Home প্রতিবেদন ভর্তিযুদ্ধে ব্যাহত হচ্ছে শিশুর মানসিক বিকাশ

ভর্তিযুদ্ধে ব্যাহত হচ্ছে শিশুর মানসিক বিকাশ

আব্দুল হাদী আল-হেলালী #

নতুন বছর শুরু হতে না হতেই পার হয়ে গেল একটি মাস। আর নতুন বছরের শুরু মানেই নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তি হওয়ার যুদ্ধ। শিশুদের এই ভর্তি নিয়ে শুরু হয় নানা তোড়জোড়। বিভিন্ন স্কুল থেকে ভর্তি ফরম সংগ্রহ করা, স্কুলে স্কুলে ঘুরে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেয়া, নির্দিষ্ট সময়ে ফলাফল দেখা, তাদের নতুন স্কুলে ভর্তি করানো ইত্যাদি ইত্যাদি। আর এমন কঠিন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার পূর্বে শুরু হয় দীর্ঘমেয়াদি মহড়া। নানা ভর্তি কোচিংয়ে দৌড়ানো, মডেল টেস্ট দেয়া, সকালে গৃহশিক্ষক আসবেন, বিকেলে  কোচিংয়ে যেতে হবে আবার রাতে টিচারদের পড়া শিখতে হবে।
কিন্তু কোমলমতি এসব শিশুর এতটুকু বিশ্রাম নেই। নেই কোনো অবসর। ছোট শিশুদের কোমল মনে এ এক বিরাট চাপ। সে সঙ্গে মায়েদের উৎকণ্ঠার শেষ নেই। তাইতো সারাক্ষণ সন্তানের পেছনে মায়ের কড়া নজর- ভালো করে পড়ো, নইলে ভালো স্কুলে ভর্তি হতে পারবে না, শহরের নামকড়া স্কুলে ভর্তি করানো যাবে না এভাবে আরও কত কী। শিশুরা মায়েদের এ রকম কথা শুনতে শুনতে একপর্যায়ে বিরক্ত হয়ে পড়ে। আর এভাবেই ভর্তি পরীক্ষার জন্য বছরজুড়ে যে প্রস্তুতি তা মানসিক বিকাশে বাধা দান করে কোমলমতি এসব শিশুকে।
কিন্তু বাবা-মায়েরাও যেন এক প্রকার অসহায়। সীমিত আসনসংখ্যার জন্য অনেক প্রতিযোগী অংশ নেয়। যেমন ১০০ আসন সংখ্যার জন্য অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় ৮০০ কিংবা ১২০০ প্রতিদ্বন্দ্বী অংশ নেয়। সেখানে তার সন্তান টিকতে পারে, নাও পারে। তাইতো প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এক পর্যায়ে অনেক সময় বাধ্য হয়েই এমন বোঝা শিশুদের মাথায় চাপিয়ে দেন অভিভাবকেরা। কিন্তু এত চাপ আর বাবা-মায়ের এমন কড়া নজরদারিতে শিশুরা পড়াশোনার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে ওঠে। ভর্তিসংক্রান্ত এমন মানসিক চাপ অস্থির করে তোলে খুদে এসব শিক্ষার্থীকে। তারপর যারা পরীক্ষায় কৃতকার্য হলো তারা বেঁচে গেলো কিন্তু যারা অকৃতকার্য হলো বা যে অভিভাবকের খুঁটির জোড় নেই তাদের কী অবস্থা? বাচ্চাটি পরীক্ষায় টিকল না, ভর্তি হতে সমর্থ হলো না বলে অবচেতনেও হয়তো বাবা-মা মনোক্ষুণœ হতে থাকেন বাচ্চাটির ওপর। যা এতদিনের ব্যবহার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। আবার অনেক বাবা-মা রয়েছেন যারা অযথা অন্যের বাচ্চার সঙ্গে নিজের বাচ্চার তুলনা করেন। হয়তো অভিভাবকরা তাদের তিরিক্ষি মেজাজের খবর নিজে টের পান না কিন্তু বাচ্চারা অনুভব করে মা, বাবা আগের মতো ভালোবাসে না। এই সময় অভিভাবকদের সাথে বাচ্চাদের এক ধরনের দূরত্ব সৃষ্টি হয়ে যায়। তারপর শুরু হয় নতুন স্কুলজীবন। বছর শুরুর সাথে সাথে হাঁটি হাঁটি পা পা করে বাচ্চারা আজকাল স্কুলে যেতে শুরু করে। যাদের কথা ফুটেনি ভালো কওে, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আশ্রয় মা, বাবাকে দেখেই বছর চার, পাঁচ সময় পার হয় শিশুটির। ভালোবাসা আর আদরে যার প্রতি মুহূর্তে অবগাহন। আজকাল একক পরিবারের বাচ্চাদের কাছে মানুষের গন্ডি বড় সীমাবদ্ধ, মা বাবার আদর অপরিসীম। সেই ছোট গন্ডির শিশুটিকে হঠাৎ করে যেতে হয় অনেক অচেনা মানুষের ভিড়ে। শুধু তাই নয়, এতটুকু জীবনে পরিচিত আদর আহ্লাদ হঠাৎ কেমন অচেনা হয়ে ওঠে। খেলাধুলার মজার জীবনটা কেমন ব্যস্ত হয়ে ওঠে। স্কুল নামের নতুন জায়গা। অচেনা মানুষগুলো শিক্ষকদের মুখ নয় যেন দৈত্য দানো। এক ঝটকায় বদলে দেয় শিশুদের জীবন যাপন। এভাবেই একটি শিশুর মানসিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়ায় আমাদের প্রচলিত ভর্তিপদ্ধতি।
এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষাবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা এবং গণস্বাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী কিশোরকণ্ঠে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, আমাদের প্রচলিত এই ভর্তিপদ্ধতি পরিবর্তন করা খুবই জরুরি। সেই সাথে অভিভাবকদেরকেও আরও সচেতন হতে হবে। মা-বাবার উচিত শিশুদের বোঝানো- যে স্কুলেই পড় না কেন ভালো করে পড় তবেই ভালো ফলাফল করবে, সেই সাথে তাদের যথাযথ মানসিক বিকাশ ঘটবে। বর্তমান এই ভর্তিপ্রক্রিয়া পরিবর্তন করে দেশের প্রাথমিক স্তরের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান বৃদ্ধিরও পরামর্শ দেন তিনি। এ ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করেন সাবেক এই উপদেষ্টা।
জাতির ভবিষ্যৎ কান্ডারিরা যদি একটি সুখকর ভর্তিপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শিক্ষাজীবনে পদার্পণ করতে পারে তাহলে হয়তো আর কোন আদুভাই জন্ম নেবে না আমাদের সমাজে। পত্রিকার পাতা খুলে লাখো শিশুর করুণ চাহনি আমাদের দেখতে হবে না। ছোট্ট শিশুটিকে হয়ত আর অপরিচিত মানুষের সামনে এসে ভড়কে যেতে হবে না। আমরা পাবো একঝাঁক মেধাবী তুখোড় ও সৃজনশীল প্রজন্ম।

SHARE

Leave a Reply