Home সাক্ষাৎকার চ্যালেঞ্জ অনেক বেশি, আরো চৌকস হয়ে উঠতে হবে – ড. মাহফুজুর রহমান...

চ্যালেঞ্জ অনেক বেশি, আরো চৌকস হয়ে উঠতে হবে – ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ

মাহফুজুর রহমান আখন্দ একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠিত ছড়াকার, কবি, গবেষক, সাহিত্য সমালোচক, সংগঠক এবং শিশুসাহিত্যিক। ছড়া-লিমেরিক, কবিতা এবং গবেষণাধর্মী গ্রন্থও বেরিয়েছে প্রায় কুড়িটি। সেই সাথে বাংলা সাহিত্যসহ বিশ্বসাহিত্যের মহানায়কদের নিয়ে বিভিন্ন প্রবন্ধও তিনি লিখে চলেছেন। তবে ছড়া-সাহিত্যের ক্ষেত্রে তিনি সবচেয়ে বেশি সফল। বিশেষত নিখাদ শিশুতোষ ছড়া ও শিশুতোষ গল্প রচনায় তাঁর দক্ষতা ঈর্ষনীয়। বিষয়ের বৈচিত্র্য, উপমা-উৎপ্রেক্ষা-রূপকের ব্যবহার এবং ছন্দের কারুকাজে তাঁর ছড়াগুলো হয়ে ওঠে আকর্ষণীয় এবং শিল্পমানে সমৃদ্ধ। সেইসাথে সমাজসচেতন, প্রতিবাদী ও ব্যঙ্গাত্মক ছড়া ও লিমেরিক রচনায়ও সিদ্ধহস্ত তিনি।
পেশাগত জীবনে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক। ১৯৭২ সালের ২৮ ডিসেম্বর গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা উপজেলার মুক্তিনগর ইউনিয়নের শ্যামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পিতা মোজাফফর রহমান আখন্দ এবং মা মর্জিনা বেগম। তিনি প্রাইমারি স্কুল থেকে শুরু করে জীবনের প্রতিটি পর্বেই কৃতিত্বপূর্ণ রেজাল্টের স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি ১৯৯৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফার্স্ট ক্লাস ফার্র্স্ট হয়ে এমএ করেছেন, অতঃপর ২০০০ সালে এমফিল এবং ২০০৫ সালে পিএইচডি ডিগ্রিও অর্জন করেন।

কিশোরকণ্ঠ : আপনার কিশোরবেলা কিভাবে কেটেছে এবং আজকের শিশুদের সাথে এর কোনো পার্থক্য আছে কি?
মাহফুজুর রহমান আখন্দ : পল্লীগ্রামে আমার জন্ম। গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা থানার শ্যামপুর গ্রামে। তখন ওটা ছিল অজপাড়া। গাঢ় সবুজ গ্রাম। গ্রামের পশ্চিম পাশ দিয়ে মৃদু কুলু কুলু শব্দে বয়ে গেছে কালপানি নদী। নদীর দুই পাশে ঘন বাঁশঝাড়, ঝোপজঙ্গল। হাজারো পাখির কিচিরমিচির, হরেক রকম বণ্যপ্রাণীর ছুটোছুটি। বাড়ির সামনে বিশাল ডোবা। শাপলা পদ্মের মাঝে রকমারি পাখির ওড়াউড়ি। মাছরাঙার ডুবসাঁতার। চাপ চাপ কচুরিপানার নিচে মাছ ধরার উৎসব। সে এক পাগল করা দৃশ্য। এসব ফেলে কি স্কুলে যেতে ইচ্ছে করে? কখনো না। এসব আমার ভীষণ ভালো লাগতো। তাই খুব ছোট বয়সে স্কুলে যাওয়া হয়নি। প্রায় ৯ বছর বয়স পর্যন্ত এসব নদী বিলে-মাছ ধরা, সাঁতার কাটা আর সবুজ মাঠে ছাগল চরানোর দুরন্তপনায় কেটেছে আমার শৈশব। আমার প্রতিবেশী ভাইবোনেরা যখন ক্লাস থ্রিতে ওঠে তখন শুরু হয় আমার স্কুলযাত্রা। স্কুলে পড়াকালীনও মাছ ধরা, ফসলের মাঠে কাজ করা ছিল আমার খুব প্রিয়।
আজকের শিশুদের সাথে সে সময়ের বিস্তর পার্থক্য। এখন তিন-চার বছর বয়সেই ওরা এক থলে বই নিয়ে স্কুলে যায়। শৈশবের সবুজ জীবনের কোনো স্বাদই তাদের নেই। মাঠের পরিবর্তে তাদের খেলাধুলা এখন মোবাইল আর কম্পিউটারে। গ্রামের নদী-ডোবাগুলোও শুকিয়ে গেছে। আগের মতো শাপলা-পদ্ম নেই। নেই মিঠে পানির রকমারি মাছ আর পাখির ওড়াউড়ি দেখার সুযোগ। এখনকার শিশুরা মাছ ধরার সুযোগই পায় না। সবকিছুই এখন অনেকটা মেকি হয়ে গেছে। লেখাপড়া ছাড়া শিশুদের যেনো আর কিছুই করার নেই। এতো পেরেশানিতে শিশুদের মধ্যে ঢুকে পড়ছে পাঠভীতি। এখন শিশুরা বইয়ের চেয়ে গেমস আর কার্টুনকেই বেশি প্রাধান্য দিতে চায়।
কিশোরকণ্ঠ : বড় হয়ে আপনি কী হতে চেয়েছিলেন এবং কতটুকু সফল বলে আপনি নিজেকে মনে করেন?
মাহফুজুর রহমান আখন্দ : আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের কথা ফোটার সাথেই শিখিয়ে দেই ‘তুমি বড় হয়ে কী হবে? শিশুটিও আধো আধো বোলে না বুঝেই উত্তর দেয়, দাত্তার, ইন্দিনিয়ার’ এরকম কিছু। অথচ সে জানেই না ডাক্তার কী, ইঞ্জিনিয়ার কী। কিন্তু আমাদের ছেলেবেলায় এ রকম কোনো কথা শিখিয়ে দেয়া হয়নি। তবে আমার দাদা মাওলানা খোদা বখশ আখন্দ সবসময় বলতেন, অনেক বড় মানুষ হতে হবে। তখন থেকেই বড় মানুষের স্বপ্ন দেখতাম। কবি হবো, সাংবাদিক হবো, শিল্পী হবো, এ রকম নানা স্বপ্ন নিয়েই কাজ শুরু করেছিলাম। ছাত্রজীবনের এক একটি ধাপ পার হলে স্বপ্নগুলো আরো বেশি দানা বেঁধে উঠেছিল। সবশেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতাই আমার স্বপ্ন হয়ে ওঠে। আলহামদুলিল্লাহ সে স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছে। আর আগের স্বপ্নগুলো তো হৃদয়জুড়েই বসে আছে। তবে বড় মানুষ হতে পেরেছি কি না তা এখনো বুঝতে পারিনি।
কিশোরকণ্ঠ : আজকের শিশু-কিশোরদের একজন সফল মানুষ হতে হলে কিভাবে পড়াশুনা করতে হবে?
মাহফুজুর রহমান আখন্দ : আমাদের সময়ের চেয়ে এখনকার চ্যালেঞ্জ অনেক বেশি। তাই শিশুদের আরো বেশি চৌকস হয়ে বেড়ে উঠতে হবে। এর জন্য চাই পাঠাভ্যাস বৃদ্ধির সাথে সাথে কো-কারিকুলার অ্যাকটিভিটিজ বাড়ানো। শুধুমাত্র মোবাইল গেমস খেলে কিংবা ফেসবুকে সময় না দিয়ে স্বাস্থ্যচর্চার জন্য যেমন খেলাধুলা করা উচিত তেমনি বিজ্ঞানের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সায়েন্টিফিক কর্মকান্ডসহ নিজের যোগ্যতা, আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি হয় ও হৃদয়ের আকর্ষণ আছে এমন কো-কারিকুলার অ্যাকটিভিটিজের সাথে সম্পৃক্ত হওয়া জরুরি। তবে পাঠ্যপুস্তক পাঠের পাশাপাশি অন্যান্য বইয়ের পাঠাভ্যাসও খুবই প্রয়োজন। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ জীবনগঠন। লেখাপড়া এবং কো-কারিকুলার অ্যাকটিভিটিজের মধ্যে একটা সমন্বয় করে চলা। সারাদিন শুধু খেলাধুলা নিয়ে ব্যস্ত থাকলাম লেখাপড়ায় নেই কিংবা সারাদিন শুধু লেখাপড়া নিয়ে পড়ে থাকলাম শারীরিক বা মানসিক বিকাশের কোন কর্মকান্ডে একদম ফাঁকি, তাহলে মানবিক বিকাশ ঘটবে না। আর এর ফলে পরিপূর্ণ মানুষ হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে।
কিশোরকণ্ঠ : শিশু-কিশোরদের জন্য কিরূপ বাংলাদেশ প্রত্যাশা করেন?
মাহফুজুর রহমান আখন্দ : শিশুদের বেড়ে ওঠার উপযুক্ত বাংলাদেশ চাই। খোলা আকাশ, দূষণমুক্ত বাতাস, বিষ ও ফরমালিন মুক্ত খাবার, খেলাধুলা ও চলাফেরার নিরাপদ মাঠ-রাস্তাঘাট, সুস্থ মিডিয়া ও সুস্থ সংস্কৃতি, সবুজ প্রকৃতি ও মননশীল পরিবেশ সর্বোপরি শিশুদের জন্য পজেটিভ ভাবনার মানসিকতাসম্পন্ন জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশ। সেইসাথে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা পরায়ণতামুক্ত এবং সন্ত্রাস, চাঁদাবাজিমুক্ত বাংলাদেশ চাই।
কিশোরকণ্ঠ : লেখালেখির অনুপ্রেরণা কী করে পেলেন এবং আপনার প্রথম লেখা কোথায় ছাপা হয়?
মাহফুজুর রহমান আখন্দ : অষ্টম শ্রেণীতে লেখাপড়াকালীনই লেখালেখি শুরু। অবশ্য তা লিখতাম একেবারে সঙ্গোপনে। খাতা আর ডায়েরির পাতা ভরে রাখতাম ছড়া-কবিতা লিখে। বড় কাউকে লজ্জায় দেখাতাম না, তবে ছোটদের ওপর মাতব্বরি করতামÑ ‘দেখবি আমি শিগগিরই খুব বড় কবি হবো, আমার কবিতা তোদের পাঠ্যবইয়ে ছাপা হবে’ আরও কত কী। এখন ওসব মনে হলে হাসি পায়। বড় বড় শিল্পীর গান শুনতাম। মনে হতো আমিও যদি গান লিখতে পারতাম, গাইতে পারতাম! অবশেষে সে স্বপ্ন পূর্ণ হতে শুরু করলো। ১৯৮৭ সালে ছাপার অক্ষরে ছড়া প্রকাশের মধ্য দিয়েই মূলত সাহিত্যের অঙ্গনে পথচলা। গান  লেখাও শুরু করেছিলাম সে সময় থেকে। তখন দেয়ালিকা প্রকাশ করতাম। অবশেষে ১৯৮৯ সালে প্রথম পত্রিকা সম্পাদনাতেও হাত দেই। সেইসাথে ১৯৯২ সালে সুস্থ সংস্কৃতিচর্চার জন্য বগুড়ায় সমন্বয় সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংসদ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনও গড়ে তুলি। সেখানে শিশু গ্রুপটিও ছিল খুবই শক্তিশালী। সংগঠনটি আজো কাজ করে যাচ্ছে।
কিশোরকণ্ঠ : আপনার প্রথম প্রকাশিত লেখা এবং তার প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?
মাহফুজুর রহমান আখন্দ :  সে এক অন্যরকম অনুভূতি। পত্রিকায় লেখা পাঠানোর পর আর ঘুম আসে না। চোখ বুজলেই নিজের নামটা ছাপার অক্ষরে এসে নতুন কল্পনার জগৎ তৈরি করে দিয়ে যায়। মনটা পাখির মতো উড়তে থাকে উন্মুক্ত আকাশে। প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুঁজতাম, অনেককেই বলে রাখতাম আমার লেখা ছাপা হবে। লেখা ছাপার পরে মনে হলো, আমি বিশ্ব জয় করে ফেলেছি।
কিশোরকণ্ঠ : আপনার লেখায় কোন কোন বিষয়গুলো বেশি এসেছে এবং কেন?
মাহফুজুর রহমান আখন্দ : আমি মূলত ইতিহাসের ছাত্র। ইতিহাস পড়ি এবং পড়াই। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ শেষ করার পর এমফিল ও পিএইচডি গবেষণা করতে এসেই মূলত ইতিহাস পাঠ শিখেছি। ইতিহাস অধ্যয়ন ও অনুসন্ধান আমার ভালো লাগে। পেশাগত কারণে এটি আরো প্রিয় হয়ে থাকছে সব সময়। এ বিষয়ে লেখালেখি করতেও খুব মজা পাই। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ের পাঠ্যবইসহ আমার বেশ কিছু গবেষণামূলক ইতিহাস গ্রন্থও প্রকাশিত হয়েছে।
ছাত্রজীবন থেকেই সাহিত্যের প্রতি একটা আলাদা টান ছিল। সেটা এখন গভীর প্রেমের রূপ লাভ করেছে। ছড়া, কবিতা, গান, লিমেরিক, গল্পসহ সাহিত্যের প্রায় প্রত্যেকটি শাখাতেই কম বেশি বিচরণের চেষ্টা করছি। সাহিত্য যেহেতু আমার হৃদয়ের খোরাক, তাই লিখতে পারলেই মনটা ফুরফুরে থাকে। আমার লেখার একটি বড় অধ্যায়জুড়ে আছে শিশুসাহিত্য। কেননা শিশু-কিশোর ও তরুণদের মাঝেই অমিত সম্ভাবনা খেলা করে। এদের পরিশুদ্ধ মানসিকতায় জাগাতে পারলেই স্বদেশ সমৃদ্ধ হবে।
কিশোরকণ্ঠ : বাংলাদেশের শিশুসাহিত্য সম্পর্কে আপনার অভিমত কী এবং শিশুসাহিত্যের ক্ষেত্রে আপনার ব্যক্তিগত পরিকল্পনা বলবেন কি?
মাহফুজুর রহমান আখন্দ : এ বিষয়ে নানাজনের নানা মত থাকলেও আমি মনে করি শিশুসাহিত্য চর্চা এখন সকল সময়ের চেয়ে তুঙ্গে। নানা ঢঙে এখন শিশুদের জন্য লেখা হচ্ছে। অডিও ভিজ্যুয়াল পদ্ধতিতে শিশুসাহিত্যকে  ছড়িয়ে দেবার জন্য নানা রকম প্রকাশনাও বেশ চোখে পড়ার মতো। তবে হতাশার দিক হলো, অধিকাংশ লেখক আদর্শিক দিক বিবেচনা না করেই মিডিয়ার কল্যাণে অতি সস্তায় নান্দনিক সাহিত্যিক হয়ে উঠতে পছন্দ করছেন; এটা শুধু শিশুসাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে নয়, বাংলা সাহিত্যের জন্যও খুব আশঙ্কার দিক। আমি ব্যক্তিগতভাবে শিশুদের জন্য যেমন ছড়া লিখছি তেমনি শিশুতোষ গল্প, প্রবন্ধ লেখারও চেষ্টা করছি। সেইসাথে যারা আমাদের স্বপ্নের মানুষ, তাদেরকে মডেল হিসেবে ধরে শিশুদের সামনে সহজ ভাষায় উপস্থাপনের চেষ্টাও অব্যাহত আছে।
কিশোরকণ্ঠ : সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সাথে আপনার দীর্ঘ পথচলা। অপসংস্কৃতির প্রভাব সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?
মাহফুজুর রহমান আখন্দ : দীর্ঘ না হলেও প্রায় দুই যুগ তো বটেই। দিন যতই গড়াচ্ছে এ অঙ্গন ততোই ইসলাম-পূর্ব আরবের সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলকে শুধু দখলই নয় অনেকাংশে ছাড়িয়েও যাচ্ছে। আকাশ সংস্কৃতির ছোঁয়ায় আধুনিকতার নামে সাংস্কৃতিক অঙ্গন এখন শুধু চিত্তবিনোদন নয় অনৈতিক বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। ভারতীয় হিন্দি চলচ্চিত্রের দাপট সামলাতে আমাদের দেশের চলচ্চিত্রও তাদের থেকে কম যাচ্ছে না, নাটকের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ মানগত দিকে অনেকাংশে এগিয়ে থাকলেও ইন্ডিয়ান সিরিয়ালের কাছে আত্মসমর্পণ করতে যাচ্ছে। মিডিয়ার যুগে এসে মনে হচ্ছে এ দেশেও এখন সংস্কৃতি চর্চার প্রতিযোগিতা নয় বরং অশ্লীলতা চর্চার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। শিশুতোষ কার্টুনেও অশ্লীল দৃশ্যের অবতারণা করা হচ্ছে। জ্ঞানচর্চার উন্নতমাধ্যম হিসেবে ইন্টারনেটের যাত্রা শুরু হলেও এটা এখন যুবসমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। অরুচিকর ওয়েবসাইটগুলো এর উপকারিতাকে ম্লান করে দিচ্ছে। সাহিত্যকেও অশ্লীলতায় পরিপূর্ণ করতে কেউ কেউ অতি উৎসাহীর ভূমিকা পালন করছেন। আগামী প্রজন্মকে বাঁচাতে হলে এসবের বিষয়ে এখনি সচেতনভাবে ভাবতে হবে।
কিশোরকণ্ঠ : আপনি গান লিখে থাকেন। বাংলা গানের ভবিষ্যত কী?
মাহফুজুর রহমান আখন্দ : গান আমার অন্যতম প্রিয় বিষয়। গান গাওয়ার ক্ষেত্রে এখন ব্যাপক ভাটা পড়লেও শোনার নদীতে জোয়ার আগের মতোই। লেখারও চেষ্টা করি। শিশুতোষ গানও লিখেছি বেশ কিছু। হিন্দি গানের ভিড়ে বাংলা গান কিছুটা ম্রিয়মাণ হলেও আশার দিক যে, শিশু-কিশোর ও তরুণদের একটি বৃহৎ অংশ ভারতীয় অশ্লীল হিন্দি গান থেকে নিজেদেরকে সরিয়ে রাখতে চেষ্টা করছে। তারা আদর্শিক বাংলা গান শোনা এবং চর্চা করাকে নিজেদের জন্য কল্যাণকর বলে মনে করছে। এর মাধ্যমে তাদের যেমন নৈতিকতার বিকাশ ঘটছে তেমনি দেশপ্রেমও তৈরি হচ্ছে সমান তালে। এটা ভীষণ আশার দিক। এ তরুণরাই একদিন এদেশ থেকে অপসংস্কৃতিকে তাড়িয়ে দিতে সক্ষম হবে ইনশাআল্লাহ।
কিশোরকণ্ঠ : আপনার শখ কী?
মাহফুজুর রহমান আখন্দ : ছোটবেলায় ছিল মাছ ধরার শখ, এখন আর পারি না। তবে এখন বই পড়া এবং লেখালেখি করতে খুব ভালো লাগে।
কিশোরকণ্ঠ : আপনার প্রিয় মানুষ কে?
মাহফুজুর রহমান আখন্দ : আব্বা-মা, পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবরা আমার প্রিয় হলেও আমার সব চেয়ে প্রিয় মানুষ মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা.। তিনি আমার সামনে চলার মডেল। তাঁকে অনুসরণ করতে পারলেই প্রত্যেক মানুষই সফল হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
কিশোরকণ্ঠ : কিশোরকণ্ঠের পাঠকদের উদ্দেশে কিছু বলুন।
মাহফুজুর রহমান আখন্দ : সবই তো কিশোরকণ্ঠের পাঠকদের উদ্দেশেই বলেছি। তারপরও তাদের উদ্দেশে আমার কথা হচ্ছে, এ দেশ আমাদের প্রিয় জন্মভূমি। এ দেশকে ভালোবাসতে হবে আমাদের সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ তৈরির স্বার্থেই। দেশটা ভালো থাকলে আমরাও ভালো থাকবো। আমরা যদি আদর্শবাদী চরিত্রবান হিসেবে গড়ে উঠতে পারি তাহলে আমাদের দেশটাও সুন্দর দেশ হিসেবে গড়ে উঠবে। আমাদের ভবিষ্যৎ সুন্দর হবে। আর আমাদের এ জীবনই শেষ নয়, মৃত্যুর পরে আছে অনন্ত জীবন, সে জীবনের সুখ ও শান্তির জন্য আমরা নিজেদেরকে ধর্মীয় মূল্যবোধের আলোকে গড়ে তুলি। এতে আমরাও সুন্দর মানুষ হবো, দেশটাকেও বানাতে পারবো শান্তির আবাসভূমি। সবাই সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে শিখি। কবিতার ভাষায়-
‘বৈরী হাওয়ার ভয় কাটেনি উথাল-পাথাল নদী / ভিড়বে তবু জীবনতরী স্বপ্ন থাকে যদি’
স্বপ্নকে ঘিরে আমরা সবাই ভালো থাকি, নিরাপদে থাকি।
কিশোরকণ্ঠ : কিশোরকণ্ঠের জন্য সময় দেয়ায় আপনাকে অনেক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
মাহফুজুর রহমান আখন্দ : কিশোরকণ্ঠ পরিবারকেও আমার পক্ষ থেকে ধন্যবাদ, আমাকে সুযোগ করে দেবার জন্য। আল্লাহ হাফেজ।

উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা
ছড়াগ্রন্থ
ধনচে ফুলের নাও, পরিলেখ প্রকাশনী, রাজশাহী, ২০০৭
পদ্মাপাড়ের ছড়া, পরিলেখ প্রকাশনী, রাজশাহী, ২০০৪
মামদো ভূতের ছাও, শব্দশিল্প প্রকাশনী, চট্টগ্রাম, ২০০৮
স্বপ্নফুলে আগুন, পরিলেখ প্রকাশনী, রাজশাহী, ২০০৯
ছড়ামাইট, আত্মপ্রকাশ ঢাকা, ২০১১
জ্বীন পরী আর ভূতোং, অন্যথা, নওগাঁ, ২০১৪
অনুকবিতাগ্রন্থ
তোমার চোখে হরিণমায়া, অন্ত্যমিল প্রকাশনী, বগুড়া, ২০১০
কবিতাগ্রন্থ
জীবন নদীর কাব্য, পরিলেখ প্রকাশনী, রাজশাহী, ২০১৫।
প্রথম দশকের কবিতা, রুহুল আমিন সম্পাদিত, সৃষ্টি প্রকাশন, বগুড়া, ২০১৩
কিছু ফুল কিছু কাঁটা, মুকুল কেশরী সম্পাদিত, প্রদীপ্ত সাহিত্য আসর, কেশরহাট, রাজশাহী, ২০১৩
শিশুতোষ গল্পগ্রন্থ
জ্বীনের বাড়ি ভূতের হাড়ি, পরিলেখ প্রকাশনী, রাজশাহী, ২০১১
জলজ রাজার দেশে, ঢাকা, ২০১৫।
গানের বই
হৃদয় বাঁশির সুর, পরিলেখ প্রকাশনী, রাজশাহী, ২০১২
লিমেরিকগ্রন্থ
গুমর হলো ফাঁস, পরিলেখ প্রকাশনী, রাজশাহী, ২০০৭
গবেষণাগ্রন্থ
রোহিঙ্গা সমস্যা : বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, গবেষণা বিভাগ, ঢাকা, ২০০৫
আরাকানের মুসলমানদের ইতিহাস, বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি, চট্টগ্রাম-ঢাকা, ২০১৩
সমকালীন বিশ্বে মুসলিম সংখ্যালঘু, গ্রন্থকুটির, ঢাকা, ২০১৪
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুসলমানদের ইতিহাস, আবদুল্লাহ এ- সন্স, ঢাকা ২০১৫।
History of Islam : Prophet Muhammad (saws) and Khulafae Rashedin, BIIT, Dhaka 2014.

পুরস্কার
ঢাকা শব্দশীলন একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার ২০১০, বগুড়া সৃষ্টিশীল লেখকসংঘ সাহিত্য পুরস্কার ২০১১, খুলনা রঙধনু সাহিত্য পুরস্কার ২০১১, বগুড়া সংস্কৃতিকেন্দ্র অ্যাওয়ার্ড ২০১২, দিনাজপুর নজরুল সাহিত্য পদক ২০১২, পাবনা উত্তরণ সাহিত্য পুরস্কার ২০১৪, পাবনা সিনসা সাহিত্য পুরস্কার ২০১৪ এবং ২০১৪ সালে রাজশাহী শহীদ কামাল খাঁ স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কারসহ বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

SHARE

1 COMMENT

  1. ড.মাহফুজুর রহমান আখন্দ সাহেবকে ধন্যবাদ তার অসাধারণ সাক্ষাৎকার দেয়ার জন্য। সাক্ষাৎটি পড়ে ছোটবেলার অনেক স্মৃতি মনে পড়ে গেল। ধন্যবাদ কিশোরকণ্ঠ প্রত্রিকাকে।

Leave a Reply