Home স্বাস্থ্য কথা মরণব্যাধি ইবোলা

মরণব্যাধি ইবোলা

কিশোরকণ্ঠ ডেস্ক

বন্ধুরা, ইতোমধ্যেই তোমরা ইবোলা ভাইরাসের নাম জেনে গেছো। প্রাণঘাতী এই ভাইরাস পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এই ভাইরাস সর্বপ্রথম কঙ্গোর প্রত্যন্ত অঞ্চল ইবোলা নদীর তীরে সংক্রমণ দেখা দিয়েছিল বলে নদীর নামানুসারে ভাইরাসটির নাম রাখা হয় ইবোলা ভাইরাস। ১৯৭৬ সালে কঙ্গোর জিয়েরা এলাকায় প্রথমবারের মতো এ রোগটি ধরা পড়ে। সেখানে ৩১৮ জন আক্রান্ত হয় যার মধ্যে ২৮০ জন (৮৮%) মারা যায়। পরবর্তীতে সুদানে তা ছড়িয়ে পড়ে এবং সেখানে ২৮৪ জন আক্রান্ত হয়ে ১৫১ জন মারা যায়। তবে চলতি বছরের মার্চে নতুন করে এই রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।
আফ্রিকার দেশগুলোতে জুলাই পর্যন্ত ইবোলা আক্রান্ত প্রায় ১৫০০ জনকে সনাক্ত করা গেছে, যার মধ্যে ৭২৯ জন মারা গেছে (৫৫%)। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হচ্ছে ৬০ জন স্বাস্থ্যকর্মী মারা গেছে এই রোগে। এই স্বাস্থ্যকর্মীরা রোগীর সংস্পর্শে ছিলো।
এই রোগের উৎপত্তি
সঠিকভাবে এই রোগের উৎপত্তি কোথায় বা কিভাবে, তা জানা না গেলেও ধারণা করা হয়-বাদুরের দেহ অভ্যন্তরে এই রোগের ভাইরাস বংশবিস্তার করে। পরবর্তীতে মানুষ বা অন্য স্তন্যপায়ী প্রাণী আক্রান্ত বাদুর খাওয়ার মাধ্যমে নিজের দেহে ভাইরাসটি বহন শুরু করে।
ইবোলার লক্ষণ
ইবোলা আক্রান্ত ব্যক্তি প্রথমে নিরীহ ফ্লু’র মতো হালকা জ্বর, মাথা ব্যথা, শরীর ব্যথা অনুভব করে। কিছুদিন পর তীব্র মাথা ব্যথা, জ্বর, শরীর ব্যথা, ত্বকে দানা দানা ওঠা, মুখে ঘা, ডায়রিয়া এবং মারাত্মক বমি শুরু হতে পারে। চূড়ান্ত পর্যায়ে শরীরের ভেতরে বাইরে রক্তপাত শুরু হতে পারে। এই ভাইরাসটি আক্রান্ত ব্যক্তির লিভার, কিডনি, হার্ট অকেজো করে দেয় যার ফলে রোগীর মৃত্যু ঘটে।
কিভাবে ছড়ায়?
বলা হয়ে থাকে বাদুরের খাওয়া ফল থেকেই ইবোলা ভাইরাস মানুষের দেহে প্রথম প্রবেশ করে এবং পরবর্তীতে তা মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে শুরু করে। ইবোলা আক্রান্ত মানুষের দেহরস অপর কোনো মানুষের দেহের স্পর্শে আসলে সেই ব্যক্তিও আক্রান্ত হতে পারেন। এমনকি আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যুর পরও ভাইরাসটি বেশ কয়েকদিন টিকে থাকে।
আশার কথা হলো, রোগটি ফ্লু ও অন্যান্য বায়ুবাহিত রোগের মতো ছড়ায় না, আক্রান্ত ব্যক্তির সরাসরি সংস্পর্শে না আসলে এই রোগে সংক্রমিত হবার ভয় নেই।
আক্রান্ত হলে কী করবে?
১) দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
২) প্রচুর পানি পান করতে হবে, যাতে দেহে পানি শূন্যতা দেখা না দেয়।
৩) নিয়মিত রক্ত চাপ পরিমাপ করতে হবে।
৪) প্রচুর অক্সিজেন আছে এরকম পরিবেশে থাকতে হবে।
৫) বিশ্রাম নিতে হবে। এছাড়া নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে কোন প্রতিষেধক উদ্ভাবিত হয়েছে কিনা বা বাজারে এসেছে কিনা।
যেহেতু এ মুহূর্তে ইবোলা ভাইরাস জ্বরের কোন প্রতিষেধক নেই, তাই প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেয়াই সবচেয়ে ভালো উপায়। সতর্ক থাকো, সুস্থ থাকো।
চিকিৎসা
রিহাইড্রেশন এবং হালকা বেদনানাশক দিয়ে করা হচ্ছে ইবোলা আক্রান্তের চিকিৎসা। খুব একটা কার্যকরী কোনো প্রতিষেধক এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। নেই কোনো প্রতিষেধক টিকাও। তথ্য মতে এই রোগে মৃত্যুর হার ৫০%-৯০%।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে এই রোগের লক্ষণগুলো অন্য আরো অনেক রোগের লক্ষণের সাথে মিলে যায় স! ফলে রোগ শনাক্ত করতে সময় লেগে যায়!
তাই সঠিক রোগ শনাক্ত করা এবং সে অনুযায়ী চিকিৎসা দেয়াটাও অনেক বড় একটা চ্যালেঞ্জ! তবে যদি রোগ দ্রুত সময়ের মধ্যে শনাক্ত করা যায় এবং সঠিক মেডিক্যাল সাপোর্ট দেয়া যায় তাহলে রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়!
ইবোলা বিভিন্নভাবে ছড়াতে পারে, যেমন- আক্রান্ত রোগীর দেহ বা দেহ থেকে নিঃসৃত রক্ত বা অন্যান্য তরল পদার্থের সংস্পর্শে আসলে সুস্থ ব্যক্তির দেহে এ ভাইরাস সংক্রমিত হয়। এছাড়া রোগীর পোশাক, ইঞ্জেকশনের জন্য ব্যবহৃত সুচ, বিছানা থেকেও এ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই যদি কোন এলাকায় ইবোলা ভাইরাস আক্রান্তের খবর পাওয়া যায়, তবে সেসব স্থানে যাতায়াতের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। অনেকে শখ করে বনের বিভিন্ন প্রাণী শিকার করে। এছাড়া বাজারেও অনেক বন্য প্রাণীর গোশত বিক্রি হয়। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, এসব বন্য প্রাণীর গোশতের মাধ্যমে ইবোলা ভাইরাস ছড়াতে পারে। তাই সাবধান থাকতে হবে।

আমাদের করণীয়
যেহেতু এর কোনো টিকা আবিষ্কৃত হয়নি তাই এই ভাইরাসটি যাতে আমাদের দেশে প্রবেশ করতে না পারে এই ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। বিমানবন্দর, নদীবন্দর, স্থলবন্দর ও সীমান্ত এলাকায় কর্তব্যরতদের এই ভাইরাসে আক্রান্তদের শণাক্তকরণে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। যদি কোনো আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হয় তবে তাকে কিভাবে পৃথক করে চিকিৎসা দিতে হবে সেই ব্যাপারেও প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন। আমাদের মনে রাখতে হবে, আমরা  প্রতি বর্গকিলোমিটারে হাজারের বেশি মানুষ বাস করি। তাই এই ভয়াবহ ভাইরাসটি যাতে কোনোভাবেই আমাদের দেশে ছড়িয়ে পড়তে না পারে সেই বিষয়ে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন এখনই।
সতর্কতা
সবসময় সাবান ও গরম পানি দিয়ে হাত ধুতে হবে।
খেয়াল রাখতে হবে যেন হাত না ধুয়ে চোখ, নাক বা মুখে হাত লাগানো না হয়।
আক্রান্ত ব্যক্তির কাছে যাওয়ার সময় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের কোনো প্রকার তরল যাতে কারো সংস্পর্শে না আসে সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে।
যদি কোনো কারণে এই রোগের লক্ষণ দেখা দেয় তবে সাথে সাথে নিজেকে আলাদা করে ফেলতে হবে যাতে অন্য কেউ এ রোগে আক্রান্ত না হয় এবং ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে।

SHARE

Leave a Reply