Home ফিচার বরফের সপ্তাশ্চর্য

বরফের সপ্তাশ্চর্য

মৃত্যুঞ্জয় রায়#

শীতটা এবার বেশ জমিয়ে পড়েছে, তাই না? আমাদের মতো দেশেই এই অবস্থা। শীতের দেশে শীতের কী অবস্থা ভাবো তো? শীতের দেশে শীতকালে বরফ পড়ে। চারদিকের গাছপালা, মাটি, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট- সব বরফে ঢেকে যায়। এমনকি কখনো কখনো সাগর বা নদীর পানির ওপরটাও জমে বরফ হয়ে যায়। তার ওপর দিয়ে দিব্যি মানুষরা হেঁটে যেতে পারে। কখনো কখনো সাগরে এতো পুরু হয়ে বরফখন্ড জমে যে সেগুলো বিশাল আকৃতির ভেলা হয়ে ভাসতে থাকে। কিন্তু তার চেয়েও অনেক বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে প্রকৃতির এসব বরফের রাজ্যে। এসো আজ আমরা বরফের সেসব বিস্ময়কর ঘটনার সাথে পরিচিত হই।
বরফের বৃত্ত
শীতের দেশে শীতকালে বরফ পড়ে চারদিক সাদা হয়ে যায়। মাঝে মাঝে কোথাও সেই বরফের চাতালে রহস্যময় বৃত্তের সৃষ্টি হয়। কোনো রকম কাঁটাকম্পাস ছাড়াই বরফের মতো মসৃণ ও জলার্দ্র পৃষ্ঠের ওপর কে অমন সুগোল বৃত্ত আঁকলো?  কোথাও কখনো এরকম একটা বৃত্ত দেখলে না হয় মানা গেলো যে এমনিই হয়তো হয়েছে। কিন্তু একই এলাকায় যখন অনেক বরফ বৃত্ত চোখে পড়ে, তখন? বিজ্ঞানীরা বলছেন, বরফ জমাট হওয়ার আগেই এক ধরনের জলঘূর্ণির অবিরাম ঘূর্ণনে বরফখন্ডের বুকে এরকম সুবৃত্ত সৃষ্টি হয়। সুগোল সেই বরফখন্ডের কিনারা ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে বৃত্তে পরিণত হয়। কখনো কখনো এসব বৃত্তের ব্যাস ৫০০ ফুটেরও বেশি হয়। সত্যিই এ এক বিচিত্র বরফ শিল্প।
বরফের কাঁটা
সুন্দরবনে গেলে তোমরা কেওড়া-ওড়া গাছের অনেক শ্বাসমূল দেখতে পাবে। সেসব মূলের অগ্রভাগ বেশ সুচালো। ঠিক তেমনি যেসব দেশে বরফ পড়ে সেসব দেশে মাঝেমধ্যে বরফের তীক্ষè কাঁটা তৈরি হয়। না এগুলো কেউ বানায় না, প্রাকৃতিকভাবেই তৈরি হয়।  সেসব কাঁটার ধার তীক্ষè ব্লেডের মতো। পাতলা, অগ্রভাগ সুচালো, গোড়ার দিকে চওড়া সেসব বরফের কাঁটা সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে। কখনো কখনো এসব বরফের কাঁটা মানুষের উচ্চতারও বেশি লম্বা হয়।
বরফের মেঘ
শরতকালে আমাদের দেশে নীল আকাশের বুকে তোমরা সাদা সাদা তুলোর মতো মেঘ ভাসতে দেখো। কিন্তু সেই মেঘগুলো যদি বরফের হয়ে যায়? দলা দলা বরফ আকাশে ভেসে বেড়াতে থাকে তো কেমন হয়? প্রকৃতির খেয়ালে এ গ্রহের বুকে সেটাও ঘটে। বিজ্ঞানীরা এ ধরনের মেঘের নাম রেখেছেন ম্যামাটাস ক্লাউড। আকাশে এ ধরনের মেঘ সাধারণত ঝড় বা চরম কোনো আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেয়। এসব মেঘ প্রাথমিকভাবে চরম শীতল আবহাওয়াতে জমে যাওয়া মেঘের জলকণা তথা বরফকুচি দিয়ে তৈরি। এসব মেঘ কখনো কখনো শত মাইল লম্বা ও একই রকম চওড়া হয়। তবে বরফের মেঘ কিন্তু বেশিক্ষণ ওভাবে ঝুলে থাকতে পারে না। বড়জোড় ১০ থেকে ১৫ মিনিট স্থায়ী হয়। বিস্ময়কর সে মেঘ দেখা সৌভাগ্যের না দুর্ভাগ্যের সেটাই ভাবার বিষয়। কেননা, সৌন্দর্য উপভোগের চেয়ে খারাপ আবহাওয়ার ভোগান্তি অনেক বেশি।
বরফের ফুল
কখনো কখনো আবহাওয়ার কারণে সাগরের শান্ত জলের বুকে জমা বরফকে শাপলা ফুলের মতো দেখা যায়। হঠাৎ দূর থেকে এই দৃশ্য দেখলে মনে হতে পারে সাগরে মাইলের পর মাইল ধরে যেন হাজার হাজার শাপলা ফুল ফুটে রয়েছে। কিন্তু কাছে গেলেই সে ভুল ভাঙে। আসলে সেগুলো ভাসমান বরফের টুকরো, ফুলের মতো জলের ওপর ভেসে রয়েছে। বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে নেমে গেলে কখনো কখনো এরূপ ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে মেরু অঞ্চলের সাগরের ওপর যখন সবেমাত্র বরফের পাতলা স্তর জমতে শুরু করে ঠিক তার পূর্বে এই ঘটনা ঘটে থাকে। এই ঘটনার জন্য সাগরতলের তাপমাত্রা ও বাতাসের তাপমাত্রার পার্থক্য ১৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড হতে হবে। বরফের স্ফটিকগুলো বড়জোড় ৩-৪ সেন্টিমিটার ব্যাসের হয়ে থাকে। উত্তর মেরু অঞ্চলে এই দৃশ্য দেখা যায়। তবে এর স্থায়িত্বকাল হয় খুব কম সময়। সাগরের বুকে বরফ জমে পুরু হলেই বরফের ফুলেরা মরে যায়।
বরফের গুহা
পাহাড়ে গেলে তোমরা হয়তো অনেক গুহা দেখতে পাবে। হঠাৎ করে পাহাড়ে কোনো সুড়ঙ্গপথের মুখ দেখে ভেতরে ঢুকে গেলে হয়তো দেখবে ভেতরে অনেকটা জায়গা ফাঁকা, অলিগলি রাস্তার মতো। ওগুলোকে বলে গুহা। কিন্তু পাহাড়ের গুহার মতো বরফের গুহাও প্রাকৃতিকভাবে কখনো কখনো সৃষ্টি হয়। তবে পাহাড়ের গুহার মতো সেসব গুহা দীর্ঘস্থায়ী  হয় না। ক্ষণস্থায়ী এসব গুহা দেখার সৌভাগ্য তাই খুব কম সময়ের জন্যই ঘটে। সাধারণত হিমবাহের একপ্রান্তে এসব গুহা দেখা যায়। হিমবাহের প্রান্তে জমে থাকা বরফ যখন ধীরে ধীরে গলতে থাকে তখন তার পানি প্রবাহের ফলে বরফের সেসব হিমবাহের মধ্যে কিছু ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়। জমাট সেই বরফের শূন্য ঘর একমাত্র নীল আলো ছাড়া আর সব রঙের আলো শোষণ করে নেয়। ফলে সেসব গুহায় নীল আলোর বিচ্ছুরণে এক অবর্ণনীয় সৌন্দর্যের সৃষ্টি হয়।
বরফের বুদবুদ
যখন সাগর বা জলাশয়ের তলদেশে মৃত কো জীব বা জৈব পদার্থের তলানি পড়ে তখন ধীরে ধীরে সেগুলো পচতে থাকে। ব্যাকটেরিয়া জীবাণুরা সেসব জৈব পদার্থের পচন ঘটায়। এর ফলে সেখানে মিথেন গ্যাসের সৃষ্টি হয়। যখন তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে নেমে যায় তখন এই মিথেন গ্যাস হিমশীতল পানিতে বুদবুদ আকারে আটকে যায়। সেসব দৃশ্য দেখতে একটার পর একটা মুদ্রা সাজানোর মতো দেখায়। ভারী সুন্দর সে দৃশ্য। তবে ভুলেও যেনো কেউ তোমরা এসব দৃশ্য দেখে তার কাছে গিয়ে দেশলাই বা আগুন জ্বালানোর চেষ্টা কোরো না। তাহলেই সুন্দর সে দৃশ্য হঠাৎ করেই ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে আর তোমরা তার আগুনে ঝলসে যাবে।
ডোরাকাটা বরফ
বরফের রঙ সাদা, আইসক্রিমের মতো বরফে রঙ মেশালে বরফ রঙিন হয়। কিন্তু প্রকৃতিতেই কখনো কখনো নানা রঙের ডোরাকাটা বরফ দেখা যায়।
বিশেষ করে আইসল্যান্ড বা গ্রিনল্যান্ডের সাগরে ভাসমান বরফের চাঁই বা ভেলা যাকে আমরা আইসবার্গ বলি তার কিছু আইসবার্গে ডোরাকাটা বরফের দেখা মেলে। এন্টার্কটিকা মহাদেশেও এরূপ ঘটনা ঘটে। কখনো এসব ডোরাকাটা দাগের রঙ হয় নীল, কখনো সবুজ বা কালো। বাদামি ও হলুদও হতে পারে। নীল ডোরাকাটা বরফের সৃষ্টি হয় যখন জমাট বরফের ফাটলগুলো পানিতে পূর্ণ থাকে।
বরফের ফাটল বা পানির মধ্যে শেওলা থাকলে রঙ হয় সবুজ। যখন কোনো বরফের চাঁই পাহাড় থেকে সাগরে নেমে আসে তখন তার ফাটলে পাহাড়ের বিভিন্ন খনিজকণা জমে থাকলে তার রঙ হয় বাদামি, কালো বা হলুদ।

SHARE

Leave a Reply