Home তোমাদের গল্প মা পাখি আর তিনটি ছানার গল্প -এস আই সানী

মা পাখি আর তিনটি ছানার গল্প -এস আই সানী

মা  পাখিটা বাসার কাছে এসে বসতেই বাচ্চা তিনটে ওপর দিকে মুখ তুলে হাঁ করে চিঁচিঁ স্বরে ডাকা শুর করে দিল। কিন্তু তাদের চোখগুলো বন্ধ কেন? তাহলে এখনো ওদের চোখ ফোটেনি? তাই তো যে! ইশ! পৃথিবীতে এলো অথচ পৃথিবীর আলো এখনো ওদের চোখে পড়েনি! গায়ে দেখছি পশমও ওঠেনি! আহারে …! তাতে কী? ক’দিন পরে চোখও ফুটবে, গায়ে পাখনাও উঠবে। কিন্তু বেচারি মা পাখিটা তো ভীষণ অস্থির! বারবার উড়ে কোথাও যাচ্ছে, একটু পরে আবার ফিরে আসছে। আর তখনি ছানাগুলো কিছু খাওয়ার আশায় হাঁ করে চিঁ চিঁ স্বরে ডেকে উঠছে। কিন্তু মা পাখিটা ওদের গালে কিছুই দিতে পারছে না। ক্ষুধার জ্বালা তো বড় জ্বালা। সেই জ্বালায় কি ছানাগুলো মরে যাবে? না…না..! মা পাখিটা ভাবছে আর উড়ে চলে যাচ্ছে। কিন্তু ফিরতে হচ্ছে তাকে রিক্ত হস্তে। বাচ্চাগুলোর জন্য সে কোথাও কোন খাবার খুঁজে পাচ্ছে না। আশপাশের সকল বিলে ঝিলে সে ঘুরে এসেছে। একটা মাছও সে পায়নি। নিজের পেটটাও ক্ষুধায় চোঁ চোঁ করছে। উড়তে উড়তে সেও ক্লান্ত। ওড়ার শক্তি যেন হারিয়ে গেছে। তবু না পারছে সে ছানাগুলো একা রেখে বেশিক্ষণ বাইরে থাকতে, না পারছে ছানাগুলোর কান্না সহ্য করতে। যদি গায়ের গোশত কেটে খাওয়ানো যেত তাহলে মা পাখি তার ছানাগুলোকে নিজের শরীরের গোশত কেটে খেতে দিত। ছানাগুলোর কান্না সহ্য করতে পারছে না মা পাখি। চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ে তার। ‘হে আল্লাহ তোমার এতো বড় দুনিয়ায় আমার বাচ্ছাগুলোর জন্য এক টুকরো খাদ্যও কি নেই? আমার বাচ্চাগুলো যে না খেয়ে মরে যাচ্ছে। আমি যে আর সইতে পারছি না আমার ছানাগুলোর আর্তনাদ। ওরা যে আমার নাড়িছেঁড়া ধন! মা পাখি ভাবে- একটা জায়গায় গেলে অবশ্য খাবার মিলবে। কিন্তু সে জায়গায় যে জীবন যাওয়ার আশঙ্কা! সেখানে গেলেই দস্যি ছেলেরা ঢিল ছুড়তে থাকে। তবুও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমাকে সেখানে যেতেই হবে। কিন্তু যদি … আরো জোরে চিঁ চিঁ করে ডেকে ওঠে ছানা তিনটে। আর স্থির থাকতে পারে না মা পাখিটা। হু হু করে কেঁদে ওঠে বুকের ভেতর। বাসা ছেড়ে উড়াল দেয় মা পাখি। উড়তে উড়তে গিয়ে পৌঁছায় সেই ধানক্ষেতটার পাশে। ধান গাছগুলো এখনো ছোট ছোট। অল্প অল্প পানি সারা ক্ষেতজুড়ে। আর এই অল্প পানিতে প্রচুর মাছ কিলবিল করে সবসময়। একটা গাছের ডালে বসে চারিদিকে দেখে নেয় মা পাখি। না, কোথাও নেই দস্যি ছেলেরা। সাহস পেয়ে গাছের ডাল থেকে ক্ষেতের আইলে নেমে আসে সে। কিন্তু…! অবাক হয় মা পাখি। কোথাও কোন মাছ নেই! ধান ক্ষেতের ভেতর এদিক ওদিক ছুটতে থাকে সে। তবুও কোন মাছের দেখা নেই। হন্যে হয়ে খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ ধানক্ষেতের ভেতর একটা ফাঁকা জায়গা দেখতে পায় মা পাখি। সেখানে গোল করে লম্বা লম্বা কিছু কাঠি পোঁতা। খাঁচার মতো। তার ভেতরে একটা মাছ লাফালাফি করছে। আনন্দে চোখ দুটো চিক চিক করে ওঠে মা পাখির, ভাবে, মাছটা ধরে নিয়ে আগে আমার সোনামণিদের ঠাণ্ডা করবো। তারপর ওরা আরামে ঘুমাবে। তারপরে আমি বেরোবো নিজের খাবারের জন্য। ভাবনাগুলো শেষ হওয়ার আগেই এক লাফে কাঠিগুলোর পাশে গিয়ে দাঁড়ায় মা পাখি। তারপর একটা কাঠির ফাঁক গলিয়ে গলাটা পুরে দেয় ভেতরে। দু’ঠোঁট দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে মাছটা। তারপর বের করে আনে। কিন্তু … থমকে যায় মা পাখি। গলায় কিছু একটা টান পড়ছে। আস্তে আস্তে গলার ফাঁসটা যেন এঁটে যাচ্ছে। কষ্ট হচ্ছে দম নিতে। ডানা ঝাপটে লাফালাফি শুরু করে মা পাখি। মাছটা ছাড়িয়ে পড়ে যায় ঠোঁট থেকে। ঠিক সে মুহূর্তে দস্যি ছেলেরা এসে ধরে ফেলে মা পাখিকে। ফাঁস আঁটা স্বরে চেঁচিয়ে কিছু বলতে চায় পাখি। কিন্তু দস্যি ছেলেরা কিছুই বুঝতে চায় না। গলাতে ধারালো কিছুর স্পর্শ পায় মা পাখি। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে লাফাতে চেষ্টা করে কিন্তু কোনো লাভ হয় না। নিজের সমস্ত শরীর দস্যি ছেলেদের হাতের ভেতর। নিমেষেই গলা থেকে দু’খণ্ড হয়ে যায় মা পাখি। বার কয়েক লাফিয়ে হয়ে যায় নিঃস্তব্ধ। রক্তে লাল হয় ধান ক্ষেতের পানি। ওদিকে মা ফেরার অপেক্ষায় অভুক্ত ছানা তিনটে কেবলই ডেকে চলেছেÑ চিঁ …চিঁ… চিঁ… চিঁ… চিঁ… চিঁ…।

SHARE

Leave a Reply