Home ফিচার এই শীতে মায়ের হাতের পিঠা

এই শীতে মায়ের হাতের পিঠা

সুহৃদ আকবর

মায়ের হাতের খাবার খেতে কার না ভালো লাগে। আর সেটা যদি হয় পিঠা তাহলে তো কথাই নেই। ভাবলেই রসে ভরে যায় মুখ। আনন্দে নেচে ওঠে মন। সকলেরই ইচ্ছে করে মায়ের হাতের বানানো পিঠা খেতে। সকলের তো আর মা নেই। আমাদের যাদের মা আছেন তাদের জন্যই কেবল তা সম্ভব। তাহলে আমরা যেন সব সময় মায়ের কথা শুনি, মায়ের মনে কষ্ট না দিই। মায়ের পাশে বসে গল্প করতে, মায়ের মায়াবী চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকতে, তাকিয়ে থেকে চোখ ভরে তুলতে আমাদের সবারই ভালো লাগে। গল্প করতে করতে এক সময় পিঠা নিয়ে দৌড়ে পালাই। পালানোর সেই দিনগুলোর কথা সকলের বোধ হয় এখনো মনে আছে। মনে হয় এইতো সেই দিনের কথা। মা পেছন থেকে যত ডাকেন আমরা শুনি না মায়ের কথা। একটু পর বাড়িতে এলে ঠিকই মায়ের আঁচলে আশ্রয় খুঁজি। রাতে মায়ের কোলে শুয়ে গল্প শুনি। ফুলপরীদের গল্প শুনতে শুনতে হারিয়ে যাই ঘুমের রাজ্যে। মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে না দিলে যেন ঘুম আসতে চায় না। মা আমার আদরের ধন। ভালোবাসার খনি। মায়ার পুত্তলি। মাকে ছাড়া আমাদের এক মুহূর্তও চলে না। মা যেমন আমাদের সাথে রাগ করে থাকতে পারেন না ঠিক তেমনি আমরাও মায়ের সাথে রাগ করে থাকতে পারি না। অনেকে বড় হয়েও মায়ের সাথে আহ্লাদিতে মেতে উঠি। মা তখন বলেন, ‘এমন করে না বাপ তুই কি এখন ছোট আছিস।’ তখন আমাদের ছেলেমানুষি যেন আরো বেশি বেড়ে যায়। মা বলে কথা।
শীত এলে সারা দেশে পিঠাপুলি বানানোর একটা ধুম পড়ে যায়। সারা বছরই আমরা মায়ের হাতের খাবার খাই। মা আমাদের জন্য মাঝে মাঝে স্পেশাল রান্না করেন। অনেক সময় খেতে না চাইলে মা আমাদেরকে খাইয়ে দেন। মায়ের মমতা মাখা হাতে খেতে ভালোই লাগে। মায়ের হাতে মাখানো সাধারণ খাবারও খেতে অমৃতের মত লাগে। শীত এলে আমাদের জন্য নানা রকম পিঠা যে তৈরি করেন মা। ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা, পাটিসাপটা পিঠা, ছাইয়া পিঠা, পুলি পিঠাসহ আরো অনেক রকমের পিঠা। পিঠা না খেলে যেন শীতের পরিপূর্ণ আনন্দ পাওয়া যায় না। আমরা যারা মায়ের কাছে থাকছি তারা তো সবসময় মায়ের আদর পাচ্ছি, মায়ের হাতের বানানো পিঠা খাচ্ছি। আর যারা মায়ের সাথে থাকি না তাদের কথা কি আমরা একবার ভেবেছি। তারা সারা বছরই মায়ের আদর থেকে বঞ্চিত হয়। তারা সপ্তাহে একবার মোবাইলে কথা বলা কিংবা মাসে একটা চিঠি দেয়ার মাধ্যমেই মায়ের সাথে ভালোবাসার প্রকাশ ঘটিয়ে থাকে। শীত এলে মা আর আমাদেরকে তাঁর ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করতে চান না। শিশিরের টুপটাপ শব্দের সাথে যেন ঝরে পড়ে মায়ের ভালোবাসা। তখন মা বাড়ির পাশের মোবাইল দোকান থেকে কথা বলেন, ‘বাবা কবে আসবি বল? তুই এলে পিঠা বানাবো। চালের গুঁড়ি করা হয়ে গেছে।’ শিল্পী আমীরুল মোমেনীন মানিকের কণ্ঠে তারই সুর বেজে
ওঠে, ‘বাড়ি থেকে মা আমাকে দিয়েছে চিঠি বাড়ি যেতে হবে পিঠা খেতে হবে ও আমার মা সালাম তোমায়।’ এ যে মা-ছেলের চিরন্তন এক বন্ধন। মা হলেন আল্লাহপ্রদত্ত এক বিশেষ নেয়ামত। আল্লাহ তায়ালার শ্রেষ্ঠ উপহার। সন্তানের কথায় মা যদি রাগ করেন তাহলে আল্লাহ তায়ালাও ঐ সন্তানের প্রতি অসন্তুষ্ট হন। সন্তান যদি মাকে খুশি করতে পারে তাহলে আল্লাহও তার প্রতি খুশি হয়ে যান। আল্লাহ তায়ালা দুনিয়া আখেরাতের সকল নেয়ামত তার জন্য উন্মুক্ত করে দেন।
মা না থাকলে আমাদের জীবনটা কী রকম হতো আমরা কি একবার তা ভেবে দেখেছি। অনেক সময় মা পিঠা বানিয়ে রেখে দেন সকালে খাওয়ার জন্য। তখন পড়ায় আমাদের মন বসতে চায় না। বারবার পিঠার গন্ধ নাকে লাগে। তখন শুধু পিঠা খেতে মন চায়। মা বলেন, ‘সকালে খেয়ো এখন পড়ো।’ কিছুতেই পড়ায় মন বসে না আমাদের। তখন মা অনেকটা বাধ্য হয়েই আমাদের হাতে পিঠা ধরিয়ে দেন। পিঠা হাতে পেয়ে আমাদের মুখে হাসি ফুটে ওঠে, হাসি দেখে মায়েরও রাগ কমে যায়। মা তখন ছেলেকে জড়িয়ে ধরেন বুকের মধ্যে।
এই শীতে মায়ের হাতের পিঠা খাওয়ার যে স্মৃতিটি আমাদের সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে তা হলো, উনুনের পাশে বসে পিঠা খাওয়ার বিশেষ মুহূর্তটি। অনেক সময় বেশি পিঠা খেলে মা বকা দেন। তখন আমাদের পিঠা খাওয়ার গতি আরো বেড়ে যায়। আসলে তখন ইচ্ছে করেই মাকে রাগ করানোর জন্য এসব দুষ্টুমি করতাম আমরা। কবি সুফিয়া কামালের ‘পল্লী মায়ের কোল’ কবিতায় সে চিত্রই উঠে এসেছে-“পৌষ পার্বণে পিঠা খেতে বসি খুশিতে বিষম খেয়ে/ আরো উল্লাস বাড়িয়াছে মনে মায়ের বকুনি পেয়ে।” শীত যেমন বাংলা প্রকৃতির শৈল্পিক এক রূপ তেমনি পিঠাপুলিও অন্যতম এক অনুষঙ্গ। শীতের চাদরের সাথে লেগে আছে মায়ের শরীরের ঘ্রাণ; শিশিরের শব্দের সাথে ঝরে পড়ে মায়ের হাতের পিঠাপুলির স্বাদ।

SHARE

Leave a Reply