Home সায়েন্স ফিকশন এডমিরালের বিস্ময়

এডমিরালের বিস্ময়

মহিউদ্দিন আকবর#

এক.
না, না। এটা অসম্ভব! এটা কী করে হয়?
নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছি না। নাকি আবার জেগে জেগেই স্বপ্ন দেখছি!
না, না। স্বপ্ন দেখবো কেমন করে। আমি তো বাইনাকুলারে চোখ রেখে ডেস্ট্রয়ারের গানপয়েন্টে দাঁড়িয়ে আছি।
সুপ্রিম কমান্ডের ক্ষমতাটাও আমার হাতে। পুরো ইউনিটকে জিরো টলারেন্স আদেশের আওতায় ডিউটিতে রেখেছি। প্রতিটি মুহূর্তের জন্য দুর্ধর্ষ সেনা এবং অফিসাররা অ্যাটেনশন। আমিও তার বাইরে নই। আমার মাথার ওপর এতো বড় দায়িত্ব! এ নিয়ে আর জেগে জেগে ঘুমের কথা ভাবতে পারি! স্বপ্ন দেখা তো দূরেই থাক। যদিও মিলিটারি নিয়ম মানতে গিয়ে আমাকেও একটা সময় করে রুটিন ঘুমে যেতেই হয়। তবে এখন তো আর ঘুমের মাঝে নেই। ডেস্ট্রয়ারের গানপয়েন্টে সর্বোচ্চ অ্যালার্ট! স্বপ্ন দেখার প্রশ্নই আসে না।
গল্পের নায়কের মত গায়ে চিমটি কেটে দেখারও প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। বাইনাকুলারের লেন্সের সামনে যতদূর দৃশ্যমান ততদূর পর্যন্ত কেবল রাশি রাশি সমুদ্র সফেন। দেখে মনে হয়, অবারিত জলধির প্রান্তরেখা মিশে গেছে আকাশের কার্নিশে। সে এক মোহনীয় দৃশ্য! যেখানে সাগরের প্রান্ত বা অপর পাড় বলে আর কিছুই চোখে পড়ছে না। দিক চিহ্নহীন এই প্রান্ত বলয়। সামনে পেছনে ডানে অথবা বামে কেবলই নোনা দরিয়া। জাহাজের নিচেও পানি আর পানি। মাথার উপরের দিকে চোখ মেলে দিলে দৃষ্টিসীমার মাঝে সীমাহীন আসমান।
তাহলে হঠাৎ সাগরের মাঝে অমন বিশালকায় নাকটা জাগালো কে? আবার দেখতে না দেখতেই টুপ করে ডুবেও গেলো! অথচ ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না- জিনিসটি যে কী। আমার বাইনাকুলারের লেন্স ফাঁকি দিয়ে একটা কাকপক্ষিও পালিয়ে গেছে তেমন পরাজয়ের ইতিহাস তো আমার  প্রোফাইলে নেই। এই নেভাল জীবনে অনেক অনেকবার তিমি, হাঙর এমনকি শত্র“দের সাবমেরিনেরও মুখোমুখি হয়েছি। প্রত্যেকটি জিনিসের আকৃতি এবং গতিপ্রকৃতি আমার মুখস্থ। এরই মাঝে বিগত বছরগুলোতে আমাদের ডেসট্রয়ারকে লক্ষ করে শত্র“দের টর্পেডোও ছুটে এসেছে দু-চারটা। ওদের টার্গেট এড়িয়ে গেছি দৃঢ়তা আর কৌশলের সাথে। তা ছাড়া টর্পেডো তো আর বুমেরাং নয়। টর্পেডো কেবল সামনেই বাড়তে জানে। ফিরে কিংবা পালিয়ে তো যেতে পারে না। হ্যাঁ, তিমি, হাঙর বা সাবমেরিন বেগতিক অবস্থা দেখলে পালিয়ে যেতে পারে। কিন্তু একটু আগে যেটা দেখতে পেলাম, তা এ তিন-চার জিনিসের একটাও না। এ দেখছি মহা চিন্তাতেই পড়া গেলো….।
নিজেদের ডেস্ট্রয়ার থেকে প্রায় তিনশ’ নটিক্যাল মাইল দূরে হঠাৎ বিশালকায় একটা বস্তুকে ডুবে যেতে দেখে দুঃসাহসী সেনানায়ক রিয়ার এডমিরাল মাসরুর আরমান বেশ চিন্তি হয়ে পড়েছেন। তবে এর একটা শেষ না দেখে হাল ছাড়ার পাত্রটি তিনি নন। বছরখানেক আগে গভীর রাতে এমনি একটি বস্তু নিজেদের নেভাল ইউনিটের দিকে নিঃশব্দে ধেয়ে আসতে দেখেছিলেন। কিন্তু সেটাকে আর আগে বাড়তে দেননি। এন্টি-এয়ারক্রাফট গানের এক গোলাতে সেটাকে ঘায়েল করে সাগরে ফেলেছিলেন এডমিরাল মাসরুর। পরে সকাল হতে দেখা গেলো, সেটা সাগরের পানিতে ভাসছে। বস্তুটা তেমন কিছু নয়। শত্র“পক্ষের একটা পর্যবেক্ষণ ড্রোন মাত্র। তার নির্দেশে দু’জন নৌকমান্ডো সি-ট্রাক ছুটিয়ে ড্রোনটার কাছে চলে গিয়েছিলেন। তারা ড্রোনের ডানায় যে মনোগ্রাম দেখতে পেয়েছেন, তার অডিও স্ন্যাভ এবং ভিডিও ফুটেজ তুলে এনেছেন।
কিন্তু আজকের বস্তুটি উড়ন্ত নয়। এমনকি উড়াল থেকে সাগরে পড়েছে বলেও মনে হয়নি। ওটা সাগর থেকেই বিশালকায় নাকটা জাগিয়েছিলো মাত্র। তাও অজ্ঞাত ও অপরিচিত হবার কারণেই রিয়ার এডমিরাল মাসরুর আরমানের যত ভাবনা। তবে সতর্কতা হিসেবে তিনি পুরো নৌবহরকে কমপক্ষে সমুদ্রসীমানার পঞ্চাশ নটিক্যাল মাইল পিছিয়ে আসার নির্দেশ দিলেন। আর দু’জন ফ্লাইট-পাইলটকে আত্মঘাতী ডাইভে যাবার জন্য প্রস্তুত থাকতে বললেন। নিজেও একজন চৌকস কো-পাইলট নিয়ে একটা স্কাইহক প্রস্তুত রাখলেন। তারপর রাডার রুমে এসে ক্রুদের সাথে নিম্নস্বরে কিসব পরামর্শ করে বেরিয়ে এলেন ব্রিজে।
ওদিকে হেলিকপ্টার এবং বোমারু ইউনিটের বিমানবাহী ফ্রিগেট ‘বাংলার রুস্তম’কেও সর্বোচ্চ সতর্ক করে রাখলেন।
দুই.
রিয়ার এডমিরাল মাসরুর আরমানের নির্দেশে দুই দিন যাবৎ রাডারগুলো নিজেদের সমুদ্রসীমানাই কেবল নয়, সাগরের আকাশসীমানাকেও সমানতালে চষে বেড়াচ্ছে। প্রতি মুহূর্তের ইন্টেসিটিগ্রাফ থেকে প্রাপ্ত ডাটাকে কনভার্ট করে প্রতি ঘণ্টার জন্য একটা করে থ্রিডি জিপ ফাইলে প্রিজার্ভ করা হচ্ছে। কিন্তু আকাশ বা সমুদ্রসীমায় কোনরকম রিমার্কেবল ইনফো ধরা পড়েনি।
এরই মধ্যে সাগরের শত্র“সীমানায় একটা ভয়ঙ্কর নিম্নচাপের সৃষ্টির কারণে গত ছয় ঘণ্টা যাবৎ সাগর বেশ উত্তাল হয়ে পড়েছে।  রিয়ার এডমিরাল মাসরুর আরমান তার নেভাল ইউনিটকে সিগন্যাল দেখে সতর্কতায় রেখেছেন।
পরের দিন বিকেল চারটা নাগাদ রেডিও বার্তায় জানা গেলো, নিম্নচাপটি একটি সমুদ্র উপকূলবর্তী প্রদেশের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং তা রাত তিনটার দিকে সে প্রদেশে আঘাত করতে পারে। তবে নিম্নচাপ যখন প্রচন্ড ঘূর্ণিঝড়ের রূপ নেবে তখন তার প্রভাবে এদেশের সমুদ্রসীমায় একটা টালমাটাল অবস্থারও সৃষ্টি হতে পারে। ব্যাপারটা প্রকৃতির একেবারে চিরকালের চরিত্র। তারপরও এডমিরাল মাসরুর তিল পরিমাণে সতর্কতার পরিবর্তন ঘটাননি।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে সাগর অস্বাভাবিক উত্তাল হয়ে উঠেছে। অন্য দিনের তুলনায় বৃষ্টিপাতও হচ্ছে মুষলধারে। রাডারগুলো কিছুটা বিভ্রান্ত হবার দশা। ধীরে ধীরে রাত বাড়ছে। ঝড়ের মাত্রাও বাড়ছে। রাত কাঁটায় কাঁটায় বারোটার ঘরে পৌঁছতেই রাডারের লিংক-মনিটরে চোখ রাখা রিয়ার এডমিরাল মাসরুর আরমানের মুখটা হাঁ হয়ে গেলো। তিনি অবিশ্বাস্য চোখে দেখতে পেলেন, নেভাল ইউনিটের অবস্থান থেকে ঠিক একশ’ নটিক্যাল মাইল দূরে সাগরের বুকে তিনদিন আগের দেখা সেই বিশালকায় বস্তুটা সাগরের তলা থেকে উঠে সাগরের পানিতে ভাসমান লেবেলে দাঁড়িয়েছে। তবে তিনি সেদিন বস্তুটিকে যে আকারের মনে করেছিলেন তার থেকে বস্তুটি আসলে অনেক বড়। রাডার ক্রুর মাধ্যমে সাথে সাথে বস্তুটির গ্রাভিটি এবং আয়তন মেপে নিয়ে আরো চিন্তিত হয়ে পড়লেন। ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকানোর কারণে বিশাল জাহাজের আকারের কালো বস্তুটি ইন্টেনসিটিগ্রাফে এক্ষণি ধরা পড়ছে আবার অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।
বিজ্ঞ ক্রু রিপোর্ট করলেনÑ এটা আসলে অদৃশ্য হবার কোনো ঘটনা নয় স্যার। সাগরের প্রচন্ড ঢেউয়ের কারণে বস্তুটা সর্বক্ষণ ভেসে থাকতে পারছে না। হঠাৎ তলিয়ে যাচ্ছে আবার ভুস করে ভেসে উঠছে। আবার….
ক্রুর কথা শেষ হবার আগেই বস্তুটা উজ্জ্বল আলো ছড়িয়ে সাগর থেকে প্রায় পঞ্চাশ মিটার শূন্যে উঠে গেলো। তারপর নেভাল ইউনিটের দিকে এগিয়ে আসতে লাগলো। ব্যাপারটা দেখে রিয়ার এডমিরাল মাসরুর আরমান আতঙ্কিত হলেও সাহস হারালেন না। তিনি গভীরভাবে রাডারের রিডিং পর্যবেক্ষণে লেগে গেলেন। এক পর্যায় প্রায় চিৎকার করে বললেন- আরে এটা তো একটা উভচর ল্যাব বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু এটা কাদের ল্যাব? ও আমাদের দিকেইবা ধেয়ে আসছে কেন?
তিনি যেন নিজেকেই প্রশ্নটা করলেন। কিন্তু কারো কোনো জবাবের অপেক্ষা না করে বললেন- এক্ষণি ওর গতির রিডিং নিন।
বলতে দেরি কিন্তু কাজটা করতে দেরি করলেন না রাডারের ক্রু। তিনি ত্রিশ সেকেন্ডের মধ্যেই জানিয়ে দিলেন- ল্যাবটার গতি এই প্রচণ্ড ঝড়ের মধ্যেও তিনশ’ এনএমপিএইচ। অর্থাৎ তিনশ’ নটিক্যাল মাইল পার আওয়ার! এটা একটা ভয়াবহ গতি।
এক লাফে এডমিরাল মাসরুর আরমানের চোখ কপালে উঠে গেলো। তিনি আর কিছু ভাবতে পারছেন না। যদি ল্যাবটায় কোনো আর্টিলারি ব্যবস্থাপনা থেকে থাকে তাহলে আর রক্ষা নেই।
হতে পারে এটা শত্র“পক্ষেও ড্রোন খোয়ানোর প্রতিশোধ নিতেই এই প্রচণ্ড প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাঝে পাঠানো হয়েছে। যাতে আমাদের ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি করেও দুনিয়াকে, বিশেষ করে জাতিসংঘকে ফাঁকি দেয়া যায়। আমাদেরও উচিত ওকে ঘায়েল করে চিরদিনের জন্য বঙ্গোপসাগরে ডুবিয়ে দেয়া। যাতে ওর ধ্বংস হয়ে যাওয়া একটা টুকরোও কেউ কোনদিন খুঁজে না পায়।
যেমনি ভাবা তেমনি নির্দেশ। এন্টি-এয়ারক্র্যাফট, টর্পেডো, গানশিপ, বম্বার- প্রতিটি ইউনিটকে অ্যাটাকের জন্য অ্যালার্ট করে কেবল ক্ষণ গণনা শুরু করেলেন। কিন্তু অবাক কান্ড!
একেবারেই নিঃশব্দে ল্যাবটি টার্গেট সীমার মাঝে পৌঁছলেও এডমিরাল মাসরুরের নেভাল ইউনিট যেই না অ্যাটাক শুরু করেছে, অমনি ল্যাবটি তার গতি বাড়িয়ে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ঊর্ধ্বাকাশে উঠে গিয়ে এক সময় রাডারেরও দৃষ্টিসীমা পেরিয়ে গেলো। এডমিরাল বিস্ময়ভরা চোখে হাঁ করে রাডার-লিংকড কম্পিউটারের মনিটরের স্ক্রিনে তাকিয়ে রইলেন। স্ক্রিনে তখনও কেবলই ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ ঝড়োহাওয়া আর মুষলধারার বৃষ্টিপাতের মাঝে মাঝে প্রচন্ড বিদ্যুৎ চমকানোর দৃশ্য চলমান।

SHARE

Leave a Reply