Home গল্প দাদীর হাতের পায়েস পিঠা

দাদীর হাতের পায়েস পিঠা

দেলোয়ার হোসেন

ছেলের জিদ দেখে মা একটু রেগেই বললেন, গ্রামে যাবো না এ-কথাতো আমি বলিনি। আমি বলেছি, গ্রামে এখন প্রচন্ড শীত।
মায়ের কথায় সামি একটু কাঁদো কাঁদো হয়ে হাত-পা ছুড়ে বললো, আমার সমাপনী পরীক্ষা তো শেষ, এখন আমি দাদার বাড়িতে কেন যাবো না। এরপর হাইস্কুলে ভর্তি হলে আর কি আমি যেতে পারবো? দাদীকে কতদিন দেখিনি বলতো!
আচ্ছা বাবা ঠিক আছে। তোমার আব্বু এসে যে সিদ্ধান্ত নেবে- তাই হবে।
আব্বু তো যাবেই- তুমিও যাবে। মজার-মজার শীতের পিঠা কেমন করে তৈরি করতে হয়, তা তুমি জানো না। এবার গিয়ে দাদীর কাছ থেকে তুমি শিখে আসবে।
ছেলের কথা শুনে মা হেসে ফেললেন। তিনি হাতের কাজ রেখে এগিয়ে এলেন ছেলের সামনে। মিষ্টি মুখে বললেন, এই ছেলে, তোমার দাদীই সব পারে? মা কি কিছুই পারে না?
মা তুমি নুডুল্স খুব ভালো রান্না করো কিন্তু কুলসি, ভাপা, চিতই আর খেজুরের রসের পায়েস করতে কি পারো?
মা ছেলের কথা শুনে চুপ করে গেলেন। তার পর বললেন, সামি- শীতের পিঠার মজাই গ্রামে, সে মজা শহরে পাওয়া যায় না। জ্বালানো খেজুরের রসের পায়েস আর কাঁচা রসের ক্ষীর একবার যে খেয়েছে- সে কখনো ভুলতে পারে না। ছোটবেলা গ্রামে আমিও খেয়েছি। অবশ্য তোমার দাদীর হাতের পায়েস সত্যি ভালো।
তো পরদিন থেকেই গ্রামে যাওয়ার জন্য গোছগাছ শুরু হয়ে গেলো। সামির আব্বু শামিম সাহেব বললেন, তোমরা কেন এতো ঝামেলা বাড়াচ্ছো? পৌষ মাসের শীতের ছোঁয়া যদি আমাদের শরীরে নাই লাগলো, তা’হলে গ্রামে যাওয়া কেন? রাই, সরিষার হলুদ ফুলে মাঠ ভরে থাকে, শিশির ভেজা সেই ফুলের মায়ায় গাঁয়ের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা পাগলের মতো ছুটে যায় মাঠে। শিশিরের ছোঁয়ায় ভিজে যায় তাদের সারা শরীর। সেই ভেজা শরীরে লেগে থাকে হলুদ ফুলের পাপড়ি। খুশিতে আত্মহারা হয় ওরা। শীতকে ওরা কেয়ারই করে না। আমরা দু’তিন দিন থাকবো। বেশি জামা-কাপড় নেয়ার কী দরকার। ভোরবেলা গ্রামে আজানের সুর কানে আসতেই ঘুম ভেঙে যায় মানুষের। প্রতিটি বাড়ির ঘরের পাশেই নানান জাতের গাছপালা। শুরু হয় পাখিদের কলতান। বিছানা থেকে উঠে পড়ে সবাই। কেউ ছোটে মাঠের দিকে- আবার কেউ কেউ বাড়িতেই লেগে যায় সংসারেরর কাজে। ছোটরা দাদা-দাদীর সঙ্গে লেপের নিচে শুয়ে মুখস্থ ছড়া-কবিতা আবৃত্তি করে।
আমি হবো সকাল বেলার পাখি
সবার আগে কুসুম বাগে উঠবো আমি ডাকি।
আমরা যদি না জাগি মা- কেমনে সকাল হবে
তোমার ছেলে উঠলে মাগো- রাত পোহাবে তবে।
একটু বড়রা বাড়ির আঙিনায় খড়কুটা জ্বেলে আগুন পোহায়। জ্বলন্ত চুলার চারপাশে বসে অনেকেই আবার গরম-গরম চিতই পিঠা, ভাপা পিঠা খায়। গ্রামের মানুষ মন থেকে যেন শীতকে বরণ করে নেয়। পৌষ, মাঘের দিন ফুরালে শীতের মজাটাও শেষ হয়ে যায়, তখন সবাই ভাবে আহা শীতের দিনগুলো কতই না ভালো ছিলো। তবে গ্রামে গরিব ঘরের ছেলেমেয়েদের খুব কষ্টে রাত কাটে, দিন আসে।
শীতে ঠোঁট ফেটে রক্ত বের হয়ে যায় ওদের। খালি পায়ে ছুটোছুটি করে শরীরটা একটু গরম করে। ঋতু-বৈচিত্র্যের সত্যিকারের রূপ ফুটে ওঠে গ্রামেই।
সামির মা বললেন, এমন বেশি কিছু তো নিচ্ছি না। শুধু দুটো কম্বল আর ব্যবহারের দু’ চারটি জামা-কাপড়। তিনজনের তিনটা ব্যাগ, আর এই পলিথিনের মধ্যে দুটো কম্বল, আর আম্মার জন্য পুরনো দুটো শাল। সামি বললো, আমার স্কুল ব্যাগটাও আমি নিয়ে যাবো কিন্তু। বাবা বললেন, তুমি নিতে পারলে নেবে। তবে পড়ার সময় পাবে না।
পরদিন সকাল সাতটার বাস ধরে বেলা দুটোর মধ্যে সামিরা গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে গেলো। বাড়িতে সামির এক চাচা থাকেন। দাদী থাকেন আলাদা একটি ঘরে। ঘরটা পাকা, লম্বা বারান্দা, সাজানো-গোছানো তিনটি রুম। ছোট-বড় দু’জন কাজের মেয়ে থাকে তাঁর সঙ্গে।
দাদী তার চামড়া কুঁচ্্কানো হাতে সামির মুখটা ধরে বললেন, দাদাভাই, এতদিন পর আমার কথা তোমার মনে পড়লো? সামি সে কথার উত্তর না দিয়ে বললো, দাদী আমি কিন্তু তোমার হাতের পায়েস খাওয়ার জন্য এসেছি, তা ছাড়াও শীতের পিঠা তো খাবোই। তারপর সামি দাদীর কানের কাছে মুখ নিয়ে চুপি-চুপি বললো, দাদী তুমি এবার আম্মাকে কুল্সি পিঠা বানানো শিখিয়ে দেবে। আম্মা কিচ্ছু পারে না, শুধু নুডুল্স আর সেমাই রান্না করতে পারে।
দাদী হাসত-হাসতে বললেন, তোমার মা শিখে কী করবে? খেজুরের রস ছাড়া সেকি পিঠা-পায়েস তৈরি করতে পারবে? তার চেয়ে বলো, তুমি কী কী পিঠা খেতে চাও?
সব পিঠা। দাদী আব্বু বলেছেন, তুমি নাকি কাঁচা রসের ক্ষীর পাকাতে পারো?
কাঁচা রসের ক্ষীর তুমি খেতে চাও?
চা-ই তো।
সেই ক্ষীর খেলে এই বুড়িটাকে ছেড়ে তোমার আর ঢাকা যেতে ইচ্ছে করবে না।
কিন্তু… আমাকে যে ঢাকায় ফিরতেই হবে। আমার রেজাল্ট হবে, তারপর হাইস্কুলে ভর্তি হতে হবে, তখন তো অনেক পড়ালেখা। এখানে বেশি দেরি করা যাবে না। তুমি বড় এক হাঁড়ি পায়েস রেঁধে দিও আমি ঢাকা নিয়ে ফ্রিজে রেখে প্রতিদিন খাবো।
এর মধ্যেই শামিম সাহেব এসে বললেন, দাদীর সাথে কী গল্প হচ্ছে? মা, তোমার হাতের কুল্সি পিঠা খাওয়ার জন্য তোমার নাতি অস্থির হয়ে উঠেছে। মা বললেন, সকালেই গরম ভাপা পিঠা সবাই খেতে পারবে। চালের গুঁড়ি করাই আছে। সামেলা আর ময়নার মাকে বলে রেখেছি ওরাই সব করবে। আমি শুধু দেখিয়ে দেবো।
শামিম সাহেব বললেন, মা বিকালে কি বাজারে আগের মতো মাছ পাওয়া যায়? সেই যে বড় বড় সিঁদুরে কৈ। শীতের সকালে কৈ মাছের তরকারির মজাই আলাদা।
এত ব্যস্ত হওয়ার কী আছে, মাছ পাওয়া যাবে সকালে। হাটবারে তুই যা- কিনতে চাস সবই পাবি।
পরদিন পাখির ডাকা-ডাকিতে সবার ঘুম ভাঙলো। উঠানে এসে সবাই তো অবাক। বাইরে একচালার নিচে ভাপা পিঠা তৈরি হচ্ছে। সামির দাদী মোড়া পেতে বসে আছেন চুলার পাশে। দেখেই ছুটে গেলো সামি।
দাদী পিঠা বানানো হয়েছে?
এই তো হচ্ছে, তোমরা হাত-মুখ ধুয়ে এসো।
সামি কলতলা হাত-মুখ ধুতে গিয়ে চেঁচিয়ে বললো, দাদী পানি ঠান্ডা কেন? দাদী বললেন, কিচ্ছু হবে না। গামছায় ভেজা হাত-মুখ মুছে ফেললেই শীত চলে যাবে। সামি চোখে-মুখে একটু পানি ছিটিয়ে দ্রুত এসে বসলো চুলার পাড়ে। দাদী বললেন, বারান্দায় গিয়ে পাটিতে বসো, সামেলা প্লেটে গরম পিঠা দিয়ে আসবে।
সামি গরম পিঠা খেতে খেতে বললো, দাদী কাল কী পিঠা হবে?
কাল কেন, রাতেই কুল্সি পিঠা খেতে পারবে। পরশু দিন রসে ভেজানো চিতই পিঠা খাবে। তারপর হাতে কাটা সেমাই, তার পরদিন …
দাদী আমরা কি অনেকদিন থাকবো?
অনেকদিন পর এসেছো- তাই অনেকদিন থাকতে হবে।
সামির মা বললেন, আমরা চলে যাবো আমাদের অফিস আছে। আপনার নাতিকে আপনি রেখে দিন। দাদী বললেন, আমার নাতিকে আমি দুধ-কদু খাওয়াবো, পাটিসাপটা পিটা খাওয়াবো, বড় বড় লাল কৈ মাছ খাওয়াবো তারপর যেতে দেবো।
সকালে উঠেই শামিম সাহেব  গেছেন গ্রামের বাজারে, ফিরে এলেন একগাদা পাঁচ মিশালি মাছ নিয়ে। তার মধ্যে বড় একটা শৈল মাছও রয়েছে। সামির আম্মা লাফানো শৈল মাছ দেখে দারুণ খুশি। তিনি বললেন, আম্মা কচি লাউ দিয়ে শৈল মাছ আমি নিজে রান্না করবো। শহরে যে লাউ পাওয়া যায় তা- এমনই শক্ত যে রান্না করার পরও মুখে তোলা যায় না। কেমন যেনো দড়কচা হয়ে থাকে। শামিম সাহেব বললেন আম্মা, আগে সোনাগাছি হাঁড়ি-হাঁড়ি রস দিয়ে যেতো- এখন কি আমাদের গাছ কাটে না? পুরনো ভিটায় এখন তো অনেক খেজুর গাছ। আজ কাটবে, কাল সকালে রস দিয়ে যাবে। ভাগের ভাগ তিন হাঁড়ি রস হয়। সামেলা আর ময়নার মা জ্বাল দিয়ে গুর তৈরি করে, কোনদিন পাটালি বানায়। ঘরে পাটালি আছে- মুড়ি দিয়ে খাবি?
না মা, এখন পিঠা খাই- বিকেলে মুড়ি আর পাটালি খাওয়া যাবে।
তোর ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরে ঘুরে গ্রামটা দেখা। হুজুরের মাজারটা জিয়ারত করে আসবি।
আচ্ছা যাবো।
এর মধ্যেই কুয়াশা কেটে সূর্যটা উঠে এসেছে বেশ উপরে। হঠাৎ সামির মা বললেন, আম্মা সামিকে তো দেখছি না- গেলো কোথায়? দাদী বললেন, মওলার ছেলে রবির সাথে কথা বলতে দেখলাম, তারপর যে কোথায় গেছে জানি না। মনে হয় রবির সাথে হানু নদীর দিকে যেতে পারে। নদীর ওপর ব্রিজ হয়েছে, সকাল-বিকাল ছেলেমেয়েরা ওখানে যায়। অনেকে বর্শি দিয়ে মাছও ধরে। এ কথা শুনে শামিম সাহেব হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলেন ব্রিজের ওপর কিন্তু সেখানে সামি নেই। ফিরে আসার সময় সোনাগাছিকে দেখলেন রসের হাঁড়ি নিয়ে যাচ্ছে। তিনি বললেন, সোনাভাই কেমন আছো?
ভালো। কবে আসলা?
গতকাল। তুমি রস নিয়ে কোথায় যাচ্ছো?
বাজারে। ওখানে গেলেই বিক্রি হয়ে যাবে। তোমাদের গাছ আজ কাটবো, কাল বাড়িতে রস দিয়ে আসবো।
এ হাঁড়িটা আমাদের বাড়িতে নিয়ে চলো। আমার ছেলে সামিকে নিয়ে এসেছি- ‘ও’ কাঁচা রস খাবে।
তাই চলো, আমারও সময় বাঁচবে।
রস নিয়ে বাড়ির ওপর যেতেই সামির আম্মা বললেন, তোমার ছেলেকে পেয়েছো?
না- তাকে তো ব্রিজের ওপর পেলাম না।
সামির দাদী বললেন, চিন্তা করিসনে চলে আসবে।
ঠিক তখনই তিন চারটি সমবয়সী ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে উঠানে এসে দাঁড়ালো সামি। সবারই খালি পা।
জামা-কাপড়ে তখনও লেগে আছে সরিষা ফুলের হলুদ পাপড়ি। ওদের দেখে সবাই হাঁ করে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকলো, তারপর শামিম সাহেব বললেন, সকাল থেকে এতক্ষণ কোথায় ছিলে? আর এদেরই বা কোথায় পেলে? সামি বললো, মাঠে গিয়েছিলাম। আব্বু সরিষা ফুলের মধ্যে দৌড়ালাম। এরাও আমার সঙ্গে ছিলো, তাই এদের নিয়ে এলাম। বাবা বললেন, বেশ করেছো। এবার হাত-পা ধুয়ে জামা-কাপড় পাল্টে নাও। সামি কিছু না বলে ঘরে চলে গেলো। ফিরে এলো অনেকগুলো জামা-কাপড় নিয়ে। ছেলেগুলোর হাতে একটা শার্ট ও একটা প্যান্ট দিয়ে বললো, গোসল করে এগুলো পরে বিকেলে এখানে এসো। সন্ধ্যায় আমার দাদীর হাতের কুলসি পিঠা খাবে মনে থাকে যেনো। খুশিতে ভরে উঠলো ছেলেদের মুখ। আচ্ছা বলে ওরা চলে গেলো।
সামির মা বললেন, এ কাপড়গুলো তুমি কখন এনেছিলে? আমি তো কিছুই জানি না।
তুমি কি রাগ করেছো আম্মু?
না, আমি খুব খুশি হয়েছি। তোমার তো পুরনো অনেক কাপড়, আরও কিছু নিয়ে আসতে। গ্রামে গরিব ছেলেদের দিতে পারতে- ওরা খুশি হতো।
আমার ছোট্ট ব্যাগে আর ধরলো না যে।
মা মনে মনে ভাবলেন, আমার তো কত শাড়ি পড়ে আছে। সেগুলো তো কখনো পরা-ই হয় না। কিন্তু আমার তো একবারও মনে হলো না- কিছু শাড়ি নিয়ে আসার কথা। আমি কিছু মনে করবো বলে ছেলেটা আমাকেও কিছু বলেনি। এতো বড় ভাবনা ওর ছোট মাথায় কেমন করে এলো!
শামিম সাহেব তার মাকে বললেন, মা- তোমার নাতির কান্ড দেখলে? যে কাজ তোমার ছেলের করা উচিত ছিলো- সে কাজটা তোমার নাতি করলো। তোমার নাতির কাছে আমরা ছোট হয়ে গেলাম। দাদী তার ভিজে উঠা চোখ দুটো মুছে বললেন, আমি দোয়া করি- আমার সামি যেনো অনেক বড় হয়। একদিন সারা গ্রামের গরিব দুঃখীদের দুঃখ যেনো ও মোচন করতে পারে।

SHARE

Leave a Reply