Home তোমাদের গল্প ভোলা যায় না

ভোলা যায় না

ইব্রাহীম বিন রশীদ#

ভুলে থাকা বড়ই কঠিন। দিনগুলো স্মৃতির আয়নায় ভেসে থাকা সুখ-দুঃখ আর ভালো লাগার সেই মিষ্টক্ষণ। মানবহীন কোনো প্রান্তে বসে যখনি ভাবি সেই সব কথা, নিজের অজান্তেই অশ্রুসিক্ত নয়ন দুটো শুধু শূন্যে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে।
হ্যাঁ, ছোটবেলায় আমার মরহুমা সেই নানীর কথাই বলছি। আমার জন্মের আগেই দুনিয়ার মায়া ছেড়ে চলে গেছেন। নানা-নানীর কাছে শুনেছি, নানা মস্ত বড় একজন গায়ক ছিলেন। নানাবাড়ির আশপাশ দিয়ে হাঁটলে অনেক মুরব্বির মুখে তার সেই বিখ্যাত গায়কের সার্টিফিকেট পাওয়া যায়। সেই নানাকে হারিয়েছি আজ থেকে প্রায় ত্রিশ বছর আগে। নানা চলে যাওয়ার অনেক বছর পর গেল দুই বছর আগে নানীও চলে যান পরপারে। এখন সেই নানা- নানীর বাড়িতে শূন্যে মিলিয়ে যাওয়া হাহাকার ছাড়া আর কিছুই শোনা যায় না। পুরনো বাড়ির বৃদ্ধ বয়সী বিশাল আকৃতির আম-জাম নারিকেল আর সুপারি গাছগুলো যেন আজ সেই মায়াবী হাতের ছোঁয়া থেকে বঞ্চিত।
নানা-নানীর কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্য কিছু দিন আগে সিকদার বাড়ি যাই। গাঁয়ের আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে কিছু দূর যাওয়ার পর ছোট্ট একটা নদী। নদীর কূল ঘেঁষে সরু পথ দিয়ে যেতে হয় নানীবাড়ি। প্রায় ত্রিশ মিনিট হাঁটার পর নানীবাড়ির সীমানা শুরু। রাস্তার পাশে বিশাল গাছ-পালা, মাঝে মাঝে ছোট ছোট দু-একটা ঘর দেখা যায়। প্রায় পাঁচ মিনিট হাঁটার পর নানীর সেই পুরনো বাড়ি। বাড়ি থেকে একটু দূরে রাস্তার পাশে নানা-নানীর কবর। আবেগ ভরা কণ্ঠ নিয়ে নানা-নানীর সমাধির পাশে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ তাদের রূহের মাগফিরাতের জন্য দোয়া করি।
সূরা ফাতেহা একবার, সূরা এখলাস তিন বার, সূরা ফালাক ও সূরা নাস একবার করে পড়ে দুরূদ শরীফ পড়লাম। মুনাজাত করার সময় হৃদয়ের শত আবেগকে আর ধরে রাখতে পারিনি। মুনাজাত শেষে বাড়ির ভেতর গিয়ে পুরনো একটা বেতের মোড়া নিয়ে বারান্দায় বসি। অনেকক্ষণ বসে থাকলাম, জনমানবের কোনো সাড়া পেলাম না। বাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখতে দেখতে হারিয়ে গেলাম। কয়েক বছর আগের সেই দিনে। আমার মা তখন দু-এক মাস গেলেই বলতেন খোকা তোর নানীবাড়ির গিয়ে দেখে আয় তোর নানী কেমন আছেন? শুক্রবার দিন থেকে শনিবার খুব ভোরে তোর নানীকে নিয়ে চলে আসবি। মায়ের অনুমতিক্রমে বৃহস্পতিবার বিকেলে দশ-বারো বছর বয়সের সময় খুব আনন্দ নিয়ে চলে যাই নানীবাড়ি। নানী আমাকে দেখে আঁচলে মুখ লুকিয়ে কেঁদে ফেলেন। কান্নাস্বরে বললেন এতদিন পর তোর মায়ের বুঝি আমার কথা মনে পড়লো। তখন একটু বুদ্ধি খাটিয়ে বলি, মা তো দু-চার দিন পরপরই তোমাকে দেখার জন্য আসতে বলেন। লেখাপড়ার চাপে আমি-ই সময় করে আসতে পারি না। এরপর নানী আমাকে কিছু খাওয়ানোর জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়তেন। খই, মুড়ি আর গুড় সামনে দিয়ে বলতেন নানা ভাই তুমি খাও, আমি কিছু রান্নার ব্যবস্থা করি। রাতে খাওয়া শেষে প্রায় অর্ধরাত পর্যন্ত নানীর সাথে গল্পে বিভোর থাকতাম। পরদিন শুক্রবার নানীর বাড়ির ছেলেপেলেদের সাথে হৈ-হুল্লোড়ে খেলাধুলায় কাটিয়ে দেই। এসব ভাবতে ভাবতে কখন বারান্দার পাটিতে শুয়ে পড়ি, তা টেরই পেলাম না।
ঘুম থেকে জেগে দেখি সন্ধ্যা হওয়ার মাত্র বিশ মিনিট বাকি। দেরি না করে বেদনাবিধুর মন নিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বাড়ি চলে আসি। বাড়িতে এসে নানীকে নিয়ে আপনমনে একটা কবিতা লিখি-
নানী আমার নানী
কতদিন তোমার সাথে
হয় না জানাজানি।
নানী আমার নানী
খোদার ডাকে চলে গেলে
হয়ে অভিমানী।

SHARE

Leave a Reply