Home প্রচ্ছদ রচনা সোনাঝরা হেমন্ত -কামাল হোসাইন

সোনাঝরা হেমন্ত -কামাল হোসাইন

মেঘ আর ঝরোঝরো বৃষ্টির খেলা শেষ হয়েছে বেশ আগেই। বর্ষায় নেয়ে ওঠা প্রকৃতি তাই আমোদে খলখল। লকলকিয়ে বেড়ে উঠছে প্রকৃতির সব। সবুজ থেকে সবুজাভ হয়ে উঠেছে এর মধ্যেই। বর্ষার ভাঙন আর অতিবৃষ্টির কিছু ছিটেফোঁটা সমস্যা তৈরি করেছে বৈকি। তারপরও বর্ষা আমাদের কাছে আশা জাগানিয়া। কারণ বর্ষাই তো আমাদের গ্রীষ্মে তপ্ত হয়ে ওঠা মাটি আর প্রকৃতিকে সতেজ করে দিয়ে গেছে। পাশাপাশি ভূ-ভূমিকে করেছে উর্বর। বর্ষার ধকল সামলে উঠেই যে চাষি নতুন উদ্যমে চাষের কাজে নেমে পড়েন।
শরৎ এসে নরম পরশ বুলিয়ে বাংলার প্রকৃতিকে আরো শাণিত করে। নদী-মেখলার এই দেশে ভাদ্র-আশ্বিনে মায়াময় বাংলার উপহার তো এই শরতেরই। শরৎ তার অপরূপ মহিমা ছড়িয়ে কেড়ে নিয়েছে আমাদের মন-প্রাণ সব। তাই শুভ্র এই শরতের কথা আমরা কখনো বিস্মৃত হতে পারি না।
বর্ষা যেমন প্রকৃতিকে সতেজ-সুন্দর করে, তেমনি শরৎ এসে বাংলার প্রকৃতিকে আড়মোড়া ভেঙে নতুনভাবে জাগিয়ে দিতে সাহায্য করে।
আর তারই উপহারসামগ্রী হাত পেতে নিয়ে ধন্য হয় সোনাঝরা হেমন্ত। কার্তিক আর অগ্রহায়ণ এই দুই মাসকে আমরা হেমন্ত ঋতু হিসেবে চিনি। হিম থেকে হেমন্ত। তাই হেমন্তকে বলা হয় শীতের পূর্বাভাষ। এই ঋতুতে তেমন অনাসৃষ্টি নেই। শরৎ থেকে সে তেমন আলাদা নয়। আবার শীতকাল থেকেও কিছুটা বিচ্ছিন্ন বলা যায়। তাই শীত-শরতের মাখামাখি এই হেমন্ত। একটি সম্পূর্ণ নিজস্ব ধারার ঋতু হেমন্ত। হেমন্তের রঙ ধূসরতায় ছাওয়া, বর্ষার মতো রুদ্র-ভাঙাচোরা নয়। শীতের দুঃসহ শৈত্যপ্রবাহ থেকেও সে অনেক দূরে অবস্থান করে। সে উদাসীন, মগ্ন, নিভৃত এক অবয়ব নিয়ে আমাদের মাঝে বিচরণ করে। কার্তিকের ছন্নছাড়া বেশভূষা ছেড়ে অগ্রহায়ণে এসে বাংলার মানুষ নতুন এক পৃথিবীকে আবিষ্কার করে। এক সর্বজনীন নবান্ন উৎসবের মধ্য দিয়ে হেমন্ত আমাদের অতিশয় প্রিয় ঋতুতে পরিণত হয়।
বর্ষায় বীজতলা থেকে ধানের চারা উঠিয়ে চাষিভাই রোপণ করেন জমিতে। তারপর যতœ-আত্তি। শরতে খেতে ধানের চারা পরিপুষ্ট হয়। বেড়ে ওঠে। এক সময় ধানের শীষ বের হয় সবুজে ছাওয়া মাঠে। সেই ধানশীষে আস্তে আস্তে দানা বেঁধে ওঠে পরিপুষ্ট ধানে। এবার ধানখেতে ধানের শীষ অল্প অল্প হেলে পড়তে শুরু করে। বাতাসে দোল খায় দোদুল দুল। সময়ের ব্যবধানে ধানের শীষে সোনারঙ ধরে। তখন দিগন্তজোড়া খেতে ভরা মাঠ সোনালি রঙে মাখামাখি হয়ে যায়। সে এক অপরূপ দৃশ্য বটে। চোখ ফেরানো যায় না। চাষিভাই অপার আগ্রহ নিয়ে চেয়ে থাকেন তার ধানখেতের দিকে। কখন খেত থেকে কেটে নিয়ে আসতে পারবেন পরম যতেœ গড়া ফসলগুলো। কারণ এই নতুন ফসলেই তো তার নতুন স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেবে। নতুন ধানে হবে নবান্ন।
উঠোনের মাচানে এতদিন ঝিমিয়ে থাকা লাউডগাটা লকলক করে বেড়ে ওঠে। শিমগাছে সাদার মাঝে বেগুনি রঙের ফুল ফুটে প্রকৃতির শোভা বাড়িয়ে তোলে কয়েকগুণ।
মূলত কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাসেই আমাদের খেত-খামারে রাশি রাশি ধানে ভরে ওঠে। এ সময় ধান কেটে ও মাড়াই করে ধান থেকে আতপ চাল তৈরি করা হয়। ওই চাল থেকে তৈরি গুঁড়া দিয়ে শুরু হয় বাংলার চিরচেনা সেই সারাবছর ধরে অপেক্ষা করা নবান্ন উৎসব। নতুন চালে রান্না করা হয় নানা রকম উপাদেয় খাদ্য। আমাদের দেশের কোনো কোনো অঞ্চলে নতুন ফসল ঘরে তোলার পরদিনই নতুন ধানের নতুন চালে ফিরনি-পায়েস বা ক্ষীর জাতীয় খাবার তৈরি করে আত্মীয়-স্বজন আর পাড়া-প্রতিবেশীদের ঘরে ঘরে বিতরণ করা হয়। এ সময় গ্রামবাংলার বউঝিরা বানাতে বসেন বিচিত্র রকমের পিঠাপুলি। দেশের অঞ্চলভেদে এ সকল পিঠাপুলির নামও হয় ভিন্ন ভিন্ন। বানানো হয় মুড়ি-মুড়কি-খইসহ নানা রকমের সুস্বাদু খাবার। এগুলোই আমাদের বাংলার চিরচেনা উৎসব-পার্বণের কথা মনে করিয়ে দেয়।
দূর গাঁয়ে থাকা মেয়েকে বাপের বাড়িতে ‘নাইওর’ আনা হয়। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘অঘ্রাণের সওগাত’ কবিতায় নবান্নের বিষয়টি দারুণভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেনÑ
‘ঋতু খাঞ্চা ভরিয়া এল কি ধরণীর সওগাত?
নবীন ধানের অঘ্রাণে আজি অঘ্রাণ হলো মাৎ।
‘গিন্নি পাগল’ চালের ফিরনী
তস্তরী বরে নবীনা গিন্নি
হাসিতে হাসিতে দিতেছে স্বামীরে, খুশিতে কাঁপিছে হাত
শিরনি রাঁধেন বড়বিবি, বাড়ি গন্ধে তেলেসমাত।
মিঞা ও বিবিতে বড় ভাব আজি খামারে ধরে না ধান
বিছানা করিতে ছোট বিবি রাতে চাপা সুরে গাহে গান;
শাশবিবি কন, আহা, আসে নাই
কতদিন হলো মেজলা জামাই।’
হেমন্ত তাই পরম আত্মীয়ের মতো আমাদের সামনে এসে হাজির হয়। তার এই সীমাহীন আয়োজন আমরা দারুণভাবে উপভোগ করি।

এবার হেমন্তের সকাল-দুপুর-বিকেল-সন্ধ্যা আর রাতের কথা জেনে নেয়া যাক।
হেমন্তের সকালের তুলনা অন্য কারো সঙ্গে সত্যিই করা চলে না। সারাটা রাত তো নানা ফুলের ঘ্রাণে কেটে যায়, ভোর এসে মোহ ভাঙিয়ে দেয় আরেকটি দিনের। স্নিগ্ধতা-কোমলতার উদাহরণ দিতে গেলে হেমন্তকে সামনে আনতে হবে। প্রকৃতিতে মিষ্টি রোদের ঝিলিক। পাতার উপর খেলা করে সকালের সোনারোদ। সারারাত ধরে ধীরে ধীরে ঝরে পড়া শিশির বিন্দু-বিন্দু মুক্তোদানার মতো ঘাসের চিকন ডগায় দোল খায়। যেন তাকে মুক্তোর মালা করে গেঁথে রেখেছে কেউ। সকালের সূর্যের আলো পড়তেই তা চোখে ধাঁধা লাগিয়ে চিকচিক করে ওঠে। গাছের পাতায়, লতানো গাছের ডগায় শিশিরবিন্দুর উপস্থিতি সত্যিই এক স্বপ্নজাগানিয়া ব্যাপার। গায়ে-পায়ে একটু পরশ লাগতেই শরীরটা শিরশির করে ওঠে। শীতল সে অনুভব চমৎকারিত্ব এনে সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। সন্ধ্যা থেকে সকাল পর্যন্ত কুয়াশার হালকা চাদরে মুড়ে থাকে সবকিছু। এ অনুভূতির তুলনা কোথায়? তবে এ শিশিরবিন্দু বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। প্রায় সকাল হবার সঙ্গে সঙ্গে কোথায় যেন মিলিয়ে যায়।
হেমন্তের দুপুর মানে এক আশ্চর্যরকম আলো ছড়ানোর সময়। আকাশের বুকে যেন সোনালি রোদ দোল খেতে খেতে নেমে আসে গ্রামের ধানবোঝাই খামারে। মেঘের দেখা মেলে না এ সময়। কোথায় যেন লুকোচুরি খেলতে গেছে তারা। কেবল চোখে ভাসে আদিগন্ত মেঘমুক্ত উদার আকাশ। এমন নিষ্কলুষ মেঘ দেখতে কার না ভালো লাগে। তারপর যখন দুপুরের পালা কাটিয়ে আস্তে আস্তে বিকেলের কোলে শুয়ে পড়ে রোদ, তখন তার মনোহর দৃশ্য সত্যিই অন্যরকম মনে হয়। নরম রোদের আদর মন কেড়ে নেয় সবার।
হেমন্তের দিন যেমন বিশিষ্টতার আচ্ছাদনে মোড়া, ঠিক একইভাবে সন্ধ্যাও আরেক মায়ার চাদর বিছিয়ে নিজেকে আলাদা করে চেনায় আমাদেরকে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার পাখায় ভর দিয়ে নেমে আসে মায়াময় রাতের আবহ। বাঁশঝাড়ে শিরশির শব্দ নতুন এক সুরের আবেশ তৈরি করে। অবশ্য সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার আগেই নীড়ে ফিরতে শুরু করে ভোরে বেরিয়ে পড়া পাখিরা। সন্ধ্যায় পাখিদের ডানা ঝাপটানি আর আলতো কিচিরমিচির সন্ধ্যাকে আরো এক ধাপ মায়াবী করে তোলে।
বাংলার অপার সৌন্দর্যময় হেমন্তের রাত আরো মোহনীয়, আরো আকর্ষণীয়, আরো মায়াময়। বিস্তৃত আকাশের গায়ে এক ফোটা মেঘ থাকে না কোথাও। বলা যায় বিশাল রাতের আকাশ সত্যি-সত্যি এক রহস্যের জাল বুনে আমাদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। এই বিশাল মেঘমুক্ত আকাশে আস্তে আস্তে হেসে উঠতে থাকে অসংখ্য তারকার মেলা। আকাশের শরীরে তারকাপুঞ্জের ধীরে ধীরে ফুটে ওঠার দৃশ্যটা কি কখনো ভোলার মতো? একে তো আকাশে কোথাও মেঘ থাকে না, তার উপর হেমন্তের ঝরোকায় তারারা যেন খলখলিয়ে হেসে হেসে পৃথিবীকে অভ্যর্থনা জানায়। মিটিমিটি জ্বলে জ্বলে নিজেদের অস্তিত্বকে জানান দিতে থাকে গোটা রাত ধরে। এ সময় মায়াময় চাঁদের শরীর থেকে মোমের মতো নরম জোসনা গলে গলে পড়তে থাকে অবিরাম। নিঃশব্দে বয়ে যেতে থাকে জোসনার আলোর ঝরনা। ঝিরিঝিরি বাতাস আর মৃদু আলোর ঝলকানিতে দূর থেকে ভেসে আসে ছাতিম ফুলের মনকাড়া ঘ্রাণ। ফোটে গন্ধরাজ, মলিকা, শিউলি, হিমঝুরি, দেবকাঞ্চন, রাজঅশোক আর কামিনী। আর দিঘির পানিতে, বিলে-ঝিলে আর ডোবায় ফুটে হাসতে থাকে বাংলার জাতীয় ফুল শাপলা। ফোটে নানা রঙের পদ্ম ফুলেরাও। মাঠের বুকজুড়ে কোথাও কোথাও দেখা যায় মটরশুঁটি আর কলাইফুলের সমাহার। কাশফুল শরতে ফুটলেও হেমন্তে এসে সে কোথাও কোথাও মাথা তুলে তার উপস্থিতি জানান দিয়ে যায়।
হেমন্তে সারা বাংলায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নদীগুলো বর্ষাদিনের স্রোতমুখরতা ভুলে স্থির ও মৌন হয়ে যায়। বয়ে চলে নীরবে-নিঃশব্দে। এ সময় নদীর স্রোতের গভীরতা মোটেও আঁচ করা যায় না। নদীতীরের গ্রাম-গঞ্জ সব রকম কালিঝুলি ঝেড়ে-মুছে ঝকঝকে তকতকে হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরে ওঠে আমাদের চারপাশ।
ধীর কদমে হেমন্ত এসে হাজির হয় আমাদের প্রকৃতিতে। শীতের কোমলতা সঙ্গী করে তার আগমন। না গরম না শীতের এই আবহাওয়ায় সত্যিই মনোরম আর আবিলতায় আমাদের জড়িয়ে রাখে চিরচেনা হেমন্ত।

SHARE

1 COMMENT

Leave a Reply