Home উপন্যাস দীনেশের দীন বদল -আহমদ বাসির

দীনেশের দীন বদল -আহমদ বাসির

তৃতীয় কিস্তি

চার.
দেখতে দেখতেই কেটে যায় দিন। সময় আর স্রোত নাকি কারো জন্যই অপেক্ষা করে না। দীনেশের দিনও বসে থাকে না, কেটে যায়। সকালের সূর্য সন্ধ্যায় অস্তমিত হয়। একেকটা দিন পার হয়ে যায় এভাবেই। অনিমেষ খুন হওয়ার পর এক মাস পার হয়ে গেল। কিন্তু এ খুনের কোনো কারণ জানা গেল না। দীনেশ প্রায়ই অসহায়ের মতো ঘরের দাওয়ায় বসে থাকে।  আবির আর আসল প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা দু’বার করে দীনেশের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। ওরা এলে দীনেশের অসহায় ভাব কিছুটা কেটে যায়। ওরা চলে গেলে আবার যেই-সেই। মা, ঠাকুর মা, এমনকি ছোট বোনটার সঙ্গেও কোনো ভাব-বিনিময় হয় না দীনেশের। আবির আর আসলের সঙ্গ ছাড়া, বাকি সময়টা দীনেশ ধ্যানের জগতেই কাটিয়ে দেয়।
গত এক মাস দীনেশের লেখাপড়া, খেলাধুলা, স্কুলে যাওয়া বন্ধ। স্কুলের শিক্ষকরা দল বেঁধে এসেছিলেন দীনেশকে দেখতে, ছাত্ররাও এসেছিল। ওরা সবাই মিলে দীনেশকে সান্ত্বনা দিয়েছে, আগের মতো লেখাপড়া চালিয়ে যেতে উৎসাহ দিয়েছে। শিক্ষকদের চেষ্টায় স্কুল কর্তৃপক্ষ দীনেশের টিউশন ফিও মওকুফ করে দিয়েছে। সে খবরও দীনেশকে দেয়া হয়েছে। স্কুলের ছাত্র-শিক্ষকরা চাঁদা দিয়ে দীনেশের পরিবারকে সহযোগিতা করার জন্য একটা ফান্ড গঠন করেছেন। সেই ফান্ডের যৎসামান্য টাকাও দীনেশের মায়ের হাতে দিয়ে গেছেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক। এদিকে আবির ও আসলের প্রচেষ্টায় গ্রামের লোকজনও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। দীনেশের পরিবারকে সহযোগিতার জন্য তারাও একটি ফান্ড গঠন করেছে। মাওলানা হাসানসহ গ্রামের গণ্যমান্য লোকজন মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দীনেশের পরিবারকে নিয়মিতভাবে সাহায্য করা হবে। এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি আর্থিক সহযোগিতা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন আবিরের আব্বু রাকীব উদ্দীন আহমদ এবং আসলের আব্বু আবুবকর সিদ্দিক। তারা দু’জনই বিদেশে ভালো চাকরি করেন। প্রতি বছর একই সময়ে দু’জনই দেড়-দু’মাসের ছুটি নিয়ে দেশে আসেন। গ্রামের গরিব মানুষকে সহযোগিতা এবং সামাজিক উন্নয়নে এরা থাকেন সবার আগে। দীনেশের পরিবারকে সহযোগিতা করার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি।
দীনেশকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে আবির ও আসলের চেষ্টার কমতি নেই। প্রতিদিনের মতো সেদিনও ফজরের নামাজ আদায় করেই আবির ও আসল দীনেশদের বাড়ির উদ্দেশে রওনা করে। বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছতেই দেখা যায়, দীনেশদের বাড়ির প্রবেশমুখে রাস্তার ওপর একটি পুলিশের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। আবির ও আসল গাড়ির কাছাকাছি হয়। গাড়িতে কেউ নেই। সম্ভবত পুলিশের লোকেরা দীনেশের বাড়িতে এসেছে। এগিয়ে যায় আবির ও আসল। দীনেশদের বাড়ির উঠানে পৌঁছাতেই ওরা দেখতে পায় পুলিশদের। থানার একজন তদন্ত কর্মকর্তা দুইজন কনস্টেবল সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। এতো ভোরে এখানে পুলিশ দেখে কিছুটা অবাক হয় আবির ও আসল। গত এক মাসে পুলিশের কোনো দেখা-সাক্ষাৎ পাওয়া যায়নি। হঠাৎ এই সাতসকালে পুলিশ কেন? দীনেশদের পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় কোনো মামলাও করা হয়নি। অনিমেষের যে কাকা ভারত চলে গেছেন তিনি ফোন করে অনিমেষের মাকে বলেছিলেন থানায় মামলা করার জন্য। অনিমেষের মা কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেনÑ‘মামলা করে কী হবে, আমি কি আমার অনিমেষকে ফিরে পাবো। মামলা করে যদি আমার অনিমেষকে আমি ফিরে পেতাম, তাহলে অবশ্যই আমি মামলা করতাম। না, আমি মামলা করব না। ভগবান আমার অনিমেষকে ভালো রাখুন, আমি শুধু এই কামনাই করব?’
তাহলে আবার পুলিশ কেন? ভাববার সুযোগ পায় না আবির ও আসল। দীনেশ, দীনেশের মা ও ঠাকুর মার সঙ্গে কথা বলে বেরিয়ে যাবেন এমন সময় আবির ও আসলকে দেখতে পান পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তা  তিনি দীনেশকে জিজ্ঞেস করেনÑ‘এরা কারা?’
-‘আমার বন্ধু’ সংক্ষেপে জবাব দেয় দীনেশ।
-‘ওরা কি তোমার খুব কাছের বন্ধু? তোমরা কি একই ক্লাসে পড়।’ জানতে চান তদন্ত কর্মকর্তা।
-‘জি, ওরা আমার খুব কাছের বন্ধু। আমরা একই ক্লাসে পড়ি।’ জবাব দেয় দীনেশ।
তদন্ত কর্মকর্তা আবির ও আসলকে ভালো করে দেখেন নেন। একটু উশখুশ করে বলেনÑ‘তাহলে তো ওদের সঙ্গেও একটু কথা বলতে হয়।’
-‘জি, বলতে পারেন’ বলেই দীনেশ আবির ও আসলের দিকে তাকায়। ওরা দু’জন তদন্ত কর্মকর্তাকে সালাম দিয়ে তার কাছাকাছি এসে দাঁড়ায়। তদন্ত কর্মকর্তা আবির ও আসলের পরিচয় জেনে নিয়ে তাদেরকে বেশ কিছু প্রশ্ন করেন। খুবই সাদামাটা প্রশ্ন। ওরাও একে একে সব প্রশ্নের জবাব দেয়। তদন্ত কর্মকর্তার হাবভাব কিছুই বোঝা যায় না। তবুও ওরা তদন্ত কর্মকর্তাকে দু’একটি পাল্টা প্রশ্ন করে। ওদের পাল্টা প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়েই তদন্ত কর্মকর্তা জানান, অনিমেষের পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো মামলা না হলেও পুলিশ বাদি হয়ে থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা করেছে। এ মামলার তদন্ত কাজেই এসেছেন তিনি। প্রয়োজন হলে আবারও আসবেন। আবির ও আসলের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য মোবাইল নাম্বার নেন তিনি। নিজের নাম্বারও দেন ওদেরকে। কোনোও ব্যাপারে ওদের কোনো সন্দেহ জাগলে কিংবা কোনো তথ্য পেলে যেন তাকে জানানো হয়, এ অনুরোধও করেন তিনি। যাওয়ার সময় বলে যান, প্রয়োজন হলে আমি আবারও আসবো।

তদন্ত কর্মকর্তা বিদায় নেয়ার পর আবির ও আসল দীনেশকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে। ভোরের বাতাস সেবন করতে করতে তিনজনই হাঁটতে থাকে।
– এভাবে আর কতদিন যাবে দীনেশ। তুই এবার স্কুলে যাওয়া শুরু করে দে। এভাবে মনমরা হয়ে শুয়ে বসে থাকলে তো তুইও অসুস্থ হয়ে পড়বি।
– কারো মুখের দিকে তাকাতে পারি না রে। বুকের ভেতরটা কেবল হু-হু করতে থাকে। আমার কিচ্ছু ভাল্লাগে না, কিচ্ছু ভাল্লাগে না । আমি কী করব বল।
আবিরের কথার জবাব দিতে গিয়ে দীনেশের চোখ পানিতে ভরে যায়। জামার হাতার প্রান্ত দিয়ে সে চোখ মোছে।
– পুলিশ দেখছি হঠাৎ তৎপর হয়ে উঠেছে। অনিমেষ কাকার খুনিদের কি ওরা খুঁজে বের করতে পারবে ? নাকি শুধু শুধু নিয়ম রক্ষার জন্যই এসব করছে পুলিশ।
আসলের মন্তব্যধর্মী প্রশ্নের কোনো জবাব দেয় না আবির। সেও পুলিশের ব্যাপারটা নিয়ে ভাবছে। ভেবে  কোনো কূলকিনারা পাচ্ছে না। ব্যাপারটা নিয়ে হাসান হুজুরের সঙ্গে কথা বলার সিদ্ধান্ত মনে মনে পাকা করে নেয় আবির।
– পুলিশ কী করবে জানি নারে। পুলিশের ব্যাপারটা নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। পুলিশের ওপর আমার কোনো আস্থাও নেই। নেপাল কাকার মেয়েটা যে খুন হয়ে গেল, ধানক্ষেতের মাঝখানে লাশ পাওয়া গেল, কই সে ব্যাপারেও তো পুলিশ কোন কূলকিনারা করতে পারল না। নেপাল কাকা তো কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে থানায় মামলাও করেছিলেন। কিচ্ছু হয়নি। উল্টো নেপাল কাকাই দেশ ছেড়ে চলে গেছেন।
অনেক দিন পর স্বতঃস্ফূর্ত কণ্ঠে কথা বলছে দীনেশ। নেপাল কাকার করুণ কাহিনী মনটাকে বিষাদাক্রান্ত করে তুললেও দীনেশের কণ্ঠস্বর শুনে খুবই খুশি হয় আবির ও আসল। দীনেশকে আজই অনেকটু স্বাভাবিক লাগছে। এতদিন দীনেশের মুখ থেকে কথা বেরুত চাইতো না। আজ নিজে নিজেই অনেক কথা বলছে। দীনেশকে নিয়ে এতদিনের দুশ্চিন্তার বোঝা কিছুটা হালকা হয় আবির ও আসলের।

পাঁচ
গ্রামে পুলিশের আনাগোনা বাড়তে থাকে। পুলিশ নাকি অনিমেষের খুনের ঘটনা তদন্ত করছে। মাঝে মাঝেই জিজ্ঞাসাবাদের নাম করে দু’একজনকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। দু’একদিনের মধ্যে তারা আবার ছাড়াও পেয়ে যায়। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তাদেরকে ছাড়াতে হয়। নির্দোষ লোকদের হয়রানিতে আতঙ্কিত হয়ে ওঠে গ্রামবাসী। গ্রামে পুলিশ এলেই সবার মধ্যে পালাই পালাই ভাব তৈরি হয়ে যায়।
এরই মধ্যে একদিন ভোরবেলা মাওলানা হাসানকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ফজরের অনেক আগে নিজ বাড়ি থেকে তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয়। ফজরের নামাজের সময় এলাকাবাসী জানতে পারেন, মাওলানা হাসানকে গ্রেফতার করা হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাওলানা হাসনকে গ্রেফতার করা হয়েছে-অনিমেষকে খুন করার অভিযোগে। কেন মাওলানা হাসান অনিমেষকে খুন করতে যাবেন? গ্রামের লোকেরা কিছুতেই এ ঘটনা বিশ্বাস করে না। তারা প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। পুলিশের পক্ষ থেকেও পাল্টা হুমকি আসে। যারা একজন খুনিকে গ্রেফতারের প্রতিবাদ করবে, তাদেরকেও এ খুনের মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়া হবে। পুলিশের ভয়ে প্রতিবাদ কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়লেও  তলে তলে এলাকাবাসী ফুঁসতে থাকেন। ষড়যন্ত্রের গোড়া অনেক শক্ত, এটা টের পেতে কারোই  দেরি হয় না। অনিমেষের কোন শত্রু না থাকলেও মাওলানা হাসানের শত্রু সংখ্যা কম নয়। মাদক ব্যবসায়ী, জুয়াড়ি ও চাঁদাবাজ চক্রের হোতারা মাওলানা হাসানকে তাদের শত্রু মনে করে। তাকে ফাঁসানোর জন্যই অনিমেষকে খুন করা হতে পারে। এমনটাই ভাবতে শুরু করেন এলাকাবাসী।
খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আদালতে মাওলানা হাসানের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় পুলিশ। পুলিশের এই তদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, অনিমেষের নতুন বাড়ির পাশের একটি ওয়াকফকৃত জমিতে মাওলানা হাসান একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন। মাদ্রাসার সীমানাও অনিমেষের বাড়ি পাশাপাশি। মাদ্রাসার পাশেই একটা হিন্দু বাড়ি নাকি মাওলানা হাসান মেনে নিতে পারছিলেন না। তিনি নাকি অনিমেষকে প্রস্তাব দিয়েছেন বাড়িটি মাদ্রাসার কাছে বিক্রি করে দেয়ার জন্য নতুবা সপরিবারের মুসলমান হওয়ার জন্য। অনিমেষ রাজি না হওয়ায় মাওলানা হাসানই তাকে খুন করিয়েছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এলাকার কোনো মানুষই এ তদন্ত প্রতিবেদনটিকে বিশ্বাস্য বলে মনে করে না। তারপরও এলাকাবাসীর কিছু করার থাকে না। নাম করা আইনজীবীরাও আদালত থেকে মাওলানা হাসানের জামিন নিতে ব্যর্থ হন। উল্টো দিনের পর দিন রিমান্ডে রেখে মাওলানা হাসানের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়।

দীনেশের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। দীনেশ ও তার পরিবারের কোনো সদস্যই মাওলানা হাসানের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেনি। পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনও তারা বিশ্বাস করে না। অথচ এ ব্যাপারে তাদের কারোই কিছু করার নেই। মাওলানা হাসানকে যেদিন গ্রেফতার করা হয় সেদিন থেকেই দীনেশদের বাড়িতে পুলিশ পাহারা বসানো হয়। পুলিশের ভয়ে কেউ সে বাড়ির আশে পাশেও যেতে পারে না। মাওলানা হাসানের সহযোগী হিসেবে এলাকার আরও কয়েকজনের পাশাপাশি আবির ও আসলকে খুঁজতে থাকে পুলিশ। তারাও গা ঢাকা দেয়। একা একা বাড়িতে বসে থাকা ছাড়া আর কোনো কাজই খুঁজে পায় না দীনেশ।
কয়েকদিন এভাবে কাটার পর একদিন গভীর রাতে দীনেশ বাড়ি থেকে গোপনের বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কাউকে কিছু না বলে রাতের অন্ধকারে বাড়ির পেছন দিক দিয়ে বেরিয়ে যায় দীনেশ। দুরু দুরু বুকে কারো ফ্যান, কারো বাড়ির উঠান, জলাশয়, নর্দমা পার হয়ে বড় রাস্তায় উঠে হাঁফ ছাড়ে দীনেশ। এখন কোথায় যাওয়া যায়? হঠাৎ করেই তার মনে পড়ে মাওলানা হাসানের স্ত্রীর কথা। চাচীর সাথে দেখা করা দরকার। হাসান চাচার বিরুদ্ধে যে আমাদের কোনো অভিযোগ নেই, এটা আগে তাকে জানানো দরকার। তারপর আবির ও আসলের সাথে দেখা করে যা হোক কিছু একটা করা যাবে। কিন্তু এত রাতে ও বাড়িতে যাওয়া কতটা নিরাপদ? সেখানেও পুলিশ পাহারা বসানো হয়েছে কি না কে জানে। তারপরও দুরু দুরু বুকে মাওলানা হাসানের বাড়ির দিকে রওনা করে দীনেশ। অনেক পথ ঘুরে যেতে হবে তাকে। বাড়ির পেছন দিক দিয়ে বের হওয়ার কারণে অনেক দূরে এসে পড়েছে দীনেশ। এখন অনেক পথ ঘুরে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। মনে মনে সাহস সঞ্চার করার চেষ্টা করে সে, কিন্তু বুকটা তার দুরু দুরু করে কাঁপতেই থাকে।

প্রায় আধ ঘণ্টা পর মাওলানা হাসানের বাড়ির অদূরে এসে থামে দীনেশ। বুঝবার চেষ্টা করে এখানে কেউ আছে কি না। এক পর্যায়ে সে নিশ্চিত হয়। না, এখানে কোনো পুলিশ পাহারা নেই। দুরু দুরু বুকে মাওলানা হাসানের ঘরের দরজায় টোকা দেয় দীনেশÑ চাচীমা, জেগে আছেন ?
জেগেই ছিলেন মাওলানা হাসানের স্ত্রী। একটি ছোট্ট ল্যাম্প জ্বালিয়ে জায়নামাজে বসে কুরআন তেলওয়াত করছিলেন। কিছুটা শঙ্কিত কণ্ঠে তিনি জবাব দেন।
– কে?
– আমি দীনেশ চাচীমা, আপনার সঙ্গে আমার জরুরি কথা আছে। দরজাটা একটু খুলুন।
– এত রাতে দীনেশ, তুমি কি একা, না সঙ্গে কেউ আছে?
– কেউ নেই চাচীমা, আমি একা একা পালিয়ে এসেছি।
মাওলানা হাসানের স্ত্রী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ভাব-গতিক বোঝার চেষ্টা করেন। কুরআন শরীফটি বন্ধ করে তিনি জায়নামাজ থেকে উঠে দাঁড়ান। তারপর কিছুটা নিশ্চিত হয়ে দরজা খুলে দেখেন, দীনেশ একাই এসেছে।
– কিভাবে এলে দীনেশ, তোমাদের বাড়িতে না পুলিশ পাহারা বসানো হয়েছে।
– আমি বাড়ির পেছন দিক দিয়ে বেরিয়ে এসেছি চাচীমা।
– ওরা টের পায়নি।
মাওলানা হাসানের স্ত্রী হাতের চার্জার ল্যাম্পটি উঁচু করে দীনেশকে দেখেন আপাদমস্তক। দীনেশের প্যান্ট প্রায় হাঁটু পর্যন্ত গুটানো। পায়ে কাদাময়লা মাখা। তিনি ¯েœœহের সুরে বলেন,
– দীনেশ এতটা রিস্ক নেয়া তোমার ঠিক হয়নি। তুমি দিনের বেলা পুলিশের অনুমতি নিয়েই বের হতে পারতে।
– পারতাম না চাচীমা, ওরা আমাকে কোথাও বের হতে দিচ্ছে না। বাবাকে হারিয়েছি। এখন মনে হচ্ছে আমাদেরও পালিয়ে যেতে হবে।
– না দীনেশ, এতটা হতাশ হয়ো না। হাত-পা ধুয়ে তুমি ঘরে এসে বস।
– না চাচীমা, আমি এখন ঘরে আসব না। আবির আর আসলের সাথে আমার দেখা করা দরকার। আমি শুধু আপনাকে একটা কথা বলতে এসেছি। আমি এখনই চলে যাবো।
– আবির আর আসলকে তুমি কোথায় পাবে দীনেশ । গ্রামের আরও অনেকের মতো ওরাও পুলিশের ভয়ে কোথাও লুকিয়ে আছে। শুধু তোমার চাচা না, আরও অনেকে মিলেই নাকি তোমার বাপকে খুন করেছে।
মাওলানা হাসানের স্ত্রীর কণ্ঠ থেকে শেষ শব্দটি মিলিয়ে যেতে না যেতেই চাপা কণ্ঠে প্রায় চিৎকার করে ওঠে দীনেশ।
– আমি বিশ্বাস করি না চাচীমা, এটা বড় ধরনের একটা ষড়যন্ত্র। হাসান চাচাকে ফাঁসানোর জন্যই আমার বাবাকে খুন করা হয়েছে। আমার বাবা তো অনেক দিন ধরেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে সপরিবারে মুসলমান হতে চেয়েছেন। এসব কথা তো আমি, আমার মা আর দাদি মা ভালো করেই জানি। আমরা তো সবাই মুসলমান হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। এখন পুলিশ বলছে উল্টো কথা। আমাদের বলছে হাসান চাচার বিরুদ্ধে সাক্ষী দেয়ার জন্য। আমরা মামলাও করিনি সাক্ষীও দেবো না। সাক্ষী দিতে হলে হাসান চাচার পক্ষেই দেবো, বিপক্ষে নয় ।
একটানা কথা বলে থামল দীনেশ। তার ভেতরের উত্তেজনা টের পেলেন মাওলানা হাসানের স্ত্রী। তিনি বিস্ময়ের সঙ্গে শুনলেন দীনেশের কথা।
– আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার। তুমি সত্যি বলছ দীনেশ? তোমার চাচাতো কোনদিন এসব কথা আমাকে বলেননি।
– সত্যি বলছি চাচীমা। আমরা এখনও মুসলমান হতে চাই। অনেক আগে থেকে আমার বাবা আমাদের সবাইকে প্রস্তুত করেছেন মুসলমান হওয়ার জন্য। কিন্তু চাচা আমাদের আরও কিছুদিন ধৈর্য ধরতে বলেছেন। গোটা একটা পরিবার মুসলমান হয়ে গেলে বিষয়টা নিয়ে নাকি দেশী-বিদেশী মিডিয়ায় অপপ্রচার হতে পারে। জোর করে ধর্মান্তরিত করা হয়েছে – এ ধরনের কথা উঠতে পারে। এ জন্য তিনি বলেছেন, আরও ভালো করে ইসলাম বুঝার জন্য, যেন কোনো বিবাদ-বাধা এলেও আমরা শান্তভাবে মোকাবেলা করে ইসলামের ওপর থাকতে পারি।
– তোমার চাচা সত্যি কথাই বলেছেন দীনেশ। কিন্তু এত বড় অঘটন ঘটবে কে জানতো।
– চাচীমা, আমি শুধু এ কথা জানানোর জন্যই এসেছি। এখন আমি যাই।
– তুমি এখন কোথায় যেতে চাও দীনেশ ? আবির ও আসলকে তো তুমি এখন খুঁজে পাবে না।
– ওদেরকে না পাওয়া পর্যন্ত আমার আর যাওয়ার কোনো জায়গা নেই চাচীমা। পুলিশ প্রতিদিন আমাদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। বাড়িতে এভাবে বসে থাকতে আমার আর ভালো লাগছে না। আপনি দোয়া করুন, আমি ওদেরকে খুঁজে বের করব।
– এভাবে তুমি ওদেরকে খুঁজে পাবে না দীনেশ। তোমার কাছে কি টাকা-পয়সা কিছু আছে?
– না, চাচীমা, আমার কাছে কিছুই নাই। আমি … দীনেশের কথা শেষ হওয়ার আগেই মাওলানা হাসানের স্ত্রী বললেন,
– তুমি একটু দাঁড়াও বাবা। আমি একটা ঠিকানা লিখে দিচ্ছি। তুমি আগে ওখানে যাও। তারপর আবির ও আসলকে খোঁজা যাবে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই মাওলানা হাসানের স্ত্রী এক টুকরো কাগজে একটি ঠিকানা লিখে দীনেশের হাতে দিলেন। সঙ্গে কিছু নগদ টাকা। টাকাটা হাতে নিতে দীনেশ ইতস্তত করছিল। মাওলানা হাসানের স্ত্রী বললেন,
– এই ঠিকানায় পৌঁছাতে হলে তোমার টাকা লাগবে। এখন এটা নাও। ভোর হওয়ার আগেই তোমাকে গ্রাম ছাড়তে হবে। সাবধানে যেও।
দীনেশ আর একটি কথাও না বলে ঠিকানা লেখা কাগজের টুকরো আর টাকাগুলো হাতে নিয়ে ঘুরে দাঁড়ায়। তারপর হনহন করে হাঁটতে হাঁটতে অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।
মাওলানা হাসানের স্ত্রী চার্জার ল্যাম্পটা হাতে নিয়ে ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকেন অনেকক্ষণ। হঠাৎ তার চোখে পানি এসে যায়। ওড়নার একটি প্রান্ত হাতে তুলে নিয়ে চোখ মুছতে মুছতে তিনি দরজা বন্ধ করেন।
(চলবে)

SHARE

Leave a Reply