Home গল্প মুয়িজের যুদ্ধ

মুয়িজের যুদ্ধ

শাহনাজ পারভীন#

বিকেলের নরম বাতাসটা বইতে শুরু করলে মুয়িজের মন খারাপ হয়। ইদানীং এটা ওর পরীক্ষিত বিষয়। বিশেষ করে মার্চের বিকেল। গত তিনটে মার্চ ছিল ওর জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ। এ বছরের মার্চ জুড়েই আধো ঠান্ডা, আধো গরম, আধো বাতাস, আধো উন্মাতাল ঝড়ের প্রস্তুতি। বিকেলের নরম বাতাসে ভেসে বেড়ানো বাতাবি ফুলের মাতাল করা গন্ধ ওকে নস্টালজিয়ার কষ্টে ভোগায়। আম বাগানের ধুলো ওড়া মাটিতে মুকুলের গড়াগড়ি। মুকুলের ডালে ডালে মৌমাছির একটানা গুঞ্জন ওকে আনমনা করে দেয়। দূর থেকে ভেসে আসে কাকদের একটানা কা- কা স্বর। কাকদের ডাক ওর একদম ভালো লাগে না। সে শব্দে বিকেল হতে না হতেই ওর সামনে থেকে সব চেনা জানা অধ্যায় অচেনা হতে থাকে। সব দেখাগুলো মুহূর্তেই অদেখা হয়ে যায়। সবকিছুই ওর নতুন মনে হয়। ওর বুকের বাম পাশের পাঁজর ঘেঁষে ব্যথা হতে থাকে। কী আচানক ভয়ঙ্কর ব্যথাটা হঠাৎ যেমন করে শুরু হয়, তেমন করে খুব সহজেই আর মিলিয়ে যায় না। ওর চোখের সামনে ভেসে ওঠে পাপন, রাজন, মুন্না, কাজল, কামাল, মুহিতের মুখগুলো। আজন্ম সে তাদের সাথে বেড়ে উঠেছিল। সকাল হতো ওদের মুখ দেখে, রাতে ঘুমাতে যাবার আগে প্রতিদিন ও ওদের সাথে এক মাদুরে বসে খেতো। স্বরবর্ণের অক্ষরমালা লিখতো, কাগজ কেটে নৌকা বানিয়ে নালার পানিতে ভাসিয়ে দিতো। বৃষ্টিতে ভিজতো, রোদে হাসতো, বিলের পুকুরের বেলে হাঁসগুলোর মত ডুব সাঁতারের খেলা খেলতো সারাটা দুপুর, স্কুলের মাঠজুড়ে দৌড়াতো, ঘুড়ি ওড়াত, গাছে চড়ত, দুরন্ত উন্মত্ততায় চোখের নিমিষে দিনগুলো পার করে দিত। আরো কত কী?
এক মার্চে দু দিনের জ্বরে বাবা হঠাৎ মারা যাবার পর থেকেই ওদের একান্নবর্তী সংসারে ওদের আর জায়গা হয় না। নতুন ঠিকানা হয় নানুর বাড়ির ছোট্ট সীমানা। যা ওকে শান্তি দিতো না মোটেও। সেখানে চাচাত ভাইবোনগুলো মুহূর্তেই ওর চোখের আড়াল হয়। কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও ওর মনের আড়াল হয় না তারা। ইদানীং আরো বেশি কাছে থাকে ওরা, আরো বেশি মনে পড়ে ওদের। হায় পৃথিবী! কি যে তোমার মায়া! প্রথম প্রথম প্রত্যেক মাসেই ওদের সাথে ওর দেখা হতো। চাচীদের সাথে ওরা মাঝে মাঝে নানুর বাসায় আসতো। পরের মার্চে ওর বড় আপন- কাছের প্রিয়জন নানু মারা যান। মুয়িজ আবারও একা হয়ে যায়। তার পরের মার্চে মায়ের নতুন বিয়ের পর থেকে ভাইবোনদের সাথে আর মুয়িজের দেখা হয় না। এই নতুন আঙ্কেল খুবই ভালো মানুষ। মাস ছয়েক আগে এই আন্টি মারা গেলে ছোট ছোট বাচ্চাদেরকে নিয়ে আঙ্কেল খুবই বিপদে পড়েন। বাধ্য হয়েছেন আবার বিয়ে করতে। মুয়িজকে আম্মার সাথে থাকতে আঙ্কেলের কোন আপত্তি নেই শুনেই আম্মা এই বিয়েতে রাজি হয়েছেন। নানুবিহীন মামার বাড়ি থাকতে মুয়িজের খুব কষ্ট হতো যে!
কিন্তু আম্মা যে কী? এই নতুন ভাইবোন সাথী আপা, শিবলী ভাইয়া, মুন্নি, অয়ন প্রত্যেকেই খুব ভালো। তারা সকলেই মুয়িজকে অনেক আদর করেন। আম্মাকে অনেক ভালবাসেন। আম্মাও তাদেরকে আদর করেন। কিন্তু মাঝে মাঝে আম্মাকে ওর অচেনা মনে হয়। কেন যে, আম্মা ও রকম করেন?
আম্মা কী বোঝে না? তাদেরও তো মা নেই। এ রকম করা মোটেই ঠিক নয়। ওরা তো এখনো অনেক ছোট। কেন, অকারণ সন্দেহে আঙ্কেলের সাথে ঝগড়া করে? কেন এই গরমে ভাইয়াকে বাজারে পাঠায়? প্রাইভেট টিউটরকে ছাড়িয়ে দিয়ে রোজ সন্ধ্যায় আমাকে পড়াতে বলে? আমার কী খারাপ লাগে না, নাকি? কেন সাথী আপাকে স্কুলে যেতে না দিয়ে ঘরের সব কাজ করায়। কেন আম্মা নিজে বাসায় থাকে অথচ রান্না করে সাথী আপু? একই সাথে খাই, অথচ সবাইকে এক পিস মাছ দিলে আমাকে দেয় দুই পিস? ভাতের নিচে এক পিস লুকিয়ে দেবে আর অন্য এক পিস দেবে ভাতের উপরে! আমি কী করে দুই পিস মাছ খাবো? একই জায়গায় বসে কি দুই রকম খাওয়া যায়? আমারও তো অনেক লজ্জা করে, না কি? আমি তো এখনো অনেক ছোট। বরং ভাইয়া, আপু মুন্নী সোনা ওদের দরকার বেশি বেশি খাবার। ওরা কত্ত বড় বড় বই পড়ে। ভারী ভারী ব্যাগ গুছিয়ে স্কুলে যায়। ওদের খেতে হবে বেশি। আম্মা কেন যে সেটা ভুলে যায়? কতদিন ভেবেছে এ নিয়ে মায়ের সাথে কথা বলবে মুয়িজ। কিন্তু ইদানীং আম্মা কেমন পাল্টে গেছে। আগের আম্মা আর এখনের আম্মার মধ্যে যোজন যোজন দূর! কেমন রাগি বদমেজাজি বোম ফাটা বিকেলের মত।
বোম ফাটা বিকেলের কথা মনে আসতেই ওর গতকালের কথা মনে আসে। গতকালও ঠিক এই সময়ে কামারখালীর বাজার ঘেষা মধুমতির পাড়ে বড় বড় দুটো শেল পড়েছে। শেল দুটো নদীর চড়ে আটকে গেছে বলে ফুটতে পারেনি। যদি শেল দুটো শুকনো জায়গায় পড়তো, তাহলে আড়পাড়া, কামারখালী, মছলন্দপুর, কোমরপুর গ্রাম মুহূর্তেই জ্বলে যেতো। কেউ বাঁচাতে পারতো না। ভাগ্যিস, নদীর চড়ে পড়েছে। মুয়িজ খুবই উত্তেজিত হয়ে ওঠে। পঁচিশ মার্চের রাত্রে ঢাকায় পাঞ্জাবি মিলিটারি নিরীহ ঘুমন্ত মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। যাকে পাচ্ছে তাকে জীবন্ত হত্যা করছে। মুয়িজ এসব কথা শুনেছে বড়দের মুখে। গতকাল থেকে এখানকার সবাই পালাতে শুরু করেছে। কিন্তু মুয়িজরা এখনো এখানেই আছে। ওরাও যাবে। গতকালই শিবলী ভাইয়ার নানা ভাই এসেছিলেন সবাইকে নিয়ে যেতে। তিনি জোরের সাথে আঙ্কেলকে বলেছেন-
-ঝুঁকি নেয়া ঠিক হবে না বাবা। সবাইকে নিয়ে আজ রাতেই চলো। তোমার আম্মা সবাইকে নিয়ে যেতে বলেছে।
– আব্বা, দেখি কী করা যায়?
– কী আর করবা? কখন কী ঘটে যায় কিচ্ছু বলা যায় না? একবার ওদের নিশানা ভুল হয়েছে বলেই যে বারবার ভুল হবে তার কি কোনো নিশ্চয়তা আছে?
– না, তা হবে না হয়ত। এই কামারখালী বাজার ওদের বিশেষ টার্গেট। কারণ সতীশ বাবুর দু’ দুটো জুটমিল ওদের লক্ষ্যবস্তু।
-তাহলে চিন্তা কর। জুটমিলে যদি শেল পড়ে তোমার ঘরের চাল ধরতে লাগবে দু’ মিনিট।
-তাই তো ভাবছি আব্বা। কিন্তু আপনার এই নতুন মেয়ের শরীর তো বেশি ভালো না। এই অবস্থায় কী যে করি?
– সেও ঠিক। তবে পথের কষ্টের চেয়েও যদি বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যায়, তখন কী করবা?
– তাই তো ভাবছি।
– অত শত ভাবনার কিছু নেই। তুমি আগামীকাল ভোরেই ওদের সবাইকে নিয়ে চলে আসো। আমি হলদে ডাঙার ঘাটে রহমতের ঘোড়ার গাড়ি পাঠিয়ে দেবো।
নানাভাই বারবার তাগাদা দিয়ে রাতেই চলে গেছেন। কিন্তু আম্মা তো কিছুতেই শিবলী ভাইয়ার নানা বাড়ি যেতে রাজি হচ্ছেন না। মুয়িজের ছোট্ট বুকটা ভয়ে দড়াম দড়াম করছে। কি জানি, যদি আজও কোন দুর্ঘটনা ঘটে?
সকালেই মধুমতির বুকের ওপর ব্রিজ তৈরি শেষ হয়েছে। শিবলী ভাইয়া মাকে বলছিল তখন। ওরা সবাই দল বেঁধে ব্রিজ দেখতে যেতে চেয়েছিল। আঙ্কেলের কড়া নিষেধ-
-এই অবস্থায় কেউ বাড়ির বাইরে যেও না। দেশের অবস্থা খুবই খারাপ। সারাদেশে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। একটা ভালো গাড়ি যোগাড় করতে পারলেই আমরা এখান থেকে চলে যাবো।
এরই মধ্যে চারিদিকে ছোটাছুটি শুরু হয়েছে। মছলন্দপুরের আকাশজুড়ে অ্যারোপ্লেনের দাপাদাপি। চারিদিক ছেয়ে গেছে কালো ধোঁয়ায়। কামারখালী বাজারে বহরকে বহর গাড়ি আসছে। দাউ দাউ আগুন জ্বলছে সতীশ বাবুর জুটমিলে, আশপাশ কলোনিতে।
মুয়িজ দৌড়ে বাড়ির ভেতরে আসে। হাঁপাতে থাকে। কাউকেই সে দেখতে পায় না। সবাই গতকালের তৈরি মোরচার ভেতর লুকিয়েছে। আম্মার অসুস্থ শরীর নিয়ে মোরচার ভেতর যেতে পারছে না। তিনি ঘরের এক কোণে মরিয়া হয়ে আছেন। এরই মধ্যে দুপদাপ ঢুকে পড়ল পাঞ্জাবি বাহিনী। শিবলী ভাইয়াও আম্মার সাথে ঘরের ভেতর। আম্মা মোরচার ভেতর যেতে পারেনি বলে ভাইয়াও যায়নি।
চোখের পলকে ঘরের দরজা লাথি দিয়ে খুলে ফেলে মিলিটারি বাহিনী। হাত ধরে হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে বাইরে বের করে আনে আম্মাকে। শিবলী ভাইয়া রুখে দাঁড়ান। যে কোন মূল্যে আম্মাকে রক্ষা করবেন তিনি।
– খবরদার, আমার অসুস্থ আম্মার গায়ে কেউ হাত দেবেন না। প্রয়োজন হলে আমাকে মারুন।
-কত্ত বড় সাহস? এইটুকুন একটু ছেলের কত্ত বড় বলিহারি? মুখের ওপর চ্যাটাং চ্যাটাং কথা কয়…
মুহূর্তেই গর্জে ওঠে কামান। শিবলী ভাইয়ার বুক ঝাঁঝরা হয়ে যায় নিমিষেই। মোরচার ভেতর থেকে সবার বের হয়ে আসার আগেই আম্মাকে টেনে গাড়িতে তোলা হয়। মুয়িজের মত বিহ্বল হয়ে তাকিয়ে থাকে সাথী আপা, নোমান ভাইয়া, মুন্নিসহ পাড়ার সকলেই। মুয়িজ আরো দেখতে পায় সেখানে জড়ো হয়েছে পাপন, মুন্না, কাজল, রাজন, নানু এবং বাবার উজ্জ্বল মুখ।
আরো কত শত মুখ স্পষ্ট হয় মুয়িজের সামনে এবং আরো অস্পষ্ট থেকে অস্পষ্টতর হতে থাকে আম্মার মুখ। মুয়িজের ঝাপসা চোখে দেখে তার পায়ের নিচে শিবলী ভাইয়ার গরম রক্তের স্রোত। সেই রক্তের স্রোতে ভাসতে ভাসতে মুয়িজ আর কিছুই দেখতে পায় না।

SHARE

Leave a Reply