Home গল্প চাকা

চাকা

মোহাম্মদ লিয়াকত আলী#

ঢাকা শহরের বাসিন্দারা চাকার ওপর বসবাসে অভ্যস্ত। অফিসগামী যাত্রীরা যানজটে আটকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাসে বসে অথবা দাঁড়িয়ে থাকে। আপ-ডাউন পাঁচ ছয় ঘণ্টা কেটে যায় চাকার ওপর।
মোতালেব মিয়ার দীর্ঘ চাকরি জীবনের সময়ের বিরাট অংশই কেটেছে বাসের চাকার ওপর। বাস একটি গণতান্ত্রিক যানবাহন। ধনী-গরিব, ছেলে-বুড়ো, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, নারী-পুরুষ, বোকা-বুদ্ধিমান, সব শ্রেণী, পেশার মানুষই বাসে চড়েন।
সব কাজেরই অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন হয়। শুধু বাসযাত্রী ছাড়া। মোতালেব সাহেব নিজেই নিজের অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন করেন। একসময় দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য ছিল ‘এক্সপ্রেস’ সার্ভিস। পরবর্তীতে বাংলায় রূপান্তরিত হয়েছে ‘দ্রুতযান’।
ক্রমান্বয়ে বিরতিহীন, গেটলক, সিটিং সার্ভিস, কাউন্টার সার্ভিস। সার্ভিসগুলো খুবই ক্ষণস্থায়ী। কিছুদিনের মধ্যেই সিটিং সার্ভিস হয়ে যায় সিটি সার্ভিস অনায়াসে। যানজটে বিরতিহীনে বিরতির অভাব নেই। সিগন্যাল পোস্টগুলোতে গেটলকের লক খুলে যায় নির্বিঘেœ। বড় সাইজের ছাতার নিচে বসা টিকেট কাউন্টার উচ্ছেদ হয়ে যায় রাস্তা থেকে।
গাবতলী থেকে যাত্রাবাড়ী ‘সুপার লোকাল সিটিং সার্ভিস’ নামে অসংখ্য মিনিবাস কিছুদিন ছিল রাজপথে। রাজধানীতে মানুষ বাড়ছে। বাড়ছে যানবাহন। সে তুলনায় গণপরিবহন বাড়ছে না। অপেক্ষমাণ যাত্রীদের গাড়ির সাইনবোর্ড দেখার সময় নেই। পা রাখার জায়গা পেলেই হলো। ঠেলা, ধাক্কা, গুঁতা, যার যে অভিজ্ঞতা আছে কাজে লাগিয়ে চড়তেই হবে গাড়িতে। যেহেতু পায়ের নিচে চাকা নেই।
হেলপারের কী দায় ঠেকেছে, সিটিং সার্ভিসের দোহাই দিয়ে গেট আটকানোর? সুতরাং সব সার্ভিস এক সমান। ‘হাফ পাস নাই’ লেখা সাইনবোর্ডগুলো কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
ট্রান্সপোর্ট ডিকশেনারি বলে কোন অভিধান নেই। তবু ট্রান্সপোর্ট সার্ভিসের কিছু নিজস্ব ভাষা আছে। মোতালেব সাহেব এসব ভাষার সাথে সর্বাধিক পরিচিত। গণপরিবহন কর্মচারীদের ‘স্টাফ’ ছাত্রদের ‘হাফ’ আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ‘পাস’ ব্যাখ্যা করে বুঝাতে হয় না কন্ডাকটরকে। আইনগত কোন বৈধতা না থাকলেও সুবিধা আদায় করে নেয় এই তিন শ্রেণীর যাত্রী। তবুও ক্যাচাল চলে মাঝে মাঝে। অলিখিত ট্রান্সপোর্ট ডিকশেনারির কিছু কিছু শব্দ শুধু ড্রাইভার হেলপার ও কনডাকটরের  মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও মোতালেব সাহেবের বুঝতে অসুবিধা হয় না।
ক্যাচাল, তাফালিং, পল্টি, কাহিনী, জারহি এ জাতীয় শব্দগুলো কনডাকটর ও হেলপারদের ব্যবহার করতে হয় কায়দামত। ডাইনে ‘লম্বর’ বায়ে ‘প্লাস্টিক’ বলে হেলপার অনবরত সতর্ক করে ড্রাইভারকে। স্যার, উস্তাদ, মামা সম্বোধনও করতে হয় পাত্রভেদে। ‘সিগন্যাল’ শুধু হেলপারের মুখে ‘সিংগেল’ উচ্চারিত হয় না। বহু শিক্ষিত প্যাসেঞ্জারও উচ্চারণ করে ‘তাড়াতাড়ি সিংগেল পার হ’।
গণপরিবহন ও চায়ের দোকানে একসময় স্টিকার লাগানো ছিল ‘রাজনৈতিক আলোচনা নিষেধ’। আইনের নিষেধাজ্ঞাই কেউ মানে না। তাই ভিত্তিহীন নিষেধাজ্ঞার কোন বালাই নেই।  রাজনৈতিক আলেচনার মোক্ষম জায়গা এই দু’টি। রেডিমেড শ্রোতাও পর্যাপ্ত সময় আছে। শুরু করে দিলেই হয়।
কিছু পরিবহনে বিশিষ্ট মনীষীদের স্মরণীয় নীতিবাক্য লেখা আছে। মুখের কথায় চেয়ে লেখার মূল্যও গুরুত্ব বেশি। তাই এই অপপ্রয়াস।
বাসের ভেতরে একসময় লেখা ছিল দশ ও পাঁচ টাকার ভাঙ্তি নেই। পরবর্তীতে বহু বছর শুধু ডান পাশে শূন্য  বেড়েছে। এখন একদম মিশে গেছে।
এক সময় ষাট সিটের বিরাট বাসের একটি বা দু’টি সিটে মহিলা লেখা থাকতো। তবু সিট খালি থাকত। পুরুষরা এসব সিটে বসত না। এখন মহিলা সিটের সংখ্যা বেড়েছে। সুযোগ পেলে পুরুষের সিটেও বসে  যায়। তবু দাঁড়িয়ে থাকে অনেক মহিলা। মোতালেব সাহেব কখনো মহিলা সিটে বসেন না। তিনি ছোটকালের একটি নীতিকথা মনে রেখেছেন।
এমন কথা বলবি না, যাতে কেউ বলে জুট
এমন জাগায়  বসবি না, যাতে কেউ বলে উঠ।
মহিলা সিটে বসা অনেক যাত্রী মহিলা দেখে উঠে যায়। কাউকে বলে উঠাতে হয়, কাউকে টেনে তুলতে হয়। এ জাতীয় অপ্রীতিকর কিছু ঘটলে মোতালেব সাহেব মীমাংসার জন্য এগিয়ে আসেন।
– এই যে ভাই, উঠেন, এটা লেডিস সিট
-পিছে পুরুষ সিটে যে মহিলা বসা আছে, তাকে উঠতে বলেন।
– কথাটা অনেকের কাছে যৌক্তিক মনে হলেও মোতালেব সাহেব ব্যাখ্যা করে সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দেন।
– পুরুষ সিট বলে বাসে কোন সিট  নেই। মহিলাদের জন্য নয় সিট সংরক্ষিত। বাকিগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত। জাতীয় সংসদের ৩৩০ আসনের মত। ৩০টি শুধু মহিলার জন্য, বাকি ৩০০টিতে পুরুষ মহিলা যে কেউ প্রার্থী  হতে পারেন।
লোকাল সার্ভিসের  সিটগুলো আকারে বেশ ছোট। লং রুটের দু’জনের সিটকে ছয় ইঞ্চি বর্ধিত করে তিনজনের সিট বানিয়ে রাজধানীতে  বহু বাস চলছে। দূরপাল্লার আনফিট বাসগুলো লোকাল সার্ভিসের জন্য ফিট হয়ে যায়। ফিটনেস সার্টিফিকেট একাডেমিক সার্টিফিকেটের মত কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়।
মোতালেব সাহেব কাউকে বিব্রত করতে চান না যানবাহনে। তবু সমস্যা একটা রয়েছে। তার শরীরটা একটু মোটা। তার মত দু’জন বসলে ৩ জনের সিটে আর জায়গা থাকে না। নাম ধরে সরাসরি আক্রমণ না করে ইনডাইরেক্ট আক্রমণের কৌশল জানা আছে তার। তাকেই একদিন এরকম আক্রমণের শিকার হতে হলো।
–     বাসের সিটগুলা কি শুধু হাতির জন্য সংরক্ষিত?
মোতালেব সাহেব বুঝতে পারেন, কথাটা তাকে কটাক্ষ করেই বলা। তিনি এবার ডাইরেক্ট আক্রমণ করলেন আত্রমণকারীর ভাষায়।
– তা হবে কেন? শিয়াল-কুকুর সবার জন্য অবারিত। ঠেলে ঠুলে বসে পড়েন।
গাড়ি হার্ড ব্রেক করলে বেখেয়ালি যাত্রীর ব্যালেন্স হারিয়ে ফেলে। লোকটা হুমড়ি খেয়ে পড়লো একেবারে মোতালেব সাহেবের গায়ের ওপর। এবার ইনডাইরেক্ট আক্রমণের সুযোগ কাজে লাগান মোতালেব সাহেব।
– এই ড্রাইভারের বাচ্চা ড্রাইভার ! কেমনে গাড়ি চালাস? পোলাপান পইরা যায়।
ড্রাইভারের নাম ধরে গালি দিলেও ড্রাইভার নির্বিকার। এসব তাদের জন্য বন্ধুত্বপূর্ণ সম্বোধন। কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা সহজে হজম করতে পারছে না।
-ব্রাদার আমাকে পোলাপান বললেন?
-আপনাকে তো কিছু বলি নাই।
– আমি কি কিছু বুঝি না? একটু আগে শিয়াল কুকুর বলেছেন।
– এসব কথা না বুঝাই ভালো। বুঝেও বুঝবেন না। তাতে মজা পাবেন। আরো মজা পাবেন ড্রাইভার, কনডাকটরদের মতো কানে তুলা দিলে। ‘কথা কানে যায় না’ শুনেও দিব্যি না শোনার ভান করে ব্যাটারা।
এখন দেশ চালায় ইংরেজিতে লেডি, গ্রাম্য ভাষায় বেডি। অনেক অফিস চালায় মহিলা। গাড়িও চালায়। শুধু গণপরিবহন ছাড়া। বাস, ট্রাক, ট্যাক্সি, রিকশা চালানোর মতো সাহসী মহিলার অভাব নেই। তবে এখনো শুরু হয়নি।
সারা বিশ্বে নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে আন্দোলন হচ্ছে। বাংলাদেশও পিছিয়ে নেই। দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। সব জায়গায় সমান অংশীদার হতে চায় তারা।
পঞ্চাশ বছর আগেও নারী-পুরুষের হার এমনই ছিল। তখন গণপরিবহনে এত মহিলা দেখা যেত না। কারণও অনেকেই জানেন। কিন্তু বক্তৃতা দিয়ে কেউ বুঝায়নি। একদিন কায়দামত মোতালেব সাহেব বাসযাত্রীদের শুনিয়ে দিলেন অপ্রিয় লেকচারটি।
– আগে মহিলাদের কাজ ছিল রান্না-বান্না ও বাচ্চা-কাচ্চা লালন-পালন । তাদের বাসে ওঠার প্রয়োজনই হতো না।
এক জাঁদরেল মহিলাও সুযোগ বুঝে কাউন্টার আরগুমেন্ট করে ফেললেন :
– আগে নারী শিক্ষার সুযোগ ছিল না। তারা মূর্খতার জন্য গৃহবন্দী ছিল। এখন শিক্ষা-দীক্ষা, সভ্যতা-সংস্কৃতিতে নারীরা-পুরুষের চেয়ে কম না। সুতরাং নারীদের আর ঘরে বন্দী করে রাখার সুযোগ নেই। সভ্যতার চাকা সচল রাখতে হলে নারীদের প্রাপ্য অধিকার দিতে হবে।
মোতালেব সাহেবের মোক্ষম জবাব
– বাসের চাকার মতোই সভ্যতার চাকা চলে টায়ার ও টিউব দিয়ে। টিউব থাকে টায়ারের ভেতরে টিউব যদি টায়ারের পাশে বাইরে লাগানো হয়, তবে চাকার অবস্থা যা হবে, আমাদের অবস্থাও তাই হচ্ছে। সুতরাং টিউব ভেতরে থাকাই ভালো যতই টেকসই হোক।
এক মুহূর্ত জাঁদরেল মহিলার অগ্নিঝরা চাপা পাঙ্চার হয়ে যায় রিকশার চাকার মতো।

SHARE

Leave a Reply