর্ব করে বললেন, জাঁহাপনা! আমার কোটি কোটি টাকার ব্যাংক ব্যালান্স আছে। আপনি রাজকার্যে দেশের যেকোন প্রয়োজনে বলুন আমি আপনাকে সহযোগিতা করতে পারবো। ঐ অর্থহীন বিত্তহীন পন্ডিতবর্গ ওরা কি পারবেন আপনাকে সাহায্য করতে?
বাদশাহ বললেন, ঠিক! রাজ্য পরিচালনা, অন্য রাজ্যের আক্রমণে বা সেনাবাহিনীর প্রয়োজনে সকল ব্যাপারেই অর্থ সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বন্ধু।
এবার পন্ডিতদের পালা। পন্ডিতদের মধ্যে থেকে জীর্ণবস্ত্র পরিহিত এক বয়োবৃদ্ধ জ্ঞানতাপস দাঁড়ালেন তিনি বলেন, জাঁহাপনা! যদি অনুমতি দেন তবে বলিÑ হ্যাঁ বলুন।
পন্ডিতবর বললেন, অর্থ সর্বক্ষেত্রেই মূল্যবান নয়, অর্থ দিয়ে উনারা সাহায্য করতে পারেন বলেছেন। কিন্তু আপনি বলুন সহ¯্র সৈন্যদের একজন মাত্র সেনাপতি কি দিয়ে বশ করে? অর্থ দ্বারা ক্রয় করা অস্ত্র দিয়ে নয়, বুদ্ধি ও মেধা দিয়ে।
বাদশাহ বললেন, তা ঠিক।
এবার অপর একজন অর্থশালী উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, জাঁহাপনা। এখানে পন্ডিতগণ যারা এসেছেন আমি ইচ্ছে করলে এদের সকলকে চাকরি দিয়ে আমার অধীনে কর্মচারী নিয়োগ করতে পারি সে ক্ষমতা আমার আছে।
বাদশাহ বললেন, হ্যাঁ তা-ও পারেন।
অপরপক্ষে এক পণ্ডিত দাঁড়িয়ে বললেন, তা ঠিক তবে আপনি আমাদের চাকরি দিয়ে অর্থনৈতিক সুবিধা দান করতে পারেন কিন্তু বিনিময়ে আমাদের কাছ থেকে যা নেবেন তা হলো বুদ্ধি ও জ্ঞান যা আপনাদের নেই।
বাদশাহ এবার চুপ করলেন।
বিত্তবানদের পক্ষ থেকে একজন দাঁড়িয়ে বললেন, জাঁহাপনা! পন্ডিত ব্যক্তিদের চেয়ে আমাদের দ্বারা আপনার উপকার অনেক বেশি হতে পারে। রাজ্যের প্রয়োজনে আমরা হাজার হাজার একর জমিজমা দান করতে পারি যা পন্ডিতেরা পারেন না।
বাদশাহ খুশি হলেন। এবার তিনি তাকালেন প্রধানমন্ত্রীর দিকে। বললেন, মন্ত্রীবর! তোমার যুক্তি এখনো দেখাতে পারোনি। শেষ জবাব আমি তোমার কাছে চাই। তুমি অতিসত্বর তোমার পক্ষ অবলম্বন করে উত্তর দাও তোমার সময় শেষ হয়ে আসছে।
মন্ত্রী মহোদয় একবার করুণ দৃষ্টিতে সকলের দিকে তাকালেন। মনে তার দৃঢ়তা রয়েছে। তারপর তিনি দাঁড়িয়ে বাদশাহর দিকে তাকিয়ে বললেন, হুজুর এক জরুরি ঘোষণার মাধ্যমে দেশের সকল অর্থ ও সম্পদশালী ব্যক্তিদের উদ্দেশে জানিয়ে দিন যে, আমাদের রাজ্য বিপদগ্রস্ত। অন্য রাজা আমাদের ওপর হস্তক্ষেপ করছে কাজেই অর্থবান সকল ব্যক্তির কাছে যত নগদ অর্থ আছে এবং তাদের যে ভূসম্পত্তি রয়েছে এই মুহূর্তে তা বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করা হলো। দেশের প্রয়োজনে সমস্ত অর্থ রাজ কোষাগারে জমা দিতে হবে এবং সমস্ত সম্পত্তি রাজ্যের মালিকানায় যাবে।
মন্ত্রী মহোদয়ের এই বক্তৃতা শুনে অর্থশালী ও সম্পদশালীরা হতভম্ব হয়ে গেল। এমনকি কেউ কেউ ভয় পেয়ে গেল, সত্যি না আবার মন্ত্রীর ঘোষণা বাস্তবায়িত হয়ে যায়।
অপরদিকে পন্ডিতবর্গের দিকে তাকিয়ে মন্ত্রী মহোদয় আবার বলতে লাগলেন, জাঁহাপনা! আর একটি ঘোষণা দিন রাজ্যে যত পন্ডিত ও বিদ্বান ব্যক্তি আছেন তাদের পান্ডিত্য, বিদ্যা ও জ্ঞান বাজেয়াপ্ত করা হলো। এগুলো রাজ কোষাগারে জমা দিতে হবে।
মন্ত্রীর এই উক্তি শুনে পন্ডিতবর্গ হাসতে লাগলেন। সমস্বরে বলতে লাগলেন, জাঁহাপনা! আমাদের বিদ্যা পাণ্ডিত্য যদি আপনার রাজ্য পরিচালনার কাজে কোন উপকারে লাগে বাজেয়াপ্ত করতে হবে না আমরা স্বেচ্ছায় তা দান করবো।
এতক্ষণে মন্ত্রী প্রাণ পেলেন। তিনি আরো বললেন, জাঁহাপনা! জ্ঞানই সত্য, বিদ্যাই সত্য। জ্ঞান হস্তান্তর করা যায় না, তাই তা ধন সম্পদের চেয়ে মূল্যবান। জ্ঞান দান করলে তা কমে না বরং বাড়ে। কিন্তু অর্থ বা সম্পদ দান করলে কমে, তাই জ্ঞানের মূল্য অধিক।
এতক্ষণে বাদশাহ মন্ত্রীর যুক্তি মেনে নিলেন এবং ধন্যবাদ জানালেন পন্ডিতবর্গকে। পুরস্কৃত করে তাদের বিদায় দিলেন।
পৃথিবীতে যুগে যুগে নবী-রাসূল, আউলিয়া, মহাপুরুষ যাঁরা এসেছেন তাঁরা জ্ঞান বা বিদ্যা নিয়ে এসে মানুষকে কল্যাণের পথে আহ্বান জানিয়েছেন।
ক্ষণস্থায়ী সম্পদ মানুষকে মুক্তি দিতে পারে না, তাই বিদ্যা বা জ্ঞান অধিক মূল্যবান।

SHARE

Leave a Reply