Home তোমাদের গল্প আজব কিংবা গুজব -মাহিন মুবাশশির

আজব কিংবা গুজব -মাহিন মুবাশশির

বেশ চিন্তায় পড়ে গেছেন জব্বার মিয়া। এ কী হচ্ছে আজকাল! শেষমেশ কি তার আমবাগানের আমগুলো ভূতেই সাবাড় করে ফেলবে? না! জব্বার মিয়া ভাবতে পারছেন না। এক সপ্তাহ ধরে তিনি রাতে ঠিক মতো ঘুমুতে পারেন না। কেবলি আমবাগানের আমগুলো পাহারা দেন। রাতে কোনো রকম চুরি-টুরিও হয় না তবু প্রতিদিনই আম কমে আসে। প্রতিদিন সকালে তিনি দেখেন এক-একটি গাছ সাফা হয়ে গেছে। পাহারা বসিয়েছেন। আবার নিজেও রাত জেগে পাহারা দেন। চোর-টোর বা কাউকে গাছে উঠতে দেখেন না। তবু কেন জানি প্রতি রাতে এক-একটি গাছের আম কে বা কারা অদৃশ্য শক্তি দিয়ে পেড়ে নিয়ে যায়। এ রহস্যের কোনো সুরাহা করতে পারেন না জব্বার মিয়া। তিনি কখনো ভূত বিশ্বাস করেননি। কিন্তু কয়েক দিন হলো তিনি বুঝতে পারছেনÑ তার আম কাননে ভূত ভর করেছে। তা-না হলে এভাবে আম চুরি হবে কেন? অবশেষে তিনি কিছু বুঝে উঠতে না পেরে ভূত তাড়ানো কবিরাজের কাছ থেকে তাবিজ-তুমার করে আনেন। সেগুলোও কোনো কাজ দেয় না।

এভাবে শেষ হতে হতে আর একটি মাত্র গাছে আম অবশিষ্ট আছে। জব্বার মিয়া আশা ছেড়ে দিয়েছেন। তার এ গাছের আমগুলোও হয়ত আর তার হবে না। প্রতিদিন পাহারা দিলেও আজ আর নিজে রাত জেগে পাহারা দিলেন না। সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠে নিজের অজান্তেই আমবাগানে ঢুকলেন। ঢুকেই অবাক হলেন। ফজর ছুঁই ছুঁই সময়ে মানুষ নয় ঠিক, কিন্তু মানুষের মতো দেখতে একদল সাদা পরীরূপী কিছু প্রাণী তার আমবাগান থেকে আম পেড়ে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি হাঁক ছাড়লেন :
– কে রে আমার আমবাগানে। এতো সাহস, গাছ থেকে আম পেড়ে নিয়ে যায়?
তাদের মধ্য থেকে একজন অদ্ভুত এক ভাষায় কথা বলে উঠলো। জব্বার মিয়া তার ভাষার কিছুই বুঝতে পারলেন না। তিনি জিজ্ঞেস করলেন :
– কী হে, কী বলছো নাকুম-নুকুম?
তাদের মাঝ থেকে একজন জব্বার মিয়ার কানের কাছে এসে দু’হাতে তুড়ির মতো বাজালো। আর অমনি জব্বার মিয়া তার কথা বুঝতে পারলেন।
অতঃপর তাদের মাঝে সবচেয়ে প্রবীণ দেখতে একজন বললো :
– জব্বার সাব, ঝড়ৎৎু! আমরা আপনার গাছের আম পেড়ে নিয়ে যাচ্ছি। আপনার কাছে অনুমতি নিয়ে আম পাড়া উচিত ছিল। কিন্তু আমাদের কাছে আমাদের ক্যাপ্টেনের অর্ডার ছিল- আপনি যেন না বুঝতে পারেন এ ভঙ্গিতে আমগুলো পেড়ে নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু আপনি যখন জেনেই গেছেন তাহলে বলছি :
– আমরা এ পৃথিবীর কেউ না। আমরা এসেছি শুক্র গ্রহ থেকে। প্রতিদিন সন্ধ্যার আকাশে পশ্চিমে যে তারাটা জ্বলে ওঠে সেটি আমাদের গ্রহ। আমরা সে গ্রহের প্রাণী। তবে মানুষদের চাইতে আমাদের মর্যাদা কম। কিন্তু কম হলেও আপনাদের মতো আমাদের গ্রহে এতো দুঃখ-ক্লেশ নেই।
জব্বার মিয়া কঠিন গলায় জেরা করতে লাগলো :
– কিন্তু আপনারা কিভাবে আমাদের গ্রহে অর্থাৎ পৃথিবীতে এলেন। আর কেনই বা আমার গাছের আমগুলো আপনাদের প্রয়োজন হলো?
শুক্র গ্রহের প্রাণীটি সহাস্যে তার প্রশ্নের উত্তর দিতে থাকলো :
– আমাদের আসলে আমগুলো প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন কেবল আমের আঁটিগুলো।
– কেন?
– কারণ আমাদের গ্রহে কোনো গাছ নেই। আর পৃথিবীর মতো কোনো গাছ আমাদের গ্রহে হওয়াও সম্ভব নয়। তবে আপনাদের গ্রহের আমগাছের আঁটি থেকে আমাদের ল্যাবরেটরিতে আমরা এক ধরনের ফল উদ্ভাবন করবো। তা দিয়ে আমরা আমাদের গ্রহে আলো ধরে রাখতে পারবো। ফলে আমাদের এ উদ্ভাবিত গাছ থেকে সারা বছরই আলো বিকিরণ করবে। যা আপনাদের গ্রহে পূর্ণিমা বলে পরিচিত।
– বলেন কী! জব্বার মিয়া অবাক হন!
– হ্যাঁ, ঠিক বলছি। শুধু তাই নয়, আমাদের গ্রহে তখন সূর্যের আলো ধরে রাখতে এ বিশেষ ফলগুলো কাজ দেবে। এ জন্য আপনার গাছের আমগুলো আমরা নিয়ে যাচ্ছি।
– তা সে ফলগুলো দেখতে কেমন হবে?
– ঠিক আপনাদের দেশের মাটি নামক উপাদানে সেটি হলেÑ তার নাম হতো ডায়মন্ড বা হীরা। যাকে আপনারা বহু মূল্যবান বস্তু হিসেবে ব্যবহার করেন। তবে আমাদের গ্রহে এর কোনো মূল্যই নেই। তবু একে আমরা আলো সংরক্ষণী ফল হিসেবে ব্যবহার করতে পারি।
জব্বার মিয়া এবার তাদের নাম জিজ্ঞেস করেন :
– আপনাদের নাম-ধাম কি কিছু আছে?
– হ্যাঁ, আপনারা যেমন হোমোসেপিয়েন্স আমরাও তেমনি ট্রাগন।
– ওরে বাবা ড্রাগন!
– না সাহেব, ড্রাগন নয়; ট্রাগন। আপনি হয়তো ঠিক-ঠাক মতো শোনেননি।
-ও আচ্ছা! ট্রাগন। ঠিক- ঠিক। ট্রাগনই।
– আপনার কিছু জানার থাকলে বলতে পারেন।
জব্বার মিয়া মুখে ভেংচি কেটে প্রশ্ন করলো:
– হু! দাঁড়ান। একটা প্রশ্ন ছিল…..; ও মনে পড়েছে। আমাদের পৃথিবীতেও কী এরকম গাছ হওয়া সম্ভব?
ট্রাগন জবাব দেয় :
– সম্ভব। তবে আমরা আপনাকে আমাদের ল্যাবরেটরির প্রস্তুতকৃত আঁটিটি দিতে পারবো না। তা শুধু আমাদের গ্রহ উপযোগী করে প্রস্তুত করা হয়েছে। আপনাদের গ্রহের জন্য একে অন্যভাবে প্রস্তুত করতে হবে।
– কিভাবে? জব্বার মিয়ার কৌতূহল বেড়ে যায়।
ট্রাগনও স্ব-উৎসাহে বলতে থাকে :
– এটি আপনাদের কোনো ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করতে হবে। তবে আপনাদের ল্যাবরেটরিতে আমরা পরীক্ষা করতে পারবো না। এটি আপনাকেই করতে হবে।
জব্বার মিয়া হতাশ স্বরে বলেন :
– কিন্তু আমি যে ততো পড়ালেখা করিনি।
ট্রাগনটি জোর গলায় বলে :
– করবেন। নতুন করে আবার পড়ালেখা করবেন।
– বলেন কী?
– হ্যাঁ, ঠিক। আমাদের গ্রহে তো মৃত্যু পথযাত্রী বৃদ্ধরাও পড়ালেখা করে।
– কী বললেন?
– আমি বলছি, পড়ালেখার কোনো নির্দিষ্ট বয়োফ্রেম নেই। বরং একটা কথা শুনে খুশি হবেন যে, বৃদ্ধদের ব্রেন আরো সার্প হয়। কারণ তারা জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা লব্ধ জ্ঞানের সাথে নতুন জ্ঞানের তুলনা করে পড়ালেখা করতে পারে। আমাদের গ্রহে তো নতুন নতুন উদ্ভাবন ও নতুন নতুন সৃজনশীল কাজ ছোট-বড় আবালবৃদ্ধ সবাই করে থাকে। আর আপনি না পাড়ার তো কোনো কারণ নেই।
– ঠিক! ঠিক!
– আমরা এটি বানানোর ফর্মুলা আপনাকে দেবো। আপনি নিজে এটি আবিষ্কার করবেন।
– হ্যাঁ, কী বললেন? কমলা? কমলা খেয়ে কী করবো?
– আহা জব্বার সাব! কমলা নয়; ফর্মুলা।
-ও মুলা? মুলাতো ভাত দিয়ে খায়।
ট্রাগনটি চেঁচিয়ে ওঠে :
– না, না জব্বার সাব! মনে হয় আপনার কানে কিঞ্চিৎ গোলোযোগ আছে? মুলা নয়, ফর্মুলা!
জব্বার সাব লজ্জিত হয়ে বলেন :
– ও আচ্ছাÑআচ্ছা, ফর্মুলা? এ দিয়ে কী হবে?
– ঐতো বললাম আপনি নিজে শিখে-পড়ে এগুলো উদ্ভাবন করবেন।
– আচ্ছা ঠিক আছে। দিয়ে যান। নিজের মনে কথাগুলো বললেন জব্বার মিয়া।
একটু পর শুক্রগ্রহের ট্রাগনরা নিমেষে অদৃশ্য হয়ে গেলো। সাথে সাথে জব্বার মিয়া দেখেতে পেলেন বাগানের শেষ সীমানার আমগাছের তলায় একটি বই পড়ে আছে। সম্ভবত এটি সেই ফর্মুলা যা শুক্রগ্রহের ট্রাগনরা তাকে দিয়ে গেছে। তাই বইটি তুলে নিয়ে তার ঘরের বই রাখার তাকে রেখে দিলেন।

এরপর দিন যায়… মাস যায়…বছর যায়…। জব্বার মিয়া ভালোমতো পড়ালেখা জানেন না বলে এ বইতে হাত দেন না। হঠাৎ একদিন তাকে অবাক করে দিয়ে তার ছ্টো ছেলে আমেরিকা থেকে দেশে ফিরে এলো। সাথে তার স্ত্রী ও দু’টি সন্তান। একজন ছেলে। আর অন্যজন মেয়ে। ছেলেটির নাম স্বপ্ন। মেয়েটির নাম ডানা। এই নিয়ে স্বপ্নডানা। স¦প্নডানারা ভাইবোন। আমেরিকার উইমেন্টাল হাসপাতালে ওদের জন্ম। ওরা যমজ। তাই দেখতে একই চেহারার।
জব্বার মিয়া ওদের দু’জনকে নিয়ে বেশ আনন্দে দিন কাটাতে লাগলেন। একদিন জব্বার মিয়া গল্পছলে প্রিয় নাতি-নাতনীকে শুক্র গ্রহের প্রাণীদের গল্পটি বললেন এবং তাদের দেয়া আমের আঁটি থেকে হীরা তৈরির ফর্মুলার বইটিও ওদের হাতে তুলে দিলেন।
তারপর দাদা জব্বার মিয়ার সাথে প্রায় ছয় মাস বাংলাদেশে থেকে বাবা-মার সাথে আবার আমেরিকায় চলে যায় স্বপ্নডানা টুইনদ্বয়। ওরা সেখানে ক্যানভাস সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে ভর্তি হয়। এখান থেকেই ধীরে ধীরে ওরা সায়েন্সে ভালো করতে থাকে। ওদের দাদার দেয়া বইটিও ওরা সবসময় সাথে রাখে। আর মনে মনে প্ল্যান করতে থাকে কিভাবে এ ফর্মুলাকে কাজে লাগিয়ে নতুন উদ্ভাবন করা যায়। কিন্তু দু’জনের কেউই কিছুতেই এ বইয়ের ফর্মুলা বুঝতে পারে না। অবশেষে আসে মাহেন্দ্রক্ষণ। সে সময় উভয়েই ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞানের ওপর পিএইচডি গবেষণায় ব্যস্ত। হঠাৎ তাদের গবেষণার সাবজেক্টের একটি তত্ত্বের সাথে ট্রাগনদের দেয়া কৃত্রিম উপায়ে ডায়মন্ড তৈরির বইয়ের ফর্মুলাগুলো মিলে যায়। ওরা পদার্থবিজ্ঞানের নির্ধারিত তত্ত্বের গবেষণা বাদ দিয়ে আম আঁটির গবেষণায় মশগুল হয়ে পড়ে। দিন রাত এক করে গবেষণা চালাতে থাকে। অবশেষে দীর্ঘ তিন মাস তেইশ দিন চার ঘণ্টা উনিশ মিনিট বত্রিশ সেকেন্ডে গবেষণা কার্য সুসম্পন্ন করে সাফল্যের মুখ দেখে স্বপ্নডানারা। ওদের সাফল্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে হইচই পড়ে যায়। হইচই পড়ে যায় সারা আমেরিকা শহরে। আমেরিকার সবগুলো টিভি চ্যানেল ফলাও করে প্রচার করতে থাকে ওদের নব্য আবিষ্কারের কথা। তাই সারা বিশ্বে এক আলোড়ন পড়ে যায়। অবশেষে বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলেও সেটি প্রচার হয়। কিন্তু অনেক দেরিতে।
একটি কথা না বললেই নয়Ñ স্বপ্নডানারা যখন ওদের দাদার দেয়া ফর্মুলা থেকে কৃত্রিম হীরা উদ্ভাবনে চূড়ান্ত সাফল্য লাভ করলো, সেদিন জব্বার মিয়া মৃত্যু পথযাত্রী। সেদিন সন্ধ্যায় তিনি ইহধাম ত্যাগ করেন। ফলে তার সযতেœ রাখা ফর্মুলার বাস্তবায়ন তিনি দেখে বা শুনে যেতে পারলেন না। এ বিষয়টি স্বপ্নডানারা যেদিন জানলো তখন ওরা নিজেরা নিজেদের ধিক্কার দিতে লাগলো। কেননা যার কাছ থেকে পাওয়া বইয়ের ফর্মুলার বাস্তবায়নে কৃত্রিম হীরা উদ্ভাবন হলো সে-ই যখন দেখে যেতে পারলো না তখন ওরা নিজেদেকে সবচেয়ে অভাগা আর অকৃতজ্ঞ মনে করলো। তাই ওরা সিদ্ধান্ত নিলো আর আমেরিকায় নয়, বাংলাদেশে ফিরে যাবে। গিয়ে ওখানেই ওরা ওদের আবিষ্কারের ফল সারা বিশ্বে পৌঁছে দেবে। এতে ওদের দাদার প্রতি যেমন কৃতজ্ঞতা প্রকাশিত হবে, তেমনি দেশ ও দেশের মানুষ উপকৃত হবে।

SHARE

Leave a Reply