Home ধারাবাহিক: দুর্গম পথের যাত্রি দুর্গম পথের যাত্রী

দুর্গম পথের যাত্রী

আসাদ বিন হাফিজ

গত সংখ্যার পর

যোবায়ের তখনো খুঁটির সাথে বাঁধা। কিন্তু সেদিকে নজর দেয়ার অবকাশ নেই এখন মক্কাবাসীদের। নিজেদের মধ্যে মারামারি লেগে যাওয়ার উপক্রম প্রায়। দুই দলই নিজেদের মতের ওপর অটল এবং মারমুখী হয়ে উঠল। খালিদ যখন দেখলো অবস্থা বেশ সঙ্কটাপন্ন তখন সে শঙ্কিত হয়ে আবু সুফিয়ানের কাছে গেল।
‘আবু সুুফিয়ান।’ খালিদ বললো, আমি আগেই বলেছিলাম তোমার এ সিদ্ধান্ত আমার মনোপূত নয়। এতে অপমানের গ্লানি ছাড়া আমরা আর কিছুই পাবো না। এখন দেখো ময়দানের অবস্থা। তোমার নিজের লোকেরা এখন পরস্পরের রক্তের জন্য উন্মাদ হয়ে উঠছে। দেখো এ হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে কত লোক ধ্বনি-প্রতিধ্বনি তুলছে। এখনো সময় আছে আবু সুফিয়ান! একজনকে হত্যা করেছ, বাকি যে আছে তাকে ছেড়ে দাও। নতুবা কুরাইশবাসী নিজেদের মধ্যে লড়াই শুরু করে দেবে এবং নিজেদের রক্তে নিজেদের হাত রঞ্জিত করবে। হিন্দা দূর থেকে দেখতে পেল খালিদ আবু সুফিয়ানের সাথে কথা বলছে। সে বুঝে নিলো, খালিদ যোবায়েরকে মুক্ত করার তদবির করার জন্যই আবু সুফিয়ানের কাছে এসেছে। বিলম্ব না করে তাই হিন্দা দ্রুত ঘোড়া তাড়িয়ে ওদের কাছে ছুটে এলো।
খালিদ! হিন্দা কর্কশ স্বরে বললো, আমি জানি তুমি কী চাও, তুমি কি আবু সুফিয়ানকে সরদার বলে মান্য কর না? যদি মান্য না কর তবে এখান থেকে চলে যাও। তোমার সাথে তার কোনো কথা নেই। আর যদি মান্য করো তবে তিনি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা মেনে নাও। বেয়াদবের মত বাড়াবাড়ি করো না, আমি যা চিন্তা করেছি তাই হবে। ওদের তুমি বাঁচাতে পারবে না।
খালিদ! আবু সুফিয়ান বললো, ‘যদি তুমি মনে কর, আমার আদেশ সঠিক নয়, তবুও তুমি আমাকে আমার মর্জি মতো কাজ করতে দাও। এখন যদি আমি আমার আদেশ ফিরিয়ে নেই তবে আমার দুর্বলতা প্রকাশ পাবে। জনসাধারণ আমার আদেশের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলবে। ভাববে, সিদ্ধান্তের ব্যাপারে আমার দৃঢ়তা নেই, ফলে ভবিষ্যতে আমার নেতৃত্ব সঙ্কটে পড়ে যাবে। তাই আমি যে আদেশ দিয়েছি তা আর ফিরিয়ে নেয়া সম্ভব নয়।
খালিদের আজ মদিনা যেতে যেতে এসব কথা একে একে মনে পড়ছিল। আজ তার আফসোস হচ্ছে এই ভেবে যে, শেষ পর্যন্ত সে আবু সুফিয়ানের আদেশই মেনে নিয়েছিল। কারণ খালিদ ছিল একজন জাত সৈনিক। একজন সৈনিক সবসময় সেনাপতির আদেশ মেনে নেয়াকে সব কিছুর ওপরে স্থান দেয়। সরদারের আনুগত্য করাকে সে শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য অপরিহার্য বলে বিবেচনা করে। খালিদ সেদিন বুকে পাথর চেপে শুধু এ কারণে আবু সুফিয়ানের আদেশ মেনে নিয়েছিল যে, কুরাইশদের মধ্যে নইলে নেতার আদেশ লংঘনের বদ রেওয়াজ চালু হয়ে যাবে।
হে মক্কাবাসী! আবু সুফিয়ান বিবদমান দর্শকদের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বললো, ‘যদি আজ এখানে দু’জন মুসলমানের হত্যাকে কেন্দ্র করে আমরা দুই দলে ভাগ হয়ে যাই, যদি ওদেরকে কেন্দ্র করে আজ নিজেদের মধ্যে রক্তারক্তি কান্ড ঘটাই, তবে এর চেয়ে দুঃখজনক ঘটনা আর কিছুই হতে পারে না। যদি দু’জন শত্রুকে কেন্দ্র করে আমরা দুই দলে ভাগ হয়ে যেতে পারি তবে আমরা যখন অসংখ্য শত্রুর মোকাবেলা করার জন্য যুদ্ধের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়বো, তখন সেখানে তোমরা কয় দলে বিভক্ত হবে? এতে করে যে তোমাদের ওপর তোমাদের শত্রুরা বিজয় পতাকা উড়াবে এই দলাদলির সময় সে কথা কি তোমাদের একবারও মনে পড়ল না? যদি তোমরা চাও তাহলে তোমরা তোমাদের সরদারের অনুগত্য থেকে ফিরে যেতে পারো। কিন্তু আমি জানি তার পরিণাম খুবই খারাপ হবে। আমি স্পষ্ট বলে দিচ্ছি তোমাদের সে করুণ পরিণতির জন্য আমাকে দায়ী করতে পারবে না।
আবু সুফিয়ানের বক্তব্য শুরু হতেই দর্শকরা নিজেদের মধ্যে তর্কাতর্কি বন্ধ করে তার চার পাশে এসে সমবেত হতে লাগল। নিজেদের জটলা থামিয়ে তারা উদগ্রীব হলো আবু সুফিয়ানের বক্তব্য শোরার জন্য। থেমে গেল ভিড়ের চিৎকার-চেঁচামেচি।
আবু সুফিয়ানের কথা শেষ হলো। খালিদ দেখলো মক্কার কয়েকজন সর্দার ঘৃণায় মুখ বিকৃত করে ময়দান থেকে সরে পড়ল। খালিদও সরে পড়তে চাচ্ছিল, কিন্তু একটা অঘটন ঘটার আশঙ্কার কারণে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও সরে পড়তে পারল না। কারণ আবু সুফিয়ানের এই বক্তৃতার পরও লোকজন পুরোপুরি শান্ত হয়নি। দেখা গেল ময়দানজুড়ে কানাঘুষা, ফিসফাস বেশ জোরেশোরেই চলছে। যে কোনো মুহূর্তে একটি সংঘর্ষ বেধে যাওয়ার আশঙ্কা তখনো শেষ হয়ে যায়নি। সে তার দলের ও গোত্রের লোকদের নিয়ন্ত্রণ করার জন্য তাদের কাছে ছুটে গেল। অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে তাদের সেখান থেকে সরিয়ে নেয়ার ফলে সে যাত্রা কুরাইশরা এক রক্তাক্ত সংঘাত থেকে রেহাই পেয়েছিল।
এ দু’জন মুসলমানকে হত্যা করে দর্শকদের আনন্দ দেয়ার জন্য হিন্দা মনের মতো পরিকল্পনা ও ব্যবস্থা করে রেখেছিল। সেই পরিকল্পনা মতো হিন্দা এবার তার কাজ শুরু করে দিল। তার ইঙ্গিতে চল্লিশজন কিশোর বালক বর্শা হাতে ময়দানে নেমে এল। নানা রকম আনন্দ ধ্বনি দিতে দিতে তারা এগিয়ে চলল যোবায়েরের দিকে। যোবায়েরের সামনে এসে তারা তাকে ঘিরে নাচতে শুরু করল। নাচের সঙ্গে এবার শুরু করল সমবেত কণ্ঠে গান। নাচ গানের তালে তালে তারা বর্শা উঁচিয়ে যোবায়েরের নাগালের মধ্যে চলে এলো। এরপর নাচের তালে তালে বিভিন্ন দিক থেকে বর্শা দিয়ে আস্তে আস্তে খোঁচা দিতে লাগল যোবায়েরের গায়ে।
কিন্তু সবাই সতর্ক থাকল যেন আঘাত খুব জোরে না লাগে, যেন আঘাতের চোটে তার এখনি মৃত্যু না ঘটে। তারা নাচছে ঘুরছে আর শরীরে বিভিন্ন অংশে আঘাত হেনে চলেছে। যোবায়েরের সারা শরীর থেকে রক্ত ঝরতে শুরু করল। কিশোরেরা এবার তালে তালে একদল এগোয় আর একদল পিছিয়ে বর্শা ছোড়ার ভঙ্গি করে। ওরা মুখ ভেংচে ভয় দেখাতে চেষ্টা করল যোবায়েরকে। কিছুক্ষণ এভাবে ভয় দেখিয়ে আবার একটু একটু করে আঘাত করতে লাগল। যোবায়ের (রা.) আঘাতের তালে তালে জিকির শুরু করলেন। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ!
ছেলেরা বর্শা উঁচিয়ে তাঁর ওপর আক্রমণ চালিয়ে যেতে লাগল। আঘাতে আঘাতে যোবায়ের (রা.) এর শরীর ঝাঁঝরা হয়ে গেল। কিন্তু সারা শরীর ক্ষতবিক্ষত করলেও তারা যোবায়ের (রা.)-এর বুকে আঘাত করল না। ছেলেরা যোবায়ের (রা.) কে ভেংচালো, খোঁচালো, ভয় দেখালো। দর্শকরা ছেলেদের কান্ড দেখে কখনো আনন্দ ধ্বনি দিল, কখনো খিল খিল করে হেসে উঠল, কখনো বা হাত তালি দিয়ে উৎসাহ দিল তাদের। ছেলেদের এই খেলা চলে অনেকক্ষণ ধরে। তারপর ছেলেরা তাদের আঘাত আরো জোরদার করে। যোবায়ের (রা.) এর কণ্ঠ থেকে প্রতিটি আঘাতের সাথে উচ্চারিত হতে থাকে আল্লাহু আকবার ও মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ধ্বনি। তার সারা শরীর রক্তে রঞ্জিত হয়ে যায়। দর্শকদের আনন্দ ধ্বনি চলতে থাকে বিরতিহীন। দীর্ঘ সময় ধরে এই বীভৎসতা চলার পর আবু জেহেলের বেটা আকরামা হাতে বর্শা নিয়ে বালকদের কাছে গেল এবং তাদেরকে কিভাবে আঘাত করবে শিখিয়ে দিতে লাগলো। এখন যোবায়ের (রা.) এর শরীরে এমন এক ইঞ্চি জায়গাও নেই যেখানটা বর্শার আঘাতে ঝাঁঝরা হয়নি। এমন এক চিলতে জায়গাও নেই যেখান থেকে রক্ত না ঝরছে।
ছেলেরা তাঁর মুখেও বর্শার আঘাত করল এবং সারা মুখ ক্ষতবিক্ষত করে দিল যখন নেচে গেয়ে ও বর্শার আঘাত করতে করতে ছেলেরা ক্লান্ত হয়ে পড়ল তখন আকরামা তাদের সেখান থেকে সরিয়ে দিল। যোবায়ের (রা.) এর দেহ রক্তে রঞ্জিত কিন্তু তিনি তখনও জীবিত। ছেলেরা সরে পড়ায় এখন আর কেউ তাকে আঘাত করছে না। তিনি আস্তে আস্তে চোখ খুললেন এবং চারদিকে তাকালেন। দেখলেন বর্শা হাতে আকরামা তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি আল্লাহর নাম জপতে থাকলেন। আকরামা ধীরে-সুস্থে যোবায়ের (রা.) এর বুক লক্ষ্য করে বর্শার নিশানা করল। তারপর সহসা প্রচন্ড শক্তি নিয়ে আঘাত করল যোবায়ের (রা) এর বুকে। বর্শা যোবায়ের (রা.) এর বুক এফোড় ওফোড় করে দিল, শহীদ হয়ে গেলেন যোবায়ের (রা.)।
এদের লাশ এভাবেই বাঁধা থাক। হিন্দার ঝাঁঝালো স্বর শোনা গেল। যতদিন লাশ পচে গলে নিঃশেষ না হবে ততদিন এখানেই থাকবে লাশ। দর্শকরা দেখতে পারবে আমাদের সাথে দুশমনী করার পরিণাম।
এই ঘটনা ঘটেছিল ৬২৫ খ্রিস্টাব্দে। খালিদের মনের পর্দায় আজও সে দৃশ্য ভাসছে। আজো তার মনে বয়ে যাচ্ছে সে ব্যথার ঢেউ। যোবায়ের (রা.) ও জায়েদ (রা.)কে হত্যার মধ্য দিয়ে কুরাইশদের মধ্যে রোপিত হলো বিভেদের বীজ। শেষ বারের মত এই দুই বীর শহীদ যখন প্রশান্ত চিত্তে নামাজ পড়ছিলেন সে দৃশ্য দেখে অনেক সাধারণ কুরাইশ এমনকি কোন কোন সরদারেরও বুকের ভেতরের কলকব্জা নড়ে উঠেছিল। ইসলাম থেকে ফিরে আসার জন্য আবু সুফিয়ানের আহবানে সাড়া না দিয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার মধ্য দিয়ে আদর্শের প্রতি তাদের দৃঢ়তা ও শ্রেষ্ঠত্বের যে স্বাক্ষর তারা রাখলেন সে মহত্ত্বের কথা স্মরণ করে অভিভূত হয়ে গেল অনেক যুবা ও তরুণ। এই দৃশ্য কুরাইশদের কিছু নেতার মনে এমন গভীর রেখাপাত করলো যে, তারা এই দুই বীরের বীরত্বে মুগ্ধ ও বিমোহিত হয়ে গেল। খালিদ বিন ওয়ালিদ এদেরই একজন। সে মনে মনে যোবায়ের ও জায়েদের বীরত্বের খুবই প্রশংসা করলো। সেই সাথে এই নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ অনুষ্ঠানের আয়োজন করায় আবু সুফিয়ান ও হিন্দার বিরুদ্ধে তার মনে জন্ম নিলো অপরিসীম ঘৃণা ও ক্রোধ।
এটা যোদ্ধাদের পক্ষে মেনে নেয়ার মতো কোন রীতি নয়। খালিদ আপন মনেই নিজেকে বললো, এই ঘটনা যোদ্ধাদের জন্য অশোভন ও অমর্যাদাকর।
কয়েকদিন পরের কথা। একদিন খালিদ ঐসব সরদারদের নিয়ে এক বৈঠকে বসল, যারা রাসূলে করিমের সাহাবীদ্বয়ের হত্যার বিরুদ্ধে সেদিন মাঠে সোচ্চার হয়েছিল।
তোমরা কি সবাই জানো, মৃত্যুবরণকারী সাহাবী মাত্র দু’জন নয়, ছয়জন ছিল? খালিদ জিজ্ঞেস করলো।
‘হ্যাঁ! একজন সরদার উত্তর দিল। এ ছিল শারজা বিন মুগির অপকর্ম। সে এই ছয়জন মুসলমানকে ধোঁকা দিয়ে মদীনা থেকে বের করে এনেছিল। আর এ অপকর্মের বুদ্ধি ও পরামর্শদাতা ছিল মক্কারই কয়েকজন ধুরন্ধর ইহুদি।
এবং তাদের সাথে ইহুদি কন্যা ইউহাদা ও কয়েকজন ইহুদি নারীর রূপের ফাঁদ ও যাদুর মত কাজ করছিল। বলল খালিদ।
ইউহাদা আসলেই এক জাদুকন্যা। বললো একজন সরদার, সে এমন জাদু জানে যে, এক ভাইকে দিয়ে আরেক ভাইকে সে জবাই করাতে পারে।
এটা কি আমাদের জন্য ভয়ের কারণ নয়? ইহুদিরা আমাদের পরস্পরের মধ্যে এমন দুশমনী সৃষ্টি করে ফেলতে পারে। অন্য এক সরদার বললো।
না! এক বৃদ্ধ সরদার বললো, মুহাম্মদ তাদের যেমন শত্রু তেমনি আমাদেরও। ইহুদিরা চাচ্ছে তাদের শত্রু খতম হোক কিন্তু তারা তার মোকাবেলায় দাঁড়াতে রাজি নয়। ওরা আমাদেরকে ব্যবহার করে মুসলমানদের ওপর জয়ী হাতে চায়। চায় মুসলমানদের সাথে আমাদের শত্রুতা এমন তীব্র ও কঠিন হোক যাতে করে আমরা মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করে দেই।
ইহুদিদের ওপর আমাদের সন্দেহ করা উচিত নয়। অন্য এক সরদার বললোÑ বরং প্রয়োজনে আমরা ইহুদিদেরকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে তলে তলে ব্যবহার করতে পারি।
কিন্তু এমন নয়, যেমন শারজা করেছে। খালিদ বললো, আর এমনও নয় যেমন আবু সুফিয়ান ও তার স্ত্রী করেছে।
তোমরা কি জান, ইউহাদা মক্কার কিছু ইহুদির সঙ্গে মদীনায় চলে গেছে? বুড়ো সরদার বললো, সে মদীনা ও তার আশপাশের ইহুদি ও অন্যান্য জাতিকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে উস্কানি দেবে। ইসলামের উন্নতিতে সে নিজে ভয় পাচ্ছে। যদি মুহাম্মদের বিশ্বাস ও মতবাদ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে আর যুদ্ধের ময়দানে মুহাম্মদের অনুসারীদের প্রেরণা যেমন আমরা দেখছি যদি তাই থাকে তবে খোদ ইহুদিদের সূর্য অস্তমিত হয়ে যাবে।
কিন্তু ইহুদিরা যুদ্ধ করার জাতি নয়। খালিদ বললো যুদ্ধের ময়দানে তারা আমাদের সঙ্গে থাকবে না।
যুদ্ধের ময়দানে তারা আমাদের জন্য একটা বড় সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে পারবে। অন্য এক সরদার বললো, তারা ইউহাদার মত রূপসী মেয়েদের দিয়ে মুসলমান সরদার ও সেনাপতিদেরকে যুদ্ধের ময়দানে আসার অযোগ্য করে দিতে পারবে।
খালিদ ওহুদ পাহাড়ের প্রান্তে এসে দাঁড়াল। চারদিকে চোখ বুলিয়ে ধীরে ধীরে উপরে উঠতে শুরু করল সে। এতক্ষণ স্মৃতিপটে যেসব দৃশ্য একের পর এক ঘুরে বেড়াচ্ছিল সহসা সেগুলো হারিয়ে গেল। তার চোখ এখন পাহাড়ের দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তর ঘুরে বেড়াতে লাগলো। পাহাড়ের উপর দিয়ে হেঁটে চলেছে ঘোড়া। একের পর এক মাড়িয়ে যাচ্ছে চড়াই উৎরাই। তার ঘোড়া এখন নিচের দিকে নামছে। এই প্রান্তরটি প্রায় এক মাইল দীর্ঘ ও আধা মাইল পাশ। এর মাঝেও কোথাও কোথাও ছোট ছোট বালির টিলা দাঁড়িয়ে আছে। নিরেট বালি নয়, বালি ও মাটি মিশ্রিত ঢিবি। খালিদ কোন জন্তুর দৌড়ানোর পদধ্বনি শুনতে পেল। সে সেদিকে চমকে তাকালো এবং তার হাত তলোয়ারের বাঁটের উপর চলে গেল। দেখল পাঁচটি হরিণ নিচের দিকে দৌড়ে যাচ্ছে। কিছু দূর গিয়ে একটি হরিণ আর একটিকে গুঁতো দিল। গুতো খাওয়া হরিণটি ফিরে দাঁড়াল, ফলে সামনাসামনি শুরু হয়ে গেল পরস্পর গুতাগুতি। অন্যান্য হরিণগুলো দাঁড়িয়ে এই গোঁতাগুঁতি দেখছিল।
আহ কী সুন্দর প্রাণী! খালিদ মুগ্ধ চোখে চেয়ে চেয়ে দেখছিল ওদের খেলা। হঠাৎ একটি হরিণ দেখে ফেলল খালিদের ঘোড়া। সাথে সাথে সে ঘাড় উঁচু করে মাটিতে পায়ে আঘাত করল। সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল ওদের লড়াই। চকিতে মাথা তুলে একদিকে ছুটে পালাল সব হরিণ। মুহূতের্র মধ্যে খালিদের দৃষ্টির বাইরে চলে গেল হরিণগুলো।
কুরাইশ সরদাররা মানসিকভাবে দুই দলে বিভক্ত হয়ে গেল। যদিও তাতে করে তখনো নিজেদের মধ্যে পরস্পর শত্রুতার সৃষ্টি হয়নি। কিন্তু প্রীতি, ভালোবাসা ও ঐক্যের যে বন্ধন এতোদিন অটুট ছিল তা আর অটুট থাকলো না।
খালিদের মনে পড়ছে, এই সেদিনও কুরাইশের সকলেই আবু সুফিয়ানকে সরদার ও সেনাপতি হিসাবে অসম্ভব শ্রদ্ধা, ভক্তি ও মান্য করত। কিন্তু মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য যখন কুরাইশদের মধ্যে ঐক্যের বিশেষ প্রয়োজন তেমনি এক জরুরি মুহূর্তে তাদের মধ্যে সৃষ্টি হলো এই মানসিক ভাঙন। একজন সেনানায়ক হিসাবে খালিদ বুঝতে পারছিল এর পরিণতি শুভ হবে না। কিন্তু দৈহিক ফাটল বন্ধ করা যত সহজ মানসিক ফাটল বন্ধ করা তত সহজ নয়। কারণ এ ফাটল চোখে দেখা যায় না। খালিদ বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তির মধ্যে দিন কাটাচ্ছিল।
‘আপনার কি জানা নেই, নিজেদের মধ্যে ফাটল শত্রুদের শক্তি ও সাহস বৃদ্ধি করে? খালিদ একদিন আবু সুফিয়ানকে বলেছিল, আপনি কি কখনও চিন্তা করেছেন, কিভাবে এই ফাটল বন্ধ করা যায়, কিভাবে আবার সব সরদারদের চিন্তাধারাকে এক সূত্রে আবদ্ধ করা যায়?
অনেক চিন্তা করেছি খালিদ! আবু সুফিয়ান হতাশ কণ্ঠে বলল, অনেক চিন্তা করেছি কিন্তু কোন পথ খুঁজে পাচ্ছি না। সকলে আগের মতই এখনো আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে, কিন্তু আমি বেশ বুঝতে পারছি, তাদের সবার মন আর আগের মত পরিষ্কার নেই। তুমি কি এমন কোন উপায়ের কথা বলতে পারো, যাতে তাদের অন্তরগুলো আবার আগের মত হয়ে যায়।
‘হ্যাঁ! একটা উপায় আমি চিন্তা করেছি।’ খালিদ বললো, ‘আমি এই চিন্তাই আপনার সামনে রাখতে চাচ্ছিলাম। সরদারদের মনে এখন নানা রকম সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। তারা মনে করছে, আমরা এখন নামে মাত্র যোদ্ধা, মুসলমানদের ভয় আমাদের অন্তরে ঢুকে গেছে। শারজা যে ছয়জন মুসলমানকে ধোঁকা দিয়েছে তাদের মধ্যে দু’জনকে আপনার দ্বারা হত্যা করিয়ে আমাদের ইমেজের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। এর একমাত্র প্রতিকার হলো, আবার মদীনার উপর আক্রমণ পরিচালনা করা। সবার সামনে এটা প্রমাণ করা যে, আমরা যুদ্ধবাজ এবং বীর জাতি, মুসলমানদের ব্যাপারে আমরা সব সময়ই আপসহীন।
আবু সুফিয়ান লাফিয়ে উঠে বলল, ‘আমার মনে হয় তুমি ঠিকই বলেছো খালিদ। তোমার কি মনে আছে, ওহোদের যুদ্ধ শেষে আমি মুহাম্মদকে বলেছিলাম, তুমি বদরের যুদ্ধে আমাদের পরাজিত করেছিলে আমরা ওহোদ পাহাড়ের পাদদেশে তার প্রতিশোধ নিয়েছি। আমি আরো বলেছিলাম, কুরাইশের বুকে প্রতিশোধের আগুন জ্বলছে, জ্বলতে থাকবে। আগামীতে বদরের ময়দানেই তোমাদেরকে আমরা যুদ্ধের জন্য আহবান জানাব?’
‘হ্যাঁ, আমার মনে আছে। খালিদ বলল, অন্যদিকে উমর বলেছিল, আল্লাহ যদি চান তবে আগামীতে বদরের ময়দানেই আবার আমাদের সাক্ষাৎ হবে। হ্যাঁ কথাগুলো উমরের মুখ দিয়েই উচ্চারিত হয়েছিল ঠিক, কিন্তু কথাগুলো ছিল মুহাম্মদের (সা)। আবু সুফিয়ান বললো, মুহাম্মদ তখন ভীষণভাবে আহত। ফলে সে কিছু বলতে পারছিল না। আমি মুহাম্মদকে সংবাদ পাঠাচ্ছি, অমুক দিন বদরের ময়দানে আসো এবং পরিণাম ভোগ কর।
দু’জনে পরামর্শ করে একটা দিন ঠিক করল এবং সিদ্ধান্ত নিল, একজন ইহুদিকে দিয়ে এ খবর মদীনায় পাঠানো হবে।
পরের দিনই আবু সুফিয়ান কুরাইশদের সব সরদারকে তার কাছে ডেকে পাঠালো।
বৈঠকে আনন্দের সাথে ঘোষণা করা হলো, মুসলমানদের আবার বদরের ময়দানে যুদ্ধের আহবান জানানো হচ্ছে। কুরাইশরা এ ধরনের ঘোষণারই অপেক্ষা ছিল, কারণ তারা আত্মীয় স্বজনের রক্তের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য ছিল বেকারার। তাদের অন্তর রাসূলে আকরাম (সা)-এর ওপর আক্রোশ বারুদের মতো পূর্ণ ছিল। মাত্র একটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গের অপেক্ষায় ছিল তারা। ঘোষণা শুনে তারা বলল, ‘মুহাম্মদ বাপের বেটায় ও ভাইয়ে-ভাইয়ে শত্রুতার সৃষ্টি করে দিয়েছে। আমরা এমন একটি ঘোষণারই অপেক্ষায় ছিলাম।
আবু সুফিয়ানের এই ঘোষণা সকলের মনে আবার ঐক্যের বন্ধন দৃঢ় করল। তারা জোরেশোরে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে লাগলো। একজন বিজ্ঞ ইহুদিকে বাছাই করা হলো এ খবর নিয়ে মদীনায় যাওয়ার জন্য। তাকে বলা হলো, এ খবর দেয়ার পর নবী করীম কী উত্তর দেয় তাও তুমি শুনে আসবে।
খালিদের মনে আছে, সেদিন তার মনে প্রশান্তি ও আনন্দ ফিরে এসেছিল। কুরাইশ সরদারদের মনেও সেনাপতি ও নেতৃত্বের ব্যাপারে যে অনাস্থার ভাব সৃষ্টি হচ্ছিল তা দূর হয়ে গিয়েছিল। খালিদ মনে মনে সঙ্কল্প নিয়ে ফেলেছিল, রাসূল করীমকে সে নিজের হাতে হত্যা করবে।
ইহুদি দূত মদীনা থেকে উত্তর নিয়ে ফিরে এলো। রাসূল করীম (সা) নির্দিষ্ট সময়ে আবু সুফিয়ান ও তার বাহিনীর জন্য বদর প্রান্তরে অপেক্ষায় থাকবেন বলে জানিয়েছেন। যুদ্ধের সময় ঠিক করা হয়েছে ৬২৬ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে।
অন্যান্য বছর শীতকালে এই সময় যেমন বৃষ্টিপাত হয় এ মৌসুমে তেমন বৃষ্টিপাত হলো না। ফলে মওসুমটা প্রায় শুষ্কই কেটে গেল। মার্চ মাসে গরম এত বেশি পড়লো যে বেদুঈনদের পক্ষেও তা সহ্য করা কঠিন ছিল। আবু সুফিয়ান এ আবহাওয়া ও পরিবেশকে যুদ্ধের উপযোগী মনে করতে পারল না। সে যুদ্ধ যাত্রার ব্যাপারে টালবাহানা করতে লাগল।
এতে খালিদ যারপরনাই লজ্জা অনুভব করলো। আবু সুফিয়ান গরমের ছুতো তুলে যুদ্ধকে পিছিয়ে নিতে চাইল। প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক ইবনে সায়াদ লিখেছেন, আবু সুফিয়ান কুরাইশ সরদারদের ডেকে বলল, যুদ্ধাভিযান চালানোর আগে মুসলমানদের ভীত সন্ত্রস্ত করে তোলা দরকার। এ ব্যাপারে ইহুদিদের সহযোগিতা নেয়া যেতে পারে।
এরপর এক ইহুদিকে বিশেষ মূল্য দিয়ে বণিকের বেশে মদীনায় পাঠানো হলো। তাকে বলা হলো, মদীনায় গিয়ে তুমি এই গুজব ছড়াবে যে, কুরাইশরা এত অধিক সংখ্যক সৈন্য নিয়ে এবার বদরের দিকে যাত্রা করছে যে, মুসলমানরা আগে কখনো এত অধিক সৈন্য একত্রে দেখেনি।
ইহুদি যথাসময়ে গিয়ে মদীনায় পৌঁছল এবং ঠিক মতই এ গুজব ছড়িয়ে দিল। মদীনাবাসীরা এ গুজব সত্য বলে বিশ্বাস করলো। কিন্তু মুসলমানরা এতে ভীত হলো কিনা ঠিক বুঝা গেল না, তবে মদীনায় একটা থমথমে ভাব সৃষ্টি হল। রাসূল (সা)ও এ খবর শুনলেন। তিনি বুঝতে পারলেন খবরটি মুসলমানদেরকে দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। রাসুল (সা) সাহাবীদের সমবেত করলেন। বললেন, ‘আল্লাহর নামে জীবন-পণকারী মুজাহিদবৃন্দ, কুরাইশরা সংখ্যায় অনেক বেশি হবে, শুধু এইটুকু কথা শুনে তোমরা কি ভয় পেয়ে গেছ? একমাত্র আল্লাহকে ভয় করার শিক্ষা যারা পেয়েছে, মূর্তিপূজারীদের আধিক্য দেখে তারা কি ভয় পেতে পারে? যদি তোমরা কুরাইশদের ভয় পেয়ে থাক আর যুদ্ধের আহবান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে চাও, তবে শুনে রাখো, যিনি সর্বশক্তিমান, যিনি আমাকে রিসালাতের দায়িত্ব দিয়েছেন সেই আল্লাহর কসম! বদরের ময়দানে কুরাইশদের মোকাবেলা করতে আমি একাই যাবো।’ রাসুলে আকরাম (সা) আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু সাহাবীরা তাকবির ধ্বনি দিয়ে আসমান জমিন কাঁপিয়ে তুললো। গুজবের রেশও কোথাও রইল না। রাসুলে করিমের ক্ষুদ্র এ ভাষণের ফলে মদীনার মাটি থেকে গুজবের প্রভাব একবারে উধাও হয়ে গেল। মুসলমানরা ব্যস্ত হয়ে উঠলো যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে। যুদ্ধাভিযানের সময় মুসলমানদের সংখ্যা পৌঁছলো দেড় হাজারে, তার মধ্যে পঞ্চাশ জন অশ্বারোহী।
ইহুদি মক্কায় ফিরে এসে বললো, প্রথম দিকে গুজবের বেশ প্রভাব পড়েছিল মদীনায়। কিন্তু একদিন মুহাম্মদ মুসলমানদেরকে সমবেত করে মাত্র কয়েকটি কথা বললো, সাথে সাথে গুজবের সমস্ত প্রভাব মুছে গেল মদীনার বুক থেকে মুসলমানরা বদরে অভিযান চালানোর জন্য পূর্ণ উদ্যমে প্রস্তুতি নিতে শুরু করল। কয়েকদিনের মধ্যেই তাদের সংখ্যা প্রায় দেড় হাজারে পৌঁছে গেল। আমার মনে হয় যুদ্ধের সময় এ সংখ্যা আরো বাড়বে।
আর মদীনা যাওয়ার পথে এই ঘটনা মনে করে তার বড় লজ্জা হচ্ছিল। সে তখন মনে করছিল, আবু সুফিয়ান কোন না কোন কারণে মুসলমানদের সম্মুখীন হতে ভয় পায়। খালিদ যখন মুসলমানের সংখ্যার কথা শুনল তখন সে ভীত সন্ত্রস্ত আবু সুফিয়ানের কাছে গেল।
আবু সুফিয়ান! খালিদ তাকে বললো, সরদারের আদেশ মান্য করা আমার কর্তব্য। কিন্তু মুসলমানদের ভয় আপনার মধ্যে এমনভাবে ঢুকে গেছে যে, আপনি ঠিকমত আদেশ করতে পারবেন কিনা তাই সন্দেহ হচ্ছে। আমার মধ্যে কুরাইশদের শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা এতো বেশি যে, ভিতুদের সাথে আমি চলতে পারব কিনা জানি না। আপনি আপনার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের চেষ্টা করুন, নইলে আপনার আদেশের দিকে হয়ত লক্ষ্যই রাখতে পারব না।
‘তুমি কি শোননি আমি ইহুদিকে মদীনায় কেন পাঠিয়েছিলাম? আবু সুফিয়ান খালিদের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি মুসলমানদেরকে যুদ্ধের আগেই ভীত সন্ত্রস্ত করে তুলতে চেয়েছিলাম।
আবু সুফিয়ান! খালিদ ক্ষুব্ধকণ্ঠে বলল, যুদ্ধে পারদর্শীরা কখনও ভয় করে না। আপনি কি মুসলমানদেরকে সংখ্যায় অল্প কয়জন হওয়ার পরও বিপুল বাহিনীর মোকাবেলায় যুদ্ধ করতে দেখেনি? আপনি কি যোবায়ের ও জায়েদকে হত্যা করার সময়ও ইসলামের বিজয় ধ্বনি দিতে শোনেননি? আমি আপনাকে শুধু এ কথা বলতে এসেছি, আপনি আপনার নেতৃত্বের সম্মান রক্ষা করুন এবং অবিলম্বে বদরের অভিযানের ব্যবস্থা করুন।
পরদিন মক্কায় সংবাদ পৌঁছলো, মুসলমানরা মদীনা থেকে বদর প্রান্তরে এসে অবস্থান নিয়েছে। এ খবর শোনার পর আবু সুফিয়ানের পক্ষে যুদ্ধযাত্রার আদেশ না দিয়ে আর কোন উপায় রইল না। এবারের এ বাহিনীতে সৈন্যসংখ্যা দাঁড়াল দুই হাজার পদাতিক ও একশ অশ্বারোহী। প্রধান সেনাপতি আবু সফিয়ান, সহপ্রধান সেনাপতি খালিদ এবং উপপ্রধান সেনাপতি ছিল আকরামা ও সাফওয়ান। বরাবরের মতোই গায়িকা, নর্তকী, বাজনাদার আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা এবং তার সাথে উদ্দীপনাময় উচ্ছল তরুণী, রমণী ও দাস-দাসীরা সঙ্গে ছিল।
মুসলমানরা রাসূল আকরামের নেতৃত্বে ৪ঠা এপ্রিল ৬২৬ খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক পয়লা জিলকদ ৪ হিজরি সালে বদরের ময়দানে এসে পৌঁছেছিলেন।
কুরাইশরা যাত্রা করে আসফান নামক স্থানে পৌঁছার পর রাত নেমে এল। রাতে আর অগ্রসর না হয়ে তারা সেখানেই রাত কাটালো। পরদিন ভোর। বাহিনী বদরের দিকে যাত্রা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আবু সুফিয়ান সৈন্যদের একত্রিত করে তাদের সামনে এক ভাষণ দিল। ভাষণে আবু সুফিয়ান বলল, কুরাইশদের বীর জওয়ানরা! মুসলমানরা তোমাদেরকে বড় ভয় পায়। তাদের সঙ্গে আমাদের এবারে যুদ্ধ হবে মুসলমানদের সাথে আমাদের শেষ যুদ্ধ। এই মুষ্টিমেয় মুসলমানকে আমরা এবার নিশ্চিহ্ন করে দেব। না মুহাম্মদ এই মাটিতে থাকবে, না তার সমর্থকরা থাকবে। কিন্তু আমরা এমন এক অবস্থায় যুদ্ধ করতে যাচ্ছি, যে পরিবেশ আমাদের প্রতিকূল হতে পারে। যদি আমরা শত্রুদের উপর ঠিকমত আঘাত হানতে না পারি তবে তা আমাদের পরাজয়ের কারণও হতে পারে। তোমরা কি লক্ষ্য করেছ, আমরা পর্যাপ্ত খাদ্যশস্য সঙ্গে আনতে পারিনি? এখন খাদ্যশস্য সংগ্রহ করাও কঠিন। কারণ এখন শুষ্ক মওসুম, সারা দেশে দুর্ভিক্ষ বিরাজ করছে।
তাছাড়া এখনকার প্রচন্ড গরমের কথাও আমাদের মনে রাখতে হবে। আমি চাই না, আমার বীর সেনারা ক্ষুৎ-পিপাসায় মরে যাক। আমরা যেহেতু মুসলমানদের সাথে চূড়ান্ত লড়াইয়ে নামতে চাই, তাই আমি মনে করি আমাদের অনুকূল অবস্থার জন্য অপেক্ষা করা উচিত। এ জন্য আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমরা আর সামনে অগ্রসর হবো না। এখনকার মত আমরা এখান থেকেই মক্কা ফিরে যাবো।
খালিদের বেশ মনে আছে, কুরাইশ সৈন্যদের মাঝে এর দুই রকম প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। এক দল যুদ্ধের পক্ষে ধ্বনি দিচ্ছিল, তারা প্রতিকূল অবস্থায়ও মুসলমানের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য কৃতসংকল্প। আরেক দল ধ্বনি দিচ্ছিল আবু সুফিয়ানের সিদ্ধান্তের সপক্ষে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেনাপতির আদেশ সকলকেই মানতে হলো। খালিদ, আকরামা ও সাফওয়ান আবু সুফিয়ানের আদেশ মান্য করতে অস্বীকার করলো। কিন্তু আবু সুফিয়ান তাদের প্রতিবাদের দিকে কান দিল না।
এ তিনজন তাদের সঙ্গে কতজন থাকতে চায় তা পর্যবেক্ষণ করতে চাইল। কিন্তু তাদের এ পর্যবেক্ষণ তাদের বিপক্ষেই গেল। সেনাদলের অধিকাংশই আবু সফিয়ানের আদেশে মক্কা ফিরে চলল। বাধ্য হয়ে খালিদ ও তার সঙ্গীদেরও তাদের পিছু পিছু মক্কায় ফিরে আসতে হলো। সেদিনের সেই ফিরে যাওয়ার স্মৃতি খালিদের আজও স্পষ্ট মনে আছে। তারা কুরাইশ সেনাদলের পিছু পিছু মক্কায় ফিরে আসছে। লজ্জায় আকরামা, সাফোয়ানসহ সকলের মাথা নিচু। কেউ কারো দিকে চোখ তুলে তাকাতেও পারছিল না। খালেদের বারবার মনে হচ্ছিল, যুদ্ধে যদি তার একটি পা কাটা পড়তো, একটি বাহু ছিন্ন হয়ে যেত বা তার চোখ অন্ধ হয়ে যেত, তবুও সে এত দুঃখ পেত না। সে সময় তার এমনও মনে হচ্ছিল, যেন সে মরে গেছে আর তার লাশ ঘোড়ার ওপর তুলে মক্কায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মুসলমানদের নবীকে হত্যা করার তার পরিকল্পনা ও প্রতিজ্ঞা পূর্ণ না করেই সে ফিরে যাচ্ছে। এই কথা তার মনকে তখন বিচ্ছুর মত দংশন করছিল।
আজ তার অনেক কথাই মনে পড়ছে। স্মৃতির এক রেকর্ড যেন অনবরত মনের পর্দায় বেজে চলে, যার কোন শেষ নেই, থামার কোন নাম নেই। ইহুদিদের তিনটি গোত্র, বনু নাজির, বনু কোরায়জা ও বনু কায়েনতার কথা মনে পড়ল তার। যখন তারা দেখলো কুরাইশরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াই না করেই ফিরে আসছে তখন তাদের মাথা গরম হয়ে গেল।
তারা কুরাইশদেরকে এমনভাবে তিরস্কৃত করতে লাগল, যেন মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুরাইশরা উত্তেজিত হয়ে ওঠে। কিন্তু কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান এসব উস্কানিতে একটুও কান দিল না। খালিদ আজো ভেবে পায় না, আবু সুফিয়ানের মনে কী ছিল, কেন সে মুসলমানদের সঙ্গে লড়াই করতে এতো ভয় পেয়েছিল।
সেই বছরই শীতের মওসুমের শুরুতে খায়বারের কিছু বিশিষ্ট ইহুদি মক্কায় গেল। বানু নাজির গোত্রের সরদার হাইয়া বিন আফতাব ছিল এদের দল নেতা। ইহুদিদের সাথে ছিল ধন সম্পদ ও বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ। তারা কুরাইশ সরদার আবু সুফিয়ান ও অন্যান্য সরদারদের জন্য মোটা অঙ্কের উপঢৌকন নিয়ে এসেছিল। এ ছাড়াও তাদের সঙ্গে ছিল সুন্দরী যুবতী, নর্তকী ও গায়িকা। মক্কাতে এরা আবু সুফিয়ানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করল। তার হাতে তুলে দিল বিপুল উপঢৌকন সামগ্রী। রাতের অধিবেশনে আহারাদির পর শুরু হলো নাচ ও গানের আসর। অনুষ্ঠানে খালিদ, আকরামা ও সাফোয়ানও উপস্থিত। আলোচনা পর্বে হাইয়া বিন আফতাব বলল, ‘যদি আপনারা মুসলমানদের শেষ না করেন এবং তাদের অগ্রগতিতে বাধা না দেন তবে তারা অচিরেই ইয়ামামা পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। যদি তারা ঐভাবে সফল হয় তবে কুরাইশদের জন্য এই বাণিজ্যপথ চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে। বাহরাইন ও ইরাকের সাথে যোগাযোগের এই গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাটির নিয়ন্ত্রণ ভার মুসলমানদের হাতে চলে গেলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে কুরাইশ সম্প্রদায়। কারণ আপনাদের আয় রোজগারের সিংহভাগ আসে এই পথ দিয়ে। এই পথ দখল করা আর আপনাদের শাহরগে তলোয়ার ধরা এক কথা। হাইয়া বিন আফতাব আরো বলল, ‘যদি আপনারা আমাদের সঙ্গে থাকেন তবে আমরা মুুসলমানদের বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লাগতে পারি। আমরা এবার ষড়যন্ত্রের এমন জাল বিছাতে চাই যা ছিঁড়ে বেরিয়ে আসার সাধ্য তাদের হবে না।
আমরা মুসলমানদের সংখ্যায় দ্বিগুণ ছিলাম, তবুও তাদের পরাজিত করতে পারিনি। আবু সুফিয়ান বলল, এদের সঙ্গে তিনগুণ শক্তি নিয়ে লড়লেও তাদের পরাজিত করা যাবে না। তবে যদি আরও কিছু গোত্র ও সম্প্রদায় আমাদের সাথে মিলিত হয়, তাহলে আমরা মুসলমানদের চিরতরে শেষ করতে পারব।
আমি এ ব্যবস্থা আগেই করে রেখেছি। হাইয়া বিন আফতাব বললো, ‘গাতফান ও বনু আসাদ সম্প্রদায় আপনাদের সঙ্গে থাকতে রাজি হয়েছে। আরও কয়েকটি গোত্রকে দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করছি। আশা করি তারাও আপনাদের সঙ্গে থাকবে।’
তিন চার বছর আগেকার সেই কলঙ্কিত কাহিনী খালিদের আজো পরিষ্কার মনে আছে। আবু সুফিয়ানের ভিতু ভিতু চেহারাটা এখনো যেন দেখতে পাচ্ছে সে। খালিদ জানতো, ইহুদিরা কেন কুরাইশ সম্প্রদায়কে মুসলমানদের বিরুদ্ধে উস্কে দিচ্ছে। ইহুদিদের ধর্ম ইসলামের সাথে প্রতিযোগিতায় আজ অতি বিপদের সম্মুখীন। কিন্তু তারা নিজেরা এর মোকাবেলা করতে পারছে না। তাই তারা আবু সুফিয়ানকে এমন একটি নকশা দেখাচ্ছে, যাতে মনে হয় মুসলমানদের ধ্বংস করা তেমন কোন কঠিন কাজ নয়। এ জন্য তারা যে ব্যবস্থা নিচ্ছে তাতে মুসলমানদের ধ্বংস সময়ের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু তারপরও খালিদ, আকরামা ও সাফোয়ান বিন উমাইয়া দেখলো আবু সুফিয়ান আগের মতই ভীত শঙ্কিত। তার যেন আর মাথা তোলার ক্ষমতা নেই।
আবু সুফিয়ানের নীরবতা অসহ্য হয়ে উঠলে কথা বলল খালিদ, আমি আপনাকে আমাদের সরদার হিসাবে মান্য করি। কিন্তু এটা না বলে পারছি না যে, আপনি একজন কাপুরুষ! যদি মুসলমানরা খারাপ আবহাওয়া এবং দুর্ভিক্ষের সময় যুদ্ধ করতে পারে তবে আমাদের বাধা কোথায়? আমরাও যুুদ্ধ করতে পারতাম!’
‘আপনি মিথ্যা বলে আমাদের ধোঁকা দিয়েছেন।’ শোনা গেল আকরামার উষ্ণ কণ্ঠ।
আবু সুফিয়ান কাপুরুষÑ সে আমাদের পুরো সম্প্রদায়ের মাথায় কাপুরুষের কলঙ্ক লাগিয়ে দিয়েছে। এখন মুহাম্মদের শিষ্যরা আমাদের মাথায় চড়ে বসবে।
এভাবে আবু সুফিয়ানকে তিরস্কার করতে করতে রাগে বৈঠক ছেড়ে বেরিয়ে এল ওরা। এখন মক্কায় অলিতে গলিতে এসব কথা গুঞ্জরিত হচ্ছে। এটাও ছিল ইহুদিদের আরেক ষড়যন্ত্র। যেন আবু সুফিয়ান না চাইলেও কুরাইশ সম্প্রদায় তাদের লজ্জা ও অপমানের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য পাগলপারা হয়ে ওঠে। ফলে অবস্থা এমন খারাপ হয়ে উঠল যে, আবু সুফিয়ানের পক্ষে বাড়ির বাইরে যাওয়াই কঠিন হয়ে গেল।

(চলবে)

SHARE

Leave a Reply