Home প্রতিবেদন সমকালীন কিশোর প্রতিবেদন কিশোর অপরাধ ও পুনর্বাসন উন্নয়নকেন্দ্র যখন জেলখানা

সমকালীন কিশোর প্রতিবেদন কিশোর অপরাধ ও পুনর্বাসন উন্নয়নকেন্দ্র যখন জেলখানা

আব্দুল হাদী আল-হেলালী #

Protibedonহ্যান্ডকাফে ঝুলিয়ে আমাদেরকে নির্যাতন করা হয়। মানুষের মত মারে না, মনে হয় আমরা গরু ছাগল। অন্যায় ছাড়া আমাদের হ্যান্ডকাফে মারা হয়।

এভাবেই নিজেদের করুণ আকুতিগুলো চিরকুটে লিখে জানালা দিয়ে বাইরে মানুষদের উদ্দেশে ছুড়ে মারে টঙ্গী কিশোর উন্নয়নকেন্দ্রের শিশু-কিশোররা। যারা প্রতিনিয়ত মুক্তজীবনে থাকা শিশুদের চঞ্চলতা দেখে নীরবে চোখের জল ফেলে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে এই কেন্দ্রের ২০ জন কিশোর জানালার কাচ ভেঙে নিজেদের শরীর ক্ষতবিক্ষত করে ক্ষোভ প্রকাশ করে। ভয়ঙ্কর এই প্রতিবাদ দেখে আঁতকে ওঠে গোটা জাতি। কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও সংশোধনের লক্ষ্যে গড়ে ওঠা এসব উন্নয়ন কেন্দ্রগুলো এভাবেই ছেয়ে গেছে অনিয়ম আর নির্যাতনে।
বাংলাদেশে টঙ্গী ও যশোরে দু’টি কিশোর উন্নয়নকেন্দ্র এবং গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে একটি কিশোরী উন্নয়নকেন্দ্র আছে; জয়পুরহাটে আরেকটি কিশোর উন্নয়নকেন্দ্র নির্মাণাধীন। কিশোর বা কিশোরী উন্নয়নকেন্দ্রকে আগে বলা হতো সংশোধনকেন্দ্র। কিন্তু সংশোধনের কথা বলা হলে মনে হতে পারে, কোমলমতি শিশুরা হয়তো ভয়ানক কোনো অপরাধ করে ফেলেছে অথবা সংশোধনকেন্দ্রের কিশোর কিশোরীদের মধ্যে ‘গিল্টি ফিলিং’ জমাট বাঁধতে পারে। এ জন্য আন্তর্জাতিক কিছু সংগঠন ও বেসরকারি সংস্থার চাপে বা প্রভাবে ‘সংশোধনকেন্দ্র’ গুলোর নাম পরিবর্তন করে ‘উন্নয়নকেন্দ্র’ করা হয়।
কিন্তু নামই শুধু পরিবর্তন হলো, কিশোর-কিশোরীদের উন্নয়ন যেন অধরাই রয়ে গেল। যেসব কিশোর-কিশোরী অপরাধ করেছে, বা স্বাভাবিক জীবন থেকে বিচ্যুত হয়েছে অথবা যাদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না, তাদেরকে উন্নয়নকেন্দ্রে এনে রাখা হয়। এসব উন্নয়নকেন্দ্রের লক্ষ্য কিশোর আদালত কর্তৃক দেয়া রায় মানবিকতার সঙ্গে কার্যকর করা। বিচ্যুত, অবাধ্য বা দন্ডপ্রাপ্ত কিশোর-কিশোরীদের সংশোধনের মাধ্যমে সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ করে দেওয়া। উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোতে যেসব বিচ্যুত, অবাধ্য ও দন্ডপ্রাপ্ত কিশোর-কিশোরী আছে। তাদের পর্যাপ্ত খাদ্য দিয়ে, খেলাধুলা ও বিনোদনের ব্যবস্থা করে, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যেন তারা আবার সমাজের সুস্থ-স্বাভাবিক ধারার সঙ্গে মিশে যেতে পারে। কিন্তু যে মুহূর্ত থেকে তাদেরকে উন্নয়নকেন্দ্রে আবদ্ধ করে রাখা হয় সেই মুহূর্ত থেকে তারা যেমন ওই স্থানটিকে কারাগার মনে করে তেমনি সমাজের সাধারণ মানুষের কাছে সেটি হয়ে যায় শিশু জেলখানা! এ জন্যই উন্নয়নকেন্দ্র বা কোথাও আবদ্ধ না রেখে বিচ্যুত, অবাধ্য ও লঘু অপরাধে দন্ডপ্রাপ্ত কিশোর-কিশোরীদের প্রবেশন কর্মকর্তা, মহিলা সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা অথবা কোন মহানুভব ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে বৃহত্তর সমাজের মধ্যে রাখা যেতে পারে। এতে করে বিচ্যুত, অবাধ্য ও লঘু দন্ডপ্রাপ্ত কিশোর-কিশোরীদের দ্রুত সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সম্ভাবনা তৈরি হবে। এসব কিশোর-কিশোরীকে মুক্ত সমাজের সুস্থ পরিবেশের পরিবর্তে উন্নয়নকেন্দ্রের আবদ্ধ ও অসুস্থ পরিবেশে রেখে পুনর্বাসনের চেষ্টা হলে পুনর্বাসন তো হবেই না বরং তারা ওই কেন্দ্রগুলো থেকে বেরিয়ে পুরাদস্তুর অপরাধীতে পরিণত হয়ে যেতে পারে। তবে ওই স্থানটিকে দন্ডপ্রাপ্ত কিশোর-কিশোরীদের সত্যিকার পুনর্বাসনকেন্দ্রে পরিণত করতে হলে খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিনোদন ও প্রশিক্ষণসহ তাদের প্রাপ্য সব অধিকার যেমন নিশ্চিত করতে হবে; সাধারণ মানুষের মানসিকতাও বদলাতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোর, কিশোরী, যুবক, প্রবীণ, বৃদ্ধ যেই হোক, তাকে যদি লোহার গ্রিল দেয়া কোন কামরায় বন্দী করে রাখা হয় অথবা বিশাল পাঁচিলের মাঝখানে দিনের পর দিন আবদ্ধ করে রাখা হয়, তাহলে ওই ব্যক্তি আস্তে আস্তে মানসিকভাবে পঙ্গু হয়ে যেতে থাকে।
তদুপরি ওই ব্যক্তি যদি পেট ভরে খেতে না পায়, রাতে ছারপোকার যন্ত্রণায় ঘুমাতে না পারে, অসুখে চিকিৎসা না পায়, জেল কর্মকর্তা বা তত্ত্বাবধায়কের প্রহারে আহত হয়, তাহলে কিভাবে তার সংশোধন হবে, আর কিভাবেই বা নিশ্চিত হবে ‘উন্নয়ন’?
সভ্য ও গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে দন্ডপ্রাপ্ত অপরাধীদের কারাগারে আবদ্ধ না রেখে প্রবেশন, প্যারোলসহ নানা বিকল্প ব্যবহার করা হচ্ছে। ‘ক্রিমিনাল জাস্টিস’ এর ক্ষেত্রে সারা বিশ্ব অপরাধীদের মুক্ত সমাজে রেখে সংশোধন ও পুনর্বাসনের চেষ্টা করছে, অথচ আমরা এখনো কারাগারকেন্দ্রিক ‘পেনাল পলিসি’ নিয়ে অপরাধ প্রতিরোধ ও নির্মূলের চেষ্টা করছি। ‘ক্রিমিনাল জাস্টিস’ এর ক্ষেত্রে যখন শাস্তির চেয়ে সংশোধন ও পুনর্বাসন প্রধান হয়ে উঠেছে, তখন শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে তো আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ, শিশু-কিশোররাই সমাজের ভবিষ্যৎ। তারা যদি বিচ্যুত হয় বা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে তাদের কোন স্থানে আটকে না রেখে বরং মুক্ত সমাজে রেখে পুনর্বাসনের চেষ্টা করা উচিত, যাতে তারা সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে।
বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালের শিশু আইনে কিছু ইতিবাচক বিধান ছিল, কিন্তু তা সঠিকভাবে প্রয়োগ করা হয়নি। ২০১৩ সালে যে আইনটি হয়েছে, সেটির যথাযথ প্রয়োগ হবে কি না, সে ব্যাপারেও সন্দেহ থেকে যায়।
দারিদ্র্য, মাদক ও অস্ত্রের সহজলভ্যতা, সামাজিক রূপান্তর, দ্রুত শিল্পায়ন, নগরায়ন, বিবাহ বিচ্ছেদ, পরিবার ভেঙে যাওয়া, মা বাবা ও সন্তানদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের অভাবসহ নানা কারণে দেশে কিশোর অপরাধ বাড়ছে।
ক্ষমতাসীন, ক্ষমতাপ্রত্যাশীরা তাদের রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত, বাবা মা অফিস-আদালত বা ব্যবসা বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত। মানুষ ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে টাকা আর ভোগের পেছনে। তাই শিশু-কিশোরদের দিকে তাকানোর কেউ নেই, কিশোর-কিশোরীদের দুঃখ কষ্ট, আনন্দ যন্ত্রণা বোঝার কেউ নেই। ফলে তাদের অনেকে বিচ্যুত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবন থেকে। আর তখন তাদের শেষ আশ্রয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে উন্নয়নকেন্দ্র নামক এই জেলখানাগুলো। শিশু-কিশোরদের এ চিত্র কি গভীর কোন সামাজিক সঙ্কট উন্মোচিত করছে না?

SHARE

Leave a Reply