Home প্রচ্ছদ রচনা শীতের যাদুকর

শীতের যাদুকর

ড. রফিক রইচ

শীতের সকালের সোহাগে সোনারোদ, আমার মিষ্টি মানিকেরা তোমরা শরৎ নিয়ে আমার লেখা রূপসী রূপের পরী শরৎ পড়েছ নিশ্চয়ই। আশা রাখছি ভালো লেগেছে। শরতের পর পাকা সোনালি ধানের গন্ধ ভরা একঢি সচ্ছলতার ঋতু হেমন্ত আমাদের চোখের সামনে দিয়ে চলে গেল। উপস্থিত হলো কুয়াশার ঘোমটা পরে শীতকাল। এটি পঞ্চম ঋতু। পৌষ ও মাঘ এ দু’মাস হলো শীতকাল। তোমরা তা জান। কিন্তু তোমরা কি জান এই শীতকালকে আগে কী বলা হতো? হয়তো কেউ কেউ জান আবার অনেকেই জান না। সবার জন্যই বলছি, আগে এই শীতকালকে বলা হতো শিশির। পরে এই শিশির ঋতুটিকেই শীতকাল বলা হয়। আগে অগ্রহায়ণ ও পৌষ মাস এই দুুই মাসকে বলা হতো হিমঋতু। এই হিমঋতুই পরবর্তীতে হেমন্তকাল হিসাবে প্রতিষ্ঠা পায়। তখনকার সময়ে হিমঋতুকে আদি ঋতু ধরে বাকি ঋতুগুলোর নামকরণ করা হয় এভাবেÑ শিশির, বসন্ত, গ্রীষ্ম, বর্ষা ও শরৎ। বর্তমান সময়ে কার্তিক ও অগ্রহায়ণ হলো হেমন্তকাল এবং পৌষ ও মাঘ মিলে হলো শীতকাল। কী বন্ধুরা বিষয়টা মজা লাগলো না। অবশ্যই মজা লাগবে। কারণ না জানা জিনিস জানাটাই দারুণ মজার।
যা হোক ছোট বন্ধুরা, বুঝতেই পারছো তোমাদের জন্য এ লেখাটি শীতকাল নিয়েই হবে। লেখাটি শীতকালের একটি ছড়া দিয়েই শুরু করি।
শীত এল, এল শীত কুয়াশার চাদরে
সকালের সোনা রোদ দেয় ডাক আদরে।
পাতা নড়ে পাতা ঝড়ে গাছ পাতাশূন্য,
ফুলগাছে ফুল ফুটে শীত করে ধন্য।
মাঠে ঘাটে শোভা নেই শীত নাকি রুক্ষ
পরিযায়ী পাখি এসে মুছে দেয় দুঃখ।
জমি ভরা ধান নেই ধান গোলা ভরা
এই ধানে শত পিঠা মিঠা হয় কড়া।
খেজুরের রস ভরা এ শীতের ঠিলা
এই রস খেয়ে দেয়ে চমকায় পিলা।
শীতে কাঁপি আমি তুমি শীতে কাঁপে সব জন
শীতে কাঁপে পশু পাখি কাঁপে শীতে গাছবন।
শীতকালে গরিবের কাঁপে গাও গুচ্ছ
লেপ-কাঁথা যার আছে শীত তার তুচ্ছ।
নেই যার কাজ কোন বিছানা সে ছাড়ে না,
যার হাতে কাজ খুব সে তো শীতে হারে না।

তোমরা তো সবাই ইনশাআল্লাহ পড়ালেখা কর যে কারণে তোমাদেরকে শীত হারাতে পারবে না। কারণ ভোরবেলা নামাজ পড়ে পড়তে বসলে পড়াশুনা দ্রুত মুখস্থ হয়। রেজাল্ট ভালো করা যায়। আশা করছি তোমরা সেটা করও এবং ক্রমান্বয়ে ফলাফলের সিঁড়িটাও বেশ পাকাপোক্ত করে তুলে এগিয়ে যাচ্ছ উচ্চ শিক্ষিত হতে। নিজেকে গড়তে। সর্বোপরি দেশকে গড়তে।
গোধূলির রক্তিম রঙ মাখানো আমার প্রিয় সোনারা তোমরা ছড়াটিতে শীতের মোটামুটি সবটাই জানতে পেরেছÑ তারপরও শীতকাল নিয়ে কিছু গল্প করা যাকÑ
হেমন্তের সোনালি ধানের গন্ধ চারিদিকে থাকতে থাকতেই শীত এসে পড়ে জাদুকরের মতো। শীতের জাদুকরকে হেমন্ত তার দু’হাতে ধানের ডালা নিয়ে সুস্বাগতম জানায়। শীত হেমন্তের ধানের ডালা গ্রহণ করে ধন্য হয়। শীত সে ধানে বানায় নবান্ন, বিভিন্ন রকম পিঠা। শীতের এই জাদুকরের গায়ে থাকে রহস্য ভরা কুয়াশার চাদর। শিশিরে ভেজা থাকে শীতের জাদুকরের দু’টি পা। প্রকৃতির যতটুকু আর্দ্রতা তার সবখানি টেনে টেনে চুষে নেয় রক্ত চোষার মত এই শীতের জাদুকর। ফলে প্রকৃতি হয়ে ওঠে শুষ্ক ও রুক্ষ। গাছগাছালির পাতাগুলো আর্দ্রতার অভাবে প্রচন্ড শুষ্ক হয়ে ধূসর বেদনায় ঝরে পড়ে। বইতে থাকে উত্তরের হিমেল হাওয়া। মাঠ-ঘাটও ফসলহীন হয়ে পড়ে। প্রকৃতি অনেকটাই মলিন অসজীব ও শোভা সৌন্দর্যহীন মনে হয় এ সময়। ভোরবেলায় সহজে সূর্যের দেখা মিলতে না দিয়ে কন কনে ঠান্ডায় প্রকৃতির গলা চেপে ধরে শীতের এই জাদুকর। জবুথবু হয়ে কাঁপতে থাকে প্রকৃতি ও প্রকৃতির পশুপাখিসহ আমরা সবাই। তাই সূর্যের সাথে রাগ করে ছড়া কাটে ছড়াকার এভাবেÑ
সূর্যটা আজ জ্বালাচ্ছে বেশ
রোদ দেয় না সারা দিন
ঘোমটা পরে থাকছে শুধু
কাঁপছি শীতে শীন্ শীন্।

সূর্যটাকে কাছে পেলে
ধরবো এঁটে ধর,
বলবো তাকে একটি কথা
রোদ দিয়ে তুই সর

ছড়া কেটেও কোন লাভ হয় না। রোদ ওঠে না, সূর্যমামা দেখা দেয় না। এ সময় গ্রামের বুড়ো-বুড়িসহ নানা বয়সের অভাবী মানুষগুলো বা শহরের ফুটপাথের মানুষগুলো খড়কুটুতে আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করে। নিতান্তই তেমন জরুরি কাজকর্ম না থাকলে বিছানার গরম লেপ-তোশক ছেড়ে উঠতে চায় না কেউ। তবে তোমাদের মত ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ভোরবেলাতেই আড়মোড়া ভেঙে চুলোর পাড়ে এসে বসে আগুনের তা নেয় এবং মা, নানীদের বানানো পিঠা মনের আনন্দে গাল ফুলিয়ে ফুলিয়ে খেতে থাকে। বড়রাও এ কাজটি একইভাবে করে থাকে। ভোরবেলাতে চুলার পাড় যেমনি গরমের আরামের তেমনি গরম রকমারি খাবারের। সে যাই হোক তবে শীতের জাদুকরের ইচ্ছা মতই মনে হয় সূর্য মামা ওঠে, বসে। এক সময় জাদুকরের জাদুর ছোঁয়ায় সূর্যের কোমল মিষ্টি আলোয় ঝলমল করে ওঠে চার পাশ। দূর্বাঘাসে, ফুলে, ফলে রাত্রে জমে থাকা শিশির বিন্দুগুলো সূর্যের এ মিষ্টি আলোয় স্বচ্ছ মুক্তদানার মত মনে হয়। মিষ্টি উষ্ণতা অনুভব করে মানুষ স্বর্গীয় সুখ পায় যেন। প্রকৃতিও হয়ে ওঠে সোনালি সুন্দর।
পৌষের সময় এ দেশের নদ-নদী, খাল-বিল, পুকুর-ডোবা, দিঘি, হাওর ও বাঁওড়ের পানি কমতে থাকে। এক সময় একেবারেই শুকিয়ে যায় পানি। পানি শুকিয়ে যাবার সময় এসব জলাশয়ে নানা প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়। যে কারণে এ সময় দলবেঁধে কোন কোন নির্ধারিত জলাশয়ে বিভিন্ন ধরনের জাল ও পলো দিয়ে মাছ ধরতে যায়। এটা আগের দিনে উৎসবের মতই মনে হতো। একে গ্রাম্য ভাষায় বাউত বলা হয়। অবশ্য আমার চোখে এটিকে মাছের গ্রাম বাড়িতে ডাকাত পড়ার মতই মনে হয়। কোন বাড়িতে ডাকাত পড়লে যেমন সে বাড়ির অর্থকড়ি সব লুট হয়ে সে বাড়ির লোকজন দরিদ্র হয়ে যায় ঠিক তেমনি মাছের গ্রাম বা বাড়িতে ডাকাত পড়ে সব মৎস্যস¤পদ লুট করে মাছের বাড়ি বা গ্রাম মাছশূন্য করে মাছের আকাল সৃষ্টি করা হয়। কথাটি বললাম এ জন্য যে- তোমরা দেখতে পাচ্ছ মাছের পরিমাণ দিন দিন কমছে। আমরা যদি এভাবে প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক জলাশয়গুলোতে অতিমাত্রায় মাছ আহরণ করি তাহলে ভবিষ্যতে আমরা আর বলতে পারবো না আমরা মাছে ভাতে-বাঙালি। তাই এ সময় প্রাকৃতিক জলাশয় সেঁচে মাছ মারা থেকে ও বাউত নামা থেকে বিরত থাকাই ভালো। এতে আগামীতে মাছের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে পারে।
ছোট বন্ধুরা, পৌষের চাইতে মাঘে এ শীত আরো তীব্র হয়। এ সময় শৈত্যপ্রবাহ শুরু হয়। তাপমাত্রা ভয়ঙ্করভাবে নিচে নেমে যায়। মানুষের জীবন স্থবির হয়ে পড়ে। যাদের পাকা বাড়িঘর, শীতের গরম কাপড় চোপড়, লেপ-কাঁথা, তোশক রয়েছে তাদের খুব একটা কষ্ট হয় না। কিন্তু যাদের নুন আনতে পানতা ফুরায় তাদের অবস্থা যারপরনাই খারাপ হয়ে ওঠে। তাদের অনেকেই মৃত্যুমুখে পতিত হয়। দেশের উত্তরাঞ্চল তোমরা জান হিমালয়ঘেঁষা। সে কারণে শীত এখানে আরো অনেক বেশি। এসব অঞ্চলের অভাবী মানুষের অনেকেই শীতের কারণে মারা যায়, যা মোটেই কাম্য নয়। তা ছাড়া গ্রামসহ শহরের ফুটপাথ ও অলিগলিতে অনেক পথশিশু যারা এ শীতে অত্যন্ত কাবু হয়ে যায়। তাদের দিকে দৃষ্টি দেবারও যেন কেউ নেই। একটি ছড়া শোন-
রাস্তার ছেলেটার বাপ-মা যে নাহক্যা
কনকনে শীতে কেঁপে ওঠে সে যে বাইক্যা।
ছেলেটার বাড়ি নাই
রান্নার হাঁড়ি নাই
কী করে যে সুখে থাক
ছেলেটারে রাইখ্যা।

দরদি ছোট সোনারা- তোমাদের অনেক গরম কাপড় এমনিতেই পড়ে থাকে আনাচে কানাচে। এ সময় এগুলো পরিষ্কার করে যদি এদের দাও তাহলে অনেক ভালো কাজ হয়। তোমরা এ ভালো কাজগুলো সবাই কমবেশি কর। তবে আজকে থেকে আরও বেশি করে করবে কেমন !
যদিও শীতের জাদুকর প্রকৃতির রূপময় স্বর্ণালঙ্কার লুটে নিয়ে প্রকৃতিকে বানিয়ে তোলে রূপহীন। রুক্ষতা ও শুষ্কতার ব্যাপকতায় চারিদিক কেমন যেন স্থবির হয়ে পড়ে। তারপরও শীত তার একান্ত নিজস¦ কিছু বৈশিষ্ট্যের জন্য অন্যান্য ঋতুগুলো থেকে একটু ভিন্ন স্বাদ, ভালোলাগা এনে দেয়। যা ঋতু বৈচিত্র্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। যে কারণে শীত আমার মত তোমরাসহ অনেকের কাছেই প্রিয় ঋতু। এ সময়ে বৃষ্টির নাচানাচি নেই, রাস্তায় ছিটেফোঁটা কাদামাটি নেই। গরমের শ্বাসরুদ্ধকর দাপট নেই, গা ঘামে ভিজে চুপসে যায় না। এ সময় মানুষের ঘরে ডোল ভরা ধানে শান্তি স্তস্তি দুটোই থাকে। তা ছাড়া শীত যেসব কারণে অন্যান্য ঋতু থেকে অনেকটা ভিন্ন এবং অনন্য তা নিচে একটু আলাদা করে তুলে ধরছি। আশা করি তাতে তোমাদের আরও ভালো লাগবে। তাহলে শুরু করি-
নানা বর্ণের ফুল ও ফল
ছোট বন্ধুরা তোমরা যারা শহরে নগরে থাক তারা শীতের ফুল ও ফলের সাথে তোমাদের পরিচয়টা একটু বেশি। কারণ শহরের সরকারি বেসরকারি অফিস আদালত, স্কুল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, বিভিন্ন পার্ক, গোলচত্বর, শৌখিন বাসাবাড়ির আশপাশ ও ছাদের চার পাশ শোভা বর্ধনের জন্য শীতের এ সময় নানা বর্ণের ফুলে ফুলে ভরে তোলা হয়। তোমরা জান ফুল পবিত্রতার প্রতীক। নানা বর্ণের এসব বাহারি ফুল দেখলে কার না ভালো লাগে। সবার মন আনন্দে নেচে ওঠে। মহান আল্লাহ্ তালার প্রশংসা গাইতে ইচ্ছে করে। মানুষ ক্রমান্বয়ে যত বেশি সভ্য হচ্ছে ততই ফুলের কদর বাড়ছে। ফুলকে উপহার হিসেবে দেবার জুড়ি নেই। বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতায় ফুলের বিকল্প ভাবার যেন অবকাশ থাকে না। ফুল নিয়ে লেখা হয় কত কবিতা, ছড়া, গান। জেনে অবাক হবে নজরুলের একটি গানের মধ্যেই ১২-১৩টি ফুলের নাম ব্যবহার করা হয়েছে। যাহোক শোভাময় এসব ফুলের প্রকাশ আমরা এ শীতকালেই পাই। তাই শীতকালকে রিক্ততা রুক্ষতার ঋতু বললেও নানা ফুলে বর্ণিল উপভোগ্য ঋতু বললেও কিন্তু ভুল বলা হবে না। পুষ্পরাজ বসন্তের আবহ কিন্তু শীতকালই শুরু করে দেয়। গোলাপ, গাঁদা, সূর্যমুখী, ডালিয়া, রজনিগন্ধা, দোপাটি, চন্দ্রমল্লিকা, অতসী, কসমস ইত্যাদি ফুল ফুটে শীতের বিষণœতাকে ম্লান করে দেয়।
বর্ণিল ফুলের পাশাপাশি আসলেই ফলের মৌসুম এই শীতকাল। কুল/বরই, কমলা, আপেল, আঙুর, কলা, বেদানা, পেস্ত—াবাদাম, কামরাঙা, আমলকী, পেঁপে এসব ফল পরিমিত পরিমাপে খেলে পুষ্টির ঘটতি মেটে বেড়ে ওঠা যায় তাড়াতাড়ি। কাজেই বেশি বেশি করে শীতের ফল খাও চোখের জ্যোতিরা আমার।

টাটকা রঙিন শাক-সবজি
আগেই বলেছি শীতের সময় পরিবেশে আর্দ্রতার পরিমাণ কমে গিয়ে শুষ্কতায় ভরে তোলে প্রকৃতি। ফলে আমাদের দেহ ত্বকের লাবণ্যতা নষ্ট হয়ে সৌন্দর্য নষ্ট হয়। যারা সৌন্দর্যসচেতন তারা বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ে। তা ছাড়া এ সময়ে পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার বেশি করে খেতে হয়। আর শীতের এ ঋতুতে অন্য ঋতুর চাইতে একটু বেশি খেলে তেমন একটা অসুবিধা হয় না। সত্যি করে বলতে গেলে বলতে হয় শীতের ঋতু হল ভূরিভোজের ঋতু। যেহেতু এ ঋতুতে একটু বেশি খেতে হবে সুস্থ ও সুন্দর থাকতে হবে তাই মহান আল্লাহ তায়ালা এ সময় প্রচুর টাটকা শাক-সবজি প্রকৃতিতে উপহার দেন। বাড়ির আশপাশ ফসলি জমি ও ছাদের ওপর ও বাড়ির পাশের উঠান এ সময় টাটকা রঙিন শাক-সবজিতে ভরে ওঠে। এসব টাটকা শাক-সবজি প্রয়োজনীয় ভিটামিন তথা পুষ্টিতে ভরা। এগুলো নিয়মিত এ সময় খেলে আমরা সুন্দর ও সুস্থ থাকতে পারবো। শীতের টাটকা শাক-সবজির মধ্যে রয়েছে ফুলকপি, বাঁধাকপি, শিম, লাউ, গাজর, মুলা, পেঁপে, আলু, টমেটো, বেগুন, লালশাক, পালংশাক, পোনকাশাক, লাউশাক, মুলাশাক, সরিষাশাক, ধনিয়াপাতা, শালগম, মটরশাক, বরবটি, খেশারিশাক ওলকপি ইত্যাদি। তবে একটি কথা তোমাদের না বলে পারছি না আর তা হলো ভিটামিন-এর চাহিদা মেটানোর জন্য একজন মানুষের গড়ে প্রতিদিন ২১৩ গ্রাম সবজি খাওয়া দরকার। কিন্তু আমরা খেতে পাই মাত্র ৫৩ গ্রাম (সবজি বিজ্ঞানী ড. মামুনুর রশিদ ২০০২) যা মোটেই ভালো কথা নয়। তাই তোমরা বেশি করে এ শীতে খাও সবজি আর শক্ত কর দেহ ও হাতের কব্জি।

খেজুর রস, খেজুর গুড় ও পায়েস
শীতকালের খেজুর রস একটি উল্লেখযোগ্য উপাদেয় পানীয় হিসাবে এ দেশে রয়েছে তার ব্যাপক কদর। খেজুর রস শীতের অনন্য একটি বৈশিষ্ট্য। এ সময় গাছিরা খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে শীতের সকালে মাটির কলসিতে করে বাড়ি বাড়ি বিক্রয় করতে আসেন। সকালে খালি পেটে মিষ্টি খেজুর রসের সে স্বাদ কারোরই ভোলার মতো নয়। তোমরাও খাও নিশ্চয়ই। তবে এখন খেজুর রস খাওয়া থেকে সাবধান থাকতে হবে। কারণ গাছিরা খেজুর রস স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে সংগ্রহ করে না। ফলে বাদুড়সহ বিভিন্ন পাখি এগুলোয় মুখ ঢুকিয়ে রস পান করার ফলে এদের শরীরে থাকা নানা রোগের জীবাণু এ রসে মিশে মানুষের শরীরে আসে এবং ভয়াবহ রোগ সৃষ্টি করে। এর মধ্যে নিপা ভাইরাস একটি মারাত্মক রোগ সষ্টিকারী জীবাণু। যাতে মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটছে। তাই নিজের বাড়িতে খেজুরগাছ থাকলে খেজুর রস অতি যতেœ স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে সংগ্রহ করে তবে খাবে এবং শীতের এ রসের স্বাদ নেবে কেমন? যাহোক এ রসের গুড়ও একটি চমৎকার মোখরোচক খাবার। যা দিয়ে তৈরি পায়েস খেলে জিবে লেগে থাকে দিনের পর দিন। তোমরা খেয়ে থাকলে আমার সাথে একমত হবে হয়ত। এ গুড়ের সাথে ভাপাপিঠাসহ অন্যান্য পিঠার স্বাদই অন্যরকম।

শীতের রকমারি পিঠা
আলোর ছটা আমার সোনামণিরা তোমরা যারা শহরে থাক শীতকালে তোমাদের শীতের ছুটি হলে নানুবাড়ি, দাদুবাড়ি বা তোমাদের সুজনদের কাছে গ্রামে গেলে দেখতে পাবে কত রকম পিঠা এ সময় করা হয়। আর যারা গ্রামে থাক তারা তো দেখই। আজকাল শহরে হয় পিঠা উৎসব। এ উৎসবেও রকমারি পিঠার সমাহার দেখতে পাবে। সোনালি নতুন ধানের নতুন চালে যেসব রকমারি পিঠা গ্রামের গৃহবধূরা করে থাকেন তোমরা খেয়ে থাক সেগুলো হলো- দুধপিঠা, ভাপাপিঠা, চিতাইপিঠা, কুসলি পিঠা, পাক্কন পিঠা, পাটিসাপটা, পুলিপিঠা, রুটিপিঠা, খোলা পিঠা, দুুই বিরানি পিঠা, চিকন পিঠা, তেলের পিঠা, মেরাপিঠা, গুড়ের পিঠা, ক্ষীরপুলি, জালি পিঠা, কন্যাভোগ, শাশুড়ি ভোগ, শ্বশুরভোগ ইত্যাদি। এসব অনেক পিঠার গায়ে নানা রকম আলপনা করা হয়। এমনকি বিভিন্ন লেখাও লেখা হয়। যেমন সুখে থেক, মনে রেখ কত কী?
পৌষের পিঠাকেন্দ্রিক একটি ছড়া না বলে পারছি না। ছড়াটি শোনÑ
আইসো পৌষ যাইয়ো না
মুখ ভার করি থাইকো না
ঘরের দাওয়ায় বসো
ধানের গোলায় বসো
কুটুম বাড়িতে বসো- সোনা পৌষিয়া
মোগরবাড়ি
আসো পউষ, থাকো পৌষ
পিঠার ধামা লইয়া।
শীতের পরিযায়ী বা
পর্যটক পাখি
অস্ট্রেলিয়া হিমালয়, নিউজিল্যান্ড ও সাইবেরিয়া থেকে নানা প্রজাতির সব পাখি তাদের জীবন ধারণের প্রয়োজনে আমাদের দেশে সারা বছরই কমবেশি আস। তবে সব চাইতে বেশি আসে শীতে। নিয়ে আসে শীতের জাদুকর শীতকে সাজাতে। এগুলো এ দেশের নিঝুমদ্বীপ, চরকুকরিমুকরি, রামসাগর, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ফকিরহাট, চিতলমারী, মোল্লাহাট বাগেরহাটের উত্তরের হাওর, সিলেট, ময়মনসিংহের হাওরসহ নানা বিল ঝিল দিঘিতে এসে কলকাকলিতে মুখরিত করে তোলে চার পাশ। শীতের সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে তোলে বহুগুণ। আমাদের দেশে পাখি প্রজাতির সংখ্যা ৭০০। এর মধ্যে পরিযায়ী বা পর্যটক পাখির সংখ্যা এক-তৃতীয়াংশ। এসব পাখির দেশে পরিবেশ প্রতিকূলতা যখন অধিক মাত্রায় হয় তখন এরা শুধু মাত্র বাঁচার জন্য, টিকে থাকবার জন্য আমাদের দেশসহ বিভিন্ন দেশে উড়াল দেয় ঝাঁক বেঁধে।
এরা আবাসস্থলগুলোতে যখন ঝাঁক বেঁধে এক সাথে উড়াল দেয় তখন ঝড়ের মতো শব্দ হয় যেন। এসব পাখির চলাফেরায় টানটান ছন্দ অনুভব করা যায়। এদের এক একটির চেহারা রাজকীয় সুন্দর। দেখলে মনে হয় এরা বিপদে পড়ে রাজকীয় প্রাসাদ ছেড়ে আমাদের এখানে এসেছে। আকারে আয়তনে, ওজনে ও নান্দনিক সৌন্দর্যে যে কেউ আমার কথার সাথে এক মত হবে। এসব পাখির মধ্যে লালশীর, জিরিয়াহ্যান্স, লেনজা হ্যান্স, কোরাজ হ্যান্স লাল চোখা, নীলথ্রাস, হুদহুদ, বালি হ্যান্স কালি হ্যান্স, পিয়ং হ্যান্স মৌলভীহ্যান্স, ক্রেক রেহল, জলমুরগি, কাদাখোঁচা, মদনটেক, শামুকভাঙা, বলাকা, চা পাখি, পিপিট, খঞ্জনা উল্লেখযোগ্য।
এসব পাখি শুধু শীতের সময় এ দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকেই বৃদ্ধি করে না এরা দেশীয় পাখিগুলোর মতোই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় রাখে উল্লেখযোগ্য অবদান। পাখিরা শান্তির প্রতীক। তোমরা দেখবে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সরকারপ্রধানরা সাদা কবুতর মুক্ত করেন। এটি শান্তির প্রতীক বলেই এমনটি করেন। যাহোক আমরা এই শান্তির প্রতীক দেশীয় পাখিগুলোসহ অতিথি পাখিগুলোকে বন্দুকের গুলিতে মেরে পেট ভরে আহার করছি। আমাদের দেশে বাহারি পাখিশিকারি ছাড়াও পাখি শিকারজীবীর সংখ্যা প্রায় ২০০০ বা ততোধিক। এসব পাখি শিকারিসহ এই আমরাই এসব নিরীহ শান্তির প্রতীক পাখিগুলোকে মেরে তাদের অশান্তি সৃষ্টি করে প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতি সাধন করছি।
আগের চাইতে দেশীয় পাখিসহ ও পারিযায়ী পাখির সংখ্যা ক্রমান্বয়ে কমছে যা পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ। তাই আমরা পাখিদের ভালো করে বাঁচতে দেবো, পরিবেশ ভালো রাখবো। ঋতু বৈচিত্র্যের মজা নেবো। পাখি নিয়ে বিখ্যাত সাহিত্যিকদের মতো ছড়া কবিতা লিখবো, সালিম আলী, আলী রেজা খান, অজয় হোম ও শরীফ খানের মত গবেষক হবো। সর্বোপরি পাখি বৈচিত্র্য রক্ষা করে পাখির দেশ বাংলাদেশকে পাখির দেশই রাখবো। কী জ্ঞানপিপাসু বন্ধুরা! এমনটি করবে না? না করলে কিন্তু পাখিগবেষক শরীফ খানের মতই পরে এমন করে দুঃখ করে বলতে হবেÑ
পাখি শিকার করেছি, গোশত খেয়েছি, এ কথা মনে পড়লে আজ আমার ভীষণ কষ্ট হয়। আমি তো শুধু পাখিদের খুন করিনি, খুন করেছি প্রাকৃতিক পারিবেশকে!

পরিশেষে তোমাদেরকে বলতে চাই, শীতকাল কিন্তু আমার প্রিয় ঋতু। প্রিয় সময়। কিন্তু এ সময়টা যেন দিন দিন কমে আসছে। কমে আসছে অন্যান্য ঋতুর সময়কালও। কেবল বাড়ছে একটি কাল আর সেটা হলো গ্রীষ্মকাল। তোমরা তো জান গ্রীষ্মকালে কেমন গরম পড়ে। এ গরম পড়ার পেছনে কারণ হলো পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়া। ফলে দীর্ঘদিনের জলবায়ুরও পরিবর্তন হচ্ছে। এ কারণে আমরা প্রতিনিয়ত দুর্যোগ পোহাচ্ছি। সিডর, আইলার মতোও এপ্রিলের জলোচ্ছ্বাসের কত বিপদ আপদেই না আমরা পড়ছি। এগুলোর জন্য উন্নত দেশগুলো দায়ী থাকলেও নিজেদেরও সচেতন হয়ে এগুতে হবে এবং ভালোভাবে ঋতু বৈচিত্র্যের স্বাদ নিয়ে বাঁচতে হবে। ভালো থাকতে হবে। তাই শীতকালকে ভালোবাসবে। পৃথিবীকে পরিমিত ও সহনীয় শীতল রাখতে নিজেরা কাজ করবে এবং অপরকে সহযোগিতা করবে।

SHARE

Leave a Reply