Home উপন্যাস পোড়োবাড়ি রহস্য

পোড়োবাড়ি রহস্য

এনায়েত রসুল

[প্রথম পর্ব]

আমরা দু’জনা
আমার মন ভালো নেই।
আগে কখনো এমন সমস্যায় পড়িনি। কী করে যে মানুষের মন খারাপ হয়, তা জানা ছিলো না আমার। কিন্তু ক’দিন থেকে কী যে হয়েছে, কিছুই ভালো লাগছে না!
মামণির ধারণা, পরীক্ষার সময় একটু বেশি খাটা-খাটুনি গেছে বলেই শরীরটা খারাপ হয়েছে। নুটু কাকু বলেন, ওটা আসল কথা নয়। আসল কথা হলো এবার পরীক্ষায় নির্ঘাত আমি ফেল করবো। সেই টেনশনের কারণেই কিছু ভালো লাগছে না আমার।
আমার কথা জানিয়ে মামণি চিঠি লিখেছিলেন বাপিকে। তার জবাবে বাপি লিখেছেন, মানুষের শরীরটা হলো যন্ত্রের মতো। যন্ত্র যেমন খারাপ হয়, যখন-তখন বিগড়ে যায়Ñ মানুষের শরীরও তেমনি মাঝেমধ্যে বিগড়ে যায়। আমারও তাই হয়েছে। দুদিন রেস্ট নিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। দুষ্টুমি না করে রেস্ট নেয়া উচিত আমার।
মজার ব্যাপার হলো, মামণি, বাপি আর নুটু কাকুর ধারণা যে একেবারেই ভুল, বারবার বলেও আমি তা বোঝাতে পারছি না! যতোবারই বলছি আমার শরীর খারাপ হয়নি, আসলে নাফিসের জন্যই মন খারাপ লাগছেÑ ততোবারই কথাটা হেসে উড়িয়ে দিচ্ছেন তারা। তাদের ধারণা, নাফিসের জন্য মন খারাপ হতেই পারে না! কিন্তু ইচ্ছে করে তো আর মন খারাপ করিনি! নিজের অজান্তেই মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। আর হবেই বা না কেন? ফাইনাল পরীক্ষার পরপরই নাফিস গ্রামের বাড়ি চলে গেছে। সুতরাং মন খারাপ তো একটু হতেই পারে।
নাফিস আমার বন্ধুÑ সবচে প্রিয় বন্ধু। ওকে ছাড়া একদন্ডও কাটে না আমার। একই ক্লাসে পড়ি দু’জনা। ক্লাসে বসি পাশাপাশি গায়ে গা লাগিয়ে। টিফিন পিরিয়ডে হুটোপুটি করে বেড়াই সারাটা স্কুলে। তারপর ঢংঢং করে যখন ছুটির ঘণ্টা বাজে, সারা পথ দুষ্টুমি করতে করতে নাফিস চলে আসে আমাদের বাড়ি। আমরা মিলেমিশে গল্প করি, স্কুলের পড়া নিয়ে আলোচনা করি আর সাইকেল নিয়ে সারাটা শহর ঘুরে বেড়াই। এভাবেই কেটে যায় আমাদের দিন। সেই নাফিস ঢাকা নেই। মন ভালো থাকার উপায় আছে?

নাফিসের চিঠি
শীতের দুপুর। এ সময়টাতে অবশ্য ঝিরঝিরে বাতাস বইবার কথা। অথচ বাইরে ঝাঁঝাঁ রোদ্দুর। আমাদের নারকেল গাছে বসে কাকগুলো কা কা করে ডেকে চলেছে। মাঝেমধ্যে পাড়া কাঁপিয়ে ছুটে যাচ্ছে ইট আর বালু বোঝাই ট্রাক। এসব শব্দ একেবারেই ভালো লাগে না। আমি তাই ড্রইংরুমে বসে কম্পিউটারে গেম খেলছি। এমন সময় মামণি এসে পাশে দাঁড়ালেন।
কম্পিউটারের মনিটরে চোখ রেখেই আমি বললাম, কী ব্যাপার মামণি? কিছু বলবে?
মামণি বললেন, এমনিতেই তোমার শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। এমন ভরদুপুরে কম্পিউটার নিয়ে বসেছো কেন? যাও বাবা, ঘুমিয়ে থাকোগে। বিকেলে খেলা কোরো।
বললাম, কেমন করে ঘুমোবো, মা? দুপুরে যে ঘুম আসতেই চায় না!
মামণি বললেন, দুপুরে যে ঘুম আসে না, সে আমি জানি। তবুও শুয়ে থাকোগে। দেখবে এক সময় ঠিকই ঘুম এসে যাবে।
আমি জানতাম, মামণি যতোই বলুন ঘুম আমার আসবে না। তবুও কম্পিউটার অফ করে ধীরে ধীরে গিয়ে ড্রইংরুমের ডিভানটাতে শুলাম। তারপর চোখ বন্ধ করে ভেবে চললাম এলোমেলো অনেক কথা।
এভাবে কতোটা সময় কেটেছে জানি না। আচমকা খটখট করে বন্ধ দরজার কড়াটা বেজে উঠলো। পরক্ষণেই ভেসে এলো এক তীক্ষèকণ্ঠÑ বাসায় আছো নাকি তন্ময় ভাইয়া?
মাঝদুপুরে হেঁড়ে গলার চিৎকার শুনে ভীষণ রাগ হলো। ধড়ফড় করে উঠে গিয়ে দরজাটা খুলতেই দেখি ডাকপিওন দাঁড়িয়ে আছে। পান খাওয়া মুখে মিটিমিটি হাসছে সে।
আমি বললাম, কেমন আছেন তোফায়েল ভাই? ব্যাপার কী বলুন তো? চিঠি আছে নাকি?
হাতে ধরে রাখা একগাদা চিঠির ভেতর থেকে একটি ইনভেলাপ বেছে নিয়ে তোফায়েল পিওন বললো, চিঠি না থাকলে কি আর শুধু শুধু বন্ধ দরজায় খটখটিয়েছি? চিঠি আছে। এই নাও চিঠিÑ একেবারে তোমার চিঠি।
আমার নামে একেবারেই যে কোনো চিঠি আসে না তা নয়। মাঝেমধ্যে আমার নামেও চিঠি আসে। তবে সে সব চিঠি আসে ইউরোপিয়ান কান্ট্রি নয়তো আমেরিকা থেকে। ডলি ফুপি চিঠি লিখেন এসেক্স থেকে। নাসিম কাকু লিখেন টেক্সাস থেকে। ইদানীং বাপি লিখছেন ইতালির রোম থেকে। গত মাসে ভয়েস অব আমেরিকা থেকেও একটা চিঠি এসেছিলো আমার নামে। কিন্তু এ চিঠিটা এসেছে এ দেশেরই কোনো এক প্রান্ত থেকে। ব্যাপারটা শুধু নতুনই নয়, একেবারেই অপ্রত্যাশিত আমার কাছে। তাই তীব্র কৌতূহল নিয়ে আমি প্রেরকের নামের দিকে তাকালাম। আর সেখানে তাকাতেই রীতিমতো চমকে উঠলামÑ আরে, এ যে নাফিসের চিঠি! দুর্গাপুর থেকে নাফিস চিঠি লিখেছে।
প্রবল উত্তেজনায় বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো। তাই ঘরে ঢুকে ডিভানে গা এলিয়ে দিয়ে পড়তে লাগলাম সেই চিঠি। নাফিস লিখেছে :

দুর্গাপুর
১৭.১২.৯০
সুপ্রিয় তন্ময়,
মনে হচ্ছে কতোদিন ধরে তোর সাথে দেখা নেই! তা, আছিস্ কেমন?
আমার চাচাতো ভাইকে আমি ছোড়দা বলে ডাকি। শিক্ষাসচিবের সাথে দেখা করার জন্য ঢাকা এসেছিলেন তিনি। ফেরার সময় জোর করে আমাকে দুর্গাপুর নিয়ে এসেছেন। ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও তাই তোকে বলে আসতে পারিনি। রাগ করবি জানি। তবে তোর রাগ যে ভেঙে যাবেÑ তাও জানি।
সত্যি কথা কি জানিস? গত সাতটি দিন সারাক্ষণ শুধু তোকে চিঠি লেখার কথা ভেবেছি। কিন্তু কেন যে লেখা হয়ে ওঠেনিÑ নিজেও তা জানি না। আসলে আমাকে পেয়ে এখানকার সবাই যেনো আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছে। ওরাই কেড়ে নিয়েছে আমার সারাটা সময়। লিখবো কখন, বল্?
আজ একটা মজার খবর জানাবো। ছোড়দার কথা তো বলেছিই তোকে। সেই ছোড়দা জানালেন, আসছে তেইশ ডিসেম্বর রাতে এখানকার আদিবাসী গারোরা অদ্ভুত সব উৎসবের আয়োজন করবে। লাংগোপ্পা গারো আর মাজং হাজং ভূত তাড়ানো নৃত্য দেখাবে। বিথাউজং নামে এক বুড়ো সাপুড়ের কাছে নাকি আগুনমুখো সাপ রয়েছে! সে সেই সাপের খেলা দেখাবে। উপজাতীয় মেয়েরা বাঁশনৃত্য দেখাবে। ছোড়দা কথা দিয়েছেন আমাকে সে সব দেখাতে নিয়ে যাবেন। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে তোকে ছাড়া সেই উৎসব দেখার আনন্দটাই মাটি হয়ে যাবে। তাই বলছি, চিঠি পেয়েই দুর্গাপুর চলে আসিস। দেরি করিস না একটুও।
এর মাঝে রোম থেকে আঙ্কেলের চিঠি পেয়েছিস? আন্টিকে আমার সালাম জানাস্। নন্দিতার জন্য চমৎকার একটা জিনিস কিনেছি। এখন বলবো নাÑ ঢাকা আসার সময় নিয়ে আসবো। ওকে আমার স্নেহাশিস দিস্।
শুভেচ্ছান্তে
তোর আদরের নাফিস

বি. দ্র. আমি কিন্তু তোর জন্য দুর্গাপুর বাজারে অপেক্ষা করবো। আসার সময় সম্ভব হলে তোর রুবিক কিউবটা নিয়ে আসিস।
নাফিসের চিঠি কেমন এলোমেলো চিন্তার মাঝে ফেলে দিলো আমাকে। বিশ্বসাহিত্যের ওপর গবেষণা করার জন্য বাপি রোম গেছেন। মামণিই এখন গৃহকর্ত্রীÑ আর সেখানেই হচ্ছে আমার সমস্যা। কারণ, যে কোনো ব্যাপারে বাপিকে যতো সহজে রাজি করানো যায়Ñ মামণিকে যায় না। তা ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপারে বাপির চেয়ে মামণি আরো বেশি সাবধানী! তাই ভাবছি, দুর্গাপুর যাবার ব্যাপারে মামণিকে রাজি করাতে পারবো তো? আর মামণি রাজি হলেও সমস্যা বাধবে নন্দিতা আর নুটু কাকুকে নিয়ে।
কি যে অবাক কান্ড! আমার কোথাও যাওয়া হচ্ছে শুনলেই চেঁচিয়ে সারা বাড়ি মাথায় তোলে নন্দিতা! নুটু কাকু চেঁচান না সত্যি, তবে তার ব্যাপারটা আরো বেশি অসহ্য মনে হয় আমার কাছে। আমি কোনো কাজ করতে যাচ্ছি শুনলেই উল্টোপাল্টা কথা বলে তিনি সবার মন বিগড়ে দেন। অটল পাহাড়ের মতো সামনে এসে দাঁড়ান তিনি। সুখের কথা, আজ তিন দিন ধরে নুটু কাকু বাসায় নেই। মাঝেমধ্যেই এমন হুট করে কোথায় যেনো চলে যান তিনিÑ কাউকে বলে যান না তার গন্তব্যের কথা। আর ফিরে আসার পর নন্দিতা বা আমি যদি জানতে চাই তিনি কোথায় গিয়েছিলেনÑ অমনি গম্ভীর কণ্ঠে বলেন, জেনে তোমাদের কী লাভ? কারো ব্যক্তিগত ব্যাপারে নাক গলানো সভ্যতা নয়। কথাটা মনে রাখবে আশা করি।
আজ একুশ তারিখ। যদি দুর্গাপুর যেতে হয় তবে কালকের ট্রেনেই যেতে হবে। হাতে সময় নেই একরত্তি। তাই ভীষণ রিস্ক নিয়ে ব্যাগের ভেতর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আর ডলি ফুপির দেয়া রুবিক কিউবটা ভরে ফেললাম।
মামণি এসবের কিছুই জানেন না! আর মামণির অনুমতি ছাড়া যে এক পা-ও নড়তে পারবো নাÑ সে কথাটিও জানা আছে আমার।

হঠাৎ নুটু কাকু
কথায় বলে, যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই রাত হয়। আমার বেলায়ও হলো তাই! মামণিকে সালাম করে যেইমাত্র রিকশায় উঠতে যাবো, অমনি আরেকটি রিকশা এসে দাঁড়ালো আমার পেছনে। অবাক চোখে চেয়ে দেখি, নুটু কাকু রিকশার ভাড়া গুনছেন।
আমি কোথাও একা যাবো, কোনো কাজ একা করবোÑ নুটু কাকুর যেনো তা পছন্দই হয় না! শুধু কি তাই? সব সময় তিনি চেষ্টা করেন আমার মেজাজটাকে বিগড়ে দিতে। তাই এমন অসময়ে নুটু কাকুকে দেখে মনে মনে শুধু আল্লাহকে ডাকতে লাগলাম। কিন্তু তবুও শেষ রক্ষা হলো না। রিকশা থেকে নামতেই তার দৃষ্টি পড়লো আমার ওপর।
আমাকে রিকশায় উঠতে দেখে নুটু কাকু এমনভাবে তাকালেন যে, যেনো রিকশায় ওঠার কোনো অধিকারই নেই আমার!
নুটু কাকুর চাউনি দেখে ঘাবড়ে গিয়ে বললাম, কি নুটু কাকু? কিছু বলবে?
আমার কথা শুনে চোখ পাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন নুটু কাকুÑ বলবো আর কি? জানতে চাইছি এমন ফুলবাবু সেজে কোথায় যাওয়া হচ্ছে?
নুটু কাকুর মেজাজ দেখে আমার পিলে চমকে যাবার মতো অবস্থা হলো। করুণ চোখে আমি তাকালাম মামণির দিকে। তারপর ভয়ে ভয়ে বললাম, দুর্গাপুর যাচ্ছি নাফিসদের বাড়িতে। মামণি পারমিশন দিয়েছেন।
কাঁধটাকে সামান্য ঝাঁকুনি দিয়ে নুটু কাকু বললেন, পারমিশন পেয়ে গেছো? তাহলে তো বিশ্ব জয় করেই ফেলেছো। আমি আর কি বলবো। দুর্গাপুর কি একেবারে না গেলেই নয়?
আমি কি জবাব দেবো ভাবছি, এমন সময় মামণি বললেন, তন্ময়কে আমিই বেড়িয়ে আসতে বলেছি। স্কুলে লম্বা ছুটি চলছেÑ ওদিকে নাফিসটাও দুর্গাপুর চলে গেছে। তাই ভাবলাম, একবার ঘুরে আসুক দেশটা। দেখে আসুক গ্রাম আর গ্রামীণ জীবন।
মামণির কথা শুনে ব্যঙ্গ ঝরে পড়লো নুটু কাকুর কণ্ঠেÑ গ্রামীণ জীবন দেখে আসবে ভালো কথা। কিন্তু বাছাধন যদি হুট করে হারিয়ে যায়, তখন তো আবার এই অধমকেই মাতৃভূমি চষে বদমাশটাকে খুঁজে বেড়াতে হবে। সেই কষ্টের কথাটা ভেবে আমি পেরেশান হয়ে যাচ্ছি।
নুটু কাকুর মুখে অমন ভবিষ্যদ্বাণী শুনে মামণি বিরক্ত হলেন। মামণি বললেন, ওসব অলক্ষুণে কথা ভেবে তোমাকে পেরেশান হতে হবে না। আল্লাহর ওপর ভরসা করেই আমি ওকে ছাড়ছিÑ তিনিই আবার ওকে ফিরিয়ে দেবেন। সে বিশ্বাস আমার আছে।
একটু থেমে মামণি বললেন, যাও তন্মায়। আল্লাহর নাম নিয়ে রিকশায় ওঠো। সাবধানে থেকো। সব সময় আল্লাহকে স্মরণে রেখো। আর দু-একদিনের বেশি দেরি কোরো না। তাহলে ভীষণ চিন্তায় পড়বো।
এবার নির্ভয়ে আমি মামণিকে বললাম, আমার জন্য চিন্তা কোরো না। সব সময় আমি সাবধানেই থাকবো। আর গারোদের উৎসবটা শেষ হলেই ফিরে আসবোÑ তুমি দেখে নিও।
মা আর নুটু কাকুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রিকশায় উঠে বসলাম। রিকশা এগিয়ে চললো ধীরে ধীরে। মোড়ের আড়ালে চলে যাবার আগেই ঘুরে তাকালাম পেছনে। অমনি চোখে পড়লো মামণিকে। গেটের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। কতোক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে থাকবেন কে জানে?

সুদূরের যাত্রী
স্টেশনে নেমে অনেক চেষ্টার পর প্রথম শ্রেণীর একটা কামরায় রিজারভেশন পেলামÑ তাও আবার অপর এক যাত্রীর সাথে শেয়ারে।
ট্রেন ছাড়ার দু-এক মিনিট আগে নির্দিষ্ট কামরায় পা রাখতেই চোখে পড়লো সেই সহযাত্রীকে। ভদ্রলোক একমনে বই পড়ছেন।
সহযাত্রী হিসেবে একজন বয়স্ক ভদ্রলোককে মেনে নিতে মনের ভেতর কিছুটা দ্বিধা থাকলেও কয়েক মিনিটের আলাপেই ভীষণ আপন মনে হলো তাকে।
ভদ্রলোকের নাম ডক্টর নিপু। ইউনিভারসিটি অব গ্ল্যাসগোর প্রাক্তন অধ্যাপক এবং মানবকল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ বিজ্ঞানী। বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় পারদর্শী তিনি।
নিজের সম্পর্কে জানাতে গিয়ে ডক্টর নিপু জানালেন, ঊনিশশো আটচল্লিশ সালে একটি নতুন ধারণার ওপর প্রবন্ধ লিখে সারা বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। সে বছরই স্কলারশিপ নিয়ে ইংল্যান্ডে যান।
ডক্টর নিপু চাইছিলেন প্ল্যান্ট সেল আর এনিমেল সেলের মাঝে সংযোগ ঘটিয়ে একটি নতুন ধরনের সেল উদ্ভাবন করতেÑ যার নাম হবে প্ল্যান্টিমেল সেল। ওটার সাহায্যে মানুষ মাটি এবং সৌরশক্তি থেকে তার খাবার সংগ্রহ করতে পারবেÑ অনেকটা উদ্ভিদের মতো। কিন্তু সেই যুগান্তকারী সেলটি আবিষ্কৃত হবার ঠিক আগ মুহূর্তে এক অবাঞ্ছিত ঘটনা ঘটে যায়। ডক্টর নিকিতা তুশো নামে এক জাপানি বিজ্ঞানী গবেষণার নাম করে ডক্টর নিপুকে জাপানের হোক্কাইডোতে নিয়ে যান। তারপর ডক্টর তুশো তাকে তার নিজস্ব সাবমেরিনে বন্দী করে রাখেন। সেখানে আটকে রেখে তার ইচ্ছে মতো ভিন্ন এক বিষয় নিয়ে গবেষণা করতে বাধ্য করেন ডক্টর নিপুকে।
ডক্টর নিকিতা তুশো ছিলেন উচ্চাভিলাষী মানবতাবিরোধী এক বিজ্ঞানী। কিন্তু শয়তান তুশোর জঘন্য পরিকল্পনা সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিলো না ডক্টর নিপুর। তাই সরল মনে নিজেকে সেই গবেষণার কাজে নিয়োজিত করেন। নিরলস পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে এক সময় গবেষণায় সফলও হোন তিনি। কিন্তু ঠিক সে সময় ডক্টর তুশোর পরিকল্পনা তার কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়। তিনি জানতে পারেন, ডক্টর তুশো চাইছেন ডক্টর নিপুর আবিষ্কৃত এসপিপিÑ থ্রি নামের বিশেষ এক ধরনের ইনসুলিন প্রয়োগ করে মানবজাতির আকৃতি বদলে দিতে। যা বাস্তবায়িত হলে এ পৃথিবীতে মারাত্মক বিপর্যয় নেমে আসবেÑ মানুষের আকৃতি হবে এক থেকে দেড় ফুটের মাঝে!
ডক্টর নিপু ডক্টর তুশোর পরিকল্পনার কথা খুলে বলেন তার সহকর্মীদের কাছে। তারা সিদ্ধান্ত নেন যেভাবেই হোক তুশোর সাবমেরিন থেকে পালিয়ে যাবেন।
এভাবে অনেক চেষ্টার পর একদিন ডক্টর নিপু অন্যান্য বন্দীদের নিয়ে মানবতাবিরোধী তুশোর কবল থেকে পালিয়ে আসতে সক্ষম হোন। তারপর দেশে এসে আবার নিজেকে সেই প্ল্যান্টিমেল সেল উদ্ভাবনের কাজে নিয়োজিত করেন। কিন্তু নানা কারণে সে ব্যাপারে আর সফল হননি তিনি। তবে এ প্রৌঢ় বয়সে থেমেও থাকেননি ডক্টর নিপু। এখনো তিনি নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন কল্যাণকর কিছু না কিছু আবিষ্কারের জন্য।
সারারাত ধরে ট্রেন ছুটে চললো আর সারারাত ডক্টর নিপু দেশ-বিদেশের গল্প শুনিয়ে গেলেন। কেমন করে ঝড়ের রাতে এস্কিমো কিশোররা মাছ শিকার করে, কেমন করে জাপানি ছেলেমেয়েরা ঘুড়ির সুতোয় ঝুলে থেকে আকাশে উড়ে বেড়ায়Ñ সে সব গল্প।
আমি বললাম, আপনি এতো সব জেনেছেন কেমন করে?
ডক্টর নিপু বললেন, বয়স হয়েছে। দেখেছি অনেক কিছুÑ শিখেছি তার সামান্যই। কিছু কিছু জেনেছি দেশ-বিদেশে ভ্রমণ করেÑ কিছু জেনেছি বইপত্র পড়ে। বড়ো হলে তুমিও অনেক কিছু জানতে পারবে। এই যেমন ধরো বিগ বেন ঘড়ির কথা। লন্ডনের ওয়েস্টমিনিস্টার ক্লক টাওয়ারে বসানো রয়েছে বিশাল আকৃতির একটি ঘড়ি। বিগ বেন নামের সেই ঘড়ির ঘণ্টার ওজন সাড়ে তেরো টন। মিনিটের কাঁটার দৈর্ঘ্য বারো ফুট আর ঘণ্টাটির কাঁটাটির দৈর্ঘ্য সাত ফুট! ১৮৫৮ সাল থেকে আজ অবধি লন্ডনবাসীদের সঠিক সময় জানিয়ে যাচ্ছে সেই ঘড়ি।
আমি তো অবাকÑ কি বলছেন আপনি? দেড়শো বছরের পুরনো ঘড়ি এখনো ঠিক ঠিক সময় দিয়ে যাচ্ছেÑ সত্যি তো নিপু কাকু?
ডক্টর নিপু বললেন, অবশ্যই সত্যি। আরো শুনবে? আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ায় ডিজনিল্যান্ড নামে এক আশ্চর্য রকম সুন্দর জায়গা আছে। ওয়াল্ট ডিজনি নামে এক চিত্রশিল্পী ১৯৫৫ সালে গড়ে তোলেন সেই স্বপ্নরাজ্য। আড়াইশো একর জমির ওপর গড়ে তোলা সেই স্বপ্নরাজ্যে অফুরন্ত আনন্দ বিতরণের জন্য রয়েছে চোখ জুড়ানো ফুলের বাগান, চিড়িয়াখানা, যান্ত্রিক মেরি গো রাউন্ড, বিদ্যুৎচালিত রেলগাড়ি, মোটরগাড়ি। আরো রয়েছে নীল পানিতে ভেসে থাকা অপূর্ব সব স্টিমার। ভোঁ ভোঁ সিটি বাজিয়ে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে সারাটা  হ্রদ ঘুরে বেড়ায় সেগুলো। তারপর আবার ফিরে আসে টার্মিনাল।
: দারুণ ব্যাপার তো! এতো কিছু আছে সেখানে?
ডক্টর নিপু বললেন, শুধু কি তাই? ডিজনিল্যান্ডে রয়েছে অস্ত্র সজ্জিত সামরিক যান, কামান-বন্দুক, বোমারুবিমান। আছে ট্যাংক, মাইন সুইপার আর খুদে সাবমেরিন।
: খুদে সাবমেরিন! কেন, সাবমেরিন দিয়ে কী হয়?
জানতে চাইলাম আমি। ডক্টর নিপু বললেন, সামরিক যান আর সাবমেরিন রাখা হয়েছে ছোটদের মনে বীরত্বভাব জাগিয়ে তোলার জন্যÑ আনন্দদানের জন্য। ছোটরা ইচ্ছে করলেই এগুলোতে চড়ে ঘুরে বেড়াতে পারে। অথবা সাবমেরিনে চড়ে অক্টোপাস আর হাঙরের ঝাঁক দেখে আসতে পারে! ইচ্ছে করলে কৃত্রিম যুদ্ধের মহড়াতেও অংশগ্রহণ করতে পারে তারা। কোনো বাধা নেই কারো জন্য। এক কথায়Ñ ডিজনিল্যান্ড ছোটদের জন্য এক অপূর্ব পৃথিবী। সারা পৃথিবীতে যার জুড়ি মেলা ভার।
: শুধু কি ইংল্যান্ড আর আমেরিকাতেই রয়েছে ওগুলো? আমাদের দেশে দেখার মতো কিছু নেই?
আমার কথা শুনে চকচক করে উঠলো ডক্টর নিপুর চোখ দুটো। তিনি বললেন, কে বলেছে নেই? নিশ্চয়ই আছে। বরং বলতে পারো বিস্ময়কর আর অলৌকিক জিনিসপত্র ওসব দেশের চেয়ে অনেকগুণ বেশিই রয়েছে আমাদের দেশে।
একটু থেমে কি যেনো ভাবলেন ডক্টর নিপু। তারপর বললেন, জানো তো, পৃথিবীতে এমন অনেক ঘটনাই ঘটে, বুদ্ধি এবং যুক্তি দিয়ে যার কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। আজ থেকে আড়াইশো বছর আগে তেমনি একটি অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটেছিলো ভারতের মাদ্রাজে। যা আজও সবার মাঝে বিস্ময়ের কারণ হয়ে আছে।
মাদ্রাজের ভিনোকুন্ডা পাহাড়ের পাদদেশে হিন্দুদের একটি দেবমন্দির রয়েছে। ১৭৫০ সালের কোনো একদিন হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দ করে সেই পাহাড়ের উপর থেকে বিশাল একটি পাথরখন্ড প্রচন্ড গতিতে নেমে আসতে থাকে। পাথরটি এমন শব্দ করে আসতে থাকে যে, সেই শব্দ শুনে উপস্থিত সবাই ঘাবড়ে যায়। দর্শনার্থী আর পুরোহিতরা দল বেঁধে ছুটে পালায় নিরাপদ দূরত্বে। সবাই ভাবে, পাথরটির আঘাতে নিশ্চয়ই সেই দেবমন্দিরটি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। কিন্তু অবাককান্ড কি জানো? ষাট টন ওজনের সেই পাথরটি আচমকা যেমন নেমে এসেছিলোÑ আচমকাই তেমনি মন্দিরের ছাদ থেকে মাত্র দুই ইঞ্চি দূরত্বে এসে থেমে যায়। হালকা পালকের মতো ভাসতে থাকে ওটাÑ মন্দিরের গায়ে ছোঁয়াটি পর্যন্ত না লাগিয়ে।
নিউটন প্রবর্তিত মাধ্যাকর্ষণ সূত্র যদি মেনে নিই, তবে তো পাথরটির বেলা মাটির ওপর আছড়ে পড়াটাই স্বাভাবিক ছিলো। অথচ তা হয়নি! কোন্ এক দুর্বোধ্য কারণে ষাট টন ওজনের সেই পাথরটি ভেসে রয়েছে। এ ব্যাপারটি আজও মানুষকে অবাক করছে আড়াইশো বছর ধরে।
: অবিশ্বাস্য ব্যাপার তো!
: অবিশ্বাস্য তো বটেই। আরো শুনবে? ভারতের রাজস্থানে সম্বর নামে একটি  হ্রদ রয়েছে। সেই  হ্রদের বিশেষত্ব হলো, বছরের আট মাস  হ্রদের পানি থাকে লবণাক্তÑ বাকি চার মাস পানির স্বাদ হয় সুমিষ্ট।
সম্বর  হ্রদের আয়তন আশি বর্গমাইল। এখান থেকে বছরে দু হাজার টন লবণ সংগ্রহ করা হয়। অক্টোবর থেকে মে মাস পর্যন্ত চলে লবণ সংগ্রহের কাজÑ জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এককণা লবণও তোলা যায় না সম্বরের পানি থেকে। কারণ এ সময়টা সম্বরের পানি হয়ে যায় সুমিষ্ট। শতাব্দীর পর শতাব্দীর ধরে চলে আসছে প্রকৃতির এই রহস্যময় খেলা।
এবার বলছি এশিয়ার অন্য দেশ চীনের কথা। চীনের নিংপো অঞ্চলে জুয়ো নামে একটি অদ্ভুত জলপ্রপাত রয়েছে। সুপ্রাচীন কাল থেকে সেই জলপ্রপাতটি বিশ্ববাসীর কাছে চরম বিস্ময় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছে।
: কেন?
: বলছি।
সে বিস্ময়ের কারণ হলো, জুয়োর পানি পাঁচশো ফুট নিচের দিকে সবেগে ধাবিত হলেও তা কখনো মাটিতে এসে পড়ে নাÑ এমনকি একটি ফোঁটাও না। আর তাই জুয়ো জলপ্রপাতের নিচের মাটি সব সময় খটখটে শুকনো থাকে! পৃথিবীতে তো কতো জলপ্রপাতই রয়েছে, কিন্তু জুয়ো জলপ্রপাতের মতো অমন অলৌকিক জলপ্রপাত আর একটিও নেই। আপন বৈশিষ্ট্যে ওটা অদ্বিতীয়।
একটানা কথাগুলো বলে একটু থামলেন ডক্টর নিপু। তারপর বললেন, বুঝলে তন্ময়! আরো কতো কি যে ছড়িয়ে রয়েছে এ পৃথিবীতেÑ যা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করবে না।
আমি এসব কিছুই জানতাম না। তাই ডক্টর নিপুর কথা শুনে কেমন অবাক হয়ে গেলাম। উনি বললেন, অপূর্ব এ পৃথিবী। তবে পৃথিবীকে জানার আগে নিজের দেশকে জানতে হবেÑ দেশের মানুষের সাথে মিশতে হবে। এই যে তুমি দুর্গাপুর যাচ্ছো, দুই চোখ খুলে দেখে আসবে ওখানকার সবকিছু। আসলে জন্মভূমিকে না জানলে পৃথিবীকে জানা যায় না। এ কথাটি সব সময় মনে রাখবে।
(চলবে)

SHARE

Leave a Reply