Home ধারাবাহিক: দুর্গম পথের যাত্রি দুর্গম পথের যাত্রী

দুর্গম পথের যাত্রী

আসাদ বিন হাফিজ #

Dharabahikগত সংখ্যার পর

‘হে কুরাইশের যুদ্ধবাজ সন্তান!’ যুবায়ের খালিদকে দেখে চিৎকার করে বলল, ‘আমাদের দু’জনের রক্ত প্রবাহিত করে তোমরা কখনোই সে পবিত্র বাণীকে স্তব্ধ করতে পারবে না, যে বাণী হেরা পর্বতের গুহা থেকে বেরিয়ে আজ মদীনা হয়ে সারা দুনিয়ায় আলোর মতো বিচ্ছুরিত হতে যাচ্ছে। কাপুরুষদের কাছে আমরা কোনো অনুকম্পা চাই না। কিন্তু যদি সাহস থাকে তবে তোমাদের শ্রেষ্ঠ বীরকে আমার সামনে এনে আমার হাত খুলে দাও। দেখো কে কার রক্তের পিপাসা মেটায়।’
যুবায়ের থামতেই ভেসে এলো জায়েদের বলিষ্ঠ কণ্ঠ, ‘যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে আসা হে পলাতক বীরেরা। তোমরা তোমাদের পরাজয়ের প্রতিশোধ আমাদের ভাইদের লাশের ওপর নিয়েছো, তোমাদের নারীদের দিয়ে ওহুদের ময়দানে আমাদের লাশের নাক-কান কেটে তার মালা গলায় পরেছ। কাপুরুষের মত আমাদের হত্যা করতে চাচ্ছো। কিন্তু এভাবে ইসলামের অগ্রযাত্রা থামানো যাবে এমন দুরাশা মোটেই করো না। ’
চার বছর পর আজ মদীনায় যাওয়ার পথে খালিদের কানে স্পষ্ট ভেসে আসছে যোবায়ের ও জায়েদের সেই বীরত্বব্যঞ্জক হুঙ্কার। খালিদ জায়েদের তিরস্কার সহ্য করতে পারছিল না, লজ্জায় মরমে মরে যাচ্ছিল।
আজ মদীনা যাওয়ার পথে সেই তিরস্কার মনে পড়ায় তার শরীর কেঁপে উঠল। একের পর এক লোমহর্ষক সব দৃশ্য এসে আছড়ে পড়ল তার মনের পর্দায়। ওহুদের ময়দানের সে দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠল, যখন আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা হামজার কলিজা চিবিয়ে গিলতে না পেরে ওগরে দিয়েছিল। যখন সে সঙ্গিনীদের বলছিলো, মুসলমানদের লাশের নাক-কান কেটে আনতে। যখন তারা তার হুকুম তামিল করতে গিয়ে মুসলমানদের নাক-কান কেটে আনলো আর হিন্দা সে নাক-কানের মালা গেঁথে গলায় পরল। সে তখন পাগলিনীর মতো নেচে নেচে গান করছিল, আর সে দৃশ্য উপভোগ করছিল তার স্বামী আবু সুফিয়ান। কিন্তু খালিদ যখন তাকে তিরস্কৃত করল তখন তার ভেতরেও বিবেক জেগে উঠেছিল এবং সে সেখান থেকে সরে পড়েছিল। খালিদও ঘৃণায় মুখ ঘুরিয়ে সরে গিয়েছিল সেখান থেকে।
তিন চার মাস পর দুই বন্দী মুসলমান হাত-পা বাঁধা অবস্থায়ও যখন সে জন্য তিরস্কার করছিল, তখন সেদিনকার কাপুরুষতার কথা স্মরণ করে লজ্জার সাথে সাথে ক্ষোভও হলো তার। সে সেখান থেকে সরে পড়লো ও কুরাইশদের ভিড়ে মিশে গেল।
সে সম্প্রদায়ের লোকেরা মুসলমান দু’জনকে বেঁধে এনেছিল তাদের নাম কোন ইতিহাস গ্রন্থেই পাওয়া যায় না। ইবনে হিশাম শুধু এতোটুকু বলেছেন, তারা কুরাইশদের সহযোগী একটি লড়াকু সম্প্রদায়ের ছিল।
খালিদ সেই লড়াকু সম্প্রদায়ের লোকদেরকে জিজ্ঞেস করল, এই দু’জনকে তোমরা কেমন করে পাকড়াও করলে?’
‘এ আর এমন কঠিন কি কাজ।’ ওরা বললো, ‘খোদার কসম! যদি বলো তবে মুসলমানদের রাসূলকেও ধরে এনে এই নিলামে দাঁড় করিয়ে দিতে পারি।’
‘বাজে বকো না, যে কাজ করতে পারবে না তার কসম খেও না।’ খালিদ বললো, ‘আমাকে শুধু বলো, এই দু’জনকে কোত্থেকে ধরে আনলে?’
তাহলে শোন। এরা ছিল ছয়জন। সে লোকটি বললো, ‘আমরা ওহুদ যুদ্ধে আমাদের নিকটাত্মীয়দের রক্তের প্রতিশোধ নিচ্ছি। ভবিষ্যতেও এভাবে প্রতিশোধ নেয়া অব্যাহত থাকবে। কিভাবে ওদেরকে আমরা ধরেছি সে এক মজার কাহিনী। ঘটনাটা এ রকমÑ আমাদের কবিলার কিছু লোক মদীনায় মুহাম্মদের কাছে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করে। তারা মুহাম্মদকে আরো জানায়, আমাদের কবিলার সমস্ত লোক ইসলামের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে পড়েছে। অনেকেই ইসলাম গ্রহণ করতে চায় কিন্তু সময় সুযোগ করে তারা সবাই মদীনা আসতে পারেনি। তাদেরকে ইসলামের ছায়াতলে নিয়ে আসার জন্য যদি কয়েকজন মোবাল্লেগ পাঠানো যায় তবে আশা করা যায় কবিলার সকলেই মুসলমান হয়ে যাবে। কবিলার মুসলমানদের কিছুুদিন ধর্মীয় শিক্ষা দেয়ার জন্যও সেখানে কয়েকজন মোবাল্লেগ প্রয়োজন।
আমাদের এই লোকেরা যখন ফিরে আসে তখন তাদের সাথে ছয়জন মুসলমানকে মোবাল্লেগ হিসেবে পাঠানো হয়। এদিকে আমাদের সরদার শারজা বিন মুগিহ এক শ’ লোককে রাজি নামক স্থানে পাঠিয়ে দিল। যখন এই ছয়জন মুসলমান রাজিতে পৌঁছলো তখন আমাদের লোকেরা ওদের ঘেরাও করে আত্মসমর্পণ করতে বললো। তুমি শুনে বিস্মিত হবে, আমাদের সশস্ত্র এক শ’ লোকের সাথে ছয়জন মুবাল্লিগ শুধুমাত্র তলোয়ার সম্বল করে যুদ্ধে লেগে গেল। যুদ্ধে তিনজন নিহত ও তিনজন বন্দী হলো।
শারজা বিন মুগিহ নির্দেশ দিয়েছিলেন, মদীনা থেকে যাদেরকে ধোঁকা দিয়ে আনা হয়েছে তাদেরক বন্দী করে মক্কা নিয়ে যাবে এবং বদর ও ওহুদের প্রান্তরে আপন আত্মীয়স্বজন খুন হওয়ায় প্রতিশোধের নেশায় যারা পাগলাপারা তাদের হাতে বিক্রি করে দেবে।
বন্দী তিনজনকে নিয়ে আমরা মক্কার দিকে আসছি। পথিমধ্যে ওদের একজন কেমন করে যেন রশি খুলে হাত বের করে ফেলল। মুক্ত হয়ে সে পালানোর চেষ্টা করবে এটাই স্বাভাবিক কিন্তু সে তা না করে অসম্ভব দ্রুততার সাথে আমাদের একজনের তলোয়ার ছিনিয়ে নিয়ে আমাদের দু’জনকে হত্যা করে ফেলল। আহাম্মক একবারও ভাবল না, একলা এতো লোকের সাথে লড়তে এলে তার ভাগ্যে মরণ ছাড়া আর কিছুই জুটবে না। যাই হোক, আমরা তার দেহ কেটে কিমা বানিয়ে ওখানে ফেলে এসেছি। এখন এই দু’জন অবশিষ্ট আছে। তবে এদের আর পালানোর উপায় নেই, আমরা এদেরকে আরও শক্ত করে বেঁধে নিয়েছি।’
‘আর তোমরা এতেই মহা খুশি হয়ে গেলে!’ খালিদের কণ্ঠ থেকে ব্যঙ্গ ঝরে পড়ল, ‘মুহাম্মদ এ ঘটনা শুনে কি বলবে সে কথা ভেবে আমি লজ্জায় মরে যাচ্ছি। মুহাম্মদ কি ভাববে না, কুরাইশ ও তার সহযোগীরা এখন এতই কাপুরুষ হয়ে গেছে যে, লড়াইয়ের ভয় পেয়ে তারা এখন ধোঁকা ও প্রতারণার পথ ধরেছে? যোদ্ধাদের সামনে আসার সাহস না থাকায় তারা এখন মোকাবেলার নামে মুবাল্লিগদের? তাও আবার ছয়জন মুবাল্লিগকে মোকাবেলা করার জন্য তাদের দরকার হয় এক শ’ জন যোদ্ধার বিশাল বাহিনীর? ছি! এসব কথা ভাবতেও আমার লজ্জা হচ্ছে। তোমরা নিজেদেরকে কেবল অপমান করোনি, যে মায়েরা তোমাদের দুধ খাইয়ে বড় করেছে সে মায়েদেরও অপমান করেছো?’
‘ওয়ালিদের বেটা! বেশি বড়াই করো না। তোমাদের বাহাদুরি তো আমরা দেখেছি। যুদ্ধের ময়দানে মুসলমানদের সামনে তোমাদের বীরত্ব দেখে মক্কার রমণীরা যে থুথু ফেলেছে সে কথা কি ভুলে গেছো? মুহাম্মদের শক্তির সঙ্গে টক্কর দেয়ার সামর্থ্য কি তোমাদের আছে? বদরের যুদ্ধে আরবের বাছাই করা এক হাজার যোদ্ধা নিয়ে লড়াই করতে নেমে মাত্র তিনশ তেরোজনের কাছে চরম মার খেয়ে পালিয়ে এসেছিলে। ওহুদের যুদ্ধে মুহাম্মদের বাহিনীতে কয়জন ছিল? সাত শ-এর কম। আর তোমরা কয়জন ছিলে? হাজার হাজার। শোন খালিদ, মুহাম্মদের হাতে জাদু আছে, যেখানে জাদু চলে সেখানে তলোয়ার চলে না।
তবে তোমার তলোয়ার চলছে কেমন করে? খালিদ জিজ্ঞেস করলো, ‘যদি মুহাম্মদের হাতে জাদু থাকে তবে তিনি তোমাদের ধোঁকায় কেমন করে পড়লেন? তাদের চার ব্যক্তিকে কী করে হত্যা করলে? এদের দু’জনকে মুহাম্মদের জাদু কেন মুক্ত করতে পারছে না? আসলে তোমরা তার মোকাবেলা করতে ভয় পাও এবং মিছে মিছি তার কাছে জাদু আছে বলে নিজেদের ধোঁকা দিয়ে সান্ত্বনা পেতে চেষ্টা করো।’
‘না, না খালিদ! আমরা জাদুকে জাদু দিয়েই মোকাবেলা করেছি।’ লোকটি বললো, আমাদের কাছেও ইহুদি জাদুকর এসেছিল। সাথে ছিল তিনজন ডাইনি। তাদের একজনের নাম ইউহাদা। আমি স্বচক্ষে দেখেছি, সে হাতে তুড়ি বাজালো আর ঘন জঙ্গল থেকে শট করে বেরিয়ে এলো একটা বর্শা, আবার তুড়ি বাজাল, বর্শাটি ঝোপের মধ্যে ফিরে চলে গেল এবং সাপ হয়ে বেরিয়ে এলো। সাপটি আমাদের চার দিকে একবার চক্কর দিয়ে আবার ঝোপের মধ্যে চলে গেল। তখন ইউহাদা বলল, সাপের এ ঘেরাওয়ের মধ্যে যারা ছিলো তারা এখন জাদুমুক্ত, তোমাদের ওপর মুহাম্মদের জাদু আর কোন কাজ করবে না। এ কারণেই না আমরা ওদের সামনে যাওয়ার সাহস পেয়েছি।
মদীনার দিকে যেতে যেতে খালিদের এসব ঘটনা একের পর এক স্মৃতিপটে ভেসে উঠছিল। খালিদ এখন আর এসব কথা মনে করতে চায় না। সে যতই এসব কথা মন থেকে তাড়াতে চাচ্ছে ততই তার মনোবাগানে বিষাক্ত ভোলতার মতো এসব স্মৃতি ভন ভন করে উড়তেই থাকল। মনে পড়ল তার ইউহাদার কথা। বাস্তবেও সে জাদুকন্যা কিনা সে কথা জানে না খালিদ। কিন্তু তার সুঠাম শরীর, অপূর্ব দেহবল্লবী চমক দেয়া চাহনি, মধুর হাসি ও কথা বলার সুমিষ্ট স্বরে অবশ্যই জাদু আছে। লোকটির মুখে যখন সে ইউহাদার নাম শুনলো, তখন সে চমকে উঠলো।
ওহুদের যুদ্ধের পর যখন কুরাইশ সৈন্যরা মক্কায় ফিরে এসেছিল তখন মক্কার ইহুদিরা এমন অসহায়ের মত আবু সুফিয়ান, খালিদ ও আকরামার কাছে এসেছিল, যেন ইহুদিদেরই পরাজয় হয়েছে। ইহুদি সরদাররা আবু সুফিয়ানকে বলল, এই যুদ্ধে মুসলমানের পরাজয় হয়নি বরং এ যুদ্ধ জয়-পরাজয় ছাড়াই শেষ হয়েছে। কুরাইশদের এ ব্যর্থতাকে ইহুদিরা যেন তাদের ব্যর্থতাই গণ্য করছিল। কুরাইশদের প্রতি তারা এমনভাবে সহানুভূতি প্রকাশ করছিল যেন তারা এ ব্যর্থতার দুঃখ ও যন্ত্রণায় মরে যাচ্ছিল।
সে দিনের কথা খালিদের এখনো স্পষ্ট মনে আছে। সে ঘোড়া নিয়ে জনবসতির বাইরে বেড়াতে গিয়েছিল। যখন ফিরে আসছিল তখন রাস্তায় ইউহাদার সাথে তার দেখা। ইউহাদার মুচকি হাসি তার চলার গতি থামিয়ে দিয়েছিল। ইউহাদা সেই হাসি অক্ষুণœ রেখেই বলেছিল, ‘আমি মোটেই মেনে নিতে পারছি না, ওয়ালিদের বেটা যুদ্ধে ব্যর্থ হয়ে ময়দান থেকে ফিরে এসেছে।’
ইউহাদা খালিদের ঘোড়ার গর্দানে হাত রেখে বললো, ‘আমার এই ঘোড়ার ওপর বড় একটা আকর্ষণ ও ভালোবাসা রয়েছে, কারণ এ অশ্বটি মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়েছিল।’
খালিদ অশ্বপৃষ্ঠ থেকে নেমে এলো, যেন ইউহাদার জাদুই তাকে ঘোড়ার পিঠ থেকে নামিয়ে এনে তার সামনে দাঁড় করিয়ে দিল।
‘এর চেয়ে বড় ব্যর্থতা আর কী হতে পারে যে, তুমি মুসলমানদের পরাজিত করতে পারনি।’ ইউহাদা বললো, ‘তোমাদের পরাজয় আমাদেরই পরাজয়। তোমাদের মত যুবকদেরই সঙ্গ দেয়ার স্বপ্ন দেখে আমার মত যুবতীরা কিন্তু কোনো মেয়েই পরাজিত সৈনিকের গলায় মালা পরানোর জন্য আগ্রহী হয় না।’
খালিদের মনে হলো তার জবান বন্ধ হয়ে গেছে, সমগ্র চেতনা ও সত্তায় কেমন একটা অলস, অবচেতন ভাব যুদ্ধের ময়দানে সে তীর, তলোয়ার ও বর্শার আঘাত মোকাবেলা করতে পারে কিন্তু ইউহাদার মিষ্টি হাসির মোকাবেলা করার কায়দা তার জানা নেই। সে ইউহাদার সামনে সম্মোহিতের মতো দাঁড়িয়ে রইল।
খালিদের দিকে তাকিয়ে ইউহাদা প্রশ্রয়ের হাসি হাসল। খালিদ প্রশ্ন করলো, ‘তুমি কি মনে কর শুধু তীরই মানুষকে বিদ্ধ করতে পারে?’ ইউহাদা বললো, ‘মেয়েদের মিষ্টি হাসিও তোমার মতো বাহাদুর ও যোদ্ধা পুরুষকে বিদ্ধ করতে পারে। পারে তাদের হাত থেকে অস্ত্র ও তলোয়ার ফেলে দিতে।’
খালিদ তাকে আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু ইউহাদা অধরে হাসি ধরে রেখেই চোখ টিপে দিল। খালিদ আবার বোবা হয়ে গেল। ইউহাদা খালিদের আরো কাছে সরে এল, খালিদ অপলক চোখে অভিভূতের মতো তাকিয়ে রইল তার দিকে। সে তার আপন অস্তিত্ব ও শিরায় শিরায় আনন্দের ধারা বয়ে যাচ্ছে অনুভব করল। ইউহাদা বলল, ‘চলি খালিদ, তোমাকে বলি বলি করেও বলা হয়নি, মনে রেখো ইউহাদা কেবল বাহাদুরেরই পূজা করে।’
ইউহাদা খালিদকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেল। কিছুদূর গিয়ে পেছনে ফিরে হাত নেড়ে বিদায় জানাল তাকে। খালিদ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল ঘোড়ার লাগাম ধরে। ইউহাদা একটু সরে যেতেই সম্বিত ফিরে পেল সে, লাফিয়ে ঘোড়ার চেপে বসলো। কিছু দূর গিয়ে খালিদ পেছন ফিরে তাকাল, দেখল ইউহাদা ফিরে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। খালিদ পেছন ফিরতেই ইউহাদা আবারও তার উদ্দেশ্যে হাত নাড়ল।
তখনও মুসলমান দু’জন নিলামের মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছে। খালিদ কুরাইশদেরকে জানালো কেমন করে ধোঁকা দিয়ে তাদের ধরা হয়েছে। এর পরিণাম কী হতে পারে তাও ভেবে দেখতে বলল সরদারদের। এ নিয়ে যখন জটলা চলছে তখন খালিদ শুনতে পেল আরো চমকপ্রদ কাহিনী।
এ ঘটনা আরো আগের। তিন-চার জন ইহুদি সরদার ইউহাদা ও আরো কয়েকজন মহিলাকে নিয়ে শারজা বিন মুগির কাছে গেল।
শারজার সম্প্রদায়টি ছিল খুবই যুদ্ধবাজ ও কলহপ্রিয়। কিন্তু তাদের ওপর মুুসলমানদের ভীতিকর এক প্রভাব পড়েছিল। জাদুকরদের সব সময়ই মানুষ ভয় পায়। এদের মধ্যে এ কথা ছাড়িয়ে পড়েছিল যে, রাসূলে করিমের হাতে জাদু আছে। ফলে মুসলমানদের ব্যাপারে প্রচন্ড এক ভীতি ছড়িয়ে পড়েছিল এদের মধ্যে।
ইহুদিরা ছিল বিশ্ব ষড়যন্ত্রকারী। তারা ষড়যন্ত্রের হাতিয়ার হিসেবে এই সম্প্রদায়কে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিলো। কারণ স্বভাবগতভাবে এরা যুদ্ধবাজ ও কলহপ্রিয় হওয়ায় যেকোনো বিপর্যয় সৃষ্টির কাজে এদের ব্যবহার করা ছিল অপেক্ষাকৃত সহজ ও নিরাপদ।
ইহুদিরা কেবল চালাক চতুর নয়, কূটকৌশলেও এরা বিশ্ব সেরা। তারা চিন্তা করে দেখলো, যদি মুসলমানের জাদুর ধারণা অন্যান্য সম্প্রদায়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে তবে তার প্রভাবে সেসব সম্প্রদায়ের মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে পড়বে। তাই ইহুদি সরদাররা শারজা বিন মুগির কাছে গিয়ে মুসলমানরা যে আসলে জাদুকর নয় এই ধারণা দূর করতে চেষ্টা করল। এ ব্যাপারে তারা অনেক কথাই বললো, কিন্তু শারজা বিন মুগিহ তাদের কথা বিশ্বাস করল না।
রাতে শারজা মেহমানদের জন্য খোলা আকাশের নিচে এক ভোজসভার আয়োজন করল। ইহুদিরা বলল, ‘আমরা তোমার দাওয়াত কবুল করতে পারি, কিন্তু তাতে মদ ও সুরা পান করানোর দায়িত্ব আমাদের দিতে হবে। তোমাদের সাথে আমাদের বন্ধুত্বের প্রমাণস্বরূপ এটাকে আমাদের শুভেচ্ছা উপহার মনে করতে পারো।’
শারজা বিন মুগিহ অগত্যা তাদের প্রস্তাব মেনে নিল। ভোজসভায় সে তার সম্প্রদায়ের কিছু বিশেষ ব্যক্তিকে দাওয়াত করল। ইহুদিরা নিজ হাতে তাদের মদ সুরা পান করালো। শরাবের মধ্যে তারা এক প্রকার গুঁড়ো মিশিয়ে দিল। সেই গুঁড়োর প্রভাবে তারা যখন নেশাগ্রস্ত হলো তখন ইহুদিরা তাদের দেখাল নানা রকম চমকপ্রদ জাদু। সে জাদু দেখে তারা তো বিস্ময়ে হতবাক।
এরপর শুরু হলো নাচ গানের আসর। ইউহাদা দেখাল তার চোখধাঁধানো রূপের চমক। নাচের আসবে ইহুদি নর্তকীরা সারা অঙ্গে ঢেউ তুলে নেশা ধরিয়ে দিল সবার। তারা স্টেজে এলো অর্ধ উলঙ্গ অবস্থায়। নাচতে নাচতে এক সময় দেহের বাকি আবরণটুকুও ছুড়ে ফেলে দিল মাটিতে। দর্শকের পলকহীন চোখ যখন তাদের গিলছিল তখন তারা দর্শকদের হাঁ করা মুখকে আরো হাঁ করে দিয়ে ব্যান্ড পার্টি নিয়ে নেমে গেল নিচে।
পরদিন সকালে যখন শারজা বিন মুগিহ চোখ খুললো তখন তার মনে হলো, যেন সে এক সুন্দর রঙিন স্বপ্ন দেখে জেগে উঠলো। তার গতকালের ধারণা ও বিশ্বাস সম্পূর্ণ পাল্টে গেল। ইহুদিদের কথায় বিশ্বাস ও আস্থা ফিরে এল তার।
কিছুক্ষণ পরে সে তার গোত্রের অন্যান্য সরদারদের নিয়ে ইহুদিদের সাথে আবারও বৈঠকে বসলো। ইহুদি তরুণী এবং নর্তকীরাও শামিল হলো সে বৈঠকে।
ইউহাদাকে দেখে শারজার হৃদয় অধীর হয়ে উঠলো। সে ইউহাদাকে টেনে তার কাছে বসালো।
‘যুদ্ধের ময়দানে সামনাসামনি লড়াই করে মুসলমানদেরকে পরাজিত করার আর প্রয়োজন নেই।’ এক ইহুদি বললো, ‘আমরা তাদেরকে কৌশলে শেষ করতে পারি। তোমরা যদি সেসব কৌশল শিখতে চাও তবে তার একটা পদ্ধতি তোমাদেরকে এখনই আমি শিখিয়ে দিতে পারি।’
খালিদ শুনল, যে ছয়জন মুসলমানকে ধোঁকা দিয়ে মদীনা থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল তাদেরকে নিয়ে আসার এ কৌশল শিখিয়ে দিয়েছিল সেই ইহুদি। শারজা বিন মুগিহ যে লোকগুলোকে রাসূলের কাছে পাঠিয়ে ছিল তাদের মধ্যেও একজন ইহুদি ছিল।
খালিদ মুসলমানদেরকে তার সবচেয়ে বড় দুশমন মনে করতো। কিস্তু তাই বলে এমন যুদ্ধহীন ষড়যন্ত্র মেনে নিতে পারল না তার বিবেক।
খালিদ বাড়ি ফিরে গিয়ে তার এক চাকরানীকে বলো, ‘জলদি ইউহাদাকে ডেকে নিয়ে আসো।’
ইউহাদা খরব পেয়ে এত তাড়াতাড়ি আসলো যেন সে এই আহ্বানের আশায় পাশেই কোথাও অপেক্ষা করছিল।
‘মুসলমানদেরকে ধোঁকা দিয়ে এভাবে হত্যা করার বুদ্ধি কি তুমিই দিয়েছো?’ খালিদ ইউহাদাকে বললো, ‘তুমি জানো, শারজা বিন মুগির সম্প্রদায়ের লোকেরা তোমাকে ডাইনি ও জাদুকর বলছে? যদি তাই হয় তাহলে জেনে রাখো, এই পদ্ধতি আমার কাছে মোটেই পছন্দনীয় নয়।’
‘আমার কথা মন দিয়ে শোন খালিদ! ইউহাদা তার পাশে গিয়ে বসলো এবং তার  দেহে হাত রেখে বললো, ‘দুশমনকে মারা প্রয়োজন। কিভাবে মারলে এটা বড় কথা নয়। তলোয়ার দিয়ে মারো, তীর দিয়ে মারো কিংবা কৌশলে নিধন করো সবটারই ফলাফল এক। তলোয়ার ও তীর চালিয়ে শত্রু নিধনে ঝুঁকি আছে। সে ঝুঁকি না নিয়েই যদি শত্রুকে নিধন করা যায়, সেটা কি আরো মঙ্গলজনক নয়? তা ছাড়া তোমরা পুরুষরা যে ঝুঁকি নিতে পারো মেয়ে হওয়ার কারণে আমরা তা পারি না। তাই বলে দেশের প্রতি, জাতির প্রতি আমাদের কি কোনো মায়া নেই, কোন দায়িত্ব নেই? আমরা আমাদের কৌশল প্রয়োগ করেছি এবং আমাদের কৌশল যে অব্যর্থ ও সার্থক তার প্রমাণ তো দেখতেই পাচ্ছো। আমি তো ভেবেছি, এ জন্য তুমি আমায় বাহবা দেবে, আমার প্রশংসা করবে।’
খালিদ ইউহাদার শরীরের উষ্ণতা অনুভব করছিল। ইউহাদা তার এত কোল ঘেঁষে বসেছিল যে, একবার মুখ ফিরাতে গিয়ে তার কোমল তুলোর মত নরম গাল খালিদের মুখ স্পর্শ করে গেল। এ সামান্য স্পর্শ খালিদের সারা দেহে অদ্ভুত এক শিহরণ জাগিয়ে তুলল। যেন তার শরীরে বয়ে যাচ্ছে এক আনন্দময় বিদ্যুৎ। কিন্তু কোত্থেকে যেন একরাশ সংকোচ এসে ঘিরে ধরল তাকে। সে একটু দূরে সরে বসল।
আজ চার বছর পর যখন সে উষর মরুভূমি পাড়ি দিয়ে একাকী এগিয়ে যাচ্ছিল মদীনার দিকে, তখনো সে ইউহাদার ঠোঁটের সেই কোমল স্পর্শ যেন অনুভব করতে পারছিল। তাদের সঙ্গে ইহুদিরা আছে বলে সে তো খুশিই ছিল। যদিও সে জানতো, ইহুদিদের এ বন্ধুত্বের কারণ মুসলমানদের সঙ্গে তাদের শত্রুতা। অবশ্য এতে ইহুদিদের যেমন লাভ আছে তেমনি তাদের নিজেদেরও লাভ আছে। সুতরাং ইউহাদা জাদুকন্যা না হলেও তার দেহে যে জাদু আছে সে জাদুর প্রভাব থেকে এসব ভেবেই সে নিজেকে বাঁচানোর তেমন কোন চেষ্টা করল না, বরং বলা যায় ইউহাদার সাথে তার সম্পর্কটা সে মেনেই নিয়েছিল।
খালিদের ঘোড়া মদীনার দিকে ছুটে চলেছে। তাঁর স্মৃতিপটে যোবায়ের বিন আদি ও জায়েদ বিন দিসনার কথা ভেসে উঠল আবার। লোকেরা খুব জাঁকজমক ও উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে নিলামে অংশ নিলো। শেষে কুরাইশদের দুই ব্যক্তি তাদেরকে অনেক সোনা দিয়ে কিনে নিলো। এই দুই ব্যক্তি খরিদ করা গোলামদের নিয়ে আবু সুফিয়ানের কাছে গেল।
‘সরদার! আমাদের ধর্ম থেকে মুখ ফিরিয়ে এই দুই ব্যক্তি মুহাম্মদের কাছে চলে গিয়েছিল। ওহুদের ময়দানে এরাই আমাদের আপনজনদের রক্ত প্রবাহিত করেছিল। কুরাইশদের সেই খুনের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য এদেরকে আমরা ক্রয় করে এনেছি। আপনি আমাদের সরদার ও সেনাপতি, আমাদের বুকে স্বজন হারানোর কী অসহনীয় ব্যথা ও প্রতিশোধের আগুন জ্বলছে তা আপনি ভালো করেই জানেন। আমাদের সেই খুনের তৃষ্ণা নিবারণের জন্য আমরা এদেরকে আপনার হাতে সমর্পণ করছি।’
‘হ্যাঁ!’ আবু সুফিয়ান বললো, ‘মক্কার মাটি মুসলমানদের রক্তের জন্য পাগল হয়ে আছে। এ দুই মুসলমানের রক্ত এ মাটির সে তৃষ্ণা কিছুটা হলেও নিবারণ করবে। এদেরকে তোমরা তোমাদের ইচ্ছেমতো খুন করতে পারো, এ ব্যাপারে আমার পূর্ণ সমর্থন ও সম্মতি আছে। কিন্তু এটা যে পবিত্র মাস! দেবতা উজ্জা ও হোবল এই পবিত্র মাসে খুন-খারাবি ও রক্তপাত পছন্দ করেন না। এ মাস শেষ হতে দাও। আগামী মাসের পয়লা তাারিখেই এদেরকে খোলা মাঠে কাঠের খাম্বার সাথে বেঁধে আমাকে খবর দেবে।’
এ খবর ছড়িয়ে পড়ল মক্কার ঘরে ঘরে। খালিদের কানেও এ সংবাদ এল। এ খবর শুনে খালিদ আবু সুফিয়ানের কাছে গেল।
‘আমার কাছে আপনার এই সিদ্ধান্ত ভালো লাগছে না।’ খালিদ আবু সুফিয়ানকে স্পষ্ট ভাষায় বললো, ‘আমরা দ্বিগুণ তিনগুণ সেনা নিয়েও অল্প সংখ্যক মুসলমানকে পরাজিত করতে পারিনি। আরবের বিশাল বিপুল জনগোষ্ঠীর মাঝে অল্প ক’জন মুসলমান এখনো বেঁচে আছে, এ ব্যর্থতা আমাদের। কিন্তু বীরের মতো মোকাবেলা না করে ধোঁকা ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে এভাবে ডেকে এনে তাদের রক্ত পান করা কাপুরুষতা। আবু সুফিয়ান, আপনি কি জানেন, মুসলমানদের ধোঁকা দিয়ে ডেকে আনার পেছনে তিনজন মহিলা ছিল? আপনি কি আপনার দুশমনদের মুখ দিয়ে বলাতে চান যে, কুরাইশ পুরুষরা এখন মেয়েদের পেছনে আশ্রয় নিয়েছে? ওদের বাহু এতই কমজোর হয়ে পড়ছে যে, অবলা নারীর সমান শক্তিও আর তারা রাখে না?’
‘খালিদ! আবু সুফিয়ান গম্ভীর স্বরে বলল, যোবায়ের ও জায়েদকে আমিও আমার নিকটাত্মীয় মনে করতাম, যেমন তুমি মনে কর। বুঝতে পারছি, তুমি এখনও ওদের নিকটাত্মীয়ই ভাবছো। কিন্তু ভুলে যাচ্ছ কেন, এখন ওরা আমাদের দুশমন! তুমি বলেই বলছি, যদি তুমি ওদের মুক্ত করতে চাও তবে এর দ্বিগুণ সোনা দ্বিগুণ মূল্য নিয়ে এসো। আমি এদেরকে তোমার হাতে তুলে দিতে রাজি আছি।’
‘না!’ পর্দার পেছন থেকে ভেসে এলো নারীকণ্ঠ। আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা রাগে ফোঁস ফোঁস করে বলে উঠলো, ‘হামজার কলিজা চিবিয়েও আমার অশান্ত বুক শান্ত হয়নি। এখনো প্রতিশোধের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে এ বুকে। যদি দুনিয়ার সব সোনা এনে আমার সামনে দাও তবুও আমি এদেরকে মুক্ত করতে দেবো না। তুমি ওদের মূল্য দ্বিগুণ করলে আমি করবো চার গুণ। ওয়ালিদের বেটা, দরকার হলে আমার সব সম্পত্তি ওদের জন্য কোরবান করবো।’
‘আবু সুফিয়ান!’ খালিদ বললো, ‘যদি আমার স্ত্রী আমার কথার মধ্যে এভাবে নাক গলাতো, তবে আমি তার জিব্বা টেন ছিঁড়ে ফেলতাম।’
‘তুমি তোমার বিবির জিহবা টেনে ছিঁড়তে পারো।’ হিন্দা বললো, ‘কারণ তোমার বুকে প্রতিশোধের আগুন নেই। মুসলমানদের হাতে তোমার বাবা মারা যায়নি, তোমাদের কোনো সন্তানও মারা যায়নি, তোমার চাচাও মারা যায়নি। তোমার এক ভাই বন্দী হয়েছিল, তোমরা মুসলমানদের দাবি অনুযায়ী মুক্তিপণ দিয়ে ভাইকে মুক্ত করেছিলে। যদি তোমার একজন আপনজনও মুসলমানদের হাতে নিহত হতো তবে স্বজন হারানোর বেদনা কী তুমি বুঝতে পারতে। তাহলে এতো বড় বড় কথা আর তোমার মুখ থেকে বের হতো না। তখন তুমি আমার অন্তরে যে প্রতিশোধের আগুন জ্বলছে তাকে শ্রদ্ধা করতে, কিন্তু স্বজন হারানোর যে যন্ত্রণা, যে দাহ সে সম্পর্কে তুমি সম্পূর্ণ অজ্ঞ। অতএব এ ব্যাপারে তোমার নাক গলানোর কোনো অধিকার নেই।’
খালিদ আবু সুফিয়ানের দিকে তাকালো। গোত্রের সরদার ও সেনাপতি হিসেবে আবু সুফিয়ানের মুখে যেখানে পৌরুষ ও শৌর্য বীর্যের দ্যুতি ও দৃঢ়তা থাকা উচিত ছিল সেখানে খেলা করছে এক অসহায় স্বামীর সকরুণ অবস্থা।
‘হ্যাঁ খালিদ!’ আবু সুফিয়ান বললো, ‘যার অন্তরে ব্যথা আছে তার অনুভূতি তোমার থেকে ভিন্ন হতে পারে। কাউকে শত্রু বলা বা ভাবা এক কথা, সেখানে প্রতিশোধের তীব্র অনুভূতি না থাকলেও চলে। কিন্তু প্রিয়জনদের খুনিকে মাফ করা অসম্ভব ব্যাপার। তুমি কেন তোমার সম্প্রদায়ের অনুভূতির প্রতি সম্মান না দেখিয়ে শত্রুপক্ষের লোকদের সমর্থন করবে? কেন ঐ দু’জন মুসলমানের জীবন দান করার জন্য তদবির করবে তুমি? তুমি চলে যাও খালিদ। এই দুই মুসলমানের ভাগ্য নির্ধারণের দায়িত্ব তোমার সম্প্রদায়ের ওপর ছেড়ে দাও।’
খালিদ নীরবে চলে গেল।
অতঃপর খালিদের সামনে সেই ভয়াবহ নির্দয় দৃশ্য ফুটে উঠলো, যে দৃশ্য সে কখনোই স্মরণ করতে চায় না। প্রকাশ্য ময়দানে কাঠের দুই খাম্বার সঙ্গে যোবায়ের ও জায়েদকে বেঁধে রাখা হয়েছে। চারদিকে দর্শকদের অসহ্য চিৎকার ও শোরগোল। সবার মধ্যে বিজয়ের স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ উল্লাস। চোখে মুখে তাদের প্রতিশোধ গ্রহণের দুর্দমনীয় নেশা। বন্দীদের প্রতি তিরস্কারের বাণ ছুুড়ে মারছে যে যেভাবে পারছে। ক্রমশ বেড়ে চলেছে শোরগোল হৈ হল্লা। উপছে পড়া এই আনন্দের ভিড়ে একজন মাত্র লোক ছিল যার বুকে আনন্দের লেশমাত্র ছিল না। সে ভিড়ের মধ্যে ঘুরে ঘুরে দেখছিল মানুষের চোখে মুখে লেপ্টে থাকা নগ্ন জিঘাংসার নিষ্ঠুরতার ছবি। সেও এই উল্লাসমুখর জনতারই অংশ, কিন্তু আসলেও কি তাই? তাহলে তার মনে কেন আনন্দের কোনো অনুভূতি জাগছে না? আনন্দ দূরে থাক, বরং মানুষের চোখে মুখে জিঘাংসা ও নিষ্ঠুরতার যে ছবি সে দেখতে পাচ্ছে তাতে বিষিয়ে উঠছে তার মন। এ কাপুরুষ দলের সেও একজন এ কথা মনে হতেই নিজেকে ধিক্কার দিতে ইচ্ছে হলো তার। পরিচিত জন ও স্বজন পরিবেষ্টিত হয়েও তার মনে হচ্ছে সে একাকী, নিঃসঙ্গ এ লোক আর কেউ নয়, এ ছিল খালিদ বিন ওয়ালিদ।
আবু সুফিয়ান ঘোড়ার ওপর সওয়ার হয়ে বন্দীদের কাছে গেল। বললো ‘অন্তিম মুহূর্তে তোমাদের কিছু চাওয়ার বা বলা থাকলে বলো?’
যোবায়ের ও জায়েদ উভয়েই জীবনের শেষ ইচ্ছে ব্যক্ত করলো আবু সুফিয়ানের কাছে। বললো, ‘আমাদেরকে নামাজ আদায় করা সুযোগ দাও।’
খালিদ মদীনার দিকে যাচ্ছে। তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে দুই মুজাহিদের প্রশান্ত চেহারা ও আত্মত্যাগের বিস্ময়কর দৃশ্য। ভয়ভীতি বা শঙ্কার লেশ নেই তাদের চোখে মুখে।
বন্দী দু’জনের হাতের বাঁধন খুলে দেয়া হলো। ধীরে সুস্থে অজু সেরে কেবলার দিকে মুখ করে নামাজে দাঁড়িয়ে গেলো ওরা দু’জনই। দর্শকের শোরগোল কমে এলো। সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল বন্দীদের দিকে। কিন্তু এদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই বন্দীদের। তারা একান্ত নিবিষ্ট মনে একাগ্রচিত্তে নামাজ আদায় করছে পরম প্রশান্তির সাথে। তাদের সে প্রশান্ত চেহারার কথা আজো খোদাই হয়ে আছে খালিদের অন্তরে। সে সময়টার এমন একটি প্রভাব তার মনের উপর পড়ে যে, আজ চার বছর পরেও তার মনে সেই স্মৃতি অত্যন্ত জীবন্ত হয়ে ভেসে উঠছে। মুসলমান দু’জনের সেই ত্যাগ ও কোরবানির কথা মনে হতেই ঘোড়ার পিঠে বসেও খালিদের মাথা নত হয়ে এলো।
যোবায়ের বিন আদি ও জায়েদ বিন দিসনাকে দেখে মনে হচ্ছিল, এই প্রচন্ড ভিড় চিৎকার ও হট্টগোল কিছুই যেন তাদের স্পর্শ করছে না। তারা মৃত্যু সম্পর্কে সম্পূর্ণ নির্ভয়। অত্যন্ত শান্ত মনে তারা নামাজ শেষ করলো। নামাজ শেষ করে ওরা আল্লাহর দরবারে দোয়ার জন্য হাত উঠালো। পৃথিবীর কেউ জানলো না তারা সেদিন আল্লাহর কাছে কী চেয়েছিলেন, মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কী ছিল তাদের শেষ প্রার্থনা। যারা তাদের খুন করার জন্য অপেক্ষা করছিল এবং যারা তাদের রক্ত দেখে উল্লাস করার জন্য সমবেত হয়েছিল তারা শুধু অবাক বিস্ময়ে দেখলো, নামাজ শেষে প্রশান্ত মনে তারা উঠে দাঁড়াল এবং আবার কাঠের খুঁটির সাথে পিঠ লাগিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে গেল।
‘ওরে হতভাগার দল!’ আবু সুফিয়ান উচ্চ স্বরে যোবায়ের ও জায়েদকে উদ্দেশ করে বলতে লাগলো, ‘তোদের ভাগ্য ও তোদের জীবন এখন আমার হাতে। তোরা মুখ দিয়ে শুধু বল, আমরা ইসলাম ত্যাগ করছি এবং আগের মতো কুরাইশ সম্প্রদায়ে শামিল হয়ে গেলাম। আমরা তিন শ’ ষাট দেবতাকেই স্বীকার করি। যদি তোরা এই কথা স্বীকার করিস তবে আমি তোদের জীবন ফিরিয়ে দেবো। যদি তা না করিস তবে মৃত্যুর জন্য তৈরি হয়ে যা। তবে এ কথাও মনে রাখিস, মরতে চাইলেও তোদের মৃত্যু সহজ হবে না। কঠিন পীড়াদায়ক কষ্ট দিয়ে তিলে তিলে মারা হবে তোদের।’
‘হে বাতিলের পূজারী আবু সুফিয়ান!’ জায়েদের কণ্ঠ গমগম করে উঠল, ‘আমরা অভিশাপ দেই ঐ পাথরের মূর্তির ওপর, যারা তার ওপর মশা মাছি বসলে তাও তাড়াতে পারে না। আমরা অভিশাপ দেই উজ্জা ও হোবলের ওপর যারা তোদেরকে পরজগতে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করবে। আমরা একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার ইবাদত করি। আর আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ (সা)কে আমাদের জীবন চলার একমাত্র পথপ্রদর্শক ও নেতা মনে করি।
জায়েদ থামতেই ভেসে এলো যোবায়েরের কণ্ঠ, ‘আমার পথও ঐ এক ও অভিন্ন পথ, যা জায়েদ বলেছে। হে মক্কাবাসীরা আমরা সত্যের জন্য কোরবানি হতে পারছি, এ আমাদের সৌভাগ্য। আমরা আল্লাহর কাছ থেকে এসেছিলাম আবার তার কাছেই ফিরে যাচ্ছি। আমরা সেখানে যাচ্ছি সে জায়গা এখান থেকে অনেক বেশি সুন্দর, অনেক বেশি পবিত্র ও মনোরম।’
‘বেঁধে ফেলো এদেরকে খুঁটির সাথে।’ আবু সুফিয়ান আদেশ করলো। ‘এরা যখন মৃত্যুর মজা চাখতে বেশি আগ্রহী, আমরা সে মজাই তাদের দেবো।’
দু’জনের হাত পেছনে খুঁটির সাথে শক্ত করে বাঁধা হলো। আবু সুফিয়ান ঘোড়া ফিরিয়ে ভিড়ের দিকে চলে এলো।
‘উজ্জা ও হোবলের শপথ!’ আবু সুফিয়ান উচ্চস্বরে ভিড় লক্ষ্য করে বললো, ‘আমি আমার সম্প্রদায়ের এমন একজনকেও দেখলাম না যে তার সরদারের মহব্বতে জীবন কোরবানি করতে প্রস্তুত। অথচ দেখো, মুহাম্মদের অনুসারীরা তার নামের ওপর কেমন অকাতরে নিজের জীবন ও প্রাণ নজরানা হিসেবে পেশ করছে।’
হিন্দা একটু দূরে ঘোড়ায় আরোহণ করে দেখছিল এ দৃশ্য। তার পাশে এক গোলাম। এক ক্রীতদাস তার প্রভুকে খুশি করার জন্য জোশের সাথে বর্শা উঁচিয়ে সরদারের আদেশ ছাড়াই বন্দীদের দিকে দ্রুত দৌড়ে গেল এবং খুঁটিতে বাঁধা জায়েদের বুকে এমন জোরে বর্শা বিদ্ধ করলো যে, বর্শাটি পেট দিয়ে ঢুকে পিঠ দিয়ে বেরিয়ে গেল। জায়েদ বিন দিসনা সঙ্গে সঙ্গে শহীদ হয়ে গেলেন।
গোলাম এবার বুক টান করে উৎফুল্লভাবে জনতার দিকে এগিয়ে গেল। তার আশা ছিল দর্শকরা তাকে বাহাবা দেবে এবং তাকে কোলে তুলে নাচবে। কিন্তু জনতা তার ওপর বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠল এবং চিৎকার করে বলতে লাগল, ‘এটা কেমন হলো, এ কি কোন প্রদর্শনী হলো? এতো সহজে এ মুসলমানকে কেন তুমি পরপারে পাঠিয়ে দিলে?’
কেউ চিৎকার করে বলতে লাগল, ‘এই গাধাটা আমাদের সব আনন্দ মাটি করে দিল। এদের নিয়ে একটু খেলা তামাশার সুযোগ দিল না।’
হিন্দা খুব তীক্ষè ও কর্কশ স্বরে চেঁচিয়ে বললো, খুন কর এই গোলামকে। ব্যাটা মুসলমানকে দয়া দেখাতে গেল! তাকে এত তাড়াতাড়ি মেরে ফেললো।’
কয়েকজন লোক তলোয়ার ও বর্শা নিয়ে দৌড়ে গেল গোলামের দিকে। ধাওয়া খেয়ে ছুটে পালাল গোলাম। কিছু লোক ধাওয়াকারীদের পথ আগলে তাদের থামিয়ে দিল।
‘সাবধান! পেছনে সরে যাও সবাই।’ এক অশ্বারোহী খাপ খোলা তলোয়ার নিয়ে ময়দানে ছুটে এসে উত্তেজিত কণ্ঠে বললো, ‘আরবের রক্ত এত হীন নয় যে, দু’জনকে বেঁধে সমস্ত কুরাইশ সম্প্রদায় একত্রিত হবে তাদের মারার জন্য। আল্লাহর কসম, যদি আবু সুফিয়ানের পরিবর্তে আমি নেতা হতাম তবে এ দু’জনকে মুক্ত করে দিতাম। আমাদের যোদ্ধারা কাপুরুষ নয় যে তারা যুদ্ধের বদলে শত্রুদের ধোঁকা দিয়ে এনে তাদের বেঁধে রেখে হত্যা করার জন্য মেতে উঠবে। কুরাইশরা, যদিও এরা এখন আর আমাদের ধর্মে নেই, তবু এদের শরীরে বইছে আমাদেরই রক্ত। শত্রু হলেও এরা এখন আমাদের মেহমান। আমরা এদের খুন করবো ঠিকই তবে এখানে নয় খুন করবো যুদ্ধের ময়দানে।’
‘ও ঠিক কথাই বলছে।’ ভিড়ের মধ্য থেকে অনেকেই চিৎকার দিয়ে উঠলো, ‘শত্রুকে বেঁধে হত্যা করা আরবের নিয়ম বিরুদ্ধ। এতে হত্যাকারীদের কাপুরুষতাই প্রমাণ হয়। এ অপবাদ আমরা নিজ হাতে নিজের ঘাড়ে তুলে নিতে পারি না।’
দর্শকদের নিজেদের মধ্যে শুরু হয়ে গেল বাগি¦তন্ডা। অনেকে বলতে লাগল, ‘আমরা খেলা দেখব। দুশমনকে এমনভাবে মারব যেন সে মরতে মরতে বেঁচে যায়, বাঁচতে বাঁচতে মরে যায়।’
কিছুক্ষণের মধ্যে দর্শকরা দুই দলে ভাগ হয়ে গেল। এক দল যোবায়েরের হত্যার বিরুদ্ধে। তাদের বক্তব্য, এটা আরবে রীতিনীতির বিরোধী, আরবের বুকে কুরাইশদের সম্মান ও মর্যাদাকে হেয়প্রতিপন্ন করার এ এক জঘন্য প্রয়াস। তাদের বীরত্বের বিরুদ্ধে এ এক প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ। সামান্য দু’জন লোককে হত্যা করে তারা যুগ যুগ ধরে কাপুরুষ বলে গালি খেতে নারাজ। আর অন্য দল যোবায়েরকে আঘাতে আঘাতে জর্জরিত করতে চাচ্ছিল। সেই আঘাত খেয়ে সে কেমন ছটফট করে মরে তা দেখার জন্য তারা হয়ে উঠেছিল হিংস্র পশুর মতো।
(চলবে)

SHARE

Leave a Reply