Home গল্প চেনকু মিয়ার রুটি-গুড্ডি

চেনকু মিয়ার রুটি-গুড্ডি

মঈন শেখ #

– রুটি আর করিস না রে মা; হামাক তাকাতেও ইচ্ছা করে না।
– তুইতো আচ্ছা ছাওয়াল। খাবার জিনিস লিয়া কেও অমন কদা বুলে? আল্লাহ নারাজ হোবে যে।
– হামার কী দুষ বুল; গলা দিয়া নামে না যে। গুলটি হইয়া আইটক্যা থাকে। উগল্যা আসে।
– তুই তাওতো রুটি পাওজু। কেউ কেউ তাওতো পাওজে না। তারা কী করবে? মায়ের প্রশ্নের কোন উত্তর খুঁজলো না কিংবা দেবারও চেষ্টা করলো না চেনকু মিয়া। নিচ দিকে মুখ করে গোঁ ধরলো তবুও। মাটি খোঁটরায় পায়ের নখ দিয়ে।
মা অবশেষে হেঁসেল থেকে উঠে এসে চেনকু মিয়ার মাথায় হাত বুলালোÑ লে বাপ অল্প এ্যকনা খা। এত বড় রাইত, না খাইয়া শুলে প্যাটের মধ্যে ঘা হোবে। আইজক্যা হাটোত হোনে চাউল আইনবেনি তুর বাপ। সকালে ভাত খাইস।
– হুঁ হুঁ, তুই দৈনিকই বুলিস ঐ কদা। চাউল তো আনে না। এভাবেই ঝাঁঝিয়ে উঠলো চেনকু মিয়া।
– আইনবে বাপ, আইনবে। সকালে ভাত না পাইলে তগন বুলিস। মা বাহু ধরে টানতে লাগলো চেনকুকে। সেও টানাটানি করলো না তেমন। তবে সামনে আগাতে খুব অনীহা। গাভী দহনের সময় বাছুর টানলে যেমন পেছন দিকে ঝুঁকে থাকে, ঠিক ঐ ঢঙে আগালো। কিংবা বড় ঝুঁকি নিয়ে কোনো যুদ্ধে যাচ্ছে সে। এ যাত্রা জিততে পারলেই দেখতে পাবে বিজয় সূর্য। ঘুম থেকে উঠে যা দেখবে। অবশেষে তেতো ওষুধ গেলা করে গিললো কয়েক টুকরা। কতকটা চিবিয়ে কতকটা না চিবিয়ে। ঢকঢক করে এক গেলাস পানি খেয়ে ধপধপ শব্দ তুলে শুতে গেল চেনকু। হাঁটার শব্দেও রাগ প্রকাশ পেল। তবে রাগটা যে কার ওপর তা প্রকাশ পেল না সরাসরি। হয়তো রুটি, হয়তো মা, হয়তো বাবার ওপর। কিংবা তিনের ওপরই।
দুইবার পাশ ফিরলো। ঘুম আসে না। ভাপ ওঠা ভাতের তাজা গন্ধ সিথানে ঘুরঘুর করছে। কতদিন শুঁকেনি গন্ধটা। চেনকু স্পষ্ট দেখতে পেল গরম ভাত গামলায় ঢালার পর স্বচ্ছ কুন্ডলী পাকানো ধোঁয়া। ধোঁয়াতে আড়াল হয় মায়ের মুখ। নতুন করে গাঝাড়া দিয়ে ওঠে ক্ষুধাটা। হোক আলুভর্তা দিয়ে, তাই খাবে। ভাতে লবণ ছিটিয়ে একটু পানি মিশাবে। ভর্তা দিয়ে মাখালে বড় মোলায়েম ও নরম হয়। কতদিন খায়নি এভাবে। স্বাদটা মনে করতে চেষ্টা করল। আর এগুলোই মনে করতে করতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়লো চেনকু।
তখন চালের আকাল। চালের অর্ধেক দাম ছিল গমের। নিম্নবিত্তের মানুষেরা একবেলা ভাত খেলে দু বেলা রুটি খেত। আবার কিছু পরিবারে ভাত রান্না মানেই মস্ত খুশির খবর। চেনকুরাও তাই। পাঁচ সদস্যের পরিবার। চেনকুরা তিন ভাইবোন। সে মেজো। জেদ রাগ, অভিমান; সবটাই তার বেশি। প্রতিবাদীও। চেনকুর বাপ মায়ে আকিকা দিয়ে নাম রেখেছিল আব্দুল জলিল। তবে এ নাম বেশিদিন টেকেনি। দু’চার দিন যদি স্কুলে যেয়ে থাকে সেখানে খাতাতে আছে। আর এখন আছে বাপ মায়ের মনে। চেনকুর মনে। চেনকু নামটা কখন কিভাবে উদয় হলো তা আর কেউ খুঁজে না এখন। খুঁজে না চেনকুও। হয়তো তার কথা বলা, স্বাস্থ্য, দেহের গড়ন কিংবা রাগ সবকিছু বিচার বিশ্লেষণ করে কেউ বুঝি সুড়–ৎ করে বলে ফেলেছিল কথাটা। ডেকেছিল চেনকু বলে। লুফে নিলো সবাই। টিকে গেল নামটা।
চেনকুর বাপের এক পা নেই। অবশ্য জন্ম থেকে নয়, পরে কাটতে হয়েছে পা টা। পড়ে পা ভেঙেছিল; খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধতে গিয়ে। কবিরাজ বড় আশ্বাস দিয়ে বাঁশের বাতায় বেঁধে দিলেও ফল হয়নি। বরং এক সপ্তাহ পরে খুলে দেখা গেল পচন ধরেছে। মেডিক্যালে নিয়ে পা’টা কাটতে হয় অবশেষে। খুঁটি ভেঙে যায় সংসারের। দেশের সমস্ত অভাব ঘাপটি মারে তাদের ঘরে।
চেনকুর বাপের পায়ের ঘা শুকালো একদিন। তবে বড় হলো সংসারের ঘা। অভাবের ঘা। নিষ্কর্মা হয়ে বসে থাকবার লোক নয় সে। কিন্তু ফিকিরও খুঁজে পায় না তেমন। শেষতক, সেনি আর হাতুড়ি কিনে ক্র্যাচে ভর দিয়ে বেরিয়ে পড়লো রাস্তায়। শীল-পাটায় ধার কাটার কাজ। মাও কাজে নামলো। সংসারটা টেকাতে হবে। রস আনতে হবে, ছেলেমেয়েদের শুকনো মুখে। মা মৌসুমে ধান কুড়ায়, মানুষের লেপ কাঁথা সেলাই করে, মুড়ি ভাজে, ধান ভাপায়, ধান ভানে ইত্যাদি ইত্যাদি।
‘আমিও ফকির হলাম আর দেশেও আকাল পড়লো’Ñ ঠিক এমনটাই ঘটলো চেনকুর বাপের বেলায়। ঘরে খাবার না থাকলে পাটায় ধার কাটাবে কে। মসলা খেয়ে তো পেট ভরবে না? ক্ষয়ে যাওয়া তেলতেলে পাটায় মসলা বাঁটবে, শরীরের শক্তি ক্ষয় করবে, তবুও ধার কাটাবে না কেউ। দু’একজন কাটালেও চাল দেয় না, যা দেয়, গম না হয় ময়দা। তবুও যদি বেশি পেত। চেনকুর মাকেও ইদানীং কেউ ডাকে না তেমন। তবে এলাকার মানুষগুলো বেশ ভালো। সবাই ভালোবাসে তাদেরকে। মেম্বার চেয়ারম্যানও ভালবাসে। চেনকুর বাপ কাটা পায়ের দিকে তাকিয়ে হাসে। হয়তো পায়ের জন্যই দিলিপ মেম্বার দুস্থ মাতার কার্ডটা করে দিয়েছিল বউয়ের নামে। এ ছাড়া ইউনিয়ন কাউন্সিলে বিভিন্ন সাহায্য এলে তাদের নাম প্রথম দিকে থাকে। ক’দিন আগেও রিলিফের ছয় ধড়া গম পেয়েছে তারা। সপ্তাহ ধরে ময়দার তান্ডব চলছে এই সংসারে। রুটি, ধাপড়ি, না হয় ময়দার ঘাঁটি। চলছে তো চলছেই। চেনকুর জেদ সেখানেই। কত আর সহ্য করা যায়।
ঘুম থেকে উঠে কিছুটা হতাশ হলো চেনকু। হেঁসেল ঘরে তখনো ঢুকেনি মা। উঠোন ঝাঁট দিচ্ছে। দশটা মার্বেল পকেটে ভরতে ভরতে বললÑ মা, হামি একনা মুন্টুদের বাড়ির দিগে গেনু, আইসাই কিন্তুক ভাত খামু। তাড়াতাড়ি রান্দেক। মায়ের হ্যাঁ বা না জবাবের আশা করলো না চেনকু। ঝেড়ে দৌড় দিলো, পকেটে ঝনঝন শব্দ তুলে।
খেলাটা ভালোই জমে উঠেছিল। কয়েক দান চেনকু জিতলো পরপর। হঠাৎ বিপরীত পক্ষের বাপ আসাতে খেলা বন্ধ হলো। ঠিক তখনই ভুলে যাওয়া ক্ষুধাটা চনমনিয়ে উঠলো। চোখের সামনে ভেসে উঠলো ভাপওঠা ভাত। গন্ধটাও নাকে এলো। দৌড় দিলো চেনকু। দুটো মার্বেল পড়ে গেল পকেট থেকে। সব পড়ে গেলেও হয়তো থামবে না বা ফিরে দেখবে না। ভাতের গন্ধ তার চারদিকে।
বাড়ির বাহির দরজা টপকেই থমকে দাঁড়ালো চেনকু। দাঁড়াতে হলো আর কী। মায়ের পিলে চমকালো ছেলেকে দেখে। ছেলের চোখ মুখের ভাষা, মায়ের অধিক কেউ অত স্পষ্ট পড়তে পারে না। তাই হয়তো দ্বিতীয়বার ছেলের দিকে তাকাতে সাহস করলো না। ভারি হয়ে এলো চোখ। মাথা নিচের দিকে ঝুলিয়ে আবার বেলনে রুটি ডলতে লাগলো। কী ভেবে চেনকু নিজেই দমদম করে মায়ের কাছে গেল। তবুও মাথা তুললো না মা। হয়তো ছেলের প্রশ্নের উত্তর গোছাচ্ছে মনে মনে।
Ñ হামার ভাগের রুটি দে। সোজা সাপটা বলল চেনকু। মা-ও বোধ হয় প্রস্তুত হয়ে ছিল। তাড়াতাড়ি দুটো রুটি চেনকুর বাড়িয়ে থাকা হাতে তুলে দিলো। অন্য সময় হলে একটি দিত। ভাবল ছেলের জ্ঞান হয়েছে। আল্লাহকে বলল মনে মনে- আল্লাহ হামার ছাওয়ালোক জ্ঞান দ্যাও। চেনকু রুটি নিয়ে বারান্দায় বসলো না, পা দুলিয়ে খেতেও লাগলো না। বরং যেভাবে এসেছিল ঠিক সেভাবেই দমদম করে চলে গেল। মা তাকিয়ে দেখলো , কিছু বলল না। কয়েকটা ঘন নিঃশ্বাস ফেলে আবার রুটি ডলতে লাগলো।
একটু পরেই ছেলে ফিরে আসবে, এমনটাই ভেবেছিল মা। ছেলে আসেনি। ঘণ্টা পার হলো। বেলা এখন দুপুরের সীমানায় উঁকি মারছে। মা অবশেষ কাজ গুছিয়ে খুঁজতে বের হলো। বেশি দূরে যায়নি ছেলে; পাড়া থেকে খানিক বাদেই পেল। ছোট বাঁশঝাড়ের গোড়ায় পা মেলে বসে আছে চেনকু। টো টো রোদে। দুই পায়ের ফাঁকে একটি মার্বেল রাখা। চকচকে লাল, ডা¹িল। তাতেই আর একটি মার্বেল লাগাবার চেষ্টা করছে বারবার। মা কাছে গিয়ে বললÑ বাপ, রুটি দুইডাই খাইজু। চেনকু পাথালভাবে মাথা ঝোঁকালো। অর্থাৎ খায়নি।
Ñ তাইলে কী করলু রুটি? তবুও কিছু বলল না। বোদ্ধা ঋষির মত ওপর দিকে আঙুল উঁচিয়ে ইশারা করল। তবে মা কিছু বুঝতে পারল না। কপালে ভাঁজ পড়লো বিস্ময়ের। এ তো মানুষ নয়; রুটি। এ আবার স্বর্গে যাবে কী করে। চেনকু কি রুটিকে স্বর্গে পাঠালো। হাজারো প্রশ্ন মনে এঁকে ওপরে তাকালো মা। এবার সত্যি সত্যি আটকে গেল মায়ের চোখ। আটকে গেল ভাষা, চিন্তা কিংবা আগে পিছে। একি কান্ড! খড়ের দড়িতে রুটি দুটো গাঁথা। বাঁশের আগায় মালা হয়ে ঝুলছে!
মা জিজ্ঞাসা করলো না, অত উঁচু বাঁশের আগা কী করে হাতে পেল। কারণ, পাশেই দেখতে পেল লম্বা একটা লগি মাটিতে পড়ে আছে। সেটি দিয়েই বাঁশের আগাটা টেনে নামিয়েছে। নিচের দিকে না তাকিয়েই প্রশ্ন করল মাÑ বাপ, রুটিক অমন করিজু ক্যান?
এবারও চেনকু মাথা তুললো না, তবে উত্তর দিলোÑ শালা রুটি হামাক মেলা কষ্ট দিজে। এবার তাকেও কষ্ট দিমু। গুড্ডি কইরা উড়ামু। শালাক শুগাইয় শুগাইয়া মারমু। খালি হামি শুগামু ক্যান?

এরই মধ্যে আরো কয়েকজন জুটেছে সেখানে। চেনকুর কথাগুলো তারাও শুনে থাকবে হয়তো। কেউ কেউ হাসছে। তবে মা হাসতে পারেনি। অনেক কিছুই আটকে গেছে তার ভেতরে। গলাতে, বুকে। গুলটি গুলটি, দলা দলা আর তেতো তেতো। যেন ময়দার জমাট দেয়াল। মা আরও দু’ ধাপ এগিয়ে ছেলেকে জড়িয়ে ধরলো। গুমোট কষ্টটা কিছু কমাতে চাইলো, চোখের পানি ফেলে।

SHARE

1 COMMENT

Leave a Reply to Musfiqul Alam Cancel reply