Home প্রচ্ছদ রচনা বিজয় শুধুই আমাদের

বিজয় শুধুই আমাদের

 মাহবুবুল হক #

Kishorkanthaবিজয় কথাটার ভাবসাবই আলাদা। কেউ যদি বলে আমি জয় লাভ করেছি, তাতে আমাদের মনে যে ধরনের আবেদন সৃষ্টি হয়, তার চেয়ে অনেকগুণ আলোড়ন সৃষ্টি হয় যদি কেউ বলে আমি বিজয় লাভ করেছি। জয়ের চেয়ে বিজয় যেনো বড়। জয় যদি ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হয় তাহলে বিজয় হলো দেশ বা জাতির। অথচ দেখো, আমাদের অভিধানে আছে জয় মানে পরাভূত করা, দমন করা, শত্রু দমন, সাফল্য এবং যুদ্ধাদি দ্বারা অধিকার আদায় করা ইত্যাদি। আবার বিজয় এর অর্থ বলা আছে প্রতিপক্ষকে দমিত বা পরাজিত করা, জয়, জিত, প্রাধান্য ইত্যাদি। তবু আমরা জয় দিবস না বলে বলছি বিজয় দিবস। জয় দিবস বললে বোধ হয় মানাতো না, যেমন মানিয়েছে বিজয় দিবস বলে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী বাংলাদেশের মাটিতে আত্মসমর্পণ করেছে। তাদের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে আমরা বিজয় লাভ করেছি। ওরা কেন আত্মসমর্পণ করেছিলো? কারণ, আমাদের সাথে যুদ্ধে ওরা পেরে উঠছিল না। তারা দারুণভাবে হতাহত হচ্ছিলো। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের তারা পরাজিত করতে পারছিল না। যতই দিন গড়াচ্ছিল, ততই মুক্তিযোদ্ধাদের শক্তি বৃদ্ধি পাচ্ছিল। কারণটা সহজ। পাকিস্তানি হানাদাররা ছিলো বারো শ’ মাইল দূরের অধিবাসী। তারা বাংলাদেশকে চিনতো না, জানতো না। বাংলাদেশের আবহাওয়া, জলবায়ু, নদ-নদী, পাহাড়, বন, খাল-বিল কোনো কিছুই ওদের জন্য অনুকূলে ছিল না। তা ছাড়া আমাদের ওপর তারা একটা অন্যায় যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছিলো, ওরা ন্যায়ের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিলো আর আমরা অস্ত্র ধরতে বাধ্য হয়েছিলাম অন্যায়ের বিরুদ্ধে। আমাদের বুকে বল ছিলো, সাহস ছিলো, ওদের বুকে তা ছিল না। ওদের ছিল শুধু অস্ত্র আর ঘৃণা আর আমাদের ছিলো ঈমান, আল্লাহর ওপর ভরসা, সাহস, দেশের মাটি এবং দেশের ও সারা দুনিয়ার মানুষের দোয়া, ভালোবাসা ও সাহায্য। ৯ মাসব্যাপী ওরা শুধু হারছিলো দেশের আনাচে-কানাচে। অবশেষে ওরা অনুধাবন করেছিলো আর নয়, যুদ্ধ চালিয়ে গেলে সব সৈন্য মৃতদেহে পরিণত হবে। সে কারণে ওরা আত্মসমর্পণ করেছিলো।
ঘটনাটা আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে জড়িত। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ আমাদের স্বাধীনতা ঘোষিত হয়। এই ঘোষণাটা আসে অবশ্য হঠাৎ করে। স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম চলছিলো। সংগ্রামের চূড়ান্ত পর্যায়ে পশ্চিম পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দের সাথে পূর্ব পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দের আলাপ আলোচনা চলছিলো। আশা করা যাচ্ছিল ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা যেমন আলাপ আলোচনার মাধ্যমে এসেছিলো বাংলাদেশের স্বাধীনতাও তেমনিভাবে আসবে। কিন্তু সে আশায় গুড়েবালি ফেলে পাকিস্তানিরা হঠাৎ করে নিরীহ ও নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের ওপর অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো। রাতের অন্ধকারে ওরা আক্রমণ করেছিল। সে রাতটি ছিলো ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের রাত। ইতিহাসে এই রাতটি ‘কালো রাত’ হিসেবে চিহ্নিত। এই রাতে পাকিস্তানি সৈন্যরা হাজার হাজার মানুষ হত্যা করেছে। হত্যা করেছে নির্বিচারে। কেন হত্যা করেছিলো? কারণ, বাঙালিরা বাঁচার অধিকার চেয়েছিলো। পাকিস্তানিরা ভেবেছিলো এই জুলুম ও অত্যাচারের ফলে বাঙালিরা ভয় পেয়ে যাবে। স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে পিছে হটে যাবে, দূরে সরে যাবে। কিন্তু হলো উল্টোটি। রাতে বাঙালি রক্তাক্ত হলো এবং পরদিনই বাঙালি স্বাধীনতা ঘোষণা করে দিলো। স্বাধীনতার ঘোষণা এমনিতেই আসতো। রয়ে সয়ে দিন ক্ষণ ঠিক করে আসতো। তা আর হয়নি। হুট করেই আসলো। কারণ, ২৫ মার্চের ব্যাপক হত্যাকান্ডকে বাঙালি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি। সহ্য করেনি। প্রতিবাদস্বরূপ বাঙালি স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে।
স্বাধীনতার এই ঘোষণাকে পাকিস্তানিরা মেনে নিতে পারেনি।
তারা স্বাধীনতাকে ধুলায় লুণ্ঠিত করতে চেয়েছিলো। অঙ্কুরে বিনাশ করতে চেয়েছিলো, নস্যাৎ করতে চেয়েছিলো। ওদের ধারণা ছিলো আক্রমণ চালিয়ে গেলে বাঙালিরা আত্মসমর্পণ করবে। আন্দোলন ছেড়ে দেবে। ক্রমাগত হত্যা ও ধ্বংস দেখলে বাঙালিরা কাবু হয়ে যাবে। মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। সে কারণেই তারা হিং¯্র হায়েনার মতো নিরীহ বাঙালির ওপর আক্রমণ অব্যাহত রাখে। কিন্তু ফল হয়েছে উল্টো, বাঙালিরা নিরাশ বা হতাশ না হয়ে বরং মাথা উঁচু করে স্বাধীনতা রক্ষার জন্য লড়াই শুরু করে। এই যে লড়াই, এই যে যুদ্ধ এরই নাম মুক্তিযুদ্ধ।
মুক্তির জন্য যে যুদ্ধ তারই নাম মুক্তিযুদ্ধ। এই যুদ্ধের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিলো দেশকে শত্রুমুক্ত করা। অর্থাৎ স্বাধীনতা নস্যাৎ করার জন্য যে পাকিস্তানি সৈন্যরা সারাদেশে হত্যা, অগ্নিসংযোগ, মা-বোনদের ইজ্জত ও সম্মান হরণ, লুটপাট করছিল, তাদেরকে পরাভূত করা এবং পরাজিত করা।
দ্বিতীয় লক্ষ্য ছিলো জাতির সার্বিক মুক্তি অর্জন করা। মূলত ঘোষিত স্বাধীনতা রক্ষা করা বা অক্ষুণœ রাখাই ছিলো সবচেয়ে বড় কাজ। ২৫ মার্চ পর্যন্ত ছিলো আমাদের স্বাধীনতার জন্য লড়াই। আর ২৬ মার্চ থেকে শুরু হলো স্বাধীনতা রক্ষার জন্য লড়াই। দুই লড়াইয়ের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য ছিলো। প্রথম পর্যায়ের লড়াইয়ের মধ্যে ছিল যুক্তি, বুদ্ধি, বিবেক, বিবেচনা, প্রতিবাদ, আলোচনা, বিক্ষোভ, সংগ্রাম, নির্বাচনসহ অসহযোগ আন্দোলন এবং দ্বিতীয় পর্যায়ের লড়াইয়ের মধ্যে ছিল প্রতিরোধ, সশস্ত্র সংগ্রাম, সামরিক-বেসামরিকসহ সার্বিক জনযুদ্ধ তথা মুক্তিযুদ্ধ। এই মুক্তিযুদ্ধ চলেছে ৯ মাসব্যাপী। দেশের আবালবৃদ্ধবনিতা মহান এই মুক্তিযুদ্ধে সার্বিকভাবে অংশগ্রহণ করেছে।
মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও বিজয় নিয়ে দেশবাসীর মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। এসব বিষয় নিয়ে গোটা দেশবাসী ঐকমত্য। দেশবাসী মনে করে স্বাধীনতা আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে মহিমান্বিত ও গৌরবান্বিত সেই স্বাধীনতা আমরা অর্জন করেছি। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে হানাদাররা আত্মসমর্পণ করায় আমরা বিজয় লাভ করেছি। আমাদের স্বাধীনতাকে আমরা অক্ষুণœ রেখেছি এবং চিরায়ত করেছি।
১৬ ডিসেম্বর তাই জাতীয় আনন্দের দিন। মহা খুশির দিন। গৌরবের দিন। জাতীয় আত্মশ্লাঘার দিন। এ দিনটি আনন্দবাহিত অশ্রু ফেলার দিন। এ দিনটি ছিল যুদ্ধরত দেশবাসীর অনেক স্বপ্নের দিন। অনেক প্রতীক্ষা ও আকাক্সক্ষার দিন। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে এদিনটি আমরা অর্জন করেছিলাম।
বিজয় দিবস আমাদের জীবনে বারবার আসছে। আনন্দের বিষয়টি আমরা পলে পলে অনুভব করছি কিন্তু ঐতিহাসিক তাৎপর্য বা এর গন্তব্য আমরা উপলব্ধি করতে পারছি না।
আজ অনুধাবন করতে হবে মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়েছে কিন্তু জাতির মুক্তিসংগ্রাম শেষ হয়নি। এখন মুক্তিসংগ্রাম শুরু করতে হবে। সকল মানুষের মুক্তির জন্য আমাদের লড়াই করতে হবে। যে লড়াইয়ের পাটাতন তৈরি করেছে আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, ধর্ম, ধারাবাহিক জীবনাচরণ, স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ এবং বিজয় লাভ।
এসো আজকের দিনে বিজয় দিবসের নুতন তাৎপর্য আমরা অনুধাবন করি।

SHARE

1 COMMENT

Leave a Reply