Home নাটিকা স্টেশন কুলি

স্টেশন কুলি

আহসান হাবীব খান #

Natikaজনৈক ভদ্রলোক হাবীব। তার বন্ধু সাজুকে সঙ্গে নিয়ে কোথাও যাওয়ার উদ্দেশে রেলস্টেশনে এসে উপস্থিত হয়। সঙ্গে বড় ব্যাগ বা ভারী বোঝা দেখে অনুমান করা যায় যে তারা দূরে কোথাও যাচ্ছেন। তবে সাজুর ব্যাগ তেমন ভারী নয়। স্টেশন প্লাটফর্মের একটি বেঞ্চিতে এসে বসে দু’জনে। পেছনে কুলি এসে ভারী ব্যাগটি ধপ করে তাদের সামনে রাখবে। এতে দু’জনেই এক সাথে আঁতকে উঠবে..।

হাবীব     :    আরে-আরে-আরে! করিস কি! ধীরে ধীরে রাখ, ভেতরে তো সব খিচুরি পাকিয়ে যাবে!
কুলি     :     সরি স্যার, বুঝবার পারি নাই। তয় বোঝাডা খুব ভারী, অনেক কষ্ট হইছে, পাঁচটা টেকা বাড়ায়া দিয়েন।
সাজু     :     (বিরক্ত হয়ে) কি ধরনের ঔদ্ধত্য দেখেছিস? একেতো মাথা থেকে ব্যাগটা ফেলে দিলো, তার উপর আবার পাঁচ টাকা বাড়িয়ে..!
কুলি     :     রাগ করেন ক্যান স্যার? আমি ছোড মানুষ, হেই তুলনায় ব্যাগডা আসলেই ভারী। আর ভারী না হইলে কি আমারে দিতেন? আপনেরাই তো আনতেন।
সাজু     :     দেখলি, দেখলি, কিভাবে মুখে মুখে কথা বলে! বেয়াদব! চুরি আরো সিনাজুড়ি!
হাবীব     :     (ধমকে) চুপ করতো তুই। তোর এই এক দোষ, যার তার সঙ্গে লেগে পড়িস।
সাজু     :     কী! ওর পক্ষ হয়ে তুই আমাকে ধমক দিচ্ছিস! ওই ছোট লোকের বাচ্চা কুলির জন্য তোর এত দরদ!
কুলি     :     (রেগে) এই মিয়া, যা কওনের আমারে কন। বাপ তুইল্যা কথা কইয়েন না। ফল ভালা হইবো না কইলাম। (উচ্চকণ্ঠে তাদের কথা শুনে আশপাশে চলতে থাকা আরও দু-একজন কুলি এসে দাঁড়াবে। তাদের দু’জনের মধ্যে বাকবিতন্ডা আরো বাড়তে থাকে।)
সাজু     :     (সংলাপ স্পষ্ট হবে) তবে রে বেয়াদব! পাজির পা-ঝাড়া ! দাঁড়া তোকে দেখাচ্ছি মজা…
কুলি     :    (সাজুর কথার ওপর দিয়ে) কিছু হইতেই হাত তুইলেন না। এই অভ্যাস ভালা না।
সাজু    :    কত বড় সাহস! আমাকে শাসায়! আজকে তোকে আমি… (রাগে সাজু আর কথা বলতে পারে না।)
কুলি    :    হাত তুললে হাতটা আর আস্ত থাকবো না। (একেবারে হাতাহাতির পর্যায়ে চলে যায়। অবস্থা বেগতিক দেখে হাবীব রাজুকে কাঁধে চাপ দিয়ে বসিয়ে দেয়। এতে পরিবেশ কিছুটা শান্ত হয়।)
হাবীব     :     রাজু তুই বসবি? আশ্চর্য! তোর কি স্থান-কালের জ্ঞান সব লোপ পেয়েছে?
রাজু     :     হ্যাঁ পেয়েছে, রেগে গেলে আমার হিতাহিত জ্ঞান থাকে না।
হাবীব     :     আর হিতাহিত জ্ঞানশূন্য মানুুষের ঘাড়েই শয়তান ভর করে বেশি। তুই তোর জায়গায় চুপ করে বস, একটি কথাও বলবি না। (কুলিকে উদ্দেশ করে) এই, তুমি আমার কাছে আস। (কুলি এগিয়ে আসবে) আরো কাছে। (একেবারে কাছে এসে দাঁড়াবে) তোমার নাম কী?
কুলি     :    নাম দিয়া কি অইবো?
হাবীব     :     আহা বলই না, তোমার নামটা জানার ইচ্ছা আমার হতে পারে না ?
কুলি     :     জে বাদশা, বাদশা মিয়া।
হাবীব     :     (পকেট থেকে চুয়িংগাম বের করে) বাহ! বাদশা মিয়া। নাও, এটা খাও। (কুলির সঙ্গে খাতির জমাতে দেখে রাজু ভীষণ অস্বস্তিতে ভুগবে)
রাজু     :     (কানের কাছে) পায়ে ধর, পায়ে ধর।
কুলি     :     (চুয়িংগাম দেখে) কি এইডা?
হাবীব    :     চুয়িংগাম, চিবোও মুখে রস আসবে।
কুলি     :     (শুকনো হাসি হেসে) হু, পেট শুকায়া থাকলে মুখে রস আইয়ে না স্যার। এই রবাট চিবায়া আমার কোন কাম নাই। তার চেয়ে কম বেশি যাই দেন, কয়ডা টেহা দেন, চইলা যাই। (পরিবেশ পুরোপুরি শান্ত হয়ে যাবে। আশপাশে জড়ো হওয়া কুলিরাও একে একে সরে যেতে থাকে।)
হাবীব     :     না না, কম দেবো না। আচ্ছা বাদশা মিয়া, এখানে ধারে কাছে কোথাও চা পাওয়া যায়? আমাকে এক কাপ চা খাওয়াতে পার?
কুলি     :     জে খাওয়াইতে পারুম।
হাবীব     :     কিরে সাজু, তুইও খাবি?
সাজু     :     (রেগে) না, ওই অমৃত তুই-ই খা।
হাবীব     :     (হেসে উঠবে) যাও বাদশা মিয়া, তুমি আমার জন্যই এক কাপ চা নিয়ে আস। (টাকা নিয়ে চা আনার জন্য ছুটে যাবে। সাজু ক্রুর দৃষ্টিতে হাবীবের দিকে তাকিয়ে থাকে। হাবীব সেটা খেয়াল করে।)
হাবীব     :     কী, কিছু বলবি? ও রকম প্রশ্নবোধক চোখে তাকিয়ে আছিস যে?
সাজু     :     না, কী বলব? তুই হচ্ছিস গিয়ে মহাপুরুষ! তোর সাথে চলছি এইতো বেশি। আবার বলবো কী?
হাবীব     :     শোন, এদের সঙ্গে রাগ করা তোর সাজে না। জন্ম থেকেই পথে পথে মানুষ ওরা। যে ভালবাসায় মানুষের আচরণে শিষ্টতা আসে, তা এরা কোনদিন কোথাও পায়নি। শিখবে কোত্থেকে বল? তাই তুই এদেরকে যেমনটি দিবি ঠিক তেমনটি ফেরত পাবি। দেখলিতো, একটু হাসিমুখে কথা বললাম তার তাতেই কেমন গলে গেল। আর ৫/১০ টাকা এদেরকে বেশি দিলেইবা ক্ষতি কী? দৈনিক সিগারেট ফুঁকেই তো শ-পাঁচেক টাকা উড়িয়ে দিস।
সাজু     :     (কথাগুলো গুরুত্ব সহকারে শুনবে) আসলে তুই যেভাবে চিন্তা করিস, সবার পক্ষে সেভাবে সম্ভব না।
(এর মধ্যে কুলি চা নিয়ে চলে আসবে)
কুলি    :    (চা বাড়িয়ে) স্যার আপনের চা।
হাবীব     :     নিয়ে এসেছ? দাও। (এক চুমুক মুখে দিবে) ভালোইতো, কোথায় বানায় এই চা?
কুলি     :     এইতো, ইস্টিশনের পুব পারে।
হাবীব     :     আচ্ছা বাদশা মিয়া, তোমাকে যদি আমি আরও কিছুক্ষণ, ও সবধহ ট্রেন ছেড়ে যাওয়া পর্যন্ত আমার কাছে থাকতে বলি, তুমি থাকবে?
কুলি     :     খুব থাকুম, স্যার।
হাবীব     :     কেন থাকবে? তোমার কাজের ক্ষতি হবে না? তুমি তো এই সময়ে আরও কয়েকটা মাল ক্যারি করে কিছু টাকা ইনকাম করতে পার।
কুলি     :     কামতো রোজই করি, টেহা পয়সাও কমবেশি কিছু না কিছু পাই। তয় আপনের মতো এই রহম সুন্দর কথা কোনদিনও পাই না। আপনে খুব ভালা মানুষ স্যার।
হাবীব     :     তুমি কি করে বুঝলে আমি ভাল মানুষ? মিষ্টি করে কথা বললেই কেউ ভাল হয়ে যায়? আমি তো খারাপ লোকও হতে পারি। (কুলি খানিকটা ভাবল। তারপর হাসি মুখে উত্তর দেয়। বোঝা যায় তার মনে আর কোন খেদ নেই।)
কুলি :         স্যার, মানুষের মনডা হইলো গিয়া বিনা তারের টেলিফোনের মত। উল্ডা-সিধা কিছু ঘটতে গেলেই মনের ভেতরে কিরিং কিরিং কইরা ওঠে। আপনের সাথে কথা কওনের সময় আমার মনের মধ্যে কিরিং কিরিং করে নাই। আর হেতেই বুঝবার পারছি, আপনে মানুষটা ফেরেশ।
হাবীব     :     বা-ব্বা! এ যে দেখছি রীতিমতো–
সাজু     :     (ব্যঙ্গ করে) শিখ, শিখ, ওর কাছ থেকেই ফিলোসফি শিখ।
হাবীব     :     কিন্তু বাদশা, তুমি যে বড় বড় লোকদের চোখে চোখে তাকিয়ে মেজাজ গরম করে কথা বলো, এটা তো-
কুলি     :     (মুখের কথা কেড়ে নিয়ে) ঠিক না। সেইটা আমিও বুঝবার পারি। কিন্তু কী করুম স্যার, কন। ধৈর্য ধরার অভ্যাসতো আমাদের মধ্যে গইড়া উঠে নাই। কেউ কিছু কইলেই মাথা গরম হইয়া যায়। হের লাইগ্যাইতো আমরা গরিব। (এতক্ষণে হাবীবের চা শেষ হয়ে আসবে। সে বাঁ-হাতে কুলিকে চায়ের কাপটা বুঝিয়ে দেয়। আর ডান হাতে পকেট থেকে একটা একশ টাকার নোট বের করে দেবে। কুলি সেটা দেখে অবাক হয়ে বলবে…)
কুলি    :    স্যার ছোড দেন, ভাঙ্তি নাই।
হাবীব    :    লাগবে না, পুরোটাই নিয়ে যাও।
কুলি    :    (খুশি হয়ে) স্যার, টেকা বাড়ায়া দিছেন বইলা না, সত্যই কইতাছি, আপনে মানুষটা ভালা। এমন কইরা মিষ্টি কতা বহুদিন হুনি না। (কুলি টাকার নোটটা নিয়ে হাসিমুখে প্রস্থান করবে। হাবীব আর সাজু তার প্রস্থান পথে চেয়ে থাকবে।)

SHARE

Leave a Reply