Home উপন্যাস দীনেসের দীন বদল

দীনেসের দীন বদল

[চতুর্থ ও শেষ কিস্তি]

Uponnashছয়.
এক নামে তাকে সবাই চেনে খুনি মাজেদ। এই অঞ্চলের গ্রামে গ্রামে মায়েরা খুনি মাজেদের ভয় দেখিয়ে শিশুদের ঘুম পাড়ান। হঠাৎ করেই পাগল হয়ে গেল সেই খুনি মাজেদ। ব্যাপারটা প্রথম ধরা পড়ে খুনি মাজেদের স্ত্রীর কাছে। এক রাতে মাজেদ খুব বিধ্বস্ত হয়ে ঘরে ফিরে। স্বামীর বিধ্বস্ত চেহারা দেখে মাজেদের স্ত্রী চমকে ওঠে। স্বামীকে সে খুব ভয় পায়। কখন কী করে বসে ঠিক নেই। বিয়ের পর থেকেই দেখে আসছে মাজেদের মেজাজ মর্জি। সারাদিন থাকে নেশার ঘোরে। রাতে বেরিয়ে যায় কাজে। স্বামী যে খুন-খারাবি করে বেড়ায় সে খবর স্ত্রী হিসেবে তার অজানা নয়। কিন্তু লাখো মানুষের আতঙ্ক খুনি মাজেদের আজ এ কী অবস্থা। খুনি মাজেদ যেন আজ অন্য কেউ হয়ে গেছে। প্রতিদিনের মতো ঠাট দেখিয়ে স্ত্রীর সাথে সে কোন কথা বলল না। বড় ঠান্ডা চোখে স্ত্রীর দিকে একবার তাকিয়ে সে মুখে বিড় বিড় করতে করতে ঘরে ঢুকে সটান শুয়ে পড়ল খাটিয়ায়। শুয়ে শুয়েও বিড় বিড় করতে লাগল মাজেদ। অনেক চেষ্টা করেও স্ত্রী বুঝতে পারল না, খুনি মাজেদ বিড়বিড় করে কী বলছে। সারারাত ঘুমায়নি মাজেদ। ঘুমায়নি তার স্ত্রীও। খাটের এক পাশে একটি চেয়ার পেতে স্বামীর কোনো নির্দেশের অপেক্ষায় বসে ছিল মাজেদের স্ত্রী। কিন্তু সারারাত মাজেদের কাছ থেকে কোনো সাড়া আসেনি। খুব ভোরে, ফজরের আজানের সঙ্গে সঙ্গেই মাজেদ চিৎকার করে বিছানায় উঠে বসে। চতুর্দিক থেকে ভেসে আসা আজানের ধ্বনিতে তলিয়ে যায় মাজেদের চিৎকার। থমকে যায় খুনি মাজেদ। আজানের মধ্যে যেন সে হারিয়ে যায়। আজান শেষ হতে না হতেই লাফিয়ে খাট থেকে নেমে পড়ে মাজেদ। তারপর দৌড়াতে থাকে রাস্তার দিকে। দৌড়াতে দৌড়াতে চিৎকার করে বলেÑ খুনি মাজেদ, আমি খুনি মাজেদ। এবার আমি আমারেই খুন কইরা ফালামু। আমি সব ফাঁস কইরা দিমু। এবার আমি আমারেই খুন কইরা ফালামু। অনিমেষরে আমিই খুন করেছি। এবার আমি আমারেই খুন কইরা ফালামু। খুনি মাজেদ দৌড়াতে থাকে আর এসব কথা বলতে থাকে। ‘এবার আমি আমারেই খুন কইরা ফালামু’ কথাটি সে সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠে চিৎকার করে বলে। পাড়ার লোকজন, যারা ঘুম থেকে উঠে পড়েছে এবং যারা এখনও উঠি উঠি করছিল, তারা সবাই মাজেদের চিৎকারে ছুটে আসে। মাজেদ একেকবার একেক দিকে ছুটতে থাকে আর নানান কথা বলতে থাকে। মুহূর্তে মাজেদের পাগলামির কথা এপাড়া থেকে ওপাড়ায় ছড়িয়ে পড়ে। অধিকাংশ মানুষই মাজেদকে ভয় পায়। মাজেদের দু’চারজন ঘনিষ্ঠ মানুষ তাকে এ পাগলামি থেকে বিরত রাখতে গিয়ে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে। সবার মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েÑ খুনি মাজেদ পাগল হয়ে গেছে। খুনি মাজেদের পাগল হয়ে যাওয়ার চেয়েও বেশি চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে অনিমেষের খুনের কাহিনী। মাজেদের মুখ থেকেই ছড়িয়ে পড়ে এসব কথা।

অত্র অঞ্চলের মাদক ব্যবসায়ী চক্রের গুরু স্বপন সাধু মাজেদকে ভাড়া খাটিয়ে অনিমেষকে খুন করিয়েছে। স্বপন সাধু সুকৌশলে মাওলানা হাসানের বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য অনিমেষের কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছে। সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল অনিমেষ। সে বিস্মিত হয়ে বলেছিল, হাসান ভাইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করব আমি? জমি দখলের অভিযোগে? মাদরাসার জন্য সে আমার এক ইঞ্চি জমিও দখল করেনি। তাহলে কেন আমি মিছামিছি মামলা করতে যাবো। অনিমেষকে প্রথমে লোভ দেখানো হয়। মাওলানা হাসানের বিরুদ্ধে মামলা করলে অনিমেষ আরও অনেক জায়গা পাবে। অনিমেষের সরলতার সুযোগে এবং মাওলানা হাসানের সঙ্গে সম্পর্কের সুবাদে অনিমেষের অনেকখানি জমি মাদরাসার নামে দখল করে নিয়েছে মাওলানা হাসান, এ কথা অনিমেষকে বুঝানো হয়। অনিমেষকে আরও বুঝানো হয়, মাদরাসার নামে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জায়গা দখল হয়েছে বলে মামলা করলে অনিমেষ প্রশাসনের কাছে সুযোগ-সুবিধা পাবে। সে ক্ষেত্রে মাদরাসার পুরো জমিটাই অনিমেষ পেয়ে যেতে পারে। ওয়াকফকৃত এ জমিটি এককালে অনিমেষের পূর্ব পুরুষদের ছিল। যিনি ওয়াকফ করেছেন তিনি অনেক আগেই এ জমি অনিমেষের পূর্ব পুরুষদের নিকট থেকে কিনে নিয়েছেন। এ তথ্য অনিমেষের খুনিরা জানতো। কিন্তু অনিমেষকে তারা কিছুতেই ম্যানেজ করতে পারেনি। তাকে অনেক অর্থবিত্তের মালিক বানানোরও লোভ দেখিয়েছে তারা। কিন্তু টলেনি অনিমেষ। শেষ পর্যন্ত লোভের অস্ত্র ছেড়ে দিয়ে তারা হাতে তুলে নিল ভয়ের অস্ত্র। অনিমেষকে ভয় দেখাল তারা। মাওলানা হাসানের বিরুদ্ধে মামলা না করলে মেরে ফেলারও হুমকি দিল তারা। মাওলানা হাসান বা কারো কাছে এসব কথা প্রকাশ করলে তার দুই সন্তানকে চিরতরে হারাতে হবে বলেও হুমকি দিল তারা। অনিমেষ তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিল যে, ব্যাপারটি সে কাউকে জানাবে না। কিন্তু মাওলানা হাসানের বিরুদ্ধে সে কোনো ভাবেই মামলা করবে না। স্বপন সাধু অনিমেষকে আর সুযোগ দিতে চাইলো না। অনিমেষকে বিশ্বাস করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে বলে সে মনে করল না। সুতরাং সিদ্ধান্ত হলো অনিমেষকে দিয়ে যেহেতু কাজ হয়নি অতএব ওকে আর বাঁচিয়ে রাখা ঠিক হবে না। সে মোতাবেক ভাড়া করা হয় খুনি মাজেদকে। মাজেদ তার পরিকল্পনা মোতাবেক অনিমেষের চোখ-মুখ, হাত-পা বেঁধে অপহরণ করে নিয়ে যায়। যেখানে মাজেদ অনিমেষকে হত্যা করে, সেখানে নিয়ে প্রথমে অনিমেষের হাত পায়ের বাঁধন খুলে দেয় মাজেদ। তারপর কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে উপর্যুপরি গুলি করে অনিমেষের বুকে। কাটা বৃক্ষের মতো ঢলে পড়ে যায় অনিমেষ। গোঙাতে গোঙাতে অনিমেষ বলতে থাকে আমি মুসলমান হয়ে গেছি এ কথাটা সবাইকে জানায়া দিও। এ কথা বলেই লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ উচ্চারণ করতে করতে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে অনিমেষ। অনিমেষ খুনের এ কাহিনী খুনি মাজেদই চিৎকার করে করে লোকদের জানিয়ে দেয়। স্বপন সাধুর নামও জানিয়ে দেয় খুনি মাজেদই। স্বপন সাধু মাদকের সা¤্রাজ্য পরিচালনা করে। তার মাদক সা¤্রাজ্য পরিচালনায় বিরাট এক বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন মাওলানা হাসান। মদ-গাঁজা-ইয়াবা- ফেনসিডিলের প্লাবন বয়ে যাচ্ছে এলাকায়। একটা নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে হঠাৎ করেই শুরু হয়েছে প্লাবন। দেখতে না দেখতে অনেক তরতাজা তরুণ সব ঝুঁকে পড়েছে নেশার দিকে।
মাওলানা হাসান এর বিরুদ্ধে শুরু করেছেন সামাজিক প্রতিরোধ। নানামুখী প্রচেষ্টার ফলে অন্তত এ অঞ্চলে এসব নেশাদ্রব্যের প্রবাহ অনেকাংশে হ্রাস করা সম্ভব হয়েছে। কিছু সংখ্যক তরুণ মাওলানা হাসানের প্রচেষ্টায় নেশার জগৎ থেকে ফিরে এসে নেশার বিরুদ্ধে কঠিন অবস্থান নেয়ায় স্বপন সাধুর ব্যবসায় ভাটা পড়েছে। যেসব তরুণ একসময় স্বপন সাধুর আস্তানা থেকে মদ-গাঁজা-ইয়াবা- ফেনসিডিল কিনে এনে নিজেরা খেত এবং বিক্রি করতো ওরা যদি এখন এর বিরুদ্ধে দাঁড়ায় এটা তার মতো কোনো লোকের কিভাবে সহ্য হবে! এসবের জন্য মাওলানা হাসানকেই দায়ী করে স্বপন সাধু। পুলিশ প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতাদের নিয়মিত বখরা দিয়ে স্বপন সাধু তার মাদক সা¤্রাজ্য পরিচালনা করে। মাওলানা হাসানের তৎপরতার কারণেই পাশাপাশি কয়েকটি গ্রাম থেকে সাধু তার মাদক সা¤্রাজ্য গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। এসব এলাকায় সে আবারও ব্যবসায়িক আস্তানা গাড়তে চায়। এ পথে মাওলানা হাসানই তার জন্য বড় বাধা। সুতরাং যে কোন ভাবে তাকে ফাঁসাতে পারলে এসব গ্রামে আবারও সাধুর ব্যবসায়িক আস্তানা খোলা সহজ হয়ে যায়। এ ব্যাপারে পুলিশ প্রশাসন ও রাজনৈতিক উচ্চমহলেরও ইন্ধন আছে। কেননা, কয়েকটি গ্রামে মাদক ব্যবসা প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারাও বখরা পাচ্ছে কম। অতএব স্বপন সাধু তার ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করতে দেরি করে না। মাওলানা হাসানের ব্যাপক জনপ্রিয়তা থাকায় স্বপন সাধু তাকে ভিন্নভাবে ফাঁসানোর আয়োজন করে। এরই মধ্যে সব গোলমাল পাকিয়ে ফেলে খুনি মাজেদ। ‘শালা পাগল হওয়ার আর সময় পেল না’ বলে বাতাসে থু থু নিক্ষেপ করে স্বপন সাধু।

পাগল হওয়ার তিন দিনের মাথায় র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হয় খুনি মাজেদ। তার পাগলামি ক্রমাগত বাড়ছিল। হয় কোথাও বসে বসে সে বিড়বিড় করত, না হয় হাতের কাছে যা পেত তাই নিয়ে ছুটতো আর চিৎকার করে বর্ণনা করতো অনিমেষ হত্যার কাহিনী। র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হওয়ার পরও সে পাগলামি করতে থাকে। র‌্যাবের সঙ্গে ধস্তাধস্তির কারণে শক্ত করে হাত-পা বেঁধে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় খুনি মাজেদকে। মহা কৃতিত্বের পরিচয় দেয় র‌্যাব। ফলাও করে প্রচার করা হয় তাদের এ কৃতিত্বের কাহিনী। ভয়ঙ্কর খুনি মাজেদ ধরা পড়েছে র‌্যাবের হাতে। কিন্তু কোনো গণমাধ্যমেই উঠে আসে না অনিমেষ হত্যার কাহিনী যে কাহিনী খুনি মাজেদ পাগল হওয়া কিংবা গ্রেফতার হওয়ার চেয়েও বেশি চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে গ্রামগুলোতে। পাগলের কথা আমল যোগ্য নয়, এই বিবেচনায় দু-একটি কাগজ ছাড়া কেউই অনিমেষ খুনের ব্যাপারে খুনি মাজেদের স্বীকারোক্তি প্রকাশ করে না। অথচ খুনি মাজেদ যে পাগল হয়ে গেছে সে কথাও তারা গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করে না।
দু’দিন পর দৈনিক পত্রিকা ও টেলিভিশনের মাধ্যমে জানা যায়, র‌্যাবের ক্রসফায়ারে মারা গেছে খুনি মাজেদ। অস্ত্র উদ্ধার করতে গেলে র‌্যারে সঙ্গে তার সহযোগীদের বন্দুকযুদ্ধে কেবলমাত্র খুনি মাজেদই প্রাণে মারা পড়ে। তার সহযোগীরা সকলেই পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

সাত.
মাওলানা হাসানের স্ত্রীর দেয়া ঠিকানাটি হাতে নিয়ে যাত্রা করার পর হঠাৎ দীনেশের মনে হলো সে বড় হয়ে গেছে। সে এখন আর নগণ্য কোন কিশোর নয়। একটা সংসারের দায়িত্ব এখন তার ওপর। তাকে এখন দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। যেভাবেই হোক আবির আর আসলকে খুঁজে বের করতে হবে। মাওলানা হাসান যখন কারাগারে তখন আবির আর আসলের চাইতে বড় কোনো শুভাকাক্সক্ষী নেই দীনেশের। অন্তত তার জানা মতে আর কেউ তাকে এতটা দরদ দিয়ে সাহায্য করবে না। নতুন সাহস বুকে নিয়ে অন্ধকার পথের ওপর সতর্ক নজর ফেলে এগিয়ে যায় দীনেশ। ফজরের আজানের কিছুক্ষণ পর পরই সে পৌঁছায় থানা শহরের বাসস্ট্যান্ডে। এখান থেকে তাকে যেতে হবে জেলা সদরে।
বাসের অপেক্ষায় বসে থেকে দীনেশ তার কর্মপরিকল্পনা গুছিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। মাওলানা হাসানের স্ত্রীর দেয়া ঠিকানার লোকটাকে খুঁজে পেলে আবির আর আসলকে খুঁজে পাওয়া যাবে। তারপর তার প্রথম কাজটি হবে তার আর পরিবারের অন্যান্যদের ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হওয়ার ব্যাপারটা। তার বাবা অনিমেষের শেষ ইচ্ছাটা পূরণই শুধু নয়, বরং মুসলমান হয়ে নিজের জীবনকে সার্থক করাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দীনেশের ভাবনার জগতে বিষয়টি এভাবেই ধরা পড়ে। তারপর দীনেশ তার পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে ভাবে। এখন সংসার চালাতে হবে তাকেই। বয়স নয় বাস্তবতাই মুখ্য। মা, ঠাকুর মা আর ছোট বোনটার জন্য তাকেই করতে হবে অন্নসংস্থান। মানুষের সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে তো আর বেশি দিন চলা যাবে না। কিছু একটা তাকে করতে হবে। তার বয়সী অনেক ছেলেই আয় রোজগার করে সংসার চালায়। সুতরাং তাকেও তাই করতে হবে। জেলা সদরেই কোন একটা কাজ জোগাড় করার চেষ্টা করতে হবে। ঠিকানার লোকটা এ ব্যাপারে সাহায্য করতে পারবেন হয়তো। লেখাপড়া চালিয়ে নেয়া তার পক্ষে সম্ভব হবে না বলে স্থির করে দীনেশ। কিছু একটা কাজের জোগাড় তাকে করতেই হবে।
বাস হেলপারের ডাক শুনে চিন্তার জগৎ থেকে ফিরে আসে দীনেশ। তড়িঘড়ি করে বাসে ওঠে সে। বাস ছেড়ে দেয় জেলা সদরের উদ্দেশে। সকাল বেলার প্রথম ট্রিপ হওয়ায় বাসে কোনো ভিড় নেই। কয়েকজন মাত্র যাত্রী এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে। দীনেশ বাসের নির্জন কোণে একটি ডাবল সিট একাই দখল করে বসে পড়ে। চলতি বাসের মধ্যে দীনেশ আবারও ভাবনার জগতে ঢুকে পড়ে। বাসটি জেলা সদরে পৌঁছতে সময় লেগে যায় ঘন্টা খানেক। বাস থেকে নেমেই দীনেশ এ দোকানদারের সঙ্গে কথা বলে ঠিকানাটির লোকেশন জেনে নেয়। ঠিকানার সঙ্গে একটি মোবাইল নাম্বার থাকলেও দীনেশ মোবাইলে ফোন করবে না বলে সিদ্ধান্ত নেয়। তার হাতে কোনো মোবাইল নেই। ইচ্ছ করলেই দু’ টাকা দিয়ে যে কোন মোবাইল ফোনের দোকান থেকে ফোন করা যায়। কিন্তু ফোন না করে দীনেশ সরাসরি ওই ঠিকানার উদ্দেশে যাত্রা করে। বাসস্ট্যান্ড থেকে খুব বেশি দূর যেতে হয় না দীনেশকে। খুব সহজেই সে ওই ঠিকানায় পৌঁছে যায়। দরজার পাল্লায় আস্তে আস্তে টোকা দেয় দীনেশ। কয়েকবার টোকা দেয়ার পর দরজা খুলে যায়। মধ্য বয়সী ক্লিনসেভ করা এক ভদ্রলোক দরজা খুলে দীনেশের দিকে তাকান। ভদ্রলোকের পরনে অফিসের পোশাক। মনে হচ্ছে অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে কারো অপেক্ষায় বসে ছিলেন। দীনেশ আস্তে করে সালাম দিয়ে ঠিকানা লেখা কাগজটি এগিয়ে দেয় ভদ্রলোকের দিকে। ভদ্রলোক কাগজটি হাতে নিতে নিতেই বলে ওঠেনÑ ‘তুমিই দীনেশ।’ তারপর নজর বুলান কাগজটির দিকে। দীনেশ আস্তে করে জবাব দেয়Ñ জি, আমিই দীনেশ। আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন …। দীনেশ কথা শেষ করতে পারে না। হাত তুলে থামিয়ে দেন ভদ্রলোক। আমি সবই জানি। তুমি ভেতরে এসো। আমি তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। অফিসে যাওয়ার আগে আমাকে কয়েক জায়গায় যেতে হবে। তুমি থাকবে আমার সাথে। এসো একসঙ্গে নাস্তা করে বেরিয়ে পড়ি। একটানা কথা বলতে বলতে ভদ্রলোক ঘরের ভেতরের দিকে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালেন। দীনেশ কাদামাখা পা নিয়ে ঘরে ঢুকতে ইতস্তত করছিল। ভদ্রলোক ঘাড় ঘুরিয়ে দীনেশের ইতস্ততভাব লক্ষ্য করে বললেন, ঢুকে পড়। ঢুকে পড়। বাম দিকে ইশারা করে বললেন- ওদিকে ওয়াশরুম আছে। তুমি ভালো করে মুখ হাত ধুয়ে এসো। তাড়াহুড়ার দরকার নেই। আমি অপেক্ষা করছি। সারারাতের নির্ঘুম, ক্লান্ত-শ্রান্ত দীনেশ অনেকক্ষণ সময় নিয়ে পরিষ্কার হয়ে ওয়াশ রুম থেকে বেরিয়ে আসে। ভদ্রলোক একটি টাওয়াল হাতে দাঁড়িয়েছিলেন। ওটা দীনেশের দিকে এগিয়ে দিয়ে তিনি নাস্তার টেবিলে গিয়ে বসেন। দীনেশ ভদ্রলোকের সহজিয়া আচরণে নিজেও সহজ হয়ে ওঠে। হাত-মুখ মুছতে মুছতে সেও বসে পড়ে নাস্তার টেবিলে। ক্ষুধার্ত দীনেশের কাছে নাস্তার এই আন্তরিকতাপূর্ণ আয়োজন খুবই ভালো লাগে। সহজ স্বচ্ছন্দে সে পেটপুরে নাস্তা করে। খাবার টেবিলে তেমন কোন কথাই হয় না দু’জনের মধ্যে। নাস্তা শেষে দীনেশকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন ভদ্রলোক।

এই ভদ্রলোক হচ্ছেন জেলা শহরের নামকরা উকিল অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান। তিনি মাওলানা হাসানের আপন মামাতো ভাই। মাওলানা হাসানের পক্ষে তিনি সহযোগী উকিলদের নিয়ে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। ফজরের পরপরই দীনেশের ব্যাপারে অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমানকে সব কথা মোবাইল ফোনে জানিয়ে দিয়েছিলেন মাওলানা হাসানের স্ত্রী। সব কথা জানতে পেরে অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান নিজেও বিস্মিত হয়েছেন। আজই মাওলানা হাসানের সঙ্গে কারাগারে সাক্ষাৎ করে সব কথা জানিয়ে দেবেন বলে মাওলানা হাসানের স্ত্রীকে জানান অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান।

এ দিকে যে রাতে দীনেশ বাড়ি থেকে গোপনে বেরিয়ে যায় সে রাতেই খুনি মাজেদ পাগল হয়ে যায়। পরদিন সকালে খুনি মাজেদের পাগলামির কথা এলাকাবাসী জানলেও দীনেশের বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার ব্যাপারটি জানতে পারে সন্ধ্যায়। পুলিশের ভয়ে ওই বাড়িতে কারো যাতায়াত না থাকায় ব্যাপারটি সকাল থেকে কেউ জানতে পারেনি। বিকেলের দিকে যখন থানা থেকে অতিরিক্ত পুলিশ এসে দীনেশের খোঁজে গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে তল্লাশি শুরু করে, তখনই এলাকাবাসী ব্যাপারটি টের পায়। প্রকৃত ঘটনা মাওলানা হাসানের স্ত্রী ছাড়া অন্য কেউ না জানার কারণে এ নিয়ে গ্রামে নানান কথা ছড়াতে থাকে। কেউ বলে, বাপের মতো ছেলেকেও মনে হয় ওরা গুম করে মেরে ফেলেছে। পুলিশি পাহারা থাকার পরও এই অবিশ্বাস্য ঘটনা কিভাবে ঘটল, এ নিয়ে এলাকায় সৃষ্টি হয় আরেক চাঞ্চল্য। অনেকে আবার মনে করে আবির ও আসলের সহযোগিতায় দীনেশ বাড়ি ছেড়ে কোথাও পালিয়ে গেছে। মাওলানা হাসানের স্ত্রীও কারো কাছে বিষয়টি প্রকাশ করেন না। পুলিশ প্রশাসন থেকে গ্রামের লোকদের হুমকি দেয়া হয়। আবির ও আসলকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়ার জন্য গ্রামের লোকদের দায়ী করে তারা। মাওলানা হাসানের সহযোগী আবির ও আসলই দীনেশকে গুম করেছে বলে অভিযোগ করে পুলিশ। চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে আবির, আসল আর দীনেশকে খুঁজে বের করে দিতে না পারলে এ গ্রামের অধিকাংশ মানুষের বিরুদ্ধে মামলা করবে তারা। দু’চার-পাঁচ হাজার মানুষের বিরুদ্ধে মামলা করতেও দ্বিধা করবে না তারা। এতে তাদের সুবিধাই হবে। যাকে-তাকে ধরে নিয়ে টাকা আদায় করতে পারবে। টাকা না পেলে সোজা হাজতখানায়।
দীনেশের হারিয়ে যাওয়ার পর গ্রামের লোকেরা আরও আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। লাখো মানুষের আতঙ্ক খুনি মাজেদ ক্রসফায়ারে মারা গেলেও তার চেয়ে অনেক বড় আতঙ্ক হয়ে দেখা দেয় পুলিশ প্রশাসন আর মাদকচক্র। দ্রুতই মাদকের চালান আসতে শুরু করে গ্রামে। সচেতন মহল তাকিয়ে তাকিয়ে দেখা ছাড়া আগের মতো আর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে না। দীনেশের বাড়ি থেকে পুলিশ পাহারা তুলে নেয়া হয়। কিন্তু এলাকায় যখন তখন টহল দিতে শুরু করে পুলিশ। মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তাদের দহরম মহরম সম্পর্ক। এলাকার কয়েকজন পুরনো মাদক ব্যবসায়ী আবার তাদের ব্যবসা খুলে বসে। পুলিশ নিয়মিত এসে বখরা নিয়ে যায়। আবির ও আসলসহ কয়েকজন তথাকথিত সহযোগীর বিরুদ্ধে দীনেশকে অপহরণের মামলা করে পুলিশ।
স্বপন সাধুও হাত গুটিয়ে বসে থাকে না। সেও তার নিজস্ব বাহিনী লাগিয়ে আবির, আসল আর দীনেশকে খুঁজতে থাকে। সহযোগীদের নির্দেশ দিয়ে রাখে সেÑ ওদের যাকে যেখানে পাওয়া যাবে তাকেই অপহরণ করে নিয়ে যেতে হবে আসল ঠিকানায়।
আট.
দুপুরের মধ্যেই খুনি মাজেদের পাগল হয়ে যাওয়ার ঘটনা জানতে পারে জেলা সদরে অবস্থানরত আবির, আসল ও দীনেশ। অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমানই তাদেরকে ঘটনাটি জানায়। শ্রান্ত-ক্লান্ত দীনেশ তখন অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমানের এক বন্ধুর বাসায় ঘুমিয়ে ছিল। আবির ও আসল সেখানে গিয়ে দীনেশকে ঘুম থেকে জাগিয়ে গোটা ঘটনাটি তার কাছে বর্ণনা করে। সব শুনে দীনেশ গুম হয়ে বসে থাকে। তার মুখ ফুটে কোন কথাই বের হয় না। আসল ফোঁস করে বলে ওঠেÑ দীনেশ, স্বপন সাধুকে আমরা ছাড়ব না। ছাড়তে হলে দাদ নিয়েই তবে ছাড়ব। আসলের এই ফোঁস ফোসানিতে বিরক্ত হয় আবিরÑ আমরাই যেখানে ঘর ছাড়া সেখানে স্বপন সাধুকে ছাড়া না ছাড়ার ব্যাপারটাই অবান্তর। আগে আমাদের সবকিছু গুছিয়ে নিতে হবে। স্বপন সাধুর চক্রান্তের জাল কতদূর পর্যন্ত বিস্তারিত হয়েছে সেটাও তো আমরা জানি না। সুতরাং পরের চিন্তা আগে করিস না আসল, আগের চিন্তা আগে কর। আসলের মাথায় রক্ত টগবগ করে ফুটে ওঠে আবিরের কথায়Ñ না আবির, আগে আমরা স্বপন সাধুকে খুন করব। তারপর পরের চিন্তা পরে করব। আসলের কথায় আবিরও উত্তেজিত হয়ে ওঠেÑ তুই সুষ্ঠুভাবে কাজ করার পক্ষে না, না অসুষ্ঠুভাবে। আমরা প্রচলিত আইনের বাইরে কোনো পদক্ষেপই গ্রহণ করব না। স্বপন সাধুর মতো ধুরন্ধর মাদক ব্যবসায়ীকে তার নিজের জালেই জড়াতে হবে। পুলিশ প্রশাসনের ভালো কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ করতে হবে। তাদের মাধ্যমেই আমরা যা করার করব। আবিরের কথা শুনে নাক সিটকায় আসলÑ আরে বাব্বা, পুলিশ প্রশাসনে আবার ভালো। আরে গাধা, ভালো মানুষদের কখনো পুলিশে চাকরি করতে শুনেছিস তুই। সেই ব্রিটিশ আমল থেকে আমি তো কোন ভাল মানুষকে পুলিশে চাকরি করতে শুনিনি। আসল বক্রোক্তির ঢঙে হেসে ফেলে আবির, হেসে ওঠে দীনেশও। আসলের কথা শুনে হাসলেও জবাব দিতে ছাড়ে না আবিরÑ শোন আসল, তোরে আমি তথ্য প্রমাণসহ বলে দিতে পারব পুলিশের সততার কারণে কত কত ভালো কাজ হয়েছে। সুতরাং এ বিষয় নিয়ে প্যাঁচাল না করে তুই চুপ যা। ফজলু আংকেল যেভাবে বলে এখন আমাদের সেভাবেই কাজ করতে হবে। বোকামি করা যাবে না।’ অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমানই ওদের ফজলু আংকেল।
বিকেলে ফজলু আংকেলের সাথে বসে আবির, আসল আর দীনেশ যখন কর্মপরিকল্পনা করছিল ঠিক সে সময়ই ফজলু আংকেলের মোবাইল ফোনে সংবাদ আসেÑ দীনেশকে হন্যে হয়ে খুঁজছে পুলিশ। সংবাদটি সবাইকে জানিয়ে ফজলু আংকেল বলেনÑ শুধু দীনেশ নয়, তোমরাও এখন মারাত্মক রিস্কের মধ্যে আছো। স্বপন সাধুও তোমাদের পেছনে লোক লাগিয়ে দিতে পারে। সুতরাং আমি ভাবছি তোমাদের তিনজনকেই ঢাকায় পাঠিয়ে দেবো। এই শহরের আদালতকে মনে হয় না ন্যায়ের পক্ষে থাকতে দেয়া হবে। কায়েমি স্বার্থবাদীরা সবকিছু উল্টে-পাল্টে দেবে। সুতরাং আমাদের সব ব্যবস্থা করতে হবে ঢাকায় গিয়ে। তোমরা যদি রাজি থাক, তাহলে দু-একদিনের মধ্যেই আমি সে ব্যবস্থা করব। আবির, আসল ও দীনেশ বিকল্প কোনো পথ নেই দেখে ফজলু আংকেলের প্রস্তাবই সমর্থন করে একবাক্যে।
জেলা শহরে নানা উদ্বেগ উৎকণ্ঠার মধ্যে আরও তিনদিন কেটে যায় ওদের। এই তিনদিনের মধ্যে কোনো না কোনো কৌশলে দীনেশের মা, ঠাকুর মা আর ছোট বোনকে জেলা সদরে নিয়ে আসার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু পুলিশ ও সাধু বাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে এ কাজ করা সম্ভব হয় না। দীনেশদের বাড়ির ওপরে গোপনে গোপনে চব্বিশ ঘন্টা নজরদারি করা হয়। আবির, আসল ও দীনেশ এত কিছুর পরও রিস্ক নিতে চেয়েছে। কিন্তু সবার নিরাপত্তা একযোগে বিঘিœত হওয়ার ভয়ে অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান ওদেরকে এই রিস্ক নেয়া থেকে নিরস্ত করেন। প্রয়োজনীয় সকল প্রস্তুতি সেরে অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান আবির, আসল আর দীনেশকে নিয়ে রাতের গাড়িতে ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা করেন। উচ্চ আদালতের বেশ কয়েকজন আইনজীবীর সঙ্গে গোটা ব্যাপারটা নিয়ে এরই মধ্যে আলোচনা করেছেন তিনি। সে মোতাবেকই আবির, আসল ও দীনেশের সঙ্গে কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছেন। ঢাকার উদ্দেশে যাত্রার পূর্ব মুহূর্তে জেলা সদরের বড় মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছে কালেমা পাঠ করে আনুষ্ঠানিকভাবে মুসলমান হয়েছে দীনেশ। এশার নামাজের জামাত শেষ হওয়ার অনেকক্ষণ পরে মসজিদে বসেই দীনেশকে কালেমা পাঠ করান ইমাম সাহেব। অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান, আবির ও আসল কেউই তখন পর্যন্ত এশার সালাত আদায় করেনি। দীনেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হওয়ার পর অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমানের ইমামতিতে সানি জামাতে নও মুসলিম দীন মুহম্মদকে সঙ্গে নিয়ে এশার সালাত আদায় করে আবির ও আসল। ওদের এশার সালাত শেষ হলে ইমাম সাহেবের ইমামতিতে সকলে মিলে দুই রাকাত নফল সালাত আদায় শেষে দীনেশের জন্য বিশেষভাবে দোয়া করা হয়। সালাত আদায় করে দীনেশ যখন মসজিদ থেকে বেরিয়ে আসে তখন তার চোখে মুখে নতুন ঔজ্জ্বল্য। প্রশান্তিতে ভরপুর হয়ে ওঠে দীনেশের হৃদয়টা। মনে হয় কোনো শান্ত-¯িœগ্ধ সরোবরের বুকে পরম প্রশান্তিতে ফুটে আছে একটি পদ্মফুল। সেই পদ্মফুলটিই যেন দীনেশের হৃদয়। দীনেশ এক পরম নির্ভরতা লাভ করে নিজের ভেতরে। ইমাম সাহেবের বুকের উষ্ণতা লেগে আছে দীনেশের বুকে। সালাত শেষে সবাই কোলাকুলি করেছে দীনেশের সঙ্গে। ইমাম সাহেব অনেকক্ষণ দীনেশকে বুকে জড়িয়ে রেখেছিলেন। একটি স্মার্ট ফোনে সকল দৃশ্যই ক্যামেরাবন্দী করেছে আসল। ইমাম সাহেব বেশ কিছু উপদেশ দিয়েছেন দীনেশকে। সবগুলো উপদেশই দীনেশের ভালো লেগেছে। মসজিদ থেকে বেরিয়ে অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমানের এক বন্ধুর বাসায় রাতের খাবার খেয়েছে সবাই। সেখানেও অভিভূত হয়েছে দীনেশ। মানুষ মানুষকে এতটা আপন করে নিতে পারে রক্তের বন্ধন কিংবা আত্মীয়ের কোনো বন্ধন ছাড়াই, এতটা আগে কখনোই বুঝতে পারেনি দীনেশ। ইমাম সাহেব তার নামটি পরিবর্তন না করে নামের আগে দু’টি শব্দ জুড়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এখন থেকে তুমি দ্বীন মুহম্মদ দীনেশ। এতেও দীনেশ অভিভূত হয়েছে। তার নামের দীনেশ শব্দটি যদি সম্পূর্ণ বাদও দিয়ে দিতেন ইমাম সাহেব তাহলেও দীনেশ কিছু মনে করত না। বরং তার নাম পুরো পরিবর্তন করে ফেলার মানসিক প্রস্তুতি ছিল তার। দীনেশ নামটি তার নামের সাথে থেকে যাবে এমনটা সে কখনও ভাবেনি। মহাসত্যের সন্ধান পেয়ে মনে মনে সে বারবার আল্লাহতায়ালার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।

রাতে গাড়িতে ওঠার আগেই অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান মাওলানা হাসানের স্ত্রীকে ফোনে সব ঘটনা জানিয়ে দেন। রাতের গাড়িতে ঢাকা যাত্রার কথাও জানান তিনি। নিজের স্ত্রীকেও ফোন করে তিনি সব জানিয়ে দেন। বিশ্বস্ত বন্ধুবান্ধব ও শুভাকাক্সক্ষী মহলকে তিনি সবিস্তারে সব জানান। কিন্তু অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান আঁচই করতে পারেননি যে, তিনি তার সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে মস্তবড় এক বিপদে পড়তে যাচ্ছেন। তাদের নাইটকোচটি নিয়ম মোতাবেক চা বিরতির জন্য একটি হাইওয়ে রেস্টুরেন্টে থামে। অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান আবির, আসল আর দীনেশকে নিয়ে চা খাওয়া এবং আড়মোড়া ভাঙার জন্য অন্যান্য যাত্রীদের সাথে নেমে আসেন কোচটি থেকে।
ওরা চারজন বাস থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গেই চতুর্দিক থেকে একদল অস্ত্রধারী তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে জনসম্মুখে ওরা পিছমোড় করে চারজনের হাত বাঁধে, পা বাঁধে, নাক খোলা রেখে ওদের মুখও বেঁধে ফেলা হয়। ওদের চারজনের সবগুলো ব্যাগ, ব্রিফকেস গাড়ি থেকে নামিয়ে দু’টি বড় মাইক্রোবাসে করে ওদেরকে তুলে নিয়ে যায় অস্ত্রধারীরা। রেস্টুরেন্টের সামনে ভিড় করা নাইটকোচের যাত্রীরা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন।
পরদিন সকালে ওদের খোঁজ না পেয়ে ঢাকা থেকে শুভাকাক্সক্ষীরা ব্যাপক খোঁজাখুঁজি করে জানতে পারে এ ঘটনা। তারপরই এ খবর চলে যায় গ্রামে। আবিরদের গ্রামজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। দীনেশের বাড়িতে আবার ওঠে ক্রন্দনরোল। গ্রামের অসহায় শান্তিপ্রিয় মানুষগুলোর চোখের সামনে আলো নিভে যায়, নেমে আসে অন্ধকার।

তারপর পার হয়ে গেছে একটি বছর, সন্ধান মেলেনি কারো। শীতের এক গভীর রাতে আগুন লেগে গেছে দীনেশদের ছোট ঘরটিতে। সে আগুনে পুড়ে মারা গেছে দীনেশের মা, ঠাকুর মা ও ছোট বোনটি। যাবজ্জীবন কারাদন্ড হয়েছে মাওলানা হাসানের। গ্রামে নেশার সা¤্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, বিদায় নিয়েছে নীতি-নৈতিকতা। এখন ঘরে ঘরে নেশাগ্রস্ত তরুণ, জুয়াড়ির দল, সকাল-বিকাল মারপিট ছাড়া তেমন কিছুই না। খুন মাঝে মাঝেই হচ্ছে। ধর্ষণ, অপহরণ নিয়মিত। চাঁদাবাজি সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সর্বক্ষণই গ্রামগুলোর ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে বিষাক্ত অশান্তির বাতাস। অনিমেষ, দীনেশ, আবির, আসল আর অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমানের কথা প্রকাশ্যে কেউ মুখে আনছে না। বিপদের সমূহ সম্ভাবনা দেখে সাধারণ মানুষ মুখে কুলুপ এঁটেছে। তবে কেউ কেউ এখনো আশাবাদী হতে চায়। তারা মনে করে আবির, আসল, দীনেশÑ ওরা আবার ফিরে আসবে। মাওলানা হাসান মুক্তি পাবেন। অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমানও ফিরে আসবেন। এ বিষাক্ত বাতাস দূর হয়ে যাবে। এটা কি সত্যিই আশা; নাকি আশার মরীচিকা- কেউ বলতে পারে না।
[সমাপ্ত]

SHARE

Leave a Reply