Home ভ্রমণ মাদাগাস্কার অদ্ভুত সুন্দর আর বৈচিত্র্যে ভরপুর এক দ্বীপ। -রফিকুল ইসলাম ফরাজী

মাদাগাস্কার অদ্ভুত সুন্দর আর বৈচিত্র্যে ভরপুর এক দ্বীপ। -রফিকুল ইসলাম ফরাজী

রহস্যময়! অদ্ভুত! অসাধারণ! অপরূপ সুন্দর! এই সবগুলো বিশেষণই দ্বীপরাষ্ট্র মাদাগাস্কারের জন্য প্রযোজ্য। পৃথিবীতে এমন রহস্যময় এবং অপরূপ সুন্দর দ্বীপ দ্বিতীয়টি নেই। মাদাগাস্কার বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত হয়েছে এর অসাধারণ ভৌগোলিক অবস্থান আর অদ্ভুত জীববৈচিত্র্যের কারণে। অসংখ্য প্রাণী আর উদ্ভিদে ভরপুর এ দ্বীপটির জীববৈচিত্র্যের কথা শুনলে তোমরা অবাক না হয়ে পারবে না। মোটকথা, মাদাগাস্কার সৃষ্টি জগতের এক অপার বিস্ময়। মহান রাব্বুল আলামিনের এক অনন্য সৃষ্টি।
মাদাগাস্কারের ভৌগোলিক অবস্থান আর জীববৈচিত্র্যের বর্ণনা দেয়ার আগে দ্বীপটি সম্পর্কে তোমাদের সাধারণ কিছু তথ্য দেয়া প্রয়োজন। এ দ্বীপটি কেবল একটি দ্বীপই নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ সার্বভৌম রাষ্ট্র। পূর্বে মাদাগাস্কারের নাম ছিল ‘মালাগাছি’। বর্তমানে এর পুরো নাম ‘দ্য রিপাবলিক অব মাদাগাস্কার’। জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এ দ্বীপরাষ্ট্রটি ভারত মহাসাগরের পাশে ও আফ্রিকার দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে অবস্থিত। মাদাগাস্কারের দক্ষিণে রয়েছে মরিসাস, পূর্বে সিসিলি, উত্তরে মোজাম্বিক ও পশ্চিমে দক্ষিণ আফ্রিকা। আফ্রিকা মহাদেশে অবস্থিত মাদাগাস্কারের আয়তন ৫ লাখ ৮৭ হাজার ৪১ বর্গকিলোমিটার। লোকসংখ্যা প্রায় ২ কোটি। এটি বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম দ্বীপরাষ্ট্র। এর চেয়ে বড় তিনটি দ্বীপরাষ্ট্র হলো-গ্রিনল্যান্ড, নিউগায়ানা ও বোর্নিভ।
দেশটির পূর্ব এবং মধ্য-দক্ষিণে আছে রেইন ফরেস্ট। আবার পশ্চিমে আছে ড্রাই ফরেস্ট। আবার একই দ্বীপে দুই বনের পাশে দক্ষিণ দিকেই আছে মরুভূমি! এমন দ্বীপ আর আছে কোথাও বলো? আর এই দ্বীপে যেসব প্রাণী থাকে, তারা আর কোন দ্বীপেই বা গিয়ে থাকতে পারবে? মাদাগাস্কারে প্রায় ৬০০ প্রজাতির জীব আছে। জীব বলতে আবার শুধু পশু-পাখি আর পোকামাকড় আর মাছ নয়, জীব বলতে কিন্তু গাছপালাকেও বোঝানো হচ্ছে।
এই দ্বীপে ৬০০ প্রজাতির জীবের মধ্যে নানারকম গাছপালা ৩৮৫ প্রজাতির, কীটপতঙ্গ আছে ৪২ প্রজাতির, মাছ আছে ১৭ প্রজাতির, উভয়চর প্রাণী আছে ৬৯ প্রজাতির, সরীসৃপ আছে ৬১ প্রজাতির আর স্তন্যপায়ী প্রাণী আছে ৪১ প্রজাতির।
অসাধারণ জীববৈচিত্র্য আর অদ্ভুত ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে মাদাগাস্কারকে নিয়ে বিজ্ঞানীরা বিরামহীন গবেষণা করে চলেছেন। বিজ্ঞানীদের হিসাবমতে, মাদাগাস্কারে অসংখ্য প্রজাতির প্রাণী এবং গাছ আছে, যার মধ্যে সিংহভাগই পৃথিবীর অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। এদের মধ্যে রয়েছে প্রায় ১৫ প্রজাতির লেমুর, ৩৬ প্রজাতির পাখি এবং আরও অনেক অদ্ভুত অদ্ভুত সব প্রাণী। আবার মাদাগাস্কারের অসংখ্য ব্যাঙের শতকরা ৯৫ ভাগই শুধু মাদাগাস্কারেই দেখা যায়। তবে অন্য কোথাও খুঁজে পাওয়া না গেলেও এসব প্রাণীর কিছু কিছু জাতভাই অবশ্য দক্ষিণ আমেরিকা আর দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে পাওয়া যায়।
মাদাগাস্কারে রয়েছে সরীসৃপের বিশাল আবাসস্থল। এখানে প্রায় সব ধরনেরই সরীসৃপ আছে। কেননা, পৃথিবীর প্রায় ৯০ ভাগ সরীসৃপই শুধু মাদাগাস্কারে থাকে। মাদাগাস্কারকে রীতিমতো সরীসৃপদের স্বর্গরাজ্য বলা যায়। এখানকার সরীসৃপদের অন্যতম হচ্ছে গিরগিটি, কুমির ইত্যাদি। তবে দুর্লভ হলেও এদের সবগুলোই যে পৃথিবীর আর কোথাও দেখতে পাওয়া যায় না এমন নয়। যেমন অজগর সাপ মাদাগাস্কার ছাড়াও আফ্রিকা এবং এশিয়ার বিভিন্ন জায়গায়, এমনকি বাংলাদেশেও দেখা যায়। অজগর ছাড়াও আছে ‘ইগুনাইড গিরগিটি’ আর ‘বোয়া’ (অজগরের মতোই এক ধরনের বিশালাকৃতির সাপ)। এদের আবার মাদাগাস্কার ছাড়াও দক্ষিণ আমেরিকায়, বিশেষ করে মহাবন আমাজনে বেশি দেখতে পাওয়া যায়।
আরেকটি দীর্ঘায়ু প্রাণীর নাম কচ্ছপ। শক্ত খোলসের ভেতরে বসবাসকারী এ প্রাণীটি কিন্তু সত্যিই বেশ অদ্ভুত আর মজার। মাদাগাস্কারে এ কচ্ছপ আছে প্রায় ৪ প্রজাতির। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত আর বড় আকারের কচ্ছপটির নাম হচ্ছে ‘প্লোশেয়ার কচ্ছপ’। এরা কিন্তু দুর্লভ প্রজাতির। আর আশঙ্কার কথা হচ্ছে সেখানকার কচ্ছপের সব প্রজাতিই বিলুপ্তপ্রায়।
মাদাগাস্কারের সাপদের নাম শুনলেই অনেকের গা শিওরে ওঠে, এমনকি আমার নিজেরও! অনেক সাপ কিন্তু এত্ত সুন্দর, যে দেখলে চোখ ফেরানো যায় না। তবোয়া আর ক্লুব্রিডস সাপই এখানে বেশি দেখা যায়। একমাত্র বিষাক্ত সাপটির নাম হচ্ছে ‘রেয়ার-ফেংড’। যদিও এই সাপ কামড় দিলে মানুষ মারা যায় না, বড়জোর শরীরের কিছু অংশ একটু অবশ হয়ে যায়। সে আর এমন কী! আমাদের গোখরা এক কামড় দিলেই তো নির্ঘাত মরণ। তবে সমুদ্রে দু’ধরনের খুব বিষাক্ত সাপ আছে। এদের একটির নাম হচ্ছে ‘হুক-নোজড সি স্নেক’ আর অন্যটি হচ্ছে ‘ইয়েলো-বেলিড সি স্নেক’।
পৃথিবীর সব দেশেই পাখি কমবেশি পাওয়া যায়। আমাদের দেশেও অসংখ্য পাখি দেখতে পাওয়া যায়। তবে মাদাগাস্কারে এ পাখি আছে প্রায় ২৫৮ প্রজাতির। এর মধ্যে আবার ১১৫ প্রজাতি হচ্ছে এন্ডেমিকথ অর্থাৎ পৃথিবীতে এদের একমাত্র বাসা মাদাগাস্কার। এক সময় এই দ্বীপে বিশালাকৃতির এক প্রজাতির পাখি দেখা যেত। একেকটা পাখি ওজনে ছিল প্রায় ৫০০ কেজি আর উচ্চতায় হতো প্রায় ১০ ফুট। ‘এপিওরনিস’ নামের এ পাখিকে তাই ডাকা হতো ‘এলিফ্যান্ট বার্ড’ নামেই। তবে গত কয়েক শ’ বছর ধরে সব লোভী শিকারি এ পাখিটিকে এতো বেশি শিকার করেছে যে, পৃথিবী থেকে একদম বিলুপ্তই হয়ে গেছে এ দানব পাখিটি। তবে মাদাগাস্কারের বিভিন্ন স্থানে এখনো মাঝে মাঝে খুঁজে পাওয়া যায় এ পাখির ডিম।
অসংখ্য বিচিত্র ধরনের কীটপতঙ্গের আবাসস্থল এ মাদাগাস্কার দ্বীপে। ক্যালিফোর্নিয়ার বিজ্ঞান একাডেমির এক হিসাব অনুযায়ী, মাদাগাস্কারে পাওয়া মাকড়সার প্রায় ৮০ শতাংশ পৃথিবীর আর কোথাও পাওয়া যায় না। মোট ৪১৮ প্রজাতির মাকড়সার মধ্যে ৩৭৯ প্রজাতিই এন্ডেমিক। মাকড়সাই আছে প্রায় ১০০০ প্রজাতির।
মাদাগাস্কারে ব্যাঙ আছে প্রায় ৩০০ প্রজাতির। এর চেয়েও মজার ব্যাপার হচ্ছে এসব প্রজাতির মধ্যে দু’চারটি ছাড়া আর কোনোটাই অন্য কোথাও দেখতে পাওয়া যায় না। আর ব্যাঙগুলো দেখতে কিন্তু অসাধারণ। আমাদের দেশের ব্যাঙের মত নয় কিন্তু!
মাদাগাস্কারের আরেক আকর্ষণ হলো লেমুর। খানিকটা কুকুর এবং খানিকটা কাঠবিড়ালের মতো দেখতে অবাক প্রাণী। এ ছাড়া মাদাগাস্কারে প্রচুর প্রাইমেট প্রাণী (দু’পায়ে ভর করে হাঁটা) পাওয়া যায়। পৃথিবীর প্রায় ২১ শতাংশ প্রাইমেটই এই মাদাগাস্কার দ্বীপে বাস করে। তবে এখানকার প্রাইমেটদের মধ্যে বানর, গরিলা বা শিম্পাঞ্জি খুব একটা নেই। সেখানকার বেশির ভাগ প্রাইমেটই হচ্ছে লেমুর। মাদাগাস্কারে এখনো প্রায় ১৫ প্রজাতির লেমুর পাওয়া যায়।
মাদাগাস্কারের সমুদ্রেও সুন্দর সুন্দর প্রচুর মাছ আছে। তবে ওখানকার অনেক মাছই আবার বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বাকি মাছগুলোও খুব একটা শান্তিতে নেই। ওদের বেশির ভাগই বিলুপ্ত হওয়ার পথে। আর এর অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে জমিতে কীটনাশকের ব্যবহার। আর তাই মাদাগাস্কারের স্নেকহেডস, স্কুইট ফিশের মতো অদ্ভুত অদ্ভুত আর সুন্দর সুন্দর সুস্বাদু মাছের প্রায় সবই এখন বিলুপ্তির পথে।
মাদাগাস্কার সম্পর্কে আরো জানতে চাইলে ইন্টারনেটের সাহায্য নিতে পারো। মাদাগাস্কার সম্পর্কিত অসংখ্য লেখা, ছবি এবং ভিডিও রয়েছে সেখানে। এছাড়া Discovery, National Geography Avi Animal Planet এই ধরনের টেলিভিশন চ্যানেলে প্রায় সময়ই মাদাগাস্কার নিয়ে নানা ধরনের ডকুমেন্টারি প্রচার করে থাকে। চাইলে সেগুলো দেখতে পারো।
[email protected]

SHARE

Leave a Reply