Home খেলার চমক বিশ্বকাপে বাংলাদেশের বিস্ময়

বিশ্বকাপে বাংলাদেশের বিস্ময়

 মোহাম্মদ হাসান শরীফ#

স্বপ্নের সেমিফাইনালে যাওয়া হয়নি বাংলাদেশের। কিন্তু এবারের বিশ্বকাপে টাইগাররা যে দুর্দান্ত খেলেছে, তা স্বপ্নকেও ছাড়িয়ে গেছে। মাথা উঁচু করেই দেশে ফিরেছে ছেলেরা। ভারতের ওই প্রশ্নবিদ্ধ জয়, তাদের কাছেও কলঙ্ক বিবেচিত হয়েছে। ফলে হেরেও জয়ী হয়েছে টাইগাররা। তাদের হুঙ্কার শোনা গেছে বিশ্বের সব প্রান্তে। এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ যে আত্মবিশ্বাস পেয়েছে, তা আগামী দিনে আরো বড় অর্জনে সহায়ক হবে।
বাংলাদেশের বিশ্বকাপ মিশন শুরু হয়েছিল আফগানিস্তানকে হারানোর মধ্য দিয়ে। পরের ম্যাচে বৃষ্টির কারণে অস্ট্রেলিয়ার সাথে পয়েন্ট ভাগাভাগি করে নেয় বাংলাদেশ। শ্রীলঙ্কার কাছে হারলেও স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে আবার জয়ের দেখা পাওয়া যায়। ইংল্যান্ডকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করে টাইগাররা। শেষ ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের কাছে হারলেও তাতে কোনো প্রভাব ফেলেনি। বরং স্বাগতিকদের বিপক্ষে যেভাবে লড়াই করেছে, তাতে টাইগারদের আত্মবিশ্বাসই ফুটে উঠেছে। আশা ছিল কোয়ার্টার ফাইনালে আরো বড় ঘটনা ঘটিয়ে দেবে মাশরাফি বাহিনী। যথেষ্ট আত্মপ্রত্যয়ীই ছিল তারা। কিন্তু দুই আম্পায়ার আর ম্যাচ রেফারি যেভাবে একের পর এক সিদ্ধান্ত দিয়েছেন বাংলাদেশের বিপক্ষে, তার বিরুদ্ধে লড়ার মতো অবস্থা ছিল না। পরিণতিতে বিদায় নিতে হয়েছে বাংলাদেশের।
ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচে অবশ্য ভাগ্যও বাংলাদেশের সহায় ছিল না। ম্যাচের প্রথম ধাপ টস ভাগ্যে হেরেও বসেন টাইগার দলপতি মাশরাফি। আর টস ভাগ্যে জিতে প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নিতে সামান্য সময় নষ্ট করেননি ভারতের অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং  ধোনি। টস জিতলে প্রথমে ব্যাট করার পরিকল্পনা ছিলো মাশরাফিরও। ২২ গজে ওই সময় তেমনটাও জানিয়েছিলেন মাশরাফি। কিন্তু তাতে কী, দমে যাবার দল তো এখন নয় বাংলাদেশ।
ভারতের ইনিংসের শুরু থেকে লাইন লেন্থ বজায় রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিলেন মাশরাফিসহ অন্য বোলাররা। বিশ্বের সেরা ব্যাটিং লাইন-আপের ওপেনারদের উদ্বোধনী জুটিতে মারমুখী হওয়ারই সুযোগ দেননি মাশরাফি-তাসকিন-নাসিররা। এই সুযোগে নিজের প্রথম ওভারে টিম ইন্ডিয়ার ওপেনার শিখর ধাওয়ানকে দারুণ এক ডেলিভারিতে বোকা বানিয়ে স্ট্যাম্পিংয়ের ফাঁদে ফেলেন বাংলাদেশের সাকিব আল হাসান। ফলে ৩০ রানে থামতে হয় ধাওয়ানকে।
এরপর অন্য প্রান্ত দিয়ে ভারতের ব্যাকুফটে ঠেলে দেন ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের নায়ক রুবেল হোসেন। ভারতের ব্যাটিংয়ের মূল স্তম্ভ বিরাট কোহলিকে প্যাভিলিয়নের টিকিট দেন রুবেল। মাত্র ৩ রান করেন কোহলি।
ধাওয়ানের পর কোহলিকে হারিয়ে একেবারেই কোণঠাসা হয়ে পড়ে ভারত। টিম ইন্ডিয়াকে কোণঠাসার বৃত্ত থেকে বের করতে আপ্রাণ চেষ্টা চালান রোহিত ও আজিঙ্কা রাহানে। বাংলাদেশ বোলারদের দারুণ সব ডেলিভারিতে এক-দুই রানের বেশি নিতেই পারছিলেন না তারা। একপর্যায়ে টিভি রিপ্লেতে ভেসেও ওঠে ‘৪৪ বল আগে সর্বশেষ বাউন্ডারি হাঁকায় ভারত।’ এমন অবস্থায় ভারত শিবিরে আবারো আঘাত হানে টাইগাররা। রাহানেকে সাকিবের দুর্দান্ত ক্যাচ বানিয়ে ম্যাচে নিজের প্রথম উইকেট তুলে নেন পেসার তাসকিন আহমেদ। রাহানে থামেন ১৯ রানে।
২৮ ওভার শেষে ৩ উইকেটে ১১৫ রানে ভারত শিবির তখন চিন্তিত। উইকেট গিয়ে প্রথমে সেট হবার চেষ্টা করেন সুরেশ রায়না। অন্য প্রান্তে খুব দ্রুত না হলেও, ভালোই রান তুলছিলেন রোহিত শর্মা। তা করতে গিয়ে ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ২৬তম হাফ- সেঞ্চুরিও তুলে নেন রোহিত।
এরই মধ্যে উইকেটে থিতু গেথে ফেলেন সুরেশ রায়না। তাতে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠার রসদও পেয়ে যান তিনি। সেই রসদে আরও একটু ঘি ঢাললেন ম্যাচের টিভি আম্পয়ার অস্ট্রেলিয়ান স্টিভ ডেভিস। ৩৪তম ওভারের দ্বিতীয় বলে রায়নার বিপক্ষে এলবিডব্লিউর আবেদন করেন মাশরাফি। কিন্তু সেই আবেদন নাকচ করে দেন নন-স্ট্রাইকে থাকা ইংল্যান্ডের আম্পায়ার ইয়ান গুড। কিন্তু এমন সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট মাশরাফি চেয়ে বসলেন রিভিউ। রিভিউতে স্পষ্ট দেখা যায় আউট পাওয়ার পক্ষে। এমনকি টিভির ধারা ভাষ্যকাররাও বলে বসেন, ‘এই সিদ্ধান্তটি বাংলাদেশের পক্ষেই যাবে’। কিন্তু বিধি-বাম। টিভি আম্পায়ার ডেভিস দিলেন না আউট। তাতে ব্যক্তিগত ১০ রানে জীবন পেয়ে যান রায়না।
জীবন পেয়ে আর পেছনে ফিরে তাকাননি রায়না। সামনের দিকে এতো দূর তাকিয়েছেন যে, শেষ পর্যন্ত রায়নার ৫৭ বলে ৬৫ রানের ইনিংসে চালকের আসনে বসে যায় ভারত। সেই চালকের আসন থেকে ভারতকে সরিয়ে দেয়ার দারুণ এক সুযোগও পেয়েছিলো বাংলাদেশ। কিন্তু এখানেও বাধা হয়ে দাঁড়ান আম্পায়ার। এবার গুড।
ব্যক্তিগত ৯০ রানে থাকা রোহিতের শট ক্যাচ নিয়েছিলেন ইমরুল কায়েস। কিন্তু কোমরের উচ্চতার অজুহাতে আউটটি বাদ করেন আম্পায়ার গুড। ফলে ওয়ানডে ক্যারিয়ারের সপ্তম সেঞ্চুরি পেতে মোটেও বেগ পেতে হয়নি রোহিতের। শেষ পর্যন্ত ১৪টি চার ও ৩টি ছক্কায় ১২৬ বলে ১৩৭ রান করেন রোহিত। আর শেষদিকে রবীন্দ্র জাদেজার ১০ বলে ঝড়ো অনবদ্য ২৩ রানে ৬ উইকেটে ৩০২ রান করে টিম ইন্ডিয়া। বাংলাদেশের পক্ষে তাসকিন ৬৯ রানে ৩ উইকেট শিকার করেন।
৩০৩ রানের বড় টার্গেটে যেভাবে এগিয়ে যাওয়া উচিত, ঠিক সেভাবেই শুরু করেছিলেন বাংলাদেশের দুই ওপেনার তামিম ইকবাল ও ইমরুল কায়েস। তামিম মারমুখীই ব্যাট চালাচ্ছিলেন। নিজের ব্যাটে বলকে চারবার বাউন্ডারির স্পর্শও দেন তামিম। ধীরে ধীরে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠা তামিম অবশেষে ফিরেন ২৫ বলে ২৫ রান করে। এই আউট নিয়ে ছিল বড় ধরনের প্রশ্ন।
তামিমের বিদায়ের পরের বলেই দিশেহারা হয়ে রান আউটের ফাঁদে পড়ে ব্যক্তিগত ৫ রানে থামেন তিন ম্যাচে পুরোই ব্যর্থ ইমরুল। ৩৩ রানে ২ উইকেট হারানো বাংলাদেশের হাল আবারো ধরেন সৌম্য সরকার ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। শক্ত হাতেই হাল ধরেছিলেন তারা। আগের ম্যাচগুলোর মতো এবারও বাংলাদেশকে ভালো অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার পণটা হয়তো ক্রিজে দাঁড়িয়েই করেছিলেন সৌম্য ও মাহমুদউল্লাহ। কিন্তু ১৭ ওভারের শেষ বলটি সব কিছু এলোমেলো করে দেয়। মোহাম্মদ সামির দেয়া বাউন্সারটি ভালোভাবেই পুল করেছিলেন মাহমুদউল্লাহ। সেটি অনেক নাটক করে তালুবন্দী করেন ভারতের ধাওয়ান। কিন্তু এই আউট নিয়েও ছিলো সন্দেহ। কারণ, টিভি রিপ্লেতে দেখা গিয়েছিলো, ধাওয়ানের পা কিছুটা হলেও স্পর্শ করেছিলো বাউন্ডারি লাইন। কিন্তু এখানেও আম্পায়াররা আউট দেন ২১ রানে থাকা মাহমুদউল্লাহকে।
এরপর দলীয় ৯০ রানে সৌম্য এবং ১০৪ রানে সাকিব আল হাসান ফিরে গেলে ম্যাচ হারের পথ তৈরি করে ফেলে বাংলাদেশ। সৌম্য ২৯ ও সাকিব ১০ রানে আউট হন। মুশফিকুর রহিম প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলেন ব্যক্তিগত ২৭ রানে আউট হয়ে। মুশফিকুরের আউটে বড় ব্যবধানে হারের শঙ্কায় পড়ে যায় টাইগাররা।
কিন্তু তা হতে দেননি সাব্বির রহমান ও নাসির হোসেন। অষ্টম উইকেটে ৫০ রানের ভালো একটি জুটি গড়ে বাংলাদেশকে অনেক বড় হার থেকে মুক্তির পথ দেখিয়েছিলেন তারা। তবে সাব্বির ৩০ ও নাসির ৩৫ রানে ফিরে গেলে অনেক বড় না হলেও, কিছুটা বড় ব্যবধানে হারের ঢেঁকুর তুলে বাংলাদেশ। ১৯৩ রানে নিজেদের ইনিংস গুটিয়ে ১০৯ রানের হার বরণ করে নেয় টাইগাররা।
এমন হারে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে ঠিকই বিদায় নিয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু তাতে কী!! পুরো বিশ্বকে অবাক করে দেয়ার মতো পারফরম্যান্স তো দেখিয়েছেন মাশরাফি-মুশফিকরা। ব্যক্তিগত ও দলগত দিক দিয়ে অর্জনের ভান্ডার অনেক বেশি সমাদৃত। ইংল্যান্ডের মতো দলকে বিদায় করে বিশ্বকাপে বাঘের মতো গর্জন বহুবার তো করলো মাশরাফি বাহিনী। তাতে অন্যান্য দলগুলোর মতো কপালে চিন্তার রেশ টেনেছিলো ভারতের মতো দলও। তারপরও আম্পয়ারের কারণে ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বলতা ছড়াতে পারেনি বাংলাদেশ। কিন্তু এই বিশ্বকাপে একটি বার্তা ঠিকই দিয়ে গেল বাংলাদেশ। তাহলো- ‘খুব বেশি দূরে নয়, শিগগিরই বিশ্বকাপ জয় করবে বাংলাদেশ।’

SHARE

Leave a Reply