Home সায়েন্স ফিকশন মহাজাগতিক বন্ধু

মহাজাগতিক বন্ধু

মোহাম্মদ মুহিবুল্লাহ#

এক.
পৃথিবী এক সঙ্কটময় মুহূর্ত অতিক্রম করছে। প্রায়ই আশ্চর্যজনক সব ঘটনা ঘটছে। ঘটনাগুলো এই রকম-
২০-১০-২৯৯৯ : প্রত্যেক দিন সাধারণত সূর্যোদয়ের পর সূর্য থেকে আসা সাদা আলোয় আলোকিত হয় পৃথিবী। কিন্তু আজ তার ব্যতিক্রম। সূর্যোদয়ের পর উজ্জ্বল গোলাপি আলোয় আলোকিত হলো পৃথিবী। পৃথিবী যেন গোলাপি রঙে রঙিন হয়ে উঠল।
২২-১০-২৯৯৯ : দিনটি কোন ঘটনা ছাড়া ভালোভাবেই শুরু হলো। কিন্তু দুপুরের দিকে ঘটল অন্যরকম ঘটনা। পৃথিবীর সব গাছের পাতাগুলো হঠাৎ নীল বর্ণ ধারণ করল। এক ঘণ্টা পর পাতাগুলো আবার সবুজ বর্ণ ফিরে পেল। তবে আগের থেকে আরও গাঢ় সবুজ বর্ণ লাভ করলো। পৃথিবীবাসী ভীত হলেও তারা অনুভব করল আগের থেকেও আরামে শ্বাস গ্রহণ করতে পারছে। চার দিকের বায়ুকে পৃথিবীবাসীর আগের থেকেও সজীব মনে হলো।
২৫-১০-২৯৯৯ : উত্তর গোলার্ধে গভীর রাত। মানুষ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। দক্ষিণ গোলার্ধে মানুষ তখন কর্মে ব্যস্ত এমন সময় প্রচন্ড ভূমিকম্পে নড়ে উঠল পৃথিবী। যার মাত্রা রিখটার স্কেলে ৯.৩। এই মাত্রার ভূমিকম্পে পৃথিবী লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু আশ্চর্যজনক ঘটনা হলো এতে পৃথিবীর কোন ক্ষতিই হলো না এমনকি একটা বিল্ডিংও ভাঙল না। সব কিছু ঠিক আগের মতোই আছে। এভাবে একের পর এক রহস্যপূর্ণ ঘটনায় পৃথিবীর মানুষ ভীতসন্ত্রস্ত। যদিও এ পর্যন্ত মানুষের কোন ক্ষতি হয়নি। অফিস আদালত, ব্যবসা বাণিজ্য শিল্প-কারখানা সব বন্ধ হয়ে গেছে। অর্থনীতির চাকা অচল হয়ে পড়ছে। প্রয়োজন ব্যতীত মানুষ ঘরের বাইরে বের হচ্ছে না। সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রগুলো মানুষে ভরে গেছে। এক কথায় জনজীবন অচল হয়ে পড়ছে। পৃথিবীর বিজ্ঞানীগণ কারণ অনুসন্ধানে নেমে পড়েছেন। কিন্তু কোন কূলকিনারা করতে পারছেন না। ইলেকট্রিক নিউজ সাপ্লাইয়ারগুলো (ENS) বিভিন্ন রিপোর্ট প্রকাশ করছে বিজ্ঞানীদের সমালোচনা করে।

দুই.
ঘটনাগুলো ঘটার কয়েক সপ্তাহ আগের ঘটনা। যা ঘটেছিল আফ্রিকার একটি গ্রামাঞ্চলে। গ্রামের অনেকেই লক্ষ্য করেছিল, গ্রামের মাঠে একটি চার কোনাকৃতি মহাকাশযান। এর ভেতরে আশ্চর্য কতকগুলো প্রাণী বসা। খবর পেয়ে সরকার ও মিডিয়ার লোক যখন সেখানে পৌঁছল ততক্ষণে হাওয়া হয়ে গেছে মহাকাশ যানটি। এরপর পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় দেখা গিয়েছিল এরকম মহাকাশযান। বাংলাদেশের বাঁশখালীর প্রত্যন্ত একটা গ্রামেও কয়েকবার দেখা গিয়েছিল এরকম মহাকাশ যান। এ নিয়ে তখন কয়েকটি ENS-এ রিপোর্টও করা হয়েছিল। কিন্তু আশ্চর্যজনক ঘটনাগুলো ঘটার পর বিষয়টি চাপা পড়ে যায়।

তিন.
দ্য ওয়ার্ল্ড সায়েন্স একাডেমি ( wsa) এর ঢাকাস্থ সদর দফতর অফিসের রুদ্ধদ্বার বৈঠক চলেছে। বৈঠকে উপস্থিত আছেন বিশ্বসেরা দশজন বিজ্ঞানী wsa-এর প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত আমেরিকান মহাকাশ বিজ্ঞানী আবদুল্লাহ গাইউম, ব্রিটিশ পদার্থবিদ জন এল কনস্টাইন, অস্ট্রিয়ার জ্যোতির্বিদ জন মিচলার, বাংলাদেশী মহাকাশবিজ্ঞানী মোহাম্মদ সিফাত উল্লাহ, ইউরোপীয় ভূবিজ্ঞানী উইলিয়াম স্পেন্সার, কানাডিয়ান উদ্ভিদ বিজ্ঞানী স্টিভটেনসন, রাশিয়ান সমুদ্রবিজ্ঞানী জেমস ওয়াটসন, আমেরিকান রসায়নবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হ্যারিস, আফ্রিকান প্রাণিবিদ উসাইন ভোল্টা ও সৌদি গণিতবিদ আবু আবদুল্লাহ আল তারবানি।
wsa-এর হলরুমে পিনপতন নীরবতা। কারও মুখে কোন কথা নেই। এমন সময় গমগম করে উঠল প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ গাইউমের কণ্ঠস্বর- ‘প্রিয় বন্ধুগণ, বিশ্বসেরা বিজ্ঞানীগণ আপনারা সকলে জানেন আপনাদের কেন ডাকা হয়েছে। পৃথিবী আজ সঙ্কটময় মুহূর্ত অতিক্রম করছে। পুরো বিশ্বের মানুষ আজ আপনাদের দিকে চেয়ে আছে। আমার বিশ্বাস আপনারা ঘটনাগুলোর রহস্য খুঁজে বের করে সমাধান করতে পারবেন। এখন আমি এ ব্যাপারে আপনাদের গবেষণা ও মতামত সম্পর্কে জানতে চাই।
এরপর বাংলাদেশী বিজ্ঞানী ছাড়া প্রত্যেক বিজ্ঞানী একে একে তাদের মন্তব্য ও গবেষণা সম্পর্কে জানালেন। কিন্তু কোনটাই তেমন সন্তোষজনক প্রমাণিত হলো না। ফলে ঘটনাগুলো রহস্যজালে আবদ্ধ থেকে গেল। সভা শেষ হওয়ার আগে হলরুমে বোমা ফাটালেন বাংলাদেশী মহাকাশ বিজ্ঞানী মোহাম্মাদ সিফাত উল্লাহ। ‘এ ঘটনাগুলো নিয়ে চিন্তা করার কিছু নেই। ঘটনাগুলো সবই আমাদের মহাজাগতিক বন্ধু কর্তৃক সম্পন্ন করা হচ্ছে আমাদের কল্যাণের জন্য।’ বলে থামলেন বিজ্ঞানী সিফাত। অন্যসব বিজ্ঞানী কৌতূহলী দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে রইলেন তার দিকে। তিনি আবার ধীরে সুস্থে শুরু করলেনÑ ‘আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় দেখা যাওয়া চারকোনাকৃতি ক্ষুদ্র মহাকাশযানগুলোর কথা। বাংলাদেশের কয়েক জায়গায়ও দেখা গিয়েছিল মহাকাশযানগুলো। আমি সেখান থেকে মহাকাশযানগুলোর ফেলে যাওয়া কিছু নমুনা সংগ্রহ করেছিলাম। আশ্চর্যজনক ঘটনাগুলো ঘটার পর আমি ঘটনাগুলোর সাথে চারকোনাকৃতি মহাকাশযানগুলোর সম্পর্ক নিয়ে মিল খুঁজতে চেষ্টা করলাম। ২৭-১০-২৯৯৯ ইংরেজি তারিখ রাত্রে আমি বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করছিলাম। হঠাৎ দেখতে পেলাম আমার স্পেসীয় মিররে একটি অদ্ভুত চেহরারা ভেসে উঠলো এবং কথা বলতে শুরু করল যা আমার মাইক্রো রেকর্ডারে রেকর্ড করা আছে।’ এ পর্যন্ত বলে থামলেন বিজ্ঞানী সিফাত। তারপর মাইক্রো রেকর্ডারের সুইচ অন করে দিলেন এরপর শোনা গেল একটি অদ্ভুত চিকন কণ্ঠস্বর ‘আমি প্রিস্টলি-১০৯২, আমার সাথে আছে প্রিস্টলি-২০৯৯। প্রিস্টল গ্রহের অধিবাসী বলে আমাদের প্রিস্টলি বলা হয়। পৃথিবীবাসীর প্রত্যেকের আলাদা নাম থাকলেও আমাদের আলাদা নাম নেই, সংখ্যার ভিত্তিতে আমাদের চিহ্নিত করা হয়। আমাদের গ্রহটা প্রক্সিমা। অ্যালবাট্রাস গ্যালাক্সিতে। প্রিস্টল ডন নামক নক্ষত্রের একটি গ্রহ, যেমন পৃথিবী সূর্যের একটি গ্রহ। আমরা পৃথিবী থেকে জ্ঞান বিজ্ঞানে প্রায় পাঁচশ বছর এগিয়ে। আমিও আমার বন্ধু মহাবিশ্ব ভ্রমণে বের হই। অনেক গ্যালাক্সি পাড়ি দিয়েও কোন প্রাণীর সন্ধান পাইনি। শেষ পর্যন্ত মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে প্রবেশ করি। বিভিন্ন গ্রহ-নক্ষত্র ঘুরে পৃথিবীতে এসে প্রাণীর সন্ধান পাই। কিন্তু দেখতে পাই পৃথিবীবাসী জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রযুক্তিতে অনেক পিছিয়ে। তারা নিজেদের অনেক সমস্যা দেখতে পায় না। দেখলেও সমাধান করতে পারে না। তাই আমিও আমার বন্ধু হাত দিই কিছু সমস্যা সমাধানে। পৃথিবীর জীব সম্পদকে রক্ষা করতে যে ওজোন স্তর রয়েছে তা প্রায় ধ্বংসের কাছাকাছি মনুষ্য কর্মকান্ডের ফলে। তাই আমরা দায়িত্ব হিসেবে ওজোন স্তর ঠিক করার কাজে হাত দিই। কিন্তু ঠিক করার সময় সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মির ফলে পৃথিবীর জীব সম্প্রদায় ধ্বংস হয়ে যেতে পারে সে জন্য পৃথিবীর চারদিকে টার্কো মিডিয়াম নামক ক্ষতিকর রশ্মি শোষণকারী গোলাপি পদার্থের স্তর সৃষ্টি করে দিই। এতে পৃথিবীতে গোলাপি রঙের অক্ষতিকর সূর্যরশ্মি প্রবেশ করে। ওজোন স্তর ঠিক করার পর গোলাপি স্তর সরিয়ে ফেলি। পৃথিবীর আরেকটি সমস্যা হচ্ছে CO২ সমস্যা। মানুষের বিভিন্ন কর্মকান্ডে যে CO২ সহ অন্যান্য ক্ষতিকর গ্যাস নির্গত হয় তাও কোন স্তর ধ্বংস করে ও পরিবেশ দূষণ করে। তাই আমরা ব্লুয়িং ফ্যাক্টর BF রশ্মির সাহায্যে গাছের সবুজ পাতায় ক্লোরোফিলের পরিমাণ ও কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে দিই। BF রশ্মির ক্রিয়া চলাকালে গাছে পাতার বর্ণ নীল রঙ ধারণ করে। এর ফলে গাছের পাতাগুলো অধিক CO২ গ্রহণ ও O২ ত্যাগ করতে পারবে, এবং খাদ্য উৎপাদনও বাড়বে। বায়ুতে বিভিন্ন গ্যাসের অনুপাত ঠিক রাখার জন্য প্রয়োজনমত অন্যান্য গ্যাস বিক্রিয়ার মাধ্যমে সৃষ্টি করে বায়ুতে মিশিয়ে দেয়া হয়। এতে পৃথিবী বায়ু দূষণের হাত থেকে রক্ষা পাবে। বিশুদ্ধ বায়ু গ্রহণের ফলে মানুষ নিরোগ ও সুস্থ সবল হয়ে উঠবে এবং মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।
আমরা পৃথিবীর ভূভাগে লক্ষ্য করি একটি বিরাট ফাটল। যার ফলে একটি প্লেট অপর প্লেটের ওপর চলে গিয়ে বিরাট দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকে যায়। তাই আমরা ক্লিওফিলিক আকর্ষণের সাহায্যে পৃথিবীর সবকিছু ঠিক রেখে পৃথিবীর ফাটল ঠিক করে দিই। সে জন্য ভূমিকম্প অনুভূত হয়। আমরা আপনার স্পেসীয় মিররে ধরা দেয়ার কারণ হলো, পৃথিবীর বিজ্ঞানীদের মধ্যে ঘটনাগুলো রহস্য উদঘাটনে একমাত্র আপনিই সঠিক পথে এগোচ্ছেন। আমাদের পরবর্তী কাজ হলো খাদ্য সমস্যাসহ আরও কয়েকটি সমস্যা সমাধান করা। সমস্যা সমাধান শেষে আমরা যাত্রা করব নতুনের সন্ধানে নতুনের পথে, আবার দেখা হবে। আজকের মতো বিদায়।’
মাইক্রো রেকর্ডার বন্ধ হতেই বিজ্ঞানী সিফাত বলে উঠলেন, ‘এরপর আমার স্পেসীয় মিরর অন্ধকার হয়ে গেল।’ অন্যান্য বিজ্ঞানীরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। কিছুক্ষণের জন্য হল রুম নীরব হয়ে গেল। ‘এবার আমাদের কাজ হবে মহাজাগতিক বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ করা।’ নীরবতা ভেঙে প্রেসিডেন্ট বললেন, ‘সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে আজকের বিজ্ঞান সভা এখানেই সমাপ্ত করছি।’

চার.
অবশেষে অনেক চেষ্টা-প্রচেষ্টার পর যোগাযোগ করা সম্ভব হলো প্রিস্টল গ্রহে অতি বুদ্ধিমান প্রাণীদের সাথে। অবশ্য তারা যদি সাড়া না দিত তাহলে তাদের সাথে যোগাযোগ করা পৃথিবীর মানুষের পক্ষে সম্ভব হতো না।
১০-১১-২৯৯৯ : বাংলাদেশকে নতুন সাজে সজ্জিত করা হলো। একটি বিরাট মাঠে এসে উপস্থিত হলেন পৃথিবীর সেরা সব বিজ্ঞানী ও সরকারপ্রধান। সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটে এর চার কোনাকৃতি প্রিস্টল মহাকাশযান চক্র দিয়ে নেমে এলো পৃথিবীতে। মহাকাশ যান থেকে নেমে এলো দুই প্রিস্টলবাসী। দেখতে অনেকটা মানুষের মত তবে মাথাটা স্বাভাবিকের চেয়ে ছোট, মাথায় গুচ্ছাকারে কয়েক গুচ্ছ চুল। স্বাভাবিক দুটো চোখের সাথে কপালে গর্তের মধ্যে আরেকটি নীলচে চোখ। গলাটা বেশ লম্বা হাত ও পা স্বাভাবিকের চেয়ে চিকন। লম্বায় পাঁচ ফুটের কাছাকাছি মহাজাগতিক বন্ধুরা পৃথিবীর মানুষের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করল। পৃথিবীর বিজ্ঞানী ও সরকারপ্রধানগণ তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলেন। পুরো বিশ্ববাসী স্যাটেলাইটের সাহায্যে দৃশ্যগুলো উপভোগ করল। প্রিস্টলি ১০৯২ ও প্রিস্টলি-২০৯৯ এক ঘণ্টা অবস্থান করল পৃথিবীবাসীর সাথে। তারপর পৃথিবীকে বিদায় জানিয়ে চলে গেল নতুনের সন্ধানে, নুতন পথে। বন্ধুত্ব স্থাপন করে গেল পৃথিবীর সাথে। যাওয়ার সময় বলে গেলÑ ‘মনুষ্য প্রজাতি তাদের মস্তিষ্কের মাত্র ৮-১০% ব্যবহার করে। যেদিন তারা ৮০-৯০% ব্যবহার করতে পারবে সেদিন তারা মহাবিশ্বের অনেক কিছু জানতে পারবে করতলগত করতে পারবে অনেক কিছু।

SHARE

Leave a Reply