Home প্রতিবেদন সিডর ও শিশু রুবেলের বেঁচে থাকার কাহিনী -আযাদ আলাউদ্দীন

সিডর ও শিশু রুবেলের বেঁচে থাকার কাহিনী -আযাদ আলাউদ্দীন

২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর। দক্ষিণ উপকূলের ওপর দিয়ে বয়ে যায় প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডর। সিডরের প্রচণ্ড আঘাতে প্রাণ হারান উপকূলের কয়েক হাজার মানুষ। ছিন্ন ভিন্ন হয়ে পুরো জনপদ, পরিণত হয় বিরানভূমিতে। জীবনের সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে যায় অনেক মানুষ। এর মধ্যে রয়েছে অনেক শিশু-কিশোর। তাদেরই একজন পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার চরবিশ্বাসের শিশু রুবেল।
জীবন সংগ্রামী শিশু রুবেল সিডরের সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকার কাহিনী নিয়ে ২০০৭ সালের ৭ ডিসেম্বর দৈনিক নয়া দিগন্তের শেষের পাতায় একটি সচিত্র প্রতিবেদন লিখেছিলাম আমি। দীর্ঘ আট বছর পর এখানে তুলে ধরছি সেই প্রতিবেদনটি :
‘২০০৭ সালের ১ ডিসেম্বর রাত ৩টা দশ মিনিট। বরিশাল লঞ্চঘাট থেকে লম্বা হুইসেল বাজিয়ে গলাচিপার চরমন্তাজের দিকে রওনা করলো এমভি শাওন-৩ লঞ্চটি। যাত্রীবাহী লঞ্চ হলেও সেদিন মূলত দৈনিক নয়া দিগন্তের ত্রাণ পরিবহনই ছিল আমাদের মুখ্য বিষয়। সামনে প্রায় একশ কিলোমিটার পথ, গন্তব্যে পৌঁছতে সময় লাগবে অন্তত ১৮ ঘণ্টা। দীর্ঘ এ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে চর ও নদী পড়েছে ১১টি। এর মধ্যে লঞ্চটি পথে পথে ঘাট দিয়েছে ১৬টি স্পটে। প্রত্যেক স্পটেই যাত্রী ও মালামাল ওঠানামার কাজ চলেছে সমানতালে। পথিমধ্যে বাউফলের ধুলিয়া ঘাট থেকে অন্যান্য যাত্রীদের সাথে এই লঞ্চে উঠেছে ৮ বছরের একটি শিশু। এর কিছুক্ষণ পরই দেখলাম শিশুটি লঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে গলা উঁচু করে লঞ্চের মাস্তুলে টাঙানো নয়া দিগন্তের ব্যানারটি পড়ছে। দেখে বেশ চঞ্চল মনে হলো ছেলেটিকে। কাছে ডেকে খোঁজখবর নিলাম তার।
নাম-রুবেল। বাড়ি গলাচিপার চরবিশ্বাসের বুড়ির চর গ্রামে। চরাগুস্থি প্রাইমারি স্কুলের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র সে। বাবা লতিফ সিকদার বেঁচে থাকলেও তার ভাষায়- ‘মোর বাপ বাঁইচ্যা থাকলেও নাই’। কেন, কী হয়েছে? ‘হেয় দুই বিয়া হরছে, হতি মা’র (সৎ মা) লইগ্যাই হের টান, মোগো কোন খবরও লয় না’ তাহলে তোমাদের সংসার চলে ক্যামনে? ‘কী আর হরমু, মুই-ই তো এহন সংসার চালাই। বেইন্যাহালে ধানের ছড়া টোহাই, দুহইর অইলে স্কুলে যাই, আবার বিহালে  মাইনষের কাম হরি’।
ধুলিয়া কেন গিয়েছ এমন প্রশ্নের জবাবে রুবেল জানায়- ‘মোর বাপে হেইয়ানে কাম হরে, বইন্যায় মোর ঘরডা মাডির লগে মিইশ্যা গেছে, ভাবছেলাম বাপের কাছে কিছু টাহা পাইলে ঘরডা কোন রহম খাড়া করন যাইবো, কিন্তু হেয় কোন টাহা না দিয়া কইছে তুই চইল্যা যা, মুই পরে দেখমু অ্যানে’। রুবেলের মন্তব্যÑ ‘মুই বুঝি হেয় (রুবেলের বাবা) মোগো লইগ্যা কিছুই করবো না, তয় হতি মার ঘরডা যদি পড়ত ঠিকই এত দিনে ঘর খাড়া অইয়া যাইত।’ আলাপচারিতার মধ্য দিয়ে বুঝলাম, বসবাসের প্রিয় ঘরটি কোনো রকম দাঁড় করানোর জন্যই এখন তার যত টেনশন।
ঝড়ের রাতের কথা জিজ্ঞেস করতেই আনমনা হয়ে স্মৃতিতে ডুবে যায় রুবেল। এরপর বলতে থাকেÑ ‘হেইদিন রাইতে তুফানের চাপে মোগো ঘরডা ভাইঙ্গা মাথার ওপরে পড়ছে, মোরা হারারাইত চাপা ঘরের মধ্যে কাডের ডেকসোর (বড় কাঠের বাক্স) লগে মিইস্যা আছেলাম। তহন মনে আইছেলো আর বাচমুনা, ডেকসোডা না থাকলে হেইদিন মোরা মইররাই যাইতাম। ঘর চাপা অবস্থায় আন্ধারের মইধ্যে আস্তে আস্তে ফাঁক কইরা মুই দাওডা (দা-বঁটি) লইয়া টিন কাইট্যা বাইর অইছি। হেরপর দাদারে (চাচাত দাদা আবদুর রব সিকদার) যাইয়া খবর দিছি। পরে হেরা আইয়্যা মোর মারে আর বইনেরে চাপা ঘরের ভেতর দিয়া বেইন্যাহালে বাইর হরছে।’
রুবেল নিজ থেকেই জানায়, ‘জানেন স্যার, মোগো ঘরডা ভাইঙ্গা যাওনে মোর হতি মায় (পারভীন) খুশি অইছে, মোর বাপরে যে আরেকটা বিয়া করাইছে হেই দাদির (আমেনা) ঘর আমাগো ঘরের পাশে অইলেও একবার পর্যন্ত দেখতে আয়নাই! কারণ হেয় তো হতি মার লগেই থাহে।
তার ভাষায়- এহন মুই লঞ্চ দিয়া নাইম্যা বাড়ি গেলেই হতি মার লগে মোর মায়ের কাইজ্যা বাইজ্যা যাইবো, কেন? প্রশ্ন করতেই রুবেল জানায়, মুই বাপের ধারে যাওয়াতে হতি মা আর দাদি মনে করবো বাপে মোরে টাহা দিছে। আসলে বাপে তো মোরে কোন টাহাই দেয় নাই।
চঞ্চল গ্রাম্য শিশু রুবেলের সাথে আলাপ করতে করতে বিবেকের পীড়া অনুভব করলাম, সাধ্যমতো সাহায্য করলাম তাকে। বেশ ভালোভাবেই বুঝি- এ সামান্য ত্রাণ দিয়ে তার কিছুই হবে না। চর বিশ্বাসের কাছে আসতেই রুবেল জানালো , স্যার মুই এই ঘাটে নাইম্যা যামু, তার হাতে একটা ভিজিটিং কার্ড দিলাম, বললাম- সম্ভব হলে যোগাযোগ রেখো। লঞ্চঘাট কাছে আসে, রুবেল নেমে যায়। যাওয়ার সময় বারবার পেছনে ফেলে যাওয়া লঞ্চের দিকে তাকায়। ২০০৭ সালের ৫ ডিসেম্বর বুধবার বিকেলে রুবেল তার এক আত্মীয়কে সাথে নিয়ে ফোন করে। স্যার মোর ঘরডা এহনও বিডার লগে মিইশ্যা রইছে। যদি কোনো ব্যবস্থা করতে পারেন মুই আমনেগো লইগ্যা দোয়া করুম। রুবেলের ফোন পেয়ে মন খারাপ হয়, কিন্তু সাধ্য যে নেই, কী করি। প্রিয় পাঠক- আপনাদের মধ্যে এমন কারও কি সাধ্য আছে ছোট্ট এ শিশুর ঘরটি দাঁড় করিয়ে দেয়ার ?’
দৈনিক নয়া দিগন্তে এই প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ার পর ব্যাপক সাড়া পাওয়া যায় পাঠকের। দরিদ্র ও জীবন সংগ্রামী শিশু রুবেলের সহায়তায় এগিয়ে আসেন অনেক মানুষ। অনেকে এই প্রতিবেদকের সাথে যোগাযোগ করে আর্থিক সহায়তা দেন রুবেলের পরিবারকে। পাঠকদের কাছ থেকে পাওয়া প্রায় ৩৫ হাজার টাকা চর বিশ্বাসের স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সাথে নিয়ে আমরা পৌঁছে দেই শিশু রুবেল ও তার মায়ের হাতে। পর্যায়ক্রমে মানুষের ভালোবাসায় দাঁড়িয়ে যায় শিশু রুবেলের ভাঙা ঘর। সিডরের আট বছর পর শিশু রুবেল এখন পরিণত হয়েছে কিশোর রুবেল-এ। তবে প্রতি বছর নভেম্বর মাস এলে এখনো প্রলঙ্ককরী ঘূর্ণিঝড় সিডরের ভয়ার্ত স্মৃতিকে স্মরণ করে রুবেলের মতো আঁতকে ওঠে উপকূলের হাজার হাজার শিশু-কিশোর।

SHARE

Leave a Reply