Home ফিচার ফুলে ফুলে বসন্ত

ফুলে ফুলে বসন্ত

হারুন ইবনে শাহাদাত #

বাংলাদেশ বৈচিত্র্যময় ছয় ঋতুর চক্রে বাঁধা। শীতের কুয়াশার জাল ছিন্ন করে নতুন পাতার শোভা আর নানান রঙবেরঙের ফুলের উপহার নিয়ে কোকিলের মধুর কণ্ঠের গানের তালে তালে এ দেশে বসন্তকাল আসে। ফুলে ফুলে মধু সংগ্রহ করতে গুণ-গুণ গান গেয়ে গাছের পাতার ফাঁকে উড়ে বেড়ায় মৌমাছি, ভ্রমর আর নানা বর্ণের পাখি। বঙ্গাব্দের বর্ষপঞ্জিকা অনুসারে ফাল্গুন-চৈত্র দুই মাস বসন্তকাল। বাংলা অভিধানে মধুমাস বলে যে সমাসবদ্ধ পদ বা শব্দটি আছে, তার অর্থ নিশ্চয় তোমাদের অজানা নয়? তারপরও বলছি বাংলা অভিধানে মধুমাস শব্দের অর্থ হলো, চৈত্রমাস। কারণ মধু থাকে ফুলে, ফলে নয়। আর বসন্তকালেরই একটি মাস চৈত্র মাস। এ সময় ফুলে ফুলে ছেয়ে যায় বাংলার প্রকৃতি। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ গ্রীষ্মকাল। বসন্তের ফুল ফলে পরিণত হয় গ্রীষ্ম কালে। গ্রীষ্মের শেষ মাস জ্যৈষ্ঠ, এ মাসে ফল পেকে রসের ভারে টইটম্বুর হয়। কিন্তু দেশের পত্রপত্রিকায় জ্যৈষ্ঠ মাসকে লেখা হয় মিষ্টি ফলের রসে ভরা মধুমাস। আসলে মধুর ঋতু হলো বসন্ত। আর রসের ঋতু গ্রীষ্ম।
বসন্তকালে বাংলাদেশের প্রকৃতি সাজে নতুন সাজে। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় যদিও তার কবিতায় লিখেছেন, ‘ফুল ফুটুক আর না ফুটুক / আজ বসন্ত।’ কিন্তু বাস্তবতা হলো, বসন্তকালে ফুল ফুটবেই। গ্রামবাংলার বাতাসে ভেসে বেড়ায় ফুলের সুগন্ধ। এই সময়ে বাগানে বাগানে সৌন্দর্যের আলো ছড়ায় জুই, চামেলি, রজনীগন্ধ্যা, শিমুল, হাসনাহেনা, গোলাপ, লাল গুল মেহের (কৃষ্ণচূড়া) আর হলুদ রঙের রাধাচূড়া।
আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বসন্তের রূপ তার নানান গান ও কবিতায় তুলে ধরেছেন। যেমন :
‘এল এ বনান্তে পাগল বসন্ত
বনে বনে মনে মনে রঙ সে ছড়ায়রে
চঞ্চল তরুণ দুরন্ত’
আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বসন্তের অপরূপের মহিমা গেয়েছেন এইভাবে : ‘আহা, আজি এ বসন্তে এত ফুল ফুটে, এত বাঁশি বাজে, এত পাখি গায়,’
শুধু রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল নন প্রতিটি মানুষের মনেই আনন্দদোলা জাগায় বসন্তকাল। বাংলা সাহিত্যের কবিতা, ছড়া, গান, গল্প, উপন্যাসসহ প্রতিটি সৃজনশীল সৃষ্টিমাধ্যমেই আছে বসন্তের সরব উপস্থিতি। বসন্তকালকে তারা বসিয়েছেন রাজার আসনে। ছয়টি ঋতুর মধ্যে বসন্তকেই বলা হয় ঋতুরাজ। ভারতীয় উপমহাদেশের বিশেষ করে বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরার হিন্দু সম্প্রদায়ের বন্ধুরা বসন্তঋতুকে বরণ করেন ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে পূজা-পার্বণ আর বন্দনা সঙ্গীত আয়োজনের মাধ্যমে। ইদানীং তাদের এসব আয়োজনে অন্য সম্প্রদায়ের লোকদেরকেও শামিল হতে দেখা যায়।
বসন্তকাল মানেই ফুল! কিন্তু কী কী ফুল ফোটে এই মধুময় সময়? এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক বিপ্রদাশ বড়–য়া লিখেন, “বাংলার সব ফুল বসন্ত থেকে গ্রীষ্মে ফুটে আকুল হয়ে যায়। আদিতে বসন্ত ও গ্রীষ্ম মিলে চার মাসে একটি ঋতু ছিল। তারপর চার মাস বর্ষা, এরপর চার মাস শীত ঋতু। সে আড়াই হাজার বছর আগের কথা। প্রকৃতির স্বভাব অনুযায়ী বসন্ত ও গ্রীষ্মে গাছপালা নবপত্রিকায় ব্যাকুল হয়ে ফুল ফোটানোর কাজ শুরু করে। সেই সঙ্গে মানুষ ও প্রাণিকুলের চিত্তচাঞ্চল্য শুরু হবে। ফুল ও ফলে ভরে উঠবে বাংলার প্রকৃতি। ১৫ বছর ধরে নিবিড় নিলাজের মতো প্রকৃতিকে অনুসরণ করে এই বিশ্বাস বেড়ে যাচ্ছে। ওই যে পদ্ম, ওই যে শাপলা, যাদের আমরা বর্ষার বিলে দেখি, ওরা পুকুর ও জলাভূমিতে বসন্তে ফুটবে। পদ্ম ছাড়া বসন্তের বাসন্তী পুজো হয় না। বসন্তে না ফুটলে কোথায় পেতাম। গ্রীষ্মের কাঠফাটা বিলে-ঝিলে ফোটে না। কারণ পানির অভাবে ওদের কন্দ মাটির নিচে ঘুমিয়ে থাকে। বসন্তের বার্তা নিয়ে আসে পলাশ-শিমুল-মাদার। এরা সবাই বাংলার নিজস্ব ফুল। সবাই রঙে ঝলমল। তার মধ্যে সাদা শাপলা ও শ্বেতপদ্ম ব্যতিক্রম। এদেরও লাল, তীব্র লাল ও গোলাপি রঙের ফুল আছে। শুধু নীলপদ্ম বাংলা-ভারতীয় উপমহাদেশের সমতল ভূমির নয়। হিমালয়ের শীত অঞ্চলের ফুল নীলপদ্ম। ওকে চাষ কওে ফোটাতে পারেন। যুথিকা, জুঁই বা জুহি সারা বিশ্বে সুগন্ধির জন্য আদরণীয়। এর ১৭০টি প্রজাতির মধ্যে উপমহাদেশে আছে ৯০টি।
মহুয়া, বকুল, সুরভি রঙ্গন, পুলক জুঁই, গন্ধরাজ, শ্বেত শিমুল ও কুর্চি, করঞ্জা, শিরীষ, শিশু, কালো কড়ইগাছে পাউডারের পাফের মতো সুগন্ধ ফুল ফোটে বসন্তে। কৃষ্ণচূড়া, জারুল, সোনালু, অশোক, নাগকেশর অর্জুন, হরীতকী, জংলি বাদাম, দেশী বাদাম, দেবদারু, তেঁতুল, বৃষ্টি শিরীষ, গগন শিরীষ সেগুন, বাংলার আকন্দ, ভাঁটফুল, নিম, নিসিন্দা, পাখিফুল, হস্তীশুঁড়, গিমে, ঢোল কলমি মাধবী মধুমালতী ফুলে ভরে উঠে বাংলার প্রকৃতি। ফুলের গন্ধে মাতওয়ারা হয়ে পাখিরা কচিপাতার ফাঁকে ফুলের মঞ্জরি মধু পান করে মিষ্টি সুরের গান ধরে। শীতের জীর্ণতা আর মলিনতা কাটিয়ে বাংলাদেশের প্রকৃতি ফিরে পায় সচেতন নতুন প্রাণ।

SHARE

Leave a Reply