Home স্মরণ একজন মাহমুদ আহমেদিনেজাদ কামারের ছেলে থেকে প্রেসিডেন্ট

একজন মাহমুদ আহমেদিনেজাদ কামারের ছেলে থেকে প্রেসিডেন্ট

কিশোরকণ্ঠ ডেস্ক #

মনে করো তুমি একটি শহরের মেয়র। তোমার কাজ কী হবে? সকালে দামি সরকাারি গাড়ি করে অফিস যাওয়া, এসি রুমে অফিস করা, শহর পরিচ্ছন্ন রাখা, নাগরিকদের মৌলিক অধিকারসমূহ রক্ষা করা ইত্যাদি নানা নিয়মতান্ত্রিক কাজ। কিন্তু অবাক হওয়ার ঘটনা হবে যদি একজন মেয়র রাস্তা ঝাড়– দেয়ার কাজটি নিজ হাতে করেন। হ্যাঁ, এরকম অবাক হওয়ার ঘটনাই বটে! ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমেদিনেজাদ যখন তেহরানের মেয়র ছিলেন তখন তিনি নিজ হাতে তেহরানের রাস্তা ঝাড়ু দিতেন। আমাদের দেশে এ রকমটি হলে অষ্টম আশ্চর্যের ঘটনা হিসেবে দাঁড়াতো এই ঘটনা। এই রকম শাসকইতো হওয়া চাই, যারা যুগ যুগ ধরে মানুষের হৃদয়ে থাকবেন অত্যন্ত শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায়।
আহমেদিনেজাদের বাবা ছিলেন একজন সামান্য কামার। এটা তেমন কোনো আশ্চর্যজনক খবর নয়। বিশ্বে এরকম আরও অনেক উদাহরণ রয়েছে। তবে কামারের ছেলে থেকে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরও তিনি নিজেকে অর্থলোভী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেননি এটাই আশ্চর্যের খবর। দুই মেয়াদে প্রেসিডেন্ট থাকার পর তিনি যখন বিদায় নেন তখন তাঁর সম্পত্তির পরিমাণ উল্লেখ করার মতো ছিলো তেহরানের পৈতৃক পুরনো বাড়িটি, যা ৪০ বছর আগে তিনি তার বাবার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন।
মাহমুদ আহমেদিনেজাদ পেশায় একজন পিএইচডিধারী সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। এ ছাড়াও তিনি ছিলেন তেহরান ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির অধ্যাপক, রাজধানী তেহরানের মেয়র এবং ইরান রেভিউলুশনারি গার্ডের প্রধান। ইরানের ষষ্ঠ প্রেসিডেন্ট হিসেবে ২০০৫ ও ২০০৯ দুই মেয়াদে তিনি নির্বাচিত হন।
মাহমুদ আহমেদিনেজাদ ১৯৫৬ সালের ২৮ অক্টোবর সেমনান প্রদেশের গারমশার নামক এক প্রত্যন্ত গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। খুব গরিব একটি পরিবার। বাবা ছিলেন একজন কামার। আহমেদিনেজাদের বয়স যখন চার বছর তখন তার বাবা জীবিকার সন্ধানে পরিবারসহ তেহরানে চলে আসেন। সেখানেই আহমেদিনেজাদের স্কুলজীবন শুরু।
একেবারেই সাদামাটা জীবনযাপনে অভ্যস্ত আহমেদিনেজাদ। আভিজাত্য তাকে কখনও স্পর্শ করতে পারেনি। প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর বিলাসবহুল এক বাড়ি তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল কিন্তু সেই বাড়িকে তুচ্ছজ্ঞান করে পৈতৃক সূত্রে পাওয়া বস্তির সেই দুই রুমের ছোট্ট বাড়িতেই বসবাস করতে চেয়েছিলেন তিনি। সরকারের কর্মকর্তাগণের অনুরোধে প্রেসিডেন্ট ভবনেই বসবাস করেন তিনি।
ভাবলে অবাক হতে হয়, এই লোকটি প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় তার ছেলে মাহাদির বিয়েতে মাত্র ৪৫ জন অতিথিকে (২৫ জন নারী এবং ২০ জন পুরুষ) নিমন্ত্রণ করেন। তাকে যখন ঘইঈ নিউজ চ্যানেলের সাংবাদিক এর কারণ জিজ্ঞাসা করেন তখন তিনি অত্যন্ত হাসিমুখে বিনয়ের সাথে বলেন, এর চাইতে বেশি মানুষকে দাওয়াত দেয়ার সামর্থ্য আমার নেই। ভাবা যায়, পৃথিবীর একটা উন্নত দেশের প্রেসিডেন্ট বলছেন এই কথা। প্রত্যেক অতিথিকে একটি কমলা, একটি কলা, একটি আপেল আর ছোট্ট এক টুকরো কেক দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়েছিল। এই হলো একটি দেশের প্রেসিডেন্টের ছেলের বিয়ে।
তিনি রাষ্ট্রের প্রধান অথচ রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে এর জন্য কোনও বেতন নিতেন না। বেতন হিসেবে তিনি তেহরান ইউনিভার্সিটি থেকে মাত্র ২৫০ ইউএস ডলার পেতেন। এবং এই টাকা দিয়ে সংসার পরিচালনা করতেন।
আহমেদিনেজাদের দিন শুরু ভোর ৫টায় এবং শেষ হয় রাত ২টায়। মাঝখানের এই ৩ ঘণ্টা সময় তিনি ঘুমান। বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে? যে মানুষটি প্রেসিডেন্ট হয়ে ছেঁড়া জামা পরে অফিসে যেতে পারেন, বস্তিতে থাকতে পারেন তার পক্ষে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। প্রতিদিন সকাল ৫টায় ফজরের নামায পড়ে কাজ শুরু করেন আর রাত ২টায় এশার নামায ও ব্যক্তিগত স্টাডি শেষ করে ঘুমাতে যান। তিনি কখনও নামাজ বাদ দেন না।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েই প্রেসিডেন্ট ভবনের দামি কার্পেটগুলো তেহরানের মসজিদে দান করে দেন। এর পরিবর্তে সাধারণ মানের কার্পেট বিছানো হয় প্রেসিডেন্ট ভবনে।
৩ আগস্ট ২০১৩ ইরানের প্রেসিডেন্ট পদ থেকে বিদায় নেয়ার আগেও ইতিহাস তৈরি করে গেলেন আহমেদিনেজাদ। ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান আয়াতুল্লাহ সাদেক লারিজানির কাছে লেখা এক চিঠিতে আট বছরে অর্জিত সম্পদের হিসাব দিয়ে যান তিনি।
বর্তমান সময়ে বিশ্বে ইরানের অবস্থান কোথায় তা আমরা সকলেই জানি। এই সাদামাটা একজন মানুষই ইরানকে এই অবস্থানে নিয়ে গেছেন। এমন একজন শাসকের পক্ষেই সম্ভব সুন্দর একটি সমাজ গড়া, যিনি নিজে হবেন মানুষের বন্ধু, খুব কাছের আপনজন।

SHARE

1 COMMENT

Leave a Reply