Home ফিচার ঈগল পাখির মজার কথা

ঈগল পাখির মজার কথা

মৃত্যুঞ্জয় রায়

ঈগল এক শক্তিশালী শিকারি পাখি। ওরা বনবিড়াল, শিয়াল, ইঁদুর, বানর এমনকি হরিণের বাচ্চা পর্যন্ত শিকার করতে পারে। ঈগলের আছে তীক্ষè দৃষ্টি। অনেক ওপর থেকেও ওরা শিকারকে দেখতে পারে। ওদের আছে বড়, শক্ত ও বাঁকা ঠোঁট আর শক্তিশালী নখ। তাই শিকার ধরতে ওদের কোনো অসুবিধা হয় না। ঈগলের চোখ মাথার তুলনায় বেশ বড় ও দৃষ্টিশক্তি প্রখর। মানুষের চেয়ে ঈগলের চোখের রেটিনায় প্রতি বর্গমিলিমিটারে প্রায় ৫ গুণ বেশি আলোকসংবেদী কোষ রয়েছে। মানুষ যেখানে মাত্র তিনটি মৌলিক রঙ দেখতে পারে, ঈগল সেখানে দেখতে পারে পাঁচটি মৌলিক রঙ। তাই শিকার যতই ছদ্মবেশ ধারণ করুক বা রঙ পাল্টাক না কেন, ঈগল বহু দূর থেকেও শিকার চিনতে পারে। ধারণা করা হয়, প্রাণীদের মধ্যে ঈগল সবচেয়ে ভালো দেখতে পারে। ওরা ২ মাইল দূর থেকেও খরগোশের মতো একটা ছোট প্রাণীকেও দেখতে পারে। হ্যাপি ঈগল ও ফিলিপিন ঈগলরা ডানা মেললে তা প্রায় আড়াই মিটার ছড়িয়ে পড়ে। এসব ঈগল অনায়াসে তাদের পায়ে একটা বানর শিকার করে ঝুলিয়ে উড়ে যেতে পারে। গ্রিসের সোনালি ঈগলরা কচ্ছপ খায়। কচ্ছপের খোলস শক্ত। তাই ওরা কচ্ছপকে নিয়ে উড়ে চলে। অনেক উঁচুতে উঠে ধপাস করে কচ্ছপকে পাহাড়ের পাথরের ওপর ফেলে দেয়। এতে কচ্ছপের খোলস ভেঙে যায়। তখন আর তাকে খেতে ঈগলের কোনো অসুবিধা হয় না। প্রায় সব ঈগলই মাংস খায়। শুধু আফ্রিকার এ প্রজাতির ঈগল তৃণভোজী, তারা খায় অয়েল পামের ফল। ওরা সাপ, গিরগিটি, পাখি, মাছ, স্তন্যপায়ী ছোট প্রাণী, কচ্ছপ ইত্যাদি শিকার করে খায়। শিকারকে পা দিয়ে খামচে ধরে প্রথমে সে ঠোঁট দিয়ে শিকারের মেরুদন্ডের স্পাইনাল কর্ড ছিঁড়ে ফেলে। এতে শিকার কাহিল হয় ও মরে। পরে ধীরে ধীরে ঈগল তাকে আহার করে। কোনো মাছ শিকার করলে প্রথমেই সে তার মাথা খেয়ে ফেলে।
পৃথিবীতে প্রায় ৬০ রকমের ঈগল পাখি আছে। একটি ঈগলের ওজন সাড়ে তিন থেকে ৬ কেজি হতে পারে। ঈগল প্রায় ৩০ বছর বাঁচে। সাধারণত ৪-৫ বছর বয়সে ওরা সাবালক হয় ও ৫ বছর বযস থেকে বাচ্চার জন্ম দিতে শুরু করে। ডিম থেকে ঈগলের বাচ্চা হয়। পুরুষ ঈগলরা দূর থেকে বাচ্চাদের জন্য খাবার সংগ্রহ করে। একটি সোনালি ঈগল প্রজনন মৌসুমে ১ থেকে ৪টি ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। ঈগল পাখিরা সাধারণত উঁচু কোনো জায়গায় বা গাছে বাসা বাঁধে। সে বাসায় মেয়ে ঈগল ডিম পাড়ে। পুরুষরা ছোট, মেয়ে ঈগলের ওজন পুরুষের চেয়ে প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি। একটা মা ঈগল সাধারণত ২টি ডিম পাড়ে। একটা মেয়ে ঈগল ও পুরুষ ঈগল সারা জীবন বন্ধুর মতো একসাথে থাকে, এক বাসায় থাকে। কোনো একজন সঙ্গী না মরা পর্যন্ত তারা একসাথে জীবন কাটায়। কোনো কারণে একজন মরে গেলে তারা নতুন সাথী খুঁজে নেয়। প্রায় ৩৫ দিন ধরে ডিমে তা দেয়ার পর তা ফুটে বাচ্চা বের হয়। একটা ডিম আগে ফোটে, অন্যটা ফোটে পরে। বাচ্চা লালন পালনে পুরুষ ও মেয়ে ঈগল দু’জন মিলে সব দায়িত্ব পালন করে। ডিম ফোটার পর পুরুষ ঈগল সারাক্ষণ বাসা পাহারা দেয় যাতে অন্য কোনো প্রাণী এসে বাচ্চাকে খেয়ে না ফেলে। এ সময় মেয়ে ঈগল যায় বাচ্চার জন্য খাবার আনতে। খাবার এনে তা বাচ্চাদের খাওয়ায়।
মানুষের মতো ঈগলরাও তাদের বাসা সব সময় পরিচ্ছন্ন রাখে, বাসা থেকে উচ্ছিষ্ট খাবার ও ময়লা ফেলে দেয়। এমনকি বাসা তৈরির সামগ্রী পুরনো হয়ে গেলে সেগুলোও নতুন সামগ্রী এনে বদলে দেয়। ওরা দু’জন মিলে বাসা মেরামত করে। বাচ্চারা সব সময় একজন আর একজনের ওপর খবরদারি করে। বিশেষ করে যখন খাবারের অভাব হয় তখন বড় বাচ্চাটা ছোটটাকে তা খেতে দেয় না। হয়তো ভাবে, অল্প খাবার খেলে তো দু’জনই মারা পড়ব। তাই একজন অন্তত খাবার খেয়ে বাঁচি, অন্যটা মরুক। ওদের মা-বাবাও এতে বড় বাচ্চাটাকে বাধা দেয় না। তবে খাবারের অভাব না হলে ওরা এরকম করে না। ঈগলরা সাধারণত বাসাতেই রাতে ঘুমায়। কিন্তু বাসা ছোট হলে তো সে জায়গা হয় না। তাই বড়রা বাসার পাশেই কোনো ডালে বসে ঘুমায়। ওদের পা ডালে বিশেষ কৌশলে এমনভাবে আটকে রাখে যে ঘুমানোর সময় ওরা গাছ থেকে পড়ে যায় না। মেয়ে ও পুরুষ ঈগল দু’জন মিলেই ডিমে তা দেয়। তা দেয়ার জন্য তারা সময় ভাগ করে নেয়। মেয়ে ঈগল সাধারণত রাতে তা দেয়। ঈগলের জিহ্বায় একটা ফুটো আছে, তা দিয়েই ওরা শ্বাস-প্রশ্বাসের কাজ চালায়। তোমার-আমার মতো ঈগলের মাথার দু’পাশে দুটো কান নেই, তবে শোনার জন্য কানের দুটো ফুটো আছে। পালক দ্বারা তা ঢাকা থাকে বলে দেখা যায় না। ওরা খুব ভালো শুনতে পারে। ঠোঁটের গোড়ায় নাকের তিনটে ফুটো আছে। এখান দিয়েও ওরা শ্বাস-প্রশ্বাসের কাজ চালায়। তবে তা দিয়ে ঘ্রাণ খুব একটা শুঁকতে পারে না। ঈগলের রক্ত আমাদের রক্তের মতোই গরম। আমাদের দেশে ঈগল খুব কম দেখা যায়। ঈগলকে অনেক দেশ শক্তি ও স্বাধীনতার প্রতীক মনে করে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় প্রতীকে তাই রয়েছে ঈগলের ছবি।

SHARE

Leave a Reply