Home গল্প কাঁকড়ার মা

কাঁকড়ার মা

 মু. সাজ্জাদ হোসাইন#

বিশাল বিস্তীর্ণ হাওর। চারদিকে থৈ থৈ পানি আর পানি। অথৈ জলরাশির একপাশ থেকে দেখলে মনে হবে সমুদ্র। কোন জায়গায় কি পরিমাণ পানি তা ওপর থেকে দেখে বুঝা বেশ মুশকিল। তবে এ হাওড়ের যারা নিয়মিত মাঝি তারা ঠিকই জানে কোথায় পানির গভীরতা কেমন। ভরা বর্ষার মওসুমে পাল তোলা অনেক নাও। রংবেরং এর বাহারীপাল বাড়িয়ে তোলেছে বিলের সৌন্দর্য। আউস ধানের পানির ওপর ভেসে থাকা মনে করিয়ে দেয় সবুজ গালিচাকে। কচুরিপানা পচিয়ে তার উপর লম্বা মিষ্টি আলুর বীজতলা তৈরি করেছে কৃষক। আর তার উপরে বসে আছে একদল বুনোহাঁস। বেশ কয়েকটি ডিমও পেরেছে ঝোপমতো এক জংলায়। ডিমের খবর অবশ্য কারও জানার কথা নয়। নুতন পানি পুরাতন হতে চলল। বর্ষার পানির বয়স প্রায় দুই মাস। স্বচ্ছ কালো জলে ঘোরে বেড়ানো পুঁটি মাছের দল যে গায়ে গতরে এবং আকারে বড় হয়েছে তা বেশ বুঝা যায়। পুঁটি মাছের দলে লাল রঙিন পুঁটিটাকেই রানী বলে মনে হয়। আর তা মনে হবেই বা না কেন? তার চলনে বলনে ঠাট বাটে যে অভিজাত্য তা তাকে বিশিষ্ট আসনে আসীন করেছে।
হাওড়ের মাঝখানে দ্বীপের মতো অসংখ্য জায়গা। সেখানে বড় বড় আম এবং জামের গাছও আছে। আরও বেশ কয়েক প্রকারের মাঝারী আকারের গাছ এবং অসংখ্য গুল্মলতায় পরিপূর্ণ। শক্তি সামর্থবান প্রাণি বলতে শিয়াল মামাও আছে কয়েকটা। বেশ ভালোই আছে মামারা। পূর্ণিমার রাতে যখন চাঁদ উঠে তখন বেশ মজা করে একসাথে চিৎকার করে কোরাস সঙ্গীত গায়- হুক্কা-হুয়া-হুক্কা-হুয়া, কেয়া মজা বনের রাজা। অবশ্য ছোট্ট দ্বীপটাতে অন্যপ্রাণির বাস না থাকায় তারাইতো আসলে বনের রাজা। জলরাশি বেষ্টিত এ ক্ষুদ্র রাজ্যে বসবাস করতো একটি মা কাঁকড়া। সন্তান সম্ভাবা মায়ের পেটে অসংখ্য ডিম জানিয়ে দেয় নতুন প্রানের আগমনি। কাঁকড়ার পেটের ডিমগুলো থেকে বাচ্চা ফুটে নি, তখনো সে ঘোরে বেড়াতো গোটা দ্বীপ রাজ্যে। আর আনন্দে আত্মহারা হতো তার অনাগত নবীন সন্তানদের ভবিষ্যত শুভ কামনায়। সন্তান জন্মের আনন্দ সে প্রায়ই প্রকাশ করতো তার স্বামীর কাছে। ছোট স্থলভাগের যে ঢাল নেমে গিয়েছে পানির দিকে, সে ঢালেই আরও অনেক কাঁকড়া পরিবারের মতো করে শক্ত এটেল মাটিতে গর্ত করে বাসা বানিয়েছে তারা।
মা কাঁকড়ার অনেক স্বপ্ন, সন্তানগুলো দেখতে কেমন হবে। তার মতো হবে না তার স্বামীর মতো হবে। গায়ের রঙ কেমন হবে ফর্সা না স্বামীর মতো কালো। কাঁকড়াটি আশা করে তার বাচ্চারা তার মতোই সুন্দর হবে আর বাবার মতো হয়ে উঠবে দক্ষ শিকারী। হঠাৎ শিয়াল মামার লেজ বাসার ভিতরে দেখে পুরুষ কাঁকড়াটি সাবধান করে দেয় তার স্ত্রীকে না ধরার জন্য। কারণ সাড়াশি দিয়ে ধরলেই বিপদ। শিয়াল মামা এক ঝটকায় করে ধরে নিয়ে যাবে। আর খেয়ে ফেলতে বেশি দেরি করবে না। শিয়ালদের উৎপাৎ বেড়ে গেয়িছে বেশ কয়েকদিন হলো। পুরুষ কাঁকড়া সিদ্ধান্ত নেয় বাসা বদলের। পরামর্শ করে তার স্ত্রীর সাথে। কোথায় নেবে বাসা মনে মনে স্থির করে।পরদিন পুরোটা গেলো নতুন বাসার খোজা এবং স্থানান্তরিত হতে।
নতুন বাসায় উঠে এসেছে তারা। এখানে শিয়াল মামাদের উৎপাৎ তেমন নেই বললেই চলে। এভাবেই দিন কেটে যেতে থাকে। সন্তান সম্ভাবা মা কাঁকড়া দিনে দিন দুর্বল হতে থাকে। খাবার দাবারের রুচিও কমে যায় তার। ডিম ফুটে পেটের ভিতরে বাচ্চাদের নড়াচড়ায় কষ্ট পায় সে। কিন্তু প্রকাশ করে না তার স্বামীর কাছে। স্বামী ঠিকই বুঝতে পারে। দিন দিনে আরো দূর্বল হতে থাকে মা কাঁকড়া। পেটের ভিতর ক্ষুধার্ত বাচ্চারা কিছু খেতে না পেয়ে খাওয়া শুরু করে মায়ের পেটের নড়ম অংশগুলো। এক সময় তা শেষ হয়ে গেলে শুরু হয় কলিজা খাওয়ার পালা। প্রতিটি কামড়ে মড়ন যন্ত্রনার ব্যথা পায় সে। কিন্তু সহ্য করে সকল যন্ত্রনা। যন্ত্রনার মধ্যেও সুখ পায় সে। অব্যক্ত যন্ত্রনা নিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে একসময়, আগত সন্তানদের স্বপ্নিল ভবিষ্যৎ তাকে নিয়ে যায় চির নিন্দ্রায়। কাঁকড়াগুলো ঝাকে ঝাকে বেড়িয়ে আসে মায়ের পেটের শক্ত অথচ নিরাপদ খোলস ভেঙ্গে, ছড়িয়ে পড়ে দিগবিদিক। এদিকে পড়ে থাকে আতœবির্সজনকারী মা কাঁকড়ার প্রানহীণ কংকাল। অপরদিকে স্বচ্ছ জলরাশির বিশাল আঙ্গিনায় এক নতুন পৃথিবীতে মেতে উঠে অপত্য কাঁকড়াগুলো। প্রকৃতির এ নিষ্ঠুর খেলা প্রান থেকে প্রান হয় সহজারিত। আর এ খেলায়ই রয়েছে বুদ্ধিমানের জন্য নিদর্শন।

SHARE

Leave a Reply