Home ফিচার ছদ্মবেশী পোকারা -মৃত্যুঞ্জয় রায়

ছদ্মবেশী পোকারা -মৃত্যুঞ্জয় রায়

একবার মালয়েশিয়ার কুয়ালা তেরলায় একটা বাটারফ্লাই গার্ডেনে ঢুকেছিলাম। সে উদ্যানের পোকামাকড়ের সংগ্রহশালাটা দেখার জন্য মন ছটফট করছিল। নামে বাটারফ্লাই গার্ডেন। তাই পাহাড়ের ঢালে কাচঘেরা বিশাল এলাকা নিয়ে গড়ে ওঠা উদ্যানের ভেতর হাজার রকমের প্রজাপতির মেলা থাকবে তাতে আর বিচিত্র কী! কিন্তু ভেতরে ঢুকে একটা গাছের ওপর হঠাৎ চোখটা আটকে গিয়েছিলো। গাছের পাতারা এনিমেটেড ছবির কার্টুনের মতো নড়াচড়া করছে। পাতারা হেঁটে হেঁটে এখান থেকে ওখানে যাচ্ছে। জাদুর ব্যাপার তো! অধীর আগ্রহ নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম গাছটার কাছে। হাত দিয়ে চোখ রগড়ে ভালোভাবে দেখার চেষ্টা করলাম, চোখের ভুল নয় তো! নাহ্, ঠিকই দেখছি। অবিকল গাছের সবুজ সতেজ পাতা, দিব্যি নড়েচড়ে বেড়াচ্ছে। গাছের কাছে থাকা লেবেলটা দেখে শেষে বুঝলাম যে ওটা আসলে গাছের পাতা না, পোকা। নাম লিফ ইনসেক্ট- পাতা পোকা। গাছের পাতা খেয়ে বাঁচে, গাছের পাতার মতো দৈহিক গড়ন। আবার ওদের যেন কেউ খেতে না পারে সে জন্য গাছের পাতার মতো ওদের এই ছদ্মবেশ ধারণ।
পৃথিবীতে এক ধরনের পোকা আছে যারা গাছ-পাতা খেয়ে ক্ষতি করে। আর এক ধরনের পোকা আছে যারা এসব গাছখেকো পোকাদের শিকার করে খায়। প্রতিদিন বিভিন্ন পাখি, ব্যাঙ, সাপ, টিকটিকি, শিকারি পরভোজী পোকা ইত্যাদি প্রাণীরা বিপুল পরিমাণ পোকা শিকার করে খায়। কেননা, পোকারাই তাদের খাদ্যের প্রধান উৎস। তাই পোকারা ওদের শত্রুর হাত থেকে বাঁচার জন্য ছদ্মবেশ ধারণ করে। কোনো কোনো পোকা ছদ্মবেশ ধরে তাদের দেহের রঙ বদলে ফেলে, কেউ বদলে ফেলে আকৃতি ও চেহারা। আবার কেউ কেউ দেহে তৈরি করা বিভিন্ন বিষাক্ত রাসায়নিক দিয়ে শত্রুর হাত থেকে নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা করে। তবে বেশির ভাগ ছদ্মবেশী পোকা তাদের আবাসস্থলের গাছপালার সাথে এমনভাবে মিশে থাকার চেষ্টা করে যেন শত্রু কখনো বুঝতে না পারে যে সেখানে কোনো পোকা আছে। কখনো কখনো কোনো কোনো পোকা গাছের পাতার রূপ ধরে, কখনো ধরে গাছের বাকলের রঙ, কখনোবা গাছের শাখা বা কাঁটার মতো হয়ে যায়। সব পোকা ছদ্মবেশ ধারণ না করলেও পৃথিবীতে বেশ কিছু পোকা আছে যারা তা করে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছদ্মবেশী পোকা হলো পাতা পোকা বা লিফ ইনসেক্ট, কাঠি পোকা বা স্টিক ইনসেক্ট এবং থলে পোকা বা ব্যাগওয়ার্ম। শেষ দু’টি ছদ্মবেশী পোকা এদেশের বিভিন্ন উদ্যানে, ফুল-ফলের গাছে বেশ দেখা যায়। এসব পোকা সাধারণত উষ্ণ ও অবউষ্ণ এলাকার বাদলবন ও অরণ্যে থাকে। শীতের দেশের অরণ্যে এদের দেখা মেলে না। কেননা, সেসব দেশের গাছেরা মৌসুমে মৌসুমে খুব রূপ বদলায়। পোকারা তাই ওসব গাছের মতো অতো ভোল পাল্টাতে পারে না।
পাতা পোকার দেহের গড়ন এমন যে গাছে থাকলে ওদের সে গাছের সবুজ পাতা বলেই মনে হয়। এদের কিছু প্রজাতির দৈহিক গড়ন আবার এতোই নিখুঁত যে তাদের দেহের কিনারা দেখলে মনে হয় যেন কোনো পোকায় খানিকটা অংশ খেয়ে গেছে। শত্রু পোকাদের বিভ্রান্ত করার এ এক চমৎকার কৌশল বটে। এমনকি তারা চলাচলের সময়ও একটু সামনে আবার একটু পিছে, এভাবে চলে। ফলে সেসব পোকা দেখে মনে হয় যেন বাতাসে গাছের পাতা দুলছে। পৃথিবীতে প্রায় ২৫-৩০ প্রজাতির লিফ ইনসেক্ট আছে।
কোনো প্রাণী যখন কোনো পোকাকে শিকারের জন্য তাড়া করে তখন সাধারণত তারা দ্রুত দৌড়ে বা উড়ে পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করে। কিন্তু ছদ্মবেশী পোকারা আবার ঠিক এর উল্টো। তারা ধাওয়া খেলেও নিশ্চল একই জায়গায় ঘাপটি মেরে বসে থাকে। মোটেই নড়াচড়া করে না। এতে শত্রু মনে করে ওটা আসলে পোকা না, অথবা পোকা হলেও মরা পোকা। শিকারিরা সাধারণত মরা পোকা শিকার করে না। তাই ওরা শত্রুর হাত থেকে বেঁচে যায়। তাই বলে তাদের যে চলতে ফিরতে হয় না তা নয়। তবে ছদ্মবেশী পোকারা দিনের চেয়ে রাতেই বেশি চলাচল করে। সে সময় ওদের শত্রুরা ওদের দেখতে পায় না। এসব পোকাকে তাই নিশাচরও বলা যায়। তবে কখনো কখনো শত্রুদের কেউ কেউ বেশ চালাক হয়। তারাও বাজিয়ে দেখার চেষ্টা করে যে আসলে ওটা ওদের ভান কি না? তাই ওদের কাছে গিয়ে খোঁচায়, বিরক্ত করে। ওরাও তখন ভিন্ন ভাব ধরে। পাতা পোকারা গাছের পাতার সাথে এমনভাবে লেগে থেকে একটু সামনে, একটু পেছনে করে এমনভাবে এগোতে থাকে যে দেখলে মনে হয় সত্যি যেন কোনো গাছের পাতা বাতাসে দুলছে। আর জিওম্যাট্রিড মথদের কাজকারবার তো আরো বিচিত্র। ওদের গায়ের রঙটাও মরা শুকনো পাতার মতো। শত্রুরা বেশি বিরক্ত করলে ওরা গাছ থেকে শুকনো পাতা ঝরার মতো টুপ করে খসে পড়ে। গাছের নিচে শুকনো পাতার মতো পড়ে থাকে। শত্রুরা চলে গেলে সেখান থেকে আবার গাছে উঠে আসে। থলে পোকারা থাকে কোন আইসক্রিমের খোলের মতো একটা থলের ভেতর। গাছের ডাল ও পাতার সাথে এর মোটা প্রান্তটা আঠার সাহায্যে আটকে থাকে। সরু প্রান্তটা থাকে ওপরের দিকে। দেখে তাকে গাছের কাঁটার মতোই মনে হয়। ওর ভেতরেই থলে পোকার বাচ্চা থাকে আর লুকিয়ে লুকিয়ে পাতার ত্বক কুরে কুরে খেতে থাকে। কিন্তু ওদের কেউ খেতে পারে না। এক জায়গায় খাওয়া শেষ হলে থলেসহ ধীরে ধীরে অন্য জায়গায় চলতে শুরু করে।
কোনো কোনো নির্বিষ সাপ আছে যারা শত্রুর পাল্লায় পড়লে দেহের রঙ বদলে তীব্র বিষাক্ত কোনো সাপের দেহের রঙ ধরে। ফলে আক্রমণকারী প্রাণীরা ভয় পেয়ে ওদের আর ঘাঁটায় না। পোকাদের জগতেও এ রকম ঘটনা আছে। মৌমাছি, বোলতা, ভিমরুল ইত্যাদি পোকাকে অনেকেই ভয় পায়। কেননা, ওদের বিষাক্ত হুল আছে। হুল ফুটিয়ে দিলেই যন্ত্রণার শেষ থাকে না। মৌমাছি ও বোলতাদের দেহে কালো ও হলুদ ডোরা কাটা দাগ আছে। এটা ওদের শনাক্তকরণের একটা প্রধান উপায়। শত্রুজীবদেরও এক অদ্ভুত ক্ষমতা আছে দ্রুত এসব দাগ চিনে মৌমাছি ও বোলতাদের চেনার। তাই এক ধরনের নির্বিষ মথ ও মাছি আছে তারা শত্রু দেখলে মৌমাছি ও বোলতার এ রূপ ধরে। যেসব মথ ও মাছিরা ছিলো শত্রুদের সুস্বাদু খাবার, তারাই হয়ে ওঠে ভয়ের। ওরা ওদের এ চেহারা দেখে বোলতা ভেবে ভুল করে আর ওদের থেকে দূরে থাকে। নিখুঁত ওদের অভিনয়। তাই ওসব মাছিকে অভিনেতা পোকা বললেও ভুল হবে না।
আর এক ধরনের ছদ্মবেশী পোকা আছে যাদের দেখলে গাছের শুকনো মরা সরু ডাল বা কাঠি বলে মনে হয়। এদের বলা হয় কাঠি পোকা বা ওয়াকিংস্টিক বা স্টিক ইনসেক্ট। পৃথিবীতে প্রায় দুই হাজার প্রজাতির ধীরে চলা স্বভাবের কাঠি পোকা রয়েছে। কোনো কোনোটার গা কাঠির মতো চিকন, কোনোটার গায়ে তীক্ষè কাঁটা আছে, আবার কেউ তীব্র দুর্গন্ধ, রক্ত ও বিষ ছড়ায়। এসব পোকার অনেক প্রজাতির ডিম দেখতে বীজের মতো। সেটিও এক রকমের ছদ্মবেশ। এতে শত্রুরা ডিম নষ্ট করতে পারে না। ক্ষুদ্র থেকে বড়ো নানা ধরনের কাঠি পোকা আছে। এশিয়াটিক প্যালোফাস ও ইস্ট ইন্ডিয়ান ফার্নাসিয়া কাঠি পোকারা প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার (১ ফুট) লম্বা। এরাই পৃথিবীর সবচেয়ে লম্বা পোকা!

SHARE

Leave a Reply