Home গল্প আনন্দেও কষ্ট থাকে -মোহাম্মদ সফিউদ্দিন

আনন্দেও কষ্ট থাকে -মোহাম্মদ সফিউদ্দিন

উজান এলাকার নদীতে বাঁধ দিয়ে পানি আটকে দেয়া হয়েছে। ভাটির এলাকার বিশাল বিশাল নদীগুলো পানির অভাবে বালুচরে পরিণত হয়েছে। হারিয়ে গেছে চিল, পানকৌড়ি, কুমির, ঘড়িয়াল, শিশুক, কাছিম ডলফিনসহ মাছখেকো নানা জাতের প্রাণী।
বড়ো বড়ো নদীপাড়ে বাতাসের ঝাপটা বয়ে যায়। শুভ্র কাশ ফুলে গিয়ে বাধা পেলেই কাশ ফুলগুলো নেচে ওঠে। এক সময় কাশবনের ভেতর ছিলো শেয়াল খাটাস মামাদের দুরন্তপনা। কাছিমের মায়েরা কাশবনের অভাবে ডিম পেড়ে ছানা তুলতে পারে না। মাছরাঙা পাখিরা নদীর উঁচুপাড় না পেয়ে মাটি খুঁড়ে গর্ত করে বাসা বানাতে পারে না। শালিক, ময়নারাও হারিয়ে যাবার পথে। খাদ্যের অভাবে কিলবিল করা পশুপাখিরা একে একে সব হারিয়ে যাচ্ছে দেশ থেকে।
আনিকা, নাবিল আর শিশির ভালো বন্ধু। ওদের বাড়ি পাশাপাশি। স্কুল আর খেলাধুলায় সবার আগে আগে। ভোরবেলায় ওরা ছুটে যায় বিলের পাড়ে। অনেকে বিল দখল করে সেখানে বালু ফেলেছে অনেক জায়গাজুড়ে। নতুন বালু পেয়ে জন্ম নিয়েছে বিশাল এলাকাজুড়ে ছোট ছোট কাশবন। শরতের আগমনে শুভ্র কাশফুলে দু’চোখ ধাঁধিয়ে যায়।
আনিকা দুরন্ত মেয়ে। কাশফুলের মতো মাতানো নাচ দেখে ওদেরও নাচতে ইচ্ছে করে। তিন বন্ধু নিজেদের সংবরণ রাখতে পারে না। ওরা শিশির ভেজা কাশবনে ঢুকে পড়ে মনের ভয়কে জয় করে। ভুলে যায় মায়েদের সতর্কবাণী। মায়েরা বলেছেন, তোরা ভোরবেলায় কাশবনে গিয়ে দুরন্তপনা করিস না। কাশবনে থাকে শেয়াল-খাটাস আর বড়ো বড়ো বিষাক্ত সাপ! ওদের মুখে পড়লে আর রক্ষে নেই!
কাশবনের কাছে আসতেই মায়েদের কথা ভুলে যায়। আনিকা ফড়িংয়ের মতো দু’হাত ছড়িয়ে দৌড়ে যায়। তা দেখে নাবিলও প্রজাপতির মতো হাত দুটো নাড়ায়। বসে থাকে না শিশির। শিশির হামু দিয়ে মাথা উঁচু করে শেয়ালের মতো দুচোখে এদিক ওদিক মেলে। ওদের দুরন্তপনা দেখে পুবদিক আলো করে সূর্যমামা দৌড়ে উঠে আসে। কিন্তু নীল আকাশে ওড়ে বেড়ানো সাদা সাদা মেঘগুলোর সহ্য হয় না। মুহূর্তের মধ্যে সূর্যমামার আগুনঝরা মুখে জমে যায়।
সূর্যমামা আর মেঘমালাদের লুকোচুরি খেলায় ওরাও মেতে ওঠে। ওদের ভয়ে কাশপাতা চুরি করতে আসা বাবুই পাখিরা প্রাণ ভয়ে ছড়ছড় করে উড়ে যায় দলবেঁধে। এক সঙ্গে শত শত বাবুই পাখির চিৎকার সকালের কাশবনে অন্য এক অনুভূতি সৃষ্টি করে। এগিয়ে যেতে যেতে ওরা তিন বন্ধু কাশবনের শেষ প্রান্তে চলে আসে।
এ দিকটায় আগে কখনো আসেনি। কাশবন লাগুয়া ধলেশ্বরী নদী। নদীর ওপারে নতুন নতুন দালান উঠেছে। ওরা বুঝতে পারছে না দালানগুলা কারা তৈরি করছে। তবে আনিকা বুঝতে পারছে একদিন হয়তো আমাদের মজা করার কাশবনটিও থাকবে না। ওপারের মতো এপারেও ওই রকম দালান গড়ে তুলবে কেউ কেউ।
নাবিল নদীপাড়ে এসেই চমকে ওঠে। আহ কী বড়ো নদী! নদী দিয়ে বড়ো বড়ো নৌকা, ট্রলার বয়ে যাচ্ছে। কাশবন লাগুয়া কয়েকটি বেদেনৌকা বাঁধা রয়েছে। বেদের ছোট ছোট ছেলেমেয়ে নদীতে জাল, বড়শি দিয়ে মাছ ধরছে। কারো জালে দু-একটি মাছ উঠলেই আনন্দে লাফিয়ে সবাইকে জানিয়ে দিচ্ছে।
একজন বৃদ্ধলোক একটি ডোঙা নিয়ে বসে আছে। তিনি প্রতিদিন লোকজন পারাপার করে একশো বিশ টাকা কিংবা একশো ত্রিশ টাকা আয় করে সংসার চালান। শিশির ডোঙাটি দেখে বললো, এই আনিকা চল আমরা ওই ডোঙায় ওঠে একটু বেড়িয়ে আসি।
নাবিল মনে মনে বললো, আমি সাঁতার জানি না। না বাবা আমি ডোঙায় চড়বো না। ডোঙায় চড়লে মাঝ নদীতে গিয়ে ডোঙাটি যদি ডুবে যায় তাহলে পানিতে ডুবে মরতে হবে। আনিকাও তাই ভাবছিলা। শিশিরের কথায় বললো, শিশির ডোঙায় চড়া ভালো না। দাদুর মুখে শুনেছি ধলেশ্বরী নদীটা ভালো না। এ নদীতে নাকি নৌকা ডুবে, গোসল করতে নেমে অনেক মানুষ, গরু মহিষ ডুবে মারা যেতো। কাজেই ডোঙায় চড়ে কাজ নেই। চল আমরা বাড়ি ফিরে যাই।
নাবিল আনিকাকে সমর্থন করে বললো, হ্যাঁ তাই চল। আজ আমরা অনেক দেরি করে ফেলেছি। স্কুলে যাবার সময় হয়ে এলো। বাড়ি গিয়ে গোসল করে ভাত খেয়ে স্কুলে যাই।
শিশির বললো, তাই তো!
আনিকা বললো, এই নাবিল আজই তো রোজার জন্য আমাদের স্কুল বন্ধ দিবে তাই না? অনেক দিন ছুটি হবে। আহ কী মজা! তিন বন্ধু এবার ঢেউয়ের মতো চঞ্চলা পায়ে বাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে কয়েকটি করে কাশফুল তুলে নিয়ে বাড়ির দিকে চলে গেলো।
ঈদের বাকি আর দুই দিন। তিন বন্ধুর স্কুল ছুটি হয়ে গেছে। ওদের পুরো এক মাস পড়ার তাগিদ নেই। সারাদিন শুধু রোজা মুখে ঘুরে বেড়ানো। কার বাড়িতে কে কত প্রকার ইফতারি তৈরি করছে। কারা এবার গরু কিনছে তা দেখতে ওদের খুব ভালো লাগে। শুধু ওদেরই নয়। গ্রামে ছোটদের সবারই ভালো লাগে। ইতোমধ্যে বাবা-মায়েরা সন্তানদের সাধ্যানুযায়ী নতুন জামা কাপড় কিনে দিয়েছেন। ওদের জামা কাপড় কিন্তু কেউ কাউকে দেখায়নি। দেখাবে কেন? আগে দেখালে যে ঈদের দিন মজা পাওয়া যায় না!

তাই নিজে নিজেই মাঝে মাঝে স্যুটকেস থেকে বের করে নতুন জামা কাপড়ের ঘ্রাণ নিয়ে আনন্দ প্রকাশ করে আবার ভাঁজ দিয়ে স্যুটকেসে রেখে দেয়। আনিকার মা আনিকাকে খুব ¯েœহ করেন। একমাত্র মেয়ে। টাকা পয়সার কমতি নেই। কিন্তু আনিকার বাবা একটু কিপটা। তাই গাঁটের টাকা খরচ করতে চান না। মায়ের কাণ্ড দেখে মুখ টিপে হাসেন।
প্রতিদিন রোজা মুখে বন্ধুরা এপাড়া ওপাড়া ঘুরে বেড়ায়। সেদিন পুব পাড়ায় যেতেই পথের পাশে একটি ষাঁড় গরু বাঁধা দেখতে পেয়ে সাকিবকে জিজ্ঞেস করল, এই সাকিব এ গরুটা দিয়ে কী করবি?

সাকিব বললো, কেন আমরা ঈদের দিন জবাই করে মাংস খাবো। তোরা এক ভাগ মাংস নিবি?
আনিকা বললো, এক ভাগ মাংস দিয়ে আমাদের কিছু হবে না। আমাদের বাড়িতে অনেক মেহমান আসবে। আমার বাবাকে বলে একটা আস্ত গরু কিনে এনে জবাই করে ঈদের দিন সবাইকে নিয়ে মজা করে খাবো। বাবা যদি গরু কিনে না আনে তাহলে আমি ঈদের দিন নতুন জামা পরবো না, গোসল করবো না। সারাদিন টইটই কর কোথাও ঘুরে বেড়াবো না। আমি শুধু ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কাটাবো।
বাবা অনিচ্ছা সত্ত্বেও আনিকার ওপর জেদ ধরে বাজার থেকে একটি গাভী কিনে আনলেন। গাভী গরুর গোশত নাকি খেতে খুব সুস্বাদু হয়। তার ইচ্ছে ছিলো কারো সঙ্গে একটি গরু কিনে এক ভাগ মাংস নেবেন। কিন্তু আনিকার জন্য তাকে শুধু শুধু অনেক টাকা খরচ করতে হলো।
ফজরের নামাজের পরেই গ্রামের মসজিদে থেকে ঘোষণা এলো, সকাল আটটায় ঈদের জামায়াত অনুষ্ঠিত হবে। ঘোষণাটি শুনতেই আনিকা ঘুম থেকে ওঠে নাবীল আর শিশিরকে নিয়ে চলে গেলো বাড়ির পাশের পুকুর ঘাটে। পুকুর ঘাটে অনেক ছেলেমেয়ে দাপাদাপি করে গোসল করছে। বয়স্করা ওদের ধমক দিচ্ছেন। কিন্তু আজ ঈদ, ঈদের দিনতো আনন্দের দিন। ছোট-বড়ো সবাই সমান। তাই এদিনে কেউ কাউকে ধমকে দেয়! আনিকা মন খারাপ করে চুপচাপ গোসল সেরে ওঠে এলো।
আনিকাকে চলে আসতে দেখে বন্ধুরাও চলে এলো।
নাবিল আর শিশির নতুন জামা কাপড় পরে সোজা চলে এসেছে আনিকাদের বাড়ি। আনিকার বাবা ভোরবেলায় গাভীটাকে ঝাঁপিয়ে দিয়েছেন। কিছু তাজা ঘাসও খেতে দিয়ে ঈদের নামাজ পড়তে ঈদগাঁয় চলে গেছেন। আনিকা মেয়ে মানুষ। তাই ঈদের মাঠে যায়নি। ওর দেখাদেখি নাবিল শিশিরও যায়নি।
আনিকা, নাবিল আর শিশিরের মনেও আনন্দ ধরে না। ওরা মনে মনে ঠিক করে রেখেছে গাভীটি কাটা হলে গবরির ওপরের পর্দা নিয়ে নতুন পাতিলের মুখে লাগিয়ে ডুগডুগি বানিয়ে রোদে শুকিয়ে ধমধমা ধম বাজাবে। বুদ্ধিটা কিন্তু আনিকা আর নাবিলের মাথায় ছিলো না। শিশিরিই গতবার মামা বাড়ি থেকে শিখে এসেছে।
বাবা নামাজ পড়ে এসেছেন। সঙ্গে এসেছে আশপাশের বাড়ির কয়েকজন বয়স্ক লোক। একটু পরেই কিনে আনা গাভীটি জবাই করে দেয়া হবে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা টান টান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ কেউ গাভীর গায়ে হাত বুলিয়ে দিয়ে আদর করছে। এদিকে আনিকার মা গরু কাটতে যারা এসেছে তাদের ডেকে নিয়ে মিষ্টি পায়েস খেতে দিয়েছেন। গরু কাটা হলে গোশত রান্না করা হবে। সঙ্গে খিচুড়ি পোলাও। তখন সবাই মিলে গরুর মাংস দিয়ে মজা করে খাবে।
মসজিদের মুয়াজ্জিন ইয়া বড়ো একটি ছুরি নিয়ে হাজির। আট-দশজন বয়স্ক লোক গাভীটাকে হাত পায়ে দড়ি বেঁধে শুয়ে দিয়েছেন। মুয়াজ্জিন আনিকার বাবার কাছে থেকে অনুমতি নিয়ে আল্লাহু আকবার বলে ছুরি চালিয়ে দিলেন।
চামড়া ছিলে পেট কাটতেই সবার চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে গেলো। এ কী! আনিকাও চমকে ওঠে মাকে ডেকে বললো, মা মা দেখে যাও আমাদের গরুর পেটে আরেকটি গরুর ছোট বাচ্চা ঘুমিয়ে আছে! নাবিল আর শিশির চিৎকার করছে। অন্য শিশুরাও বলছে, গরুর পেটে বাচ্চা!
গাভীর পেটে বাচ্চা দেখে সবার মন খারাপ হয়ে গেলো। ঈদের আনন্দ মুহূর্তের মধ্যে উদাও হয়ে যায়। বাবা চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বললেন, না আমার নিয়ত ঠিক ছিলো না। আমার এতো টাকা-পয়সা থাকতেও আমি একটি ষাঁড় গরু কিনিনি।
আমি আনিকার ওপর জেদ ধরে গাভী গরুটি অল্প টাকা দিয়ে কিনেছিলাম। তাইতো একটির জায়গায় দুটো জান চলে গেলো।
আল্লাহ তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও। আল্লাহ, না বুঝে আমি অনেক বড় অন্যায় কাজ করে ফেলেছি। হে আল্লাহ তুিম আমাকে মাফ করে দাও। বাবা এ কথা বলে আনিকাকে বুকে চেপে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লেন।

SHARE

Leave a Reply