Home বিশেষ রচনা মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর ছেলেবেলা

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর ছেলেবেলা

 মুহাম্মদ জাফর উল্লাহ্

সকালের সূর্যই বলে দেয় দিনটি কেমন হবে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর ছেলেবেলার প্রতি তাকালেই যে কেউ অনুধাবন করতে পারবেন যে এই শিশুই মহামানব রূপে এ পৃথিবীতে আগমন করেছিলেন।
আজ থেকে প্রায় সাড়ে ১৪ শত বছর আগে বাংলাদেশ থেকে দূরে বহু দূরে রুক্ষ-শুষ্ক পাহাড়-পর্বত আর মরুবেষ্টিত বালুকাময় এক দেশ; নাম তার আরব। সে দেশেরই কঠিন পাথরের পাহাড় বেষ্টিত এক প্রাচীন শহরের নাম মক্কা। মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইবরাহিম (আ) পুনঃপ্রতিষ্ঠিত কাবাঘরকে কেন্দ্র করেই হাজার বছর আগে গড়ে উঠেছিল এ জনপদ। মক্কানগরী ছিল আরবের তথা সারা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ পবিত্রতম স্থান। জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য, অর্থ-সম্পদ সবদিক দিয়ে ছিল উন্নত। এত কিছু থাকার পরও সেখানে ছিল না তিল পরিমাণ শান্তি। হত্যা, লুণ্ঠন, নারী নির্যাতন, জীবন্ত শিশুকন্যাকে পুঁতে ফেলে হত্যা, দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। মানুষ আল্লাহ্কে ভুলে গিয়ে লা’ত, মানাত, হোবল, উজ্জা প্রভৃতি হাতে গড়া মূর্তির পূজায় ছিল মগ্ন। আল্লাহ্র ঘর কাবা ছিল ৩৬০টি মূর্তিতে অপবিত্র।
পৃথিবীর এ চরমতম জাহেলিয়াতের যুগ সন্ধিক্ষণে ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের ১২ রবিউল আউয়াল সুবহি সাদিকের সুনির্মল আভায় প্রকৃতির নিখাদ নিস্তব্ধতা ভেঙে মা আমেনার কোলজুড়ে এলো এক আলোকিত শিশু। হকচকিত মানবাত্মা। উৎসুক বিশ্ববাসী। তারা কর্ণ উৎকীর্ণ করে জানতে চাইলো ধূলির ধারায় আজ এ আলোক উজ্জ্বল সুপ্রভাত নিয়ে কে এলো? তাদের সাথে সুর মিলিয়ে কবি বলেনÑ
“নূরের দরিয়া সিনান করিয়া
কে এল মক্কায় আমেনার কোলে
ফাগুন পূর্ণিমা নিশীথে যেমন
আসমানের কোলে রাঙা চাঁদ দোলে।
…… ……. ……. …….
এলরে চিরচওয়া আলো আখেরি নবী
সৈয়দে মক্কি মাদানি আল আরবি
নাজেল হয়ে সে যে ইয়াকুত রাঙা ঠোঁটে
শাহাদাতের বাণী আধো আধো বোলে॥”
কে করবে তাঁর জন্মানুষ্ঠান? কে দেবে আকিকা? কে রাখবে তাঁর নাম? জন্মের পূর্বেই তো মারা গেছেন পিতা আবদুল্লাহ্।
এগিয়ে এলেন স্নেহবৎসল পিতামহ। দাদা আবদুল মুত্তালিব সাত দিনের মাথায় এতিম নাতির আকিকা করলেন মহা ধুমধামে। নাম রাখলেন মুহাম্মদ। আর মা আমিনা চাঁদের মতো সুন্দর পিতৃহীন শিশুপুত্রের নাম দিলেন আহমদ। সোয়ায়বা নামক দাসীমাতা অতি আদরে পান করালেন নিজের বুকের দুধ।
আরবের প্রথানুযায়ী ধাত্রী মা হালিমা সাদিয়া সানন্দে দায়িত্ব নিলেন ছোট্ট মুহাম্মদের লালন-পালনের। নিজপুত্র আবদুল্লাহ্ আর সায়মার চেয়ে বেশি ভালবাসতেন শিশু নবীকে। মা হালিমার অভাবের সংসারে সৌভাগ্যের পরশমণি বুলিয়ে দিয়েছিলেন শিশু মুহাম্মদ। তাঁর বুকে নামল দুধের জোয়ার। উট-ভেড়ার পাল হল সবল-সুঠাম। মাঠ-ঘাট ভরে গেল ফুল ও ফসলে। দুঃখিনীর সংসারে এলো সুখ ও সমৃদ্ধির প্রাণবন্যা। শিশু নবীজি মা হালিমার দুধপানেও রাখলেন সাম্য-সমতা। ডান দুধটি খেতেন নিজে আর বাম দুধটি রেখে দিতেন অন্য ভাইয়ের জন্য।
মক্কার অদূরে বনু সা’দ বংশের শিশু-কিশোরদের সাথে বেড়ে ওঠেন নবীজি। সমকালীন আরবের সবচেয়ে বিশুদ্ধভাষী ছিলেন বনু সাদের লোকেরা। তিনি ছোট্ট বয়সেই তাদের কাছ থেকে শিখে নেন বিশুদ্ধ আরবি ভাষা। বড় হয়েও তাঁর ভাষায় ছিল না আঞ্চলিক ভাষার টান। সে জন্যই তিনি যখন বড় হয়ে লোকজনের সামনে বক্তব্য পেশ করতেন তখন লোকেরা তা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শ্রবণ করতেন। চারদিকে বিরাজ করতো পিনপতন নীরবতা। মানুষ খুশি মনে তাঁর হাতে হাত রেখে কবুল করতো সত্য ধর্ম ইসলাম।
শিশু নবীজি যেতেন দুধভাই আবদুল্লাহ্ ও বোন সায়মার সাথে মাঠে মেষ চরাতে। খেলতেন তাদের সাথে। যোগ দিত অন্য শিশুরা। ছেলেমেয়েরা যখন আনন্দের আতিশয্যে মাত্রাতিরিক্ত হাল-লাফ ও হাসি-ঠাট্টায় মেতে উঠতো, নবীজি তাতে অংশ না নিয়ে তখন দূরে দাঁড়িয়ে দিগন্ত বিস্তৃতি আকাশ, পশু-পাখি, চন্দ্র-তারার সৃষ্টিরহস্য অনুধাবনের লক্ষ্যে ভাবুক হয়ে যেতেন। এ সময় একদিন ফেরেশতাদের একটি দল এসে শিশু নবীজির সিনাচাক বা অলৌকিকভাবে তাঁর অন্তকরণ পরিষ্কার (্বক্ষবিধারণ) করে দিয়ে যান।
সাড়ে পাঁচ বছর বয়সে শিশু মুহাম্মদ ধাত্রী মা হালিমার গৃহ হতে মক্কায় ফিরে আসেন মমতাময়ী মায়ের কোলে। তিনিতো তাঁর প্রিয় বাবাকে দেখেননি। কোন দিন নানার বাড়িতে যাওয়া হয়নি তাঁর। একদিন মা আমিনা স্নেহের পুত্র মুহাম্মদ ও উম্মে আয়মন নামে এক দাসীকে সাথে নিয়ে স্বামী আবদুল্লাহ্র কবর জেয়ারতের উদ্দেশে ইয়াসরিবে (মদিনায়) গমন করেন। মদিনায় আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়ানোর পর ফেরার পথে স্বামী আবদুল্লাহ্র কবরের কাছে এসে পুত্রকে নিয়ে হাজির হন। আল্লাহ্র অপার মহিমায় সেখানেই হঠাৎ কঠিন রোগে পীড়িত হয়ে মা আমিনা মৃত্যুবরণ করেন। দুঃখ-শোকে শিশু নবীজি একেবারে মূক হয়ে যান। উম্মে আয়মন পিতৃমাতৃহীন মুহাম্মদকে সাথে নিয়ে মক্কায় ফিরে আসেন। দাদা আবদুল মুত্তালিব বুকে টেনে নেন নিঃস্ব নাতিকে। কিন্তু এ সুখ বেশি দিন সইল না। কিছু দিন পর মারা গেলেন দাদাও। এরপর কিশোর মুহাম্মদকে আগলে নিলেন চাচা আবু তালিব। আবু তালিবের অভাবের সংসারে নবীজি অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে দিনাতিপাত করেন। নিজের অনেক ছেলে-মেয়ে থাকার পরও চাচা আবু তালিব নবীজিকে বেশি ভালোবাসতেন। নবীজিও চাচার সমস্ত কাজে আগ বাড়িয়ে সাহায্য করতেন। সংসারের টুকিটাকি কাজ ছাড়াও মাঠে মেষ চরাতেন।
একবার বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে আবু তালিব সিরিয়া গমনের জন্য রওনা হলে কিশোর নবীজি বায়না ধরলেন চাচার সাথে যাবার জন্য। চাচাও তাতে রাজি হয়ে মুহাম্মদকে সাথে নিলেন। সিরিয়ার পথে তিনি প্রত্যক্ষ করলেন অভিশপ্ত সামুদ জাতির ধ্বংসাবশেষ। তা দেখে তিনি স্তম্ভিত হয়ে চাচার কাছ থেকে জানতে পারলেন যে আল্লাহ্র আদেশ ও নিষেধ অমান্য করার অপরাধে সামুদ জাতি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এ কথা শ্রবণে ভাবী নবী চিন্তামগ্ন হয়ে পড়লেন।
এ সময় বহিরা নামে এক ইহুদি ধর্মযাজক আবু তালিবকে সাবধান করে দিলেন যে, ‘আলোকিত এই কিশোরের প্রতি নজর রেখো। তার পিঠে আমি মোহরে নবুওয়তের চিহ্ন দেখতে পেয়েছি। সে-ই তাওরাত, যবুর ও ইঞ্জিলে বর্ণিত আগামী দিনের পয়গাম্বর।’
এরপর তড়িঘড়ি অল্প ব্যবসা করেই আবু তালিব ভ্রাতুষ্পুত্রকে সাথে নিয়ে মক্কায় ফিরে এলেন। কিন্তু সেবার ব্যবসায় তিনি সবচেয়ে বেশি লাভবান হলেন। এটিও অবশ্যই কিশোর নবীজির বরকতের গুণে।
হযরত মুহাম্মদের কিশোর বয়সে মক্কায় সংঘটিত হয় ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘতম যুদ্ধ, যা ফুজ্জারের যুদ্ধ নামে প্রসিদ্ধ। কোরাইশ ও কায়েস গোত্রের মধ্যে প্রথমে শুরু হলেও পরবর্তীতে তাদের আত্মীয়-স্বজন এ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এ যুদ্ধে কোরাইশদের পক্ষে চাচা আবু তালিবের সাথে তিনিও অংশ নেন। তিনি তলোয়ার পরিচালনা করতে পারেননি অল্প বয়সের কারণে; তবে তিনি তীর-ধনুক এগিয়ে দিয়ে তাদের সাহায্য করেছিলেন। কিন্তু মানুষে মানুষে এই হানাহানি প্রত্যক্ষ করে বালক নবীজির অন্তর ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। এই সমস্যার সমাধান কিভাবে করা যায় তা তিনি গভীরভাবে চিন্তা করতে লাগলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর কয়েকজন বন্ধু নিয়ে গঠন করলেন শান্তিসংঘ ‘হিলফুল ফুজুল’। তাদের সাথে নিয়ে শপথ নিলেনÑ (ক) আমরা দেশের শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখব (খ) বিনা কারণে কারো সাথে যুদ্ধে জড়াবো না (গ) অনাথ-এতিমকে সাহায্য করবো (ঘ) গোত্রে গোত্রে সম্প্রীতি গড়ে তুলবো (ঙ) সন্ত্রাসীদের মক্কায় আশ্রয় দেবো না (চ) হজে আগত মুসাফিরদের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করবো।
এ অল্প বয়সেই বালক মুহাম্মদ (সা) মক্কাবাসীর নিকট আল-আমিন খেতাবে ভূষিত হলেন। যে কোন বিরোধ বাধলে লোকেরা তাঁর নিকট ছুটে আসতেন সদলবলে। তিনি সমাধান দিতেন শান্তিপূর্ণ উপায়ে। সবাই ঘরে ফিরে যেত খুশিমনে। তেমনি এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের অবতারণা ঘটে নব সংস্কারকৃত কাবায় পবিত্র হাজারে আসওয়াদ বা কাল পাথর পুনঃস্থাপন নিয়ে। তা কে প্রতিস্থাপন করবে এ নিয়েই চরম বিরোধ। শেষ পর্যন্ত তরুণ মুহাম্মদ (সা) তাঁর নিজের গায়ের চাদরটি বিছিয়ে দিলেন কা’বা চত্বরে। তার মাঝে রাখলেন কাল পাথরটি। ডাকলেন গোত্রপতিদের। এবার চার গোত্রের প্রধানকে রুমালের চার কোণ ধরে হাজরে আসওয়াদকে তুলে নিয়ে কাবার গায়ে স্থাপন করতে বললেন। গোত্রপতিরা তাঁর কথা মানলেন। মিটে গেল তাদের চরম রক্তক্ষয়ী বিরোধ।
এভাবে সত্য দিয়ে, সেবা দিয়ে ও চারিত্রিক মাধুর্যতা দিয়ে বালক নবী জাহেলি সমাজের অন্তর জয় করে নিয়েছিলেন। পরবর্তী এই সত্যবাদী ও নির্ভীক তরুণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এক নয়া জাতি। বিশ্বের জন্য এনেছেন শাশ্বত এক ধর্মÑ আল-ইসলাম। বিশ্ববাসীকে পথপ্রদর্শন করেছেন ইহকাল ও পরকালের। আর কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর অনুসারীরা যেন পথভ্রষ্ট না হয় তার জন্য রেখে গেছেন পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ।

SHARE

Leave a Reply