Home মুখোমুখি যে পড়ে না সে অন্ধকারেই রয়ে যায় – আল মাহমুদ

যে পড়ে না সে অন্ধকারেই রয়ে যায় – আল মাহমুদ

শুরু হলো নতুন বিভাগ মুখোমুখি। এই বিভাগে তোমাদের প্রশ্নের উত্তর দেবেন দেশের প্রখ্যাত লেখক, কবি, ছড়াকার, সাহিত্যিক, শিক্ষক, অভিনেতা, শিল্পী, খেলোয়াড় ও বিশিষ্টজনরা। এই সংখ্যায় তোমাদের মুখোমুখি হয়েছেন দেশের প্রধান কবি আল মাহমুদ। তোমাদের পাঠানো অসংখ্য প্রশ্ন থেকে বাছাইকৃত কিছু প্রশ্ন এবং এর উত্তর নিয়ে সাজানো হলো এই সংখ্যার ‘মুখোমুখি’

আপনি বরাবরই বলেন, কবির কাজ হলো স্বপ্ন দেখানো। শুধু স্বপ্ন দেখানোর মধ্য দিয়ে কি সফলতা অর্জন করা সম্ভব?
তাজরিয়া আক্তার এ্যামি
আজিমপুর গার্লস স্কুল এন্ড কলেজ, ঢাকা
আল মাহমুদ : কবির কাজ হলো স্বপ্ন দেখানো, স্বপ্ন দেখানো মানে হলো সুখের স্বপ্ন, সমৃদ্ধির স্বপ্ন, দুঃখ পার করার স্বপ্ন, ভালো থাকার স্বপ্ন, এ জন্য বলেছি কবির কাজ হলো জাতিকে স্বপ্ন দেখানো অর্থাৎ বড় হবার স্বপ্ন। স্বপ্ন ছাড়া কেউ এগোতে পারে না।

যদি কবি না হতেন তাহলে কী হতেন? শৈশবে কী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন?
রফিকুল ইসলাম রিপন
ভবানীগঞ্জ ডিগ্রি মাদ্রাসা, লক্ষ্মীপুর
আল মাহমুদ : কিছুই হতাম না (মুচকি হেসে)। ছোট থেকেই আমার মনোবাঞ্ছা ছিল কবি হবো। আমি যখন স্কুলে পড়ি তখন থেকে এরকমই ভাবতাম যে, কবি হবো। কবি শব্দটা এসেছে ‘কোবিদ’ শব্দ থেকে, যার অর্থ হলো জ্ঞানী, কবি বলেন অন্যেরা শোনেন।

কবি হতে চাইলে কী করতে হবে? আমি একজন কবি হতে চাই।
হাসিব মাহমুদ মোশাররফ
ধাপ সাতগাড়া কামিল মাদরাসা, রংপুর
আল মাহমুদ : আমার মনে হয় ইচ্ছা করলেই কেউ কবি হতে পারে না। কবি হওয়া খুব সহজ ব্যাপার নয়। এর জন্য জন্মগত একটা প্রতিভার দরকার হয়। যদিও কেউ কবি হয়ে জন্মায় না, তবে কবি হতে হলে তাকে প্রচুর পড়াশোনা ও সাধনা করতে হয়, স্বপ্নের ভেতর সাঁতার কাটতে হয়। মনে প্রবল ইচ্ছা থাকতে হয়। ইচ্ছা আর সাধনা থাকলে লক্ষ্যে পৌঁছা সম্ভব।

ছোটবেলায় কি স্কুল ফাঁকি দিতেন? এর জন্য কী পরিমাণ বকা খেতেন?
ফয়সল, তৃতীয় শ্রেণী
মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ, ঢাকা
আল মাহমুদ : ফাঁকি যে দিতাম না- তা নয়। সবাই বলতো আমি, মহা ফাঁকিবাজ, আরো বলতো দুষ্টু ছেলে, চালাক-চতুর ছেলে। তবে স্কুল পালানোর উপায় ছিল না। আমি যে স্কুলে পড়তাম সেটা খুব কড়াকড়ি ছিল।
আমি একজন ভালো ছাত্র হতে চাই। এ জন্য পড়াশোনায় মন বসাতে হলে আমাকে কী করতে হবে?
মো: শাহাদাত হুসাইন
জামেয়া কাসেমিয়া, নরসিংদী
আল মাহমুদ : পড়াশোনার দু’টি জগৎ আছে। একটা হলো অ্যাকাডেমিক বা পাঠ্য, অন্যটা হলো সৃজনশীল। ক্লাসের বইয়ের বাইরে ‘ঈশপের গল্প’, ‘আমরা সেই সেই জাতি’, ‘মোরা বড় হতে চাই’ ও ‘কিশোরকণ্ঠ’Ñ এগুলো বাধ্যতামূলক পাঠ্যপুস্তক নয় কিন্তু এগুলো খুবই উপকারী। এ ধরনের আরো বই আছে, এ বইগুলো পড়লে নিজের ভেতর একটা জগৎ তৈরি হয়, কল্পনার জগৎটা প্রসারিত হয়। জ্ঞান বৃদ্ধি পায়। পাঠ্যজগতের বাইরে আরেকটা জগৎ পাওয়া যায়। আর উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য তো ভালো ছাত্র হওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। পড়তে হবেÑ প্রচুর পড়তে হবে। ভালো ভালো বই পড়তে হবে। জ্ঞানের রাজ্যে সেরা হতে হবে।

কোন পদ্ধতি অনুসরণ করলে কবি আল মাহমুদ হওয়া সম্ভব?
আল মালিক নাছরুল্লাহ খান রুম্মান
সদর, নাটোর
আল মাহমুদ : আমার মতো হওয়ার ব্যাপারে অবশ্য আমি উৎসাহ দেই না। তবে আমার পড়ার খুব ইচ্ছা ছিল, পড়ার প্রতি আগ্রহ ছিল। আমার দু’টি অভ্যাস ছিল। একটা হলো পড়া, অন্যটা হলো ভ্রমণ বা বেড়ানো। নতুন নতুন জায়গায় ঘোরা। আমি বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করতে পছন্দ করতাম। নতুন নতুন জায়গায় ভ্রমণ নতুন নতুন জ্ঞানের দরজা খোলে দেয়। জানার আগ্রহ তৈরি করে।

কবিরা সবসময় আর্থিক টানাপড়েনের মধ্যে থাকেন, এর কারণ কী?
কাশপিয়া
মতিঝিল মডেল স্কুল, ঢাকা
আল মাহমুদ : সব কবিই যে আর্থিক কষ্টের মধ্যে থাকে এটা ঠিক নয়। এটা আগে হতো। কবি হতে হলে দরিদ্র হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। অনেক কবি আছেন যারা প্রাচুর্যের মধ্যে থেকেছেন।

শিশুসাহিত্যের উন্নতি বা প্রসারের জন্য কী কী পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন?
এম হাসান
কুড়িগ্রাম
আল মাহমুদ : আসলে ‘শিশুসাহিত্য’ বলে আলাদা করে দেখার কিছু নেই। সাহিত্য সাহিত্যই। যারা শিশুদের মানস গঠনের উপযোগী লেখা তৈরি করেন তারাও বড় লেখক। কিন্তু তাদের একটা প্রচেষ্টা ছিল যে, শিশু বয়সের উপযোগী করে সাহিত্য রচনা করা। এটা দরকার অনেক বেশি।
আপনার লেখায় গ্রামের কথা বেশি এসেছে। লোকজ জীবনের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে এর কারণ কী?
সাবিহা
পাথার পাড়া বালিকা উচ্চবিদ্যালয়
উল্লাপাড়া, সিরাজগঞ্জ
আল মাহমুদ : আমি কিন্তু ঐভাবে গ্রামের বাসিন্দা নই। আমার বসবাস শহরে। তবে গ্রামের অনেক শব্দ আমি কবিতায় ব্যবহার করেছি। আসলে গ্রামের শব্দতো বাংলা ভাষারই শব্দ তাই না? এগুলো আমাদের ঐতিহ্য। গ্রামে জন্ম নিয়েছি ঠিক আছে কিন্তু সারা জীবন তো শহরেই কাটালাম। একটা কথা আছে, ‘যদি পড়ে কহর, তবুও ছেড়ো না শহর’। আমি এই কথায় বিশ্বাসী। শহরে অনেক কিছু হয় যেমনÑ সৃষ্টিশীল কাজ, রাষ্ট্র পরিচালনা ইত্যাদি। তবে যতই শহরমুখী হই না কেন, গ্রামকে বাদ দেয়া যাবে না। গ্রাম আমাদের শেকড়।

‘আমার মায়ের সোনার নোলক হারিয়ে গেছে শেষে’ সোনার নোলক বলতে কী বুঝিয়েছেন?
রাকিবুল ইসলাম
রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ
আল মাহমুদ : এখানে নোলক বলতে দেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, বিশ্বাস, এগুলোর কথা বুঝিয়েছি। জাতিগতভাবে আমাদের যে ঐতিহ্য রয়েছে তা আমাদের অমূল্য সম্পদ। এই সম্পদকে সংরক্ষণ করতে হবে।

‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ কোন প্রেক্ষাপটে লিখেছেন?
আব্দুল আলিম
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
আল মাহমুদ : ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ এমন একটি কাব্যগ্রন্থ যে, সে সময়কার কমিউনিস্টরাও এর উচ্চ প্রশংসা করেছিলো। এটি পাঠ করলে ঐতিহ্যগত প্রেরণা পাওয়া যায়Ñ এটাই ছিল এই কাব্যগ্রন্থের মোটিভ।

কিশোরকণ্ঠের একজন পাঠক হিসেবে আপনি আমাকে কী উপদেশ দেবেন?
তাসনিয়া খানম,
ইমাম গায্যালী গার্লস স্কুল এন্ড কলেজ, পাবনা
আল মাহমুদ : কিশোরকণ্ঠের পাঠকদের উদ্দেশে বলবোÑ পড়াই হলো এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র উপায়। পড়তে পড়তে মওকা মেলাতে হবে। যে পড়ে না সে অন্ধকারেই রয়ে যায়। সুতরাং পড়তে হবে জানতে হবে।

বাংলাভাষা বা সাহিত্য কোন পর্যায়ে আছে বলে আপনি মনে করেন?
রোকন উদ্দিন
মেরিন অ্যাকাডেমি, নারায়ণগঞ্জ
আল মাহমুদ : আমি মনে করি বৈপ্লবিক কিছু লেখা হচ্ছে। যদিও কিছু সঙ্কট রয়েছে। কিন্তু বাংলা সাহিত্য তো থেমে নেই। বাংলাভাষা বেশ সমৃদ্ধ হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে এ ভাষা স্বীকৃতি লাভ করেছে। সাহিত্যে নতুন নতুন বিষয় আসছে। তরুণরাও খুব ভালো লিখছে যদিও ওদের সাথে ঐভাবে দেখা-সাক্ষাৎ বা কথা বলার সুযোগ হয় না। আমার বয়স হয়ে গেছে। কোথাও বের হতে পারি না।

তরুণ লেখকদের উদ্দেশে আপনার উপদেশ কী?
আবরার আশরাফ দীপ্ত
মতিঝিল আইডিয়াল, ঢাকা
আল মাহমুদ : তরুণদের দরকার আছে। কারণ শিল্প-সাহিত্য তারুণ্যের মুখাপেক্ষী। নতুন কিছু নিয়ে আসে তরুণরা। এই জন্য তরুণদের আমি খুব পছন্দ করি। এক সময় বলা হতো কাকের চেয়ে নাকি কবির সংখ্যা বেশি। এগুলো ঠিক না। কাকের চেয়ে যদি কবির সংখ্যা বেশি হয় তাহলে ধরে নিতে হবে সে দেশের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি খুব উন্নত।

SHARE

Leave a Reply