Home ধারাবাহিক: দুর্গম পথের যাত্রি দুর্গম পথের যাত্রী -আসাদ বিন হাফিজ

দুর্গম পথের যাত্রী -আসাদ বিন হাফিজ

গত সংখ্যার পর

‘ওহে নবীর প্রেমিকরা!’ পলায়নরত মুসলমানদের সামনে সাবধানবাণী শোনা গেল, ‘যদি নবী না থাকেন তবে আমাদের ওপর অভিশাপ, কারণ আমরা যারা এখনও জীবিত আছি, আমরা কেমন নবীপ্রেমিক? নবী করীম (সা) এর শাহাদাতের সঙ্গে সঙ্গে তোমরা শাহাদাতের পেয়ালা পান না করে কাপুরুষের মতো মৃত্যু ভয়ে পালাচ্ছ?’
থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল পলায়নপর মুসলমানরা। এই উদ্দীপ্ত আহ্বান তাঁদের মনে আগুন ধরিয়ে দিল। এদের সাথে কোন ঘোড়া ছিল না। কিন্তু তারা অশ্বারোহী শত্রুদের ওপর প্রচণ্ড আক্রমণ করে বসল।  সে আক্রমণ গিয়ে আঘাত হানল খালিদ ও আকরামার অশ্বারোহী বাহিনীর ওপর।
খালিদের আজ একে একে মনে পড়েছে তার হাতে নিহত মুসলমানদের কথা। তাঁদেরই একজন ছিলেন রাফাআ বিন ওয়াকাশ। খালিদের অশান্ত চিত্তে বেদনার ঢেউ উঠলো। অনুশোচনায় দগ্ধ হতে লাগল হৃদয় মন। সে অনুভব করল, এতোদিন সে শুধু উদ্দেশ্যহীনভাবেই রক্ত প্রবাহিত করছে। কিন্তু এ ছাড়া তার উপায়ই বা কি ছিল! কারণ সে সময় তো মুসলমানদেরই তার সবচেয়ে বড় শত্রু মনে হতো!

মুসলমানদের শক্তি তখন নিঃশেষ হয়ে এসেছে। মুষ্টিমেয় কয়েকজন পদাতিক আর কতক্ষণ অশ্বারোহীদের সাথে যুদ্ধ করতে পারে! তারা নিরুপায় হয়ে পার্বত্য অঞ্চলের দিকে পিছু হটছে। রাসূলে করিম নিজেও এক সঙ্কীর্ণ প্রান্তরের দিকে সরে যাচ্ছেন। যুদ্ধের গতি এখন উল্টো দিকে। একটু আগে মুসলমানরা যেমন গনিমতের মাল লুট করার জন্য ছোটোছুটি করছিলেন ঠিক তেমনি কুরাইশরাও মুসলমানদের লাশ ও আহতদের আর্তনাদের মাঝে গনিমতের মাল সংগ্রহ করতে উঠেপড়ে লেগেছ সবাই। তবে এর মধ্যেও কিছু কুরাইশ রাসূলের পেছনে ছুটে গেল। কিন্তু রাসূলের সাহাবাগণ তাদের ওপর প্রাণপণ আক্রমণ চালিয়ে ধাওয়াকারী কুরাইশদের প্রায় সবাইকেই হত্যা করলেন। কেবল লড়াই না করে যারা প্রাণ নিয়ে পালালো তারাই কোনো রকমে বেঁচে গেল।
রাসূল (সা) প্রান্তর পার হয়ে একটি উঁচু স্থানে গিয়ে পৌঁছলেন। সেখান থেকে তিনি যুদ্ধের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন। নবীজীর সঙ্গী ত্রিশজন সাহাবার মধ্যে ষোলজনই শহীদ হয়ে গেছেন। সে চৌদ্দজন বেঁচে আছেন তাদের অধিকাংশ আহত। তিনি সেখান থেকে যুদ্ধের ময়দান গভীরভাবে নিরীক্ষণ করে দেখলেন কোথাও আর কোন মুসলমান দেখা যাচ্ছে না। রাসূল (সা) শহীদ হয়ে গেছেন এ খবর ছড়িয়ে পড়ায় মুসলমানদের মধ্যে গভীর নৈরাশ্য ছড়িয়ে পড়েছিল এবং যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে যে যেদিকে পারে উ™£ান্তের মত সরে পড়েছিল। কেউ কেউ ফিরে গিয়েছিল মদিনায়। কেউবা কুরাইশদের প্রতিশোধের ভয়ে পাহাড়ের কোন গোপন স্থানে গিয়ে আত্মগোপন করে আছে।
রাসূল (সা) এবার আহতদের দিকে তাকিয়ে দেখতে লাগলেন। নবীকন্যা ফাতেমা (রা) পিতাকে খুঁজতে খুঁজতে পেরেশান হয়ে একেবারেই লবেজান হয়ে পড়েছেন। যখন তার পা আর কিছুতেই চলছে না, এমন সময় তিনি নবীজীকে দেখতে পেলেন এবং ক্লান্ত পায়ে ছুটে গেলেন তাঁর কাছে। হজরত আলী (রা) পাশের ঝর্ণা থেকে পানি এনে হুজুর (সা)-কে পান করালেন। ফাতেমা (রা) পিতার আহত স্থানগুলো পানি দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার করতে লাগলেন আর ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন।
খালিদের মনে আছে, রাসূলে করিমের শাহাদাতের খবর শুনে তিনি আত্মায় শান্তি অনুভব করেছিলেন। কিন্তু সে শান্তি নষ্ট করে দিল একটি হুঙ্কার। সমস্ত অন্তর জুড়ে ধ্বনি-প্রতিধ্বনি তুলে ছড়িয়ে পড়ল সে গর্জন। কেউ একজন গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছিল হে মুসলমানগণ, তোমরা আনন্দিত হও! আমাদের নবী জীবিত আছেন! সুস্থ আছেন! এই উদাত্ত ঘোষণায় প্রথমে চমকে উঠেছিল খালিদ। তারপর তার যেমন হাসি এলো তেমনি দুঃখও হলো। সে নিজেকেই নিজে বললো, কোনো মুসলমান কি পাগল হয়ে গেছে?

ঘটনাটি ছিল এইÑ মুসলমান দু-একজন তখনো আরো ভালো জায়গায় লুকানোর আশায় এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করছিল। এমনিভাবে ঘুরতে ঘুরতে কা’ব বিন মালেক (রা) পাহাড়ের ওই জায়গায় এসে পৌঁছলেন, যেখানে রাসূলে আকরাম (সা) বিশ্রাম করছিলেন। তিনি নবী করিম (সা)-কে দেখতে পেয়ে আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে জোরে তাকবির ধ্বনি দিয়ে উঠলেন। তারপর চিৎকার করে বলতে লাগলেন, আমাদের নবী জীবিত আছেন! আমাদের নবী জীবিত আছেন! যেসব মুসলমান ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে পাহাড়ের খাঁজে এখানে ওখানে ঘোরাফেরা করছিলেন বা লুকিয়ে ছিলেন, এই ঘোষণা শোনা মাত্রই সবাই দৌড়ে সেখানে ছুটে এলেন। হজরত উমর (রা)ও দৌড়ে রাসূলের কাছে এসে পৌঁছলেন। এর আগে আবু সুফিয়ান যুদ্ধের ময়দানে পড়ে থাকা লাশগুলো ঘুরে ঘুরে দেখছিল। সে অনুসন্ধান করছিল রাসূলে করিমের পবিত্র দেহ মোবারক। সে সামনে যাকেই পেতো তাকেই জিজ্ঞেস করত, তুমি কি মুহাম্মদের লাশ দেখেছো?
এক সময় সে খালিদকে সামনে পেলো।
‘খালিদ!’ আবু সুফিয়ান জিজ্ঞেস করল, তুমি কি মুহাম্মদের লাশ দেখেছো?
‘না!’ খালিদ উত্তর দেয়। সে আবু সুফিয়ানের দিকে ঝুঁকে প্রশ্ন করে তুমি কি নিশ্চিত যে মুহাম্মদ নিহত হয়েছেন?
‘হ্যাঁ!’ আবু সুফিয়ান উত্তর দেয়, সে আমাদের আক্রমণ থেকে বেঁচে কোথায় যাবে? কেন, তোমার কি এ ব্যাপারে সন্দেহ হয়?
‘হ্যাঁ! আবু সুফিয়ান!’ খালিদ উত্তর দেয়, ‘আমার সন্দেহ দূর হবে না যতক্ষণ আমি নিজ চোখে তাঁর লাশ দেখতে না পাবো। মুহাম্মদ এতো সহজেই নিহত হওয়ার লোক নয়।
‘মনে হচ্ছে তোমার ওপর মুহাম্মদের জাদুর প্রভাব পড়েছে?’ আবু সুফিয়ান গর্বের সাথে বলল, ‘মুহাম্মদ আমাদের মাঝেরই কেউ নয়? তুমি কি তাকে চেন না? যে ব্যক্তি এত হতাযজ্ঞের নায়ক, একদিন তাকেও নিহত হতে হবে এটাই তো স্বাভাবিক। নিশ্চয়ই মুহাম্মদ নিহত হয়েছে। যাও তার লাশ খুঁজে বের করো, আমি তার মাথা কেটে মক্কায় নিয়ে যাবো।’
ঠিক সেই সময়ই পার্বত্য এলাকা থেকে কা’ব বিন মালেকের উদাত্ত কণ্ঠে ধ্বনিত হলো, হে মুসলমানগণ, তোমরা আনন্দিত হও! আমাদের নবী জীবিত আছেন! সুস্থ আছেন!’ এই শব্দ যেন বিজলির মতো চমক তুলে কড়কড় শব্দে গর্জন করে আদিগন্ত প্রান্তর ছেয়ে ফেলল।
‘শুনেছ আবু সুফিয়ান!’ খালিদ বলল, ‘এখন বুঝলে মুহাম্মদ কোথায়? লাশের মাঝে খুঁজে তাঁকে পাবে না। তুমি চাও তো আমি তাকে আক্রমণ করতে যেতে পারি। কিন্তু তোমাকে এমন নিশ্চয়তা দিতে পারব না, আমি মুহাম্মদকে শেষ পর্যন্ত হত্যা করতে পারবো।’
খালিদ একটু আগেই সাহাবীদের নিয়ে রাসূলে করিমকে পাহাড়ের আড়ালে যেতে দেখেছে। কিন্তু সে অনেক দূরে। খালিদ নতি স্বীকার করার বা সঙ্কল্প শিথিল করার লোক নয়। সে কিছু অশ্বারোহীকে সাথে নিয়ে পাহাড়ের সেই জায়গার দিকে অগ্রসর হতে থাকলো যেদিকে রাসূলে করিমকে সে যেতে দেখেছে।
প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক ইবনে হিশামের লেখা থেকে জানা যায়, রাসূল (সা) যখন খালিদ ও তার সাথীদের পাহাড়ের চূড়ায় উঠে আসতে দেখলেন হুজুরের মুখ থেকে সহসা বের হয়ে গেল, ‘আল্লাহ জুলজালাল, ওকে তুমি ওখানেই থামিয়ে দাও।’
খালিদ তার অশ্বারোহীদের সঙ্গে নিয়ে সঙ্কীর্ণ পথ বেয়ে ওপরে উঠছিলো। পথ ক্রমশ এতটাই সঙ্কীর্ণ হয়ে গেছে যে ঘোড়াগুলোকে একই লাইনে চালাতে হলো। রাসূলে করিম ক্ষতের যন্ত্রণায় চুর হয়ে পড়েছিলেন। হজরত উমর (রা) খালিদ ও তার অশ্বারোহীদের ওপরে আসতে দেখে তলোয়ার বের করে নিচে নামলেন।
‘দ্যাখ! ওয়ালিদের বেটা’ হজরত উমর (রা) গর্জে উঠলেন, ‘যদি লড়াই করা জানিস তবে এই সঙ্কীর্ণ গিরিপথ দেখে নে প্রশস্ততা দেখে নে, তোর অশ্বারোহীসহ কেউ কি আমার হাত থেকে এখন জীবিত ফিরে যেতে পারবি?’
খালিদ যুদ্ধের কৌশল ভালো মতোই জানতো। সে দেখলো, যে জায়গায় সে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে দাঁড়িয়ে ঘোড়া নিয়ে লড়াই করা আসলে অসম্ভব। জায়গাটি খুবই ভয়াবহ। খালিদ নিজে ঘোড়া ফিরিয়ে নিল, সেখান থেকে ফিরে গেল সাথীদের নিয়ে।
ওহুদের যুদ্ধ শেষ হয়েছে, কিন্তু শেষ হয়েছে চূড়ান্ত মীমাংসা ছাড়াই। নিশ্চিত পরাজয়ের হাত থেকে বেঁচে গিয়ে কুরাইশরা যতটুকু করেছে তাতে তারা হয়তো এতোটুকু দাবি করতে পারে যে, তারা মুসলমানদের বেশি ক্ষতি করতে পেরেছে। কিন্তু মুসলমানদের নির্মূল করার যে স্বপ্ন তাদের ছিল, সে স্বপ্ন থেকে গেছে। যে উদ্দেশ্যে মক্কা থেকে বিশাল বাহিনী নিয়ে ছুটে এসেছিল সে উদ্দেশ্য সফল না করেই ফিরে যেতে হয়েছে তাদের। ফলে খালিদের বারবারই মনে হয়েছে, এই যুদ্ধ হার-জিত ছাড়াই শেষ হয়েছে।
কিন্তু পথ চলতে চলতে খালিদ মনে মনে বলল, ‘আসলে কি তাই! এই যুদ্ধ হারজিত ছাড়াই শেষ হয়েছে? না, এই যুদ্ধে আসলে আমাদের পরাজয়ই হয়েছিল। মুসলমানদের সৈন্য ছিল মাত্র সাত শ! আর আমাদের ছিল তিন হাজার!! কুরাইশদের অশ্বারোহী ছিল দুই শ’, মুসলমানদের ছিল দু’জন। একটি শিশুকেও যদি জিজ্ঞেস করা হয় এ রকম অবস্থায় কারা জিতবে, চোখ বন্ধ করেই সে নির্দ্বিধায় বলবে, কুরাইশরা। যদি কোন সাধারণ মানুষকেও এ প্রশ্ন করা হয়, সেও ভাবনা-চিন্তা ছাড়াই বলবে, কুরাইশরা। যে কোন হিসেবেই আমাদের বিজয় ছিল সুনিশ্চিত। কিন্তু আমরা সব হিসাব ভুল প্রমাণ করেছি। এ যুদ্ধে আমাদের বিজয় তখনই হতো যদি মুহাম্মদ (সা)-কে হত্যা করতে পারতাম। একটি মাত্র লোক, কিছুদিন আগেও যে ছিল আমাদেরই একজন, যে লোকটি এতিম, যে লোকটি স্বজনহারা, সেই একটি লোককে হত্যা করার জন্য আরবের সম্মিলিত বিশাল বাহিনী নিয়ে এসে তার লাশ ছাড়া ফিরে যাওয়ার পরও কি কেউ বলবে আমরা বিজয়ী হয়েছিলাম? যুদ্ধে আসার সময় মক্কার বীর যোদ্ধারা বুক ফুলিয়ে নিজ নিজ নারীদের কাছে গর্ব করে বলেছিল, হাসিমুখে বিদায় দাও, মুহাম্মদের মস্তক আনা গাছ থেকে খেজুর ছেঁড়ার চাইতে কঠিন কাজ তো নয়, এই নারীদের কাছে মাতা নিচু করে ফিরে আসার পরও কি বলতে হবে আমরা বিজয়ী হয়েছি! যে যোদ্ধা যুদ্ধ থেকে ফেরত এসে আপন বধূ মাতা-ভগ্নিদের ধিক্কার কুড়ায়, তার মত অধম আর কে আছে? ওহুদের পাহাড় আর প্রান্তরের বালিয়াড়ি যেমন সাক্ষী আমাদের পরাজয়ের তেমনি সাক্ষী মক্কার ধূলিকণা, ঘরের অবলা নারী।
খালিদের চিন্তা তরঙ্গে বয়ে যাচ্ছে অজস্র হিন্দোল। ঢেউয়ের দোদুল দোলায় ভাসছে ভাবের সহস্র বুদবুদ। ভাবনার এতোসব ঘুরপাকে পড়ে নিজেই অস্বস্তি বোধ করলো। সে বারবার এদিকে ওদিকে মাথা নাড়লো। অবশেষে দাঁত কটমট করে জোরে একবার ঝাঁকুনি দিয়ে সোজা সামনের দিকে তাকাল। চোখের সামনে ভেসে উঠল যুদ্ধের শেষ দৃশ্য। সে এই ভয়াবহ স্মৃতি মন থেকে মুছে দিতে যতই মাথা ঝাঁকায়, সাগরের ঢেউ তোলার মতো সেই স্মৃতি হৃদয় সমুদ্রে আরো জোরে তোলপাড় তোলে। মনে মনে তার খুব লজ্জাবোধ হতে লাগলো। যুদ্ধবাজরা কখনও এমন করে না।
খালিদ যখন হজরত উমর (রা)-এর ধমক খেয়ে ফিরে আসছিল তখন সেই পাহাড়ের উপত্যকা থেকে তার দৃষ্টি গিয়ে পড়লো যুদ্ধের ময়দানে। সেখানে তখন ছড়ানো ছিটানো অজস্র লাশ। হয়তো কেউ কেউ এখনো পুরোপুরি মারা যায়নি, আহত ও অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে আছে। লাশ ও আহতদের উঠানোর জন্য না কোন মুসলমান এগিয়ে এলো, না কোন কুরাইশ। খালিদের চোখ আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দাকে দেখতে পেল, সেই লাশ ও আহতদের সমুদ্রে। সে হাতে ছোরা নিয়ে দৌড়াচ্ছে ময়দানময়। তার সঙ্গে তাল রেখে তার পিছু পিছু দৌড়াচ্ছে তার সখি, বাঁদি ও যুদ্ধে আসা অন্যান্য মহিলারাও।
হিন্দা ছিল দশাসই চেহারার জাঁদরেল মহিলা। যেমন বলিষ্ঠ শরীর তেমনি শক্ত সামর্থ্য। সে এক লাশ থেকে আরেক লাশের পাশে ছুটে যাচ্ছিল এবং প্রতিটি লাশ খুঁটে খুঁটে দেখছিল। কোন কোন লাশ মুখ থুবড়ে পড়েছিল, সে পা দিয়ে ঠেলে সেই লাশ সোজা করে দেখতো। সে সঙ্গিনীদের বার বার তাগাদা দিয়ে বলতে লাগল, জলদি খোঁজ, জলদি খোঁজ হামজার লাশ খুঁজে বের করতে হবে।
এভাবে হন্যে হয়ে খুঁজতে খুঁজতে একসময় সে হামজা (রা)-এর লাশ পেয়ে গেল। ক্ষুধার্ত পশুর মতো এসেই লাশের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল সে। কেটে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করতে লাগল হামজা (রা)-এর লাশ। সেই সব টুকরো সে ছুড়ে ফেলতে লাগল এদিকে ওদিকে। অন্যান্য মহিলারা হতবাক হয়ে দেখছিল এ হৃদয়বিদারক দৃশ্য। সে অন্য মহিলাদের দিকে তাকিয়ে পাগলের মতো চিৎকার করে বলতে লাগল, এখানে দাঁড়িয়ে কী দেখছিস তোরা?
মহিলাদের মনে হলো হিন্দা পাগল হয়ে গেছে।
‘এই দেখ, আমি আমার বাবা, আমার চাচা ও আমার ছেলের খুনির লাশকে কী অবস্থা করে দিলাম। যা, মুসলমানদের প্রত্যেক লাশের এমনই অবস্থা কর। প্রত্যেকের কান কেটে আন, নাক কেটে আন। যা, জলদি যা, সর এখান থেকে বলছি।
মহিলারা হিন্দার উন্মাদিনী রূপ দেখে ভয় পেয়ে ওখান থেকে সরে পড়ল। হিন্দার ক্রোধ থেকে বাঁচার জন্য কেউ কেউ শহীদদের লাশগুলো টানাহেঁচড়া করতে লাগল, কেউ বা কাটাছেঁড়াও শুরু করল। হিন্দা আপন মনে হামজা (রা)-এর লাশ টুকরো টুকরো করতে লাগল। এবার সে ছুরি দিয়ে খুুঁচিয়ে হামজা (রা)-এর বুক চিরে দুই ভাগ করে ফেললো। পাঁজরের হাড়ের ফাঁক দিয়ে হিন্দা তার হাত ঢুকিয়ে দিল বুকের মধ্যে। যখন লাশের ভেতর থেকে হাত বের করে আনলো তখন দেখা গেল তার হাতে হামজা (রা)-এর কলিজা। টপটপ করে কলজে থেকে রক্ত ঝরছিল, হিন্দা সেই রক্তাক্ত কলিজা টুকরো টুকরো করতে বসল এবার। কিন্তু কলিজা টুকরো করেও শান্ত হলো না তার মন, সে এবার হামজা (রা)-এর কলিজার টুকরো মুখে পুরে কুকুরের মতো চিবাতে লাগলো। অন্যান্য মহিলা অবাক হয়ে তাকিয়েছিল হিন্দার দিকে। তারা দেখল, এ কলিজার টুকরোটা গিলতে চেষ্টা করছে কিন্তু কিছুতেই গিলতে পারছে না। তার গলা দিয়ে কিছুতেই টুকরোটি নিচে নামছে না। স্বস্তির বদলে হিন্দার চেহারা রাগে বীভৎস হয়ে উঠল। সে টুকরোটি মুখ থেকে বের করে ছুড়ে ফেলে দিল দূরে।
খালিদ দেখতে পেল, আবু সুফিয়ান দূরে দাঁড়িয়ে এ দৃশ্য দেখছে। হিন্দার এই পাশবিক কাণ্ড দেখে সে যেন বেশ আনন্দ পাচ্ছে। খালিদ একজন যুদ্ধবাজ, সামনা সামনি লড়াই করে শত্রুকে হত্যা করতে তার বাধে না কিন্তু লাশের সাথে এমন দুর্ব্যবহার তার মনকে বিষিয়ে তুলল, মানুষ এমন ঘৃণিত কাজ করতে পারে দেখে মনে মনে সে খুবই কষ্ট পেল।
খালিদ ঘোড়া ছুটিয়ে আবু সুফিয়ানের কাছে এলো।
আবু সুফিয়ান! খালিদ রাগে ও ঘৃণায় মুখ বিকৃত করে বলল, ‘তুমি কি তোমার স্ত্রীর এই ঘৃণিত ও পাশবিক কাজ পছন্দ করছ?
আবু সুফিয়ান অসহায় দৃষ্টি মেলে খালিদের দিকে তাকাল।
‘চুপ করে আছো কেন আবু সুফিয়ান!’ খালিদ আবার বলল এই ভঙ্গিতে।
‘তুমি হিন্দাকে চেন না খালিদ!’ আবু সুফিয়ান অস্পুট সরে বললো ‘ও এখন পাগলের চেয়েও উন্মাদিনী। এখন যদি আমি বা তুমি তার কাজে বাধা দিতে যাই তবে সে আমাদের পেটও ছুরি দিয়ে ফেড়ে ফেলতে দ্বিধা করবে না।’
খালিদ হিন্দাকে ভালো মতোই জানতো। সে আবু সুফিয়ানের অসহায়ত্ব বুঝতে পারল। আবু সুফিয়ান মাথা নিচু করে ঘোড়ার লাগাম টেনে মুখ ঘুরিয়ে অন্য দিকে চলে গেল। খালিদও এ দৃশ্য সহ্য করতে পারলো না, সেও সরে গেল ওখান থেকে।
যখন হিন্দা হামজা (রা)-এর কলিজা চিবিয়ে ছুড়ে ফেলছিল, তখন পেছনে দাঁড়িয়ে এ দৃশ্য দেখছিল আরো একজন জোবায়ের বিন মুতআমের গোলাম ওয়াহশি বিন হারব। তার হাতে তখনো সেই আফ্রিকান বর্শা যা দিয়ে সে হামজা (রা)-কে শহীদ করেছিল।
‘এখানে দাঁড়িয়ে কী করছ বিন হারব?’ হিন্দা হারবকে দেখতে পেয়ে বলল, ‘যাও, মুসলমানদের লাশগুলো টুকরো করো।’
ওয়াহশি বিন হারব খুব কম কথা বলে, চেষ্টা করে, ইশারা ও ইঙ্গিতে কথা বলার। সে হিন্দার আদেশ মান্য করার পরিবর্তে তার হাত হিন্দার সামনে বাড়িয়ে দিল। তার দৃষ্টি এখন লেপ্টে আছে হিন্দার গলায় পরা সোনার হারের দিকে। হিন্দার মনে পড়লো তার প্রতিশ্রুতির কথা। সে ওয়াহশিকে বলেছিল, যদি তুমি আমার বাবা, চাচা ও বেটার খুনিকে হত্যা করতে পারো, তবে আমার পরনে যত গয়না আছে সব তোমার হবে। এখন সে পুরস্কার নিতে এসেছে। হিন্দা তার সমস্ত গয়না খুলে ওয়াহশি বিন হারবের হাতে দিয়ে দিল। ওয়াহশির ঠোঁটে হাসির আভা ফুটে উঠলো, সে সেখান থেকে চলে গেল। হিন্দার সমগ্র চেতনায় তখন বিজয় ও প্রতিশোধের ভূত চেপে ছিল।
দাঁড়াও বিন হারব। হিন্দা চেঁচিয়ে হাবশি গোলমাকে বলল। যখন সে তার কাছে এলো তখন হিন্দা বললো, আমি তোমাকে বলেছিলাম আমার কলিজা ঠাণ্ডা করতে পারলে তোমাকে আমার গয়না দিব কিন্তু তুমি তার চেয়েও বেশি হকদার। হিন্দা কুরাইশ মহিলাদের দিকে ইশারা করে বলল, ‘তুমি জান এই নারীদের মধ্যে কে কে দাসী আছে, সেই সঙ্গে কে যুবতী ও সুন্দরী। তোমার যে দাসী ভালো লাগে তাকে নিয়ে যাও।
ওয়াহশি বিন হারব তার স্বভাবসিদ্ধ অবস্থায় নীরবে কিছুক্ষণ হিন্দার মুখের দিকে গভীরভাবে চেয়ে রইলো। কিন্তু একবারও দাসীদের দিকে না তাকিয়ে সে অবজ্ঞায় মাথা নত করে সেখান থেকে চলে গেল।
একটু পর যুদ্ধের সেই ভয়াবহ পরিবেশে হিন্দার ভরাট গলার সুমিষ্ট সুরে গান শোনা গেল।
ঐতিহাসিক ইবনে হিশাম বর্ণনা করেছেন, সে সুমিষ্ট গানের ভাষা ছিল এ রকম :
আমি বদরের যুদ্ধের হিসাব এবার বুঝে পেয়েছি।
একটি রক্তাক্ত সমরের প্রতিশোধ রক্তাক্ত সমরেই নিয়েছি।
উৎবা আমার পিতা, তার শোক আমার সহ্যের বাইরে ছিল।
আমার চাচার জন্য শোক ছিল, সন্তানের জন্য শোক ছিল। সে শোকের প্রতিশোধ নিয়ে এখন আমার বুক শীতল হয়েছে।
আমি আমার প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছি।
ওয়াহশি আমার হৃদয় যাতনার ঔষধ দিয়েছে। আমি ওয়াহশির প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব ততদিন যতদিন আমার হাড় মাটির সাথে মিশে না যায়।
আবু সুফিয়ান তার দুই সঙ্গীর সাথে আলাপ করছিল। বলছিল, আমার বিশ্বাস হচ্ছে না মুহাম্মদ জীবিত আছে।
খালিদ হয়তো দূর থেকে অন্য কাউকে দেখে মুহাম্মদ বলে ভুল করছে। বলল তার এক সঙ্গী। আবু সুফিয়ান আরো বলল, আমি সচক্ষে দেখছি খালিদ অশ্বারোহীদের নিয়ে সেই সঙ্কীর্ণ গিরিপথের দিকে গিয়েছিল, যেখান থেকে মুসলমানদের বসে থাকা দেখা যায়। সে গিরিপথ পার হয়নি দূর থেকে মুসলমানদের দেখেই ফিরে এসেছে। ফলে তার দেখায় ভুল থাকা অসম্ভব নয়।
‘মুহাম্মদের অনুসারীগণ!’ আবু সুফিয়ান গিরিপথের গোড়ায় দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে বলল, তোমাদের মাঝে কি মুহাম্মদ বেঁচে আছে?’
রাসূলে করিম (সা) সে শব্দ শুনতে পেলেন। তিনি মুসলমানদের ইশারা করে চুপ থাকতে বললেন। আবু সুফিয়ান আরও জোরে আবারো বলল, তোমাদের মাঝে কি মুহাম্মদ বেঁচে আছে?
কিন্তু মুসলমানরা শুনতে পেয়েও তার কোনো জবাব দিল না।
আবু সুফিয়ান এবার চিৎকার করে বলল, আবু বকর কি তোমাদের মাঝে জীবিত আছে?’
এবারও তার কোনো জবাব দিল না কেউ। তিনবার জিজ্ঞেস করেও কোনো জবাব না পেয়ে সে আবার ডাকল, উমর তুমি কি জীবিত আছো?’
মুসলমানরা নীরব।
আবু সুফিয়ান ঘোড়া ঘুরিয়ে নিচে নেমে এল। সেখানে কুরাইশদের অনেক লোক জটলা করে রাসূলে আকরাম সম্পর্কে নানা রকম জল্পনাকল্পনা করছিল। কিন্তু নিশ্চিত করে কেউ সঠিক খবর বলতে পারছিল না। তারা আবু সুফিয়ানের কাছ থেকে সঠিক খবর জানার জন্য সেখানে দাঁড়িয়ে অধীরভাবে অপেক্ষা করছিল।
‘হে কুরাইশ সম্প্রদায়!’ আবু সুফিয়ান চিৎকার করে বললো, ‘মুহাম্মদ মরে গেছে। আবু বকর, উমরও বেঁচে নেই। এখন মুসলমানরা তোমাদের ছায়া দেখেও ভয় পাবে। আনন্দ কর! আনন্দে নাচো, গাও।’
কুরাইশরা আনন্দে নাচতে শুরু করল। কিন্তু সে কেবল মুুহূর্তকালের জন্য, হঠাৎ গিরিপথের ওপর থেকে কারো ভরাট কণ্ঠের এমন গর্জন ভেসে এল যে, তারা সব নীরব নির্বাক ও পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে গেল।
‘হে আল্লাহর দুশমন!’ শোনা গেল হজরত উমর (রা) এর কণ্ঠ, মিথ্যা বলিস না আবু সুফিয়ান, যাদের তুই মৃত বললি তারা তিনজনই বেঁচে আছে। নিজের সম্প্রদায়কে ধোঁকা দিস না আবু সুফিয়ান। তোর পাপের শাস্তি দেয়ার জন্য আমরা সকলেই জীবিত আছি।
আবু সুফিয়ান ব্যঙ্গের হাসি হেসে গলা উঁচু করে বলল, হে ইবনুল খাত্তাব! তোর আল্লাহ তোকে যে এখনো আমাদের হাত থেকে বাঁচিয়ে রেখেছে সে জন্য শোকর কর। তুই কি আমাদের শাস্তি দেয়ার কথা বলছিস? আমাদের বীরেরা এমন স্বপ্ন বেশি দিন দেখার জন্য তোকে বাঁচিয়ে রাখবে ভাাবিস না। আর মুহাম্মদ বেঁচে আছে বলে কেন মিথ্যে আমাদের ধোঁকা দেয়ার চেষ্টা করছিস?’
আল্লাহর কসম! আল্লাহর রাসূল (সা) বেঁচে আছেন এবং তোদের প্রতিটি কথাই তিনি শুনতে পাচ্ছেন।’
আরবরা প্রথা অনুযায়ী যুদ্ধ শেষে দুই পক্ষের সরদার ও সেনাপতিরা একে অপরের ওপর তিরস্কার ও গালমন্দের তীর বর্ষণ করতো। আবু সুফিয়ান সেই প্রথা অনুযায়ী দূরে দাঁড়িয়ে হজরত উমর (রা)-এর সাথে কথা কাটাকাটি করতে থাকে।
‘হে ইবনুল খাত্তাব! তুই হুবল ও উজ্জার ক্ষমতা ও শ্রেষ্ঠত্বের খবর কি কিছুই জানিস না। বলল আবু সুফিয়ান।
হজরত উমর (রা) রাসূলে আকরামের দিকে তাকিয়ে দেখলেন। রাসূল (সা) ইশারায় তাকেই জবাব চালিয়ে যেতে বললেন।
হে বাতিলের পূজারী! গমগম করে বেজে উঠল হজরত উমর (রা)-এর কণ্ঠ, আল্লাহ তো সেই সত্তা, এ বিশ্ব চরাচরের সর্বত্র ছড়িয়ে আছে যার শ্রেষ্ঠত্ব ও ক্ষমতা। অহমিকার পর্দা ছিঁড়ে যদি বেরিয়ে আসতে পারতি তবে তুইও দেখতে পেতি আল্লাহ কত বড় শক্তিমান ও ক্ষমতাশালী।
‘আমাদের দেবতা যেমন হোবল এবং দেবী উজ্জা’ আবু সুফিয়ান বলল, তোমাদের কি তেমন কোন দেবতা-দেবী আছে?’
যে দেবতার দেবী ছাড়া চলে না, আর দেবীর চলে না দেবতা ছাড়া তেমন পরমুখাপেক্ষী দেবতার আমাদের প্রয়োজন নেই। আমাদের আছে এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহ! যিনি স্বয়ম্ভু, স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং অমুখাপেক্ষী। তোমাদের তো তেমন কোনো স্বয়ংসম্পূর্ণ আল্লাহ নেই।
এবারের মতো যুদ্ধ তো শেষ হলো। আবু সুফিয়ান বললো, তোমরা বদরের ময়দানে আমাদের যেভাবে নাস্তানাবুদ করেছিলে এবার এই পাহাড়ের পাদদেশে আমরা তোমাদের কাছ থেকে তার প্রতিশোধ নিলাম। আগামী বছর আমরা তোমাদেরকে আবার বদরের ময়দানে যুদ্ধের জন্য আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। ‘ইনশাঅল্লাহ! তোমাদের যদি আবারো দোলাই খাওয়ার শখ হয়ে থাকে তাহলে সে আশা পূরণ করার জন্য আমরা অবশ্যই বদরের ময়দানে হাজির হবো। হজরত উমর (রা) জবাব দিলেন, সেদিন আবার বলো না যে আমরা তোমাদের বেইজ্জতি করেছি, বরং বোকারা যেমন নিজের দুর্গতি নিজেই ডেকে আনে তোমাদের দুর্গতি হবে তোমাদেরই হাতের কামাই।
আবু সুফিয়ান ঘোড়া ফিরিয়ে দুই কদম অগ্রসর হয়েই আবার ঘোড়া থামালো। পেছন দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বললো, হে
উমর, আবু বকর ও মুহাম্মদ। আবু সুফিয়ানের কণ্ঠ এখন যথেষ্ট মার্জিত ও নরম, তোমরা যখন ময়দান থেকে লাশ তুলবে তখন এমন কিছু লাশ পাবে যাদের অঙ্গ কাটাছেঁড়া। আল্লাহর কসম, আমি কোন লাশ বিকৃত করার হুকুম দেইনি। এবং লাশের সঙ্গে এমন দুর্ব্যবহার আমি পছন্দও করি না। এ ব্যাপারে আমার ওপর কোন দোষ চাপালে আমার ওপর জুলুম করা হবে। আবু সুফিয়ানও মুখ ঘুরিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে চলে গেল।
ওহুদ পাহাড়ের প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছে খালিদ। মদিনা আর খুব বেশি দূরে নেই। যেতে যেতে খালিদের ঘোড়া নিজে নিজেই দিকপরিবর্তন করলো। খালিদ বাধা দিল না, সে বুঝতে পারলো ঘোড়াটি কোন পানির সন্ধান পেয়েছে। কিছুুদূর গিয়ে ঘোড়া নিচের দিকে নেমে যেতে লাগলো। খালিদের মনে পড়ে গেল এই জায়গার কথা। ওহুদ যুদ্ধের পর ফেরার পথে কুরাইশরা এখানে থেমেছিল বিশ্রামের জন্য। নিচে পানির বিশেষ উৎস মজুদ ছিল।
ঘোড়া খুব দ্রুত সে পানির ঘাটে নেমে গিয়ে থামলো। খালিদ ঘোড়া থেকে লাফ দিয়ে নিচে নামলো এবং অঞ্জলি ভরে মুখে পানি ছিটালো। একটু বিশ্রামের জন্য উপত্যকায় এক বৃক্ষের ছায়ায় বসে পড়লো। তার সেই সময়ের কথা মনে পড়ছে, যখন ওহুদের যুদ্ধ শেষে কুরাইশরা ফিরে এসেছিল এখানে। এখানে বিশ্রাম করার সময়ই কুরাইশ সরদারদের মাঝে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। একদল বলছিল, মুসলমানদের সাথে বোঝাপড়া শেষ না করে, দুনিয়ার বুক থেকে মুহাম্মদ ও তার নতুন ধর্মকে নিশ্চিহ্ন না করে তারা মক্কায় ফিরে যাবে না। প্রয়োজনীয় বিশ্রাম নিয়ে তারা মুসলমানদের ওপর আর একবার আক্রমণ চালাবে এখান থেকে। সাফওয়ান বিন উমাইয়া বললো, ‘আমরা পরাজয় বরণ করে আসিনি। যদি তোমরা মনে কর যে, মুসলমানের অবস্থা খুবই খারাপ, তবে নিজেদের অবস্থা দেখো, আমাদের অবস্থাও ভালো নেই। মুসলমানদের সঙ্গে এতো তাড়াতাড়ি আবার যুদ্ধ বাধানোর বিপদ মাথায় নেয়া উচিত নয়। অতিরিক্ত কোন কিছুই ভালো নয়। এখনি আবার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে এমনও তো হতে পারে ভাগ্য আমাদের পক্ষেও না থাকতে পারে?
কুরাইশদের মধ্যে যখন এই বিতর্ক চলছিল, তখন কয়েকজন লোক দু’জন পথিককে ধরে নিয়ে সরদারদের সামনে হাজির করলো। এই দু’জন লোক যারা নিজেকে পথিক বলছে, এরা আমাদের তাঁবুর আশপাশে ঘোরাঘুরি করছিল। এমন সময় আমাদের চার পাঁচজন লোক তাদের জিজ্ঞেস করে, তোমরা কোথায় যাচ্ছো? তারা এমন এক জায়গার নাম বলে যে জায়গা আমাদের কেউ চেনে না।
আবু সুফিয়ান ও অন্যান্য সরদাররা তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করলো। এবারও তারা একই উত্তর দিল। তখন আবু সুফিয়ানের ইশারায় তাদের দেহ তল্লাশি করা হলো। তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া গেল ছোরা ও তরবারি। তাদের জিজ্ঞেস করা হলো, তোমরা এই অস্ত্র গোপন করে রেখেছিলে কেন?
তারা এর কোনো জবাব না দিয়ে চুপ করে রইল। খালিদের সন্দেহ হলো এরা মুসলমানদের গোয়েন্দা। এরপর তাদের নিয়ে যাওয়া হলো কুরাইশ সৈন্যদের সামনে। তাদেরকে দাঁড় করিয়ে কুরাইশ সৈন্যদের জিজ্ঞেস করা হলো, ‘এদেরকে কেউ চেনো?’
দুই-তিন জন উত্তর দিল, আমরা এদের চিনি, এরা মদিনার বাসিন্দা।
কুরাইশের এক ব্যক্তি উঠে বললো, এদের একজনকে আমি ভালো মতোই জানি, ওকে আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে দেখেছি।
আবু সুফিয়ান দু’জনের দিকে তাকিয়ে বললো, তোমরা যদি নিজের মুখে স্বীকার কর, তোমরা মুহাম্মদের গোয়েন্দা তাহলে আমি তোমাদের বাঁচানোর জিম্মা নিলাম।
দু’জনের একজন স্বীকার করলো।
যাও আমি তোমাদের ক্ষমা করলাম। আবু সুফিয়ান বললো।
এ দু’জন আসলে মুসলমানদের গোয়েন্দা ছিল এবং তারা কুরাইশদের পরিকল্পনা সম্পর্কে তথ্য নিতে এসেছিল। ছাড়া পেয়ে ওরা দু’জন হাসিমুখে তাদের উটের দিকে চলে যাচ্ছিল। আবু সুফিয়ানের ইঙ্গিতে তীরন্দাজরা দু’জনের ওপর
পেছন থেকে তীর চালাল। ওরা তীর খেয়ে পড়ে গেল আর উঠতে পারল না।
‘তোমরা কি উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেছ?’ আবু সুফিয়ান তার পাশে দাঁড়ানো সরদারকে বলল, গোয়েন্দা পাঠানোর উদ্দেশ্য হলো মুসলমানরা হেরে যায়নি, তারা এক্ষুণি বা কিছুক্ষণের মধ্যে আক্রমণ করার পরিকল্পনা করছে। আমার নির্দেশ হচ্ছে, তোমরা জলদি মক্কায় রওনা হও এবং আগামীতে যুদ্ধের জন্য ভালো করে প্রস্তুতি নাও।
পরের দিন রাসূলে করিম সংবাদ পেলেন, কুরাইশরা যেখানে অবস্থান করেছিল, সেখানে তারা দু’জন গোয়েন্দাকে হত্যা করে লাশ ফেলে মক্কায় চলে গেছে।
খালিদ এই প্রথম বড় কোন যুদ্ধে লড়াই করলো। সে বুঝতে পারলো, তারা মুসলমানদের পরাজিত করতে পারেনি। চার বছর পর আজও তার চিন্তা চেতনা বলছে, মুসলমানদের এই শক্তি কোনো সাধারণ শক্তি নয়। এ শক্তির পেছনে রয়েছে কোনো নিগূঢ় গোপন রহস্য, যে রহস্য আজও সে জানতে পারেনি। তার কাছে কুরাইশদের কিছু ত্রুটি ধরা পড়লো। কুরাইশদের কিছু কথা ও কিছু কাজ তার ভালো লাগেনি। ইহুদিদের দু’টি অসামান্য সুন্দরী মেয়ের কথাও মনে পড়ল, যারা কুরাইশদের সরদারদের সঙ্গে অন্তরঙ্গভাবে মিশে গিয়েছিল। সে জানতো, ইহুদিরা তাদের সুন্দরী মেয়েদের দিয়ে জাদুর খেলা দেখায়। এরা কুরাইশ সম্প্রদায়ের ওপর প্রভাব বিস্তার করে সে প্রভাব মুসলমানদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে চেষ্টা করেছে। এই পদ্ধতি তার কাছ মোটেই পছন্দনীয় ছিল না।
এই দুই সুন্দরীর একজন খালিদের সঙ্গে দেখা করেছিলো। খালিদ তখন অনুভব করেছিলো, এই সময় কেবল সুন্দরী নয়, সে অসম্ভব বুদ্ধিমতী ও জ্ঞানী। মেয়েটির যৌবন ও সৌন্দর্যে যেমন তাক লাগনো জাদু আছে, তার কথার জাদু তার চেয়েও শক্তিশালী।
অনেকক্ষণ পর্যন্ত এই নারী খালিদের মানসপটকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। তার ঘোড়া যখন হ্রেষা রবে ডেকে উঠলো তখন খালিদ যেন স্বপ্নের ঘোর থেকে জেগে উঠলো। সে দ্রুত উঠে দাঁড়ালো এবং ঘোড়ায় চড়ে পুনরায় মদিনার রাস্তা ধরলো।
ওয়ালিদের পুত্র খালিদ ছিল রাজপুত্রের মত বিত্তবৈভবের অধিকারী। বিলাসিতা সুখ ও আনন্দের প্রতি বিমুখ ছিল না। কিন্তু বিলাসিতা ও সুখের চাইতে যুদ্ধের উন্মাদনা তার কাছে বেশি গুরুত্ব পেতো। মদিনার দিকে যাওয়ার সময় তার মনে সেই কমনীয় ইহুদি যুবতীর ছবি বারবার ভেসে উঠলো, যার নাম ইউহাদা। রঙবেরঙের প্রজাপতি হয়ে তার মনে উড়ে বেড়াতে লাগলো। খালিদ অনেক চেষ্টা করেও সেই প্রজপতিকে তার সামনে থেকে সরাতে পারলো না।
ওহুদ যুদ্ধের তিন চার মাস পরের ঘটনা। কুরাইশরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ভয়ঙ্কর এক ষড়যন্ত্র করে, যে ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত ছিল না খালিদ কিন্তু সে কুরাইশদের সম্প্রদায়ের এমন প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিল যে, মুসলমানদের বিরুদ্ধে কোন ষড়যন্ত্রে অংশগ্রহণ না করলে তার দায় সে এড়াতে পারতো না। সে এমন দাবি করতে পারতো না যে সে তাতে জড়িত নয়।
ওহুদ যুদ্ধে আহত হওয়া বিভিন্ন কুরাইশ যোদ্ধার ক্ষত তখনও সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যায়নি, একদিন খালিদ সংবাদ পেল, মদিনা থেকে ছয়জন মুসলমান ইসলামের তাবলিগের জন্য রাজির দিকে যাচ্ছে। পথে আফফান থেকে কিছু দূর একটি অমুসলিম সম্প্রদায় তাদের বাধা দেয় এবং দু’জনকে ধরে মক্কাতে নিয়ে আসে। খালিদ খবর পেলো তাদের এখন নিলামে বিক্রি করা হচ্ছে। খালিদ দৌড়ে সেখানে গেল। দেখল, মুসলমানদের একজন যুবায়ের বিন আদি, অন্য জন জায়েদ বিন দিসনা। খালিদ দু’জনকেই ভালো করে চিনতো ও জানতো। তারা উভয়েই খালিদের সম্প্রদায়ের লোক ছিল। ইসলাম গ্রহণ করে তারা মদিনায় চলে যায়। রাসূলের জন্য তাদের ভালোবাসা এমন প্রচণ্ড ছিল যে, তারা নবী করিমের জন্য প্রাণ দিতে সবসময়ই ছিল এক পায়ে খাড়া। রাসূলে করিমও তাদের খুবই প্রিয় জানতেন। খালিদ দেখলো, তাদেরকে একটি মঞ্চে দাঁড় করানো হয়েছে, আর তার চারপাশে কুরাইশরা ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। দু’জনের হাতই রশি দিয়ে বাঁধা এবং যারা তাদের ধরে এনেছে তাদের এক ব্যক্তি সে রশি ধরে পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
এই দু’জন মুসলমান! একজন মঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলো, তারা দু’জনই ওহুদ যুদ্ধে তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। এদের হাতে তোমাদের বহু আত্মীয় স্বজন মারা গেছে। এমন কেউ কি আছো, প্রতিশোধের আগুন নেভাতে চাও? তাহলে এদের ক্রয় করো এবং নিজে হাতে হত্যা কর। রক্তের বদলে রক্ত এই শর্তেই এদের কিনতে পারবে। যারা বেশি মূল্য দেবে তারাই পাবে এদের।
দুই অশ্ব একজন বলে উঠলো।
দুই অশ্ব, দুই অশ্ব, ডাকতে থাকল সে।
দুই ঘোড়া ও একটি উট। আরেক জন বলে উঠলো।
ঘোড়া ও উটের কথা বাদ দাও, সোনার বলি দাও। সোনা আনো, শত্রুর রক্তে প্রতিশোধের আগুন নেভাও বলে উঠল একজন।
যাদের নিকটাত্মীয় ওহুদ যুদ্ধে মারা গিয়েছিলো, তারা বেশি বাড়িয়ে বলছিল। যুবায়ের ও জায়েদ চুপচাপ দাঁড়িয়ে। তাদের মুখে কোনো ভয় বা শঙ্কার লেশ নেই। নেই আতঙ্ক বা সামান্যতম অশান্তির বোধ। খালিদ ভিড় ঠেলে সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।
(চলবে)

SHARE

Leave a Reply