Home ফিচার শিশুদের প্রাণে নোবেলের ছোঁয়া -আব্দুল হাদী আল-হেলালী

শিশুদের প্রাণে নোবেলের ছোঁয়া -আব্দুল হাদী আল-হেলালী

২০০৯ সাল। পাকিস্তান ও আফগানিস্তান সীমান্তের সোয়াত নামক উপত্যকায় চরমপন্থী জঙ্গিদের আধিপত্য। কন্যাশিশুদের স্কুলে যাওয়া নিষিদ্ধ। অনেকের মতোই এই ঘটনা ব্যথিত করে ১১ বছর বয়সী মালালা ইউসুফজাইকে। কিন্তু আর সবার মতো কষ্টগুলোকে জিইয়ে রেখে চুপ করে থাকেনি মালালা। স্কুলে যেতে না পারার কষ্টকর স্মৃতিগুলো সে ধরে রাখে ডায়েরির পাতায়।
২০০৯ সালের শেষ দিকে মালালার নাম ছড়িয়ে পড়তে থাকে বিশ্বব্যাপী। বিবিসি আর নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতো গণমাধ্যমে ছাপা হয় তার সাক্ষাৎকার। নারীশিক্ষায় অবদানের জন্য তাকে শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করে পাকিস্তান সরকার। সব মিলে অন্ধকার সোয়াতে এক টুকরো আলো হয়ে ওঠে মালালা। কিন্তু এমন আলো যেন সহ্য করতে পারছিল না দুষ্কৃতকারীরা। তারা ঘোষণা দেয় সুযোগ পেলেই তাকে হত্যা করা হবে। হুমকি মাথায় নিয়েও স্কুল বন্ধ করেনি মালালা। কিন্তু হঠাৎ একদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে ঘটলো সেই অবিশ্বাস্য ঘটনা, মালালার ওপর গুলি চালায় একদল চরমপন্থী উগ্রগোষ্ঠী। তার মাথায় ও কাঁধে দু’টি গুলি লাগে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে করে পেশোয়ারের সামরিক হাসপাতালে আনা হয় মালালাকে। সে যাত্রায় বেঁচে যায় মালালা। আর এখান থেকেই যেন নতুন মোড় নেয় মালালা গল্পের। বিশ্বব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে মালালা। মালালা ভর্তি হয় ইংল্যান্ডের বার্মিংহাম শহরের ইডব্যাগস্টোন হাইস্কুলে। পড়াশুনার সাথে সাথে চলতে থাকে তার নারীশিক্ষার কাজ। এবার যেন তার এই কাজ আরেকটু নতুন মাত্রা পায়। পাকিস্তানের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ব সভায় তুলে ধরেন তার আবেদনময়ী রূপকল্প। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের এক বিশেষ অধিবেশনে ভাষণ দেবার সুযোগ হয় তার। এর পরের গল্প শুধুই এগিয়ে যাবার। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সাথে নিজের লক্ষ্য নিয়ে আলোচনা করে। নাইজেরিয়ার বোকো হারাম জঙ্গিদের হাতে অপহৃত দুই শোর বেশি ছাত্রীর মুক্তির জন্য সে দেশের প্রেসিডেন্টের সাথে কথা বলে। গত দু’বছরে এমন অনেক কাজে অংশ নেয় মালালা। গত বছর তার নিজের জন্মদিনে রাষ্ট্রপুঞ্জে দেয়া এক বক্তৃতায় ফের শান্তির বার্তা দেয় এই কিশোরী। বুঝিয়েছিল শিক্ষার মাহাত্ম্য। তার ভাষণে, ‘চরমপন্থীরা বই ও কলমের শক্তিকে ডরায়’ এমন মন্তব্য করে বেশ অভিনন্দনও পায় এই সোয়াতি কন্যা। ২০১৩ সালে মার্কিন সাময়িকী টাইম মালালাকে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি বলে বর্ণনা করে। একই বছর মালালা ইউরোপীয় ইউনিয়নের শাখার পুরস্কার পায়।
এই সব কার্যক্রমের মধ্যেই গত বছর মালালার নোবেলের গুঞ্জন ওঠে। শুরু হয় সোস্যাল মিডিয়াতে মালালাকে নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা।  এমনকি সোয়াতের অনেক বাসিন্দার চোখে মালালা পশ্চিমাদের সৃষ্টি। তাকে ব্যবহার করে পশ্চিমারা পাকিন্তানের কৃষ্টি-ঐতিহ্য নষ্ট করতে চায় বলে মন্তব্য করেন অনেকে। নানা  ঘটনার  বাঁকবদলের মধ্য দিয়ে গত ১০ অক্টোবর বাংলাদেশ সময় বিকাল ৩টায় ‘নোবেল কমিটি অব দ্য নরওয়েজিয়ান পার্লামেন্ট’ আনুষ্ঠানিকভাবে এশিয়ার দুই শান্তিদূতের নাম ঘোষণা করে। যার মধ্যে একজন হলো সোয়াতের সাহসিনী কন্যা মালালা ইউসুফজাই। শিশুদের ওপর নির্যাতন বন্ধ ও শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিত করতে বিশেষ অবদান রাখার জন্য তাকে এই পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। একই সাথে বিশ্বে সর্বকনিষ্ঠ নোবেল বিজয়ী খেতাবটি নিজের দখলে নেয় মালালা। নোবেল পুরস্কার কমিটির মতে, শিশুদের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার কারণে এবারে যৌথভাবে এই পুরস্কার দেয়া হয়েছে।
নোবেল বিজয়ী অপর শান্তির দূত হলেন ভারতে শিশু অধিকার আন্দোলনের কর্মী কৈলাশ সত্যার্থী। ১৯৫৪ সালে ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের বিদিশা শহরে জন্ম এই শিশু বন্ধুর।  পড়াশুনা করেন বিদিশা সরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে। তড়িৎ প্রকৌশলী হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন কৈলাশ। কিন্তু মাত্র ২৬ বছর বয়সেই ইঞ্জিনিয়ার পেশার ইতি টানেন। নামেন শিশুদের অধিকার রক্ষার আন্দোলনে। গড়ে তোলেন বাচপান বাঁচাও আন্দোলন (বিবিএ)। শিশুদের শৈশব (বাচপান) বাঁচাতে অলাভজনক এই প্রতিষ্ঠানটি কাজ করে যাচ্ছে সেই ১৯৮০ সাল থেকে। গত ৩৪ বছরে আশি হাজার শিশুকে দাসত্ব ও শিশুশ্রমের হাত থেকে রক্ষা করেছে কৈলাশের এই সংগঠন।
শিশুদের বড়ই ভালোবাসেন কৈলাশ সত্যার্থী। চার মাস আগে টাইমস অব ইন্ডিয়া তার কাছে জানতে চেয়েছিল, ইঞ্জিনিয়ারিং ছেড়ে কেন এই আন্দোলনের পথ বেছে নিয়েছেন তিনি। কৈলাশ বলেছিলেন, ‘আমার দর্শন হলো আমি শিশুদের বন্ধু।’ শিশুদের নিয়ে তার দর্শন আরো খোলাসা করতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘বোকামি বা নির্বুদ্ধিতাকে অনেকেই শিশুতোষ আচরণ বলে মন্তব্য করে থাকে। এমন দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো দরকার। আমি তো শিশুদের থেকেও শিখতে পারি।’ কৈলাশ আরো বলেছিলেন, ‘শিশুদের কাছ থেকে সরলতার শিক্ষা পাওয়া যায়, শিশুরা নিষ্পাপ, ঠোঁটকাটাÑ যা সত্য তাই বলে দেয়, সারল্য শিশুদের বড় একটি গুণ।’
মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে বিশ্বাসী ৬০ বছর বয়সী কৈলাস বিভিন্ন শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে নেতৃত্বও দিয়েছেন। বিদিশার পর ওডিশা ও মধ্যপ্রদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে দিল্লি, মুম্বাইয়ের মতো শহরে শিশু পাচার, শিশুশ্রম, শিশু শিক্ষার অভাবের বিরুদ্ধে লাগাতার আন্দোলন চালিয়েছেন। আঘাত এসেছে, আক্রান্ত হয়েছেন, রক্ত ঝরেছে কিন্তু দমে যাননি। ধীরে ধীরে স্বীকৃতি মিলেছে দেশে-বিদেশে। নানা দেশে সক্রিয় ‘গ্লোবাল মার্চ অ্যাগেনেস্ট চাইল্ড লেবার’ তারই তৈরি। এর আগে ‘ডিফোডারস অব ডেমোক্রেসি’ ‘মেডেল অব দি ইতালিয়ান সেনেট’, ‘রবার্ট এফ কেনেডি ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস অ্যাওয়ার্ড’-এর মত একাধিক পুরস্কার লাভ করেন তিনি। ‘সাউথ এশিয়ান কোয়ালিশন অন চাইল্ড সার্ভিচুড (এসএএসিএস) প্রতিষ্ঠার অন্যতম অগ্রগামী কর্মী হিসেবেও কাজ করেন তিনি।  বর্তমানে তিনি শিক্ষার জন্য বৈশ্বিক প্রচারণা সংস্থার বৈশ্বিক জোটকে নিয়ন্ত্রণকারী ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার অন চাইল্ড লেবার এন্ড এডুকেশনের (আইসিসিএলই) আন্তর্জাতিক পরামর্শক পরিষদের সাথেও যুক্ত রয়েছেন। শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া ভারতীয় এই শিশু অধিকার কর্মী তার এই পুরস্কারটি উৎসর্গ করেছেন ভারতের আপামর জনগণ ও শিশুদাসদের প্রতি।
এমনিভাবে মালালা ও কৈলাশের হাত ধরে হয়তো নোবেল পুরস্কার উঠে এলো বিশ্বের কোটি কোটি শিশুদের হাতে।  সেই সাথে শহীদ আসমা আল-বেলতাগির মতো প্রেরণাময়ী কিশোরী, যিনি মিসরের সঙ্কটময় সময়ে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ছুটে বেড়াতেন নারী ও শিশুদের সেবা করতে, আশ্রয়কেন্দ্রে যেতেন খাবার নিয়ে, পানি বিলি করে বেড়াতেন নিজের হাতে তাদের মতো শান্তির দূতদের না পাওয়া নোবেলের প্রতিচ্ছবি হয়ে থাকবে এই নোবেল পুরস্কার। তারা হয়তো আজীবন নিঃস্বার্থ ভাবে মানবকল্যাণে শান্তির পক্ষে কাজ করে স্বীকৃতি পাবার আগেই স্বৈরাচারের বুলেটে গোটা পৃথিবীকে কাঁদিয়ে শান্তি দূতের দায়িত্ব অন্যদের ওপর অর্পণ করে বিদায় নিয়েছেন কিন্তু মালালা-কৈলাশের এই অর্জন ইশারায় হয়তো তাদের কথা স্মরণ করিয়ে দেবে। সেই সাথে স্মরণ করিয়ে দেবে মানবাধিকার বঞ্চিত ফিলিস্তিনের মায়াবী সেই কচি মুখগুলোকে। যারা চিৎকার করতে করতে মৃত্যুর দুয়ারে গিয়েও বিশ্ববাসীর টনক নড়াতে পারেনি। স্মরণ করিয়ে দেবে দাসত্বের বেড়াজালে আবদ্ধ  বিশ্বের লক্ষ লক্ষ শিশুদের কথা। আর এভাবেই হয়ত শান্তির প্রতীক নোবেল পুরস্কার বিশ্বের অধিকার বঞ্চিত অগণন শিশুদের প্রাণ ছুঁয়ে যাবে।

SHARE

Leave a Reply