Home গল্প গল্পমামা

গল্পমামা

 দেলোয়ার হোসেন #

golpoস্কুল থেকে ফেরার পথে প্রথমা বললো, অনঘ তোমার মোটা মামা এসেছে? অনঘ বললো, খবরটা আমিই তোমাকে দিতে চেয়েছিলাম কিন্তু তুমি কার কাছে শুনেছো?
– অরিনের কাছে শুনেছি।
– আমার সেই ভূতের গল্প তোমার মনে আছে?
– খুব মনে আছে। লন্ডন গিয়ে সামি মামা কি আরও মোটা হয়ে গেছে?
– প্রথমা তোমাকে একটা কথা বলি, মামাকে আর কখনো মোটা মামা বলবে না। বলবে, সামি মামা, নয়তো গল্পমামা।
– ঠিক আছে। গল্পমামাই বলবো। এবার বলো গল্পের আসর কখন বসবে?
– কাল ছুটির দিন। তোমরা বিকেলেই চলে এসো। মামা অনেক চকলেটও এনেছে।
অনঘদের পাঁচতলার ছাদটা অনেক বড় আর খুব সুন্দরও। তিনদিকে ফুলের টপ সাজানো। তখন সূর্যটা ঢলে পড়ছে পশ্চিমে। দক্ষিণের ঝির ঝির মিষ্টি হাওয়া বইছে চমৎকার পরিবেশ। ছাদে তিনটা বড় কার্পেট পাতা আছে। বাড়ির ছেলেমেয়েরা ছাড়াও অনঘের দু’তিন জন বান্ধবীও বসেছে। অনঘের সামি মামা বসে আছে একটা বেতের সোফায়। তার ভুঁড়ি আর মোটা শরীর নিয়ে নিচে বসা একেবারেই অসম্ভব।
প্রথম আরিনই মুখ খুললো। বললো, মামা লন্ডনে কি বাংলাদেশের মতো ভূত আছে? ভূতের কথা শুনে মামা শরীর দুলিয়ে হাসতে হাসতে বললো, তোমরা দেখছি এখনও সেই ভূত নিয়েই পড়ে আছো। দুনিয়াটা কোথায় চলে গেছে সে খবর কি তোমরা রাখো? আসলে আমারও জানা ছিলো না। লন্ডনে গিয়ে বুঝেছি।
শ্রোতাদের মধ্যে রবি একটু ফটকা। সে বললো, মামা চাঁদে নাকি মানুষ যাচ্ছে?
– একদিন তো অবশ্যই যাবে। কেন তুমি কি যেতে চাও?
– বাংলার মাটি ছেড়ে চাঁদে যাবো না। মামা আপনি ভূতের ভবিষ্যৎ ছবিটা দেখেছেন?
– সে তো কবেই দেখেছি। তোমরা কি কেবল ভূতের গল্পই পড়? একটা কথা বলি মন দিয়ে শোনো। আগের দিন মানুষ বসবাস করতো অন্ধকারে। তখন ভূত ছিলো কিন্তু এখন ভূতদের এমনই অবস্থা যে, ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি। এখন থেকে তোমরা পেছনের কথা ফেলে রেখে সামনের কথা ভাবো। বিজ্ঞান প্রতিদিন নতুন নুতন আবিষ্কার করে যাচ্ছে। যারা আবিষ্কার করছেন, তারা আমাদের মতই মানুষ। তবে তারা বিদেশী। রেডিও, টেলিভিশন, উড়োজাহাজ, কম্পিউটার, মোবাইল ছাড়াও আরও অনেক কিছু আছে, যা মানুষের ভালোর জন্য বিজ্ঞানীদের দীর্ঘ সময় ব্যয় করে আবিষ্কার করেছেন।
মামার কথায় রবি বললো, মামা বিনা তারে মোবাইলে আমরা কত সুবিধা ভোগ করছি। আমার মনে হয় কী এসব ভূতের কারসাজি। ভূতেরা এতদিন আমাদের ভয় দেখালেও এখন মানুষের ভালোর জন্য কিছু কাজ করছে। তা না হলে মুহূর্তে আমেরিকার কথা আমরা শুনচ্ছি, আমাদের কথা ওখানকার মানুষ শুনছে। এসব কঅ করে হয়!
মামা হো-হো করে হাসতে হাসতে বললো, তোমাদের মাথা থেকে ভূত তাড়াতে হলে সরষে পড়া দিতে হবে। রবি খিল খিল শব্দে হেসে উঠে বললো, মামা তুমি জানো না সরষের মধ্যেও ভূত থাকে।
– তুমি ঠিকই বলেছো। আচ্ছা বলো তো টেলিভিশন কে আবিষ্কার করেছেন?
– যে বেটা আবিষ্কার করেছে তার নাম টেলিভিশনের পর্দায় কখনো দেখিনি। আমরা ছবি দেখি, গান শুনি, খবর শুনিÑ আরো অনেক কিছু। তবে টিভি কোম্পানিগুলোর নাম জানি।
– বেটা নয়, বলো বিজ্ঞানী। তাঁর নাম বেয়ার্ড। তিনি ব্রিটিশ বিজ্ঞানী। রেডিও এখন আর তোমরা শোনো না। অথচ এক সময় রেডিও ছিলো একমাত্র বিনোদনের যন্ত্র। ১৯০২ সালে ইতালির বিজ্ঞানী মার্কনি যন্ত্রটি আবিষ্কার করেছিলেন।
অনঘ মামার হাতে চায়ের কাপ দিতে দিতে বললো, মামা এখন বিদেশীদের মত বাংলাদেশের মানুষও কম্পিউটার নিয়ে মেতে আছে নাওয়া-খাওয়া বাদ দিয়ে। অথচ এই মহামূল্যমান যন্ত্রটি যিনি আবিষ্কার করেছেন তাঁর নাম জানার প্রয়োজন মনে হয়নি। এখন তোমার কথায় সেই বিজ্ঞানীর নাম জানতে ইচ্ছে করছে। যে মানুষটা আমাদের জন্য এতো করলেন তাঁর নামটা না জানা সত্যি বড় অপরাধ। মামা তুমি বলে দাও না, আমরা সবাই জেনে নিই।
অনঘের মোটা মামা মনে মনে খুশি হয়ে বললো, ধরো তোমরা কেউ বুদ্ধি খাটিয়ে একটা কিছু তৈরি করলে। লোকে বললো, জিনিসটা খুব ভালো হয়েছে। কিন্তু কেউ জানলো না সেটা তুমি করেছো। তখন কি তোমার ভালো লাগবে?
রবি ঝটফট উত্তর দিলো কখনো না।
গল্পমামা বললো, রাইট। কম্পিউটার ছাড়া এখন আমরা কিছু ভাবতেই পারি না। ইংল্যান্ডের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের অধ্যাপক চার্লস বারেজ কম্পিউটার আবিষ্কার করেন। আর ইংরেজ কবি বায়রনের কন্যা অ্যাডা অগাস্টা পৃথিবীর প্রথম কম্পিউটার প্রোগ্রামার।
এক কোণে বসে ছিলো শান্ত। নামে শান্ত হলেও সে দুষ্ট এবং ফাঁকিবাজ। তো সে হঠাৎ বলে উঠলো, মোটা মামা, আদার ব্যাপারী হয়ে জাহাজের খবর নেয়ার দরকার কী। নগদ যা পাও হাত পেতে নাও। বাকির খাতা শূন্য থাক।
মামা খলখলিয়ে হেসে বললো, জীবনের অনেক মূল্যরে শান্ত। আসলে আমরা দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা বুঝি না। তোমরাও ইচ্ছা করলে জ্ঞানী, গুণী মানুষ হতে পারো। শুধু মনের ইচ্ছাশক্তি আর মহামূল্যবান সময় কাজ লাগাতে হবে। এসব কথা তোমাদের বলছি, কারণ আমি আমার জীবন থেকে বুঝেছি, সময় কতো মূল্যবান।
– মামা, আমরা গরিব মানুষ, আমাদের দেশও গরিব। আমাদের দ্বারা ওসব হবে না। তুমি ইংল্যান্ডের একটা ভূতের গল্প বলো। কতদিন সেখানে থেকে এলে, একটা দুটো ভূতের সাথে তো দেখা হতেই পারে।
– তাহলে সেই গরিব ছেলের গল্পই তোমাদের শোনাই। শত শত বছর পূর্বে যে ছেলেটা ইংল্যান্ডের সব ভূত তাড়িয়ে ছিলো।
– তুমি কি সত্যি বলছো? তার নাম কি তুমি জানো?
– অবশ্যই। তার নাম উইলিয়াম মারডক। ছেলেটি নিজের চেষ্টায় সারা লন্ডন শহরটাকে আলোয় ভরে দিয়েছিলো। তার পূর্বে মোমবাতি আর কেরোসিনের টিম টিমে আলো ছাড়া আর কিছু ছিলো না। ছেলেটির বাড়ি ছিলো স্কটল্যান্ডের একটা গ্রামে। কী করে এতো বড় একটা কাজ করলো, তা কি জানতে চাও?
অনঘ বললো, মামা তুমি বলো আমরা শুনবো। অনঘের কথা শুনে অন্যরাও বলে উঠলো, হ্যাঁ মামা তুমি সেই বুদ্ধিমান ছেলেটার গল্পই বলো। অনঘের সামি মামা তখন চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে উইলিয়াম মারডকের গল্প শুরু করলো।
উইলিয়াম মারডকের খেলা ছিলো কয়লা কুড়িয়ে এনে একটা গর্তে জমা করা। তারপর সেই কয়লায় আগুন জ্বালিয়ে সে আপন মনে চেয়ে থাকতো। পোড়া কয়লা দিয়ে ধোঁয়া উড়তোÑ এই ছিলো ছেলেটার খেলা।
একটু বড় হয়ে সে চলে গেলো ইংল্যান্ডের বার্মিংহাম শহরে কাজের খোঁজে। একদিন সে ঘুরতে ঘুরতে একটা বড় কারখানায় গেলো। কারখানাটা ছিল জেমস নামের একটা লোকের। বাষ্পের শক্তি কাজে লাগিয়ে অনেক নাম করেছে সে। ছেলেটি মালিকের সামনে গেলো আর ভয় পেয়ে তার মাথার টুপিটা মাটিতে পড়ে গেলো। ফলে একটা অদ্ভুত শব্দ হলো। মালিক বললো, টুপিটা তুমি কোথা থেকে কিনেছো? ছেলেটি বললো এটা আমি নিজে তৈরি করেছি।
ছেলেটির কথা শুনে মালিক মনে মনে ভাবলো, এমন বুদ্ধিমান ছেলেই আমার কারখানায় দরকার। ব্যস চাকরি হয়ে গেলো! ছেলেটি একটুও সময় নষ্ট না করে একমনে কাজ করে। সে সবরকম কাজই করে। আসলে অজানাকে জানার জন্য তার মন ছিল ব্যাকুল। তাই একটুও ক্লান্তি বোধ করতো না। হঠাৎ একদিন তার মনে পড়লো, ছেলেবেলার সেই খেলার কথা। তখন মাথার মধ্যে কি-যে বুদ্ধি খেলে গেলো তা সেই জানে।
পরদিন ছেলেটি ঘরে এসে একটি কেটলির মধ্যে বেশ কিছু কয়লা নিয়ে কেটলিটার ওপরের ঢাকনা ভালোভাবে বন্ধ করে দিলো। কেটলির যে পথে পানি বের হয়Ñ সেখানে দু’তিন হাত লম্বা একটা নলের একমুখ ভালোভাবে আটকে দিলো। নলের অন্য মুখও একটা ধাতব পাত্রের ছিদ্রপথে আটকে দিলো। ধাতব পাত্রটির ওপর দিকে চিকন একটা ফাঁকা দন্ড শক্ত করে দাঁড় করলো। নলের মুখে খুব ছোট ছোট তিন চারটা ছিদ্র করলো। তারপর কেটলিটা চুলার ওপর রেখে জ্বাল দিতে লাগলো। ছেলেটির উদ্দেশ্য কয়লার পাত্র থেকে ধোঁয়া নল দিয়ে ধাতব পাত্রে যাবে এবং ওপরের নলের ছিদ্র পথে বের হবে। তবে কোথাও যেনো লিক না থাকে।
কেটলিতে জ্বাল দিতে দিতে একসময় সেই ছোট ছোট ছিদ্রপথে খুব বেগে বাষ্প বের হতে শুরু করলো। ছেলেটি তখন দিয়াশলাইয়ের কাঠি জ্বেলে বাষ্পের মুখে ধরলো। সঙ্গে সঙ্গে অবাক করা এক কান্ড ঘটে গেলো। নলের মুখে তখন এমন আলো জ্বলতে শুরু করলো যে, ছেলেটির ঘরবাড়ি মিষ্টি এক আলোর বন্যায় ভাসতে লাগলো। ছেলেটি তখন আলো আবিষ্কারের আনন্দে পাগলের মতো হাসতে শুরু করল।
পাড়া প্রতিবেশীরা এমন অবিশ্বাস্য আলো দেখে ছুটে এলো, সবাই ছেলেটির বুদ্ধি এবং কান্ড দেখে অবাক। তারপর এ কথা ছড়িয়ে পড়লো চারদিকে। এই আলোর উৎস জানার জন্য অনেকে তাকে লোভ দেখালো কিন্তু সে কারো কথায় কান দিলো না। শেষে শহর কর্তৃপক্ষকে বললো, আমি এই অন্ধকার লন্ডন শহরটাকে আলোয় ভরিয়ে দেবো। কর্তৃপক্ষ ছেলেটির কথা শুনে প্রথমে তাকে পাগল ভাবলো। পরে রাজি হলোÑ আর ছেলেটির গবেষণা কাজে সব রকম সাহায্য করলো। একদিন সত্যিই সারা লন্ডন শহর আলোয় হেসে উঠলো।
তোমরা ভেবে দেখো, পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ জন্ম নিয়েছে, আবার তারা পৃথিবী ছেড়ে চলেও গেছে। কিন্তু কেউ তাদের খবর রাখে না। তবে তার মধ্যে দু’ চারজন তাঁদের সৃষ্টির জন্য পৃথিবীতে আজও অমর হয়ে আছেন। তাই বলছিÑ এমন জীবন গড়ো/মরেও যেনো অমর হতে পার।

SHARE

Leave a Reply