Home স্মরণ সকলের প্রিয় কবি ফররুখ আহমদ

সকলের প্রিয় কবি ফররুখ আহমদ

রিয়াজ পারভেজ

[dropcaps round=”no”]কবি [/dropcaps]তিনি। এক মহান কবি। তিনি ছোটদের কবি, বড়দের কবি, এমনকি কবিদেরও কবি। সকলের প্রিয় কবি।
শতাব্দীর এক শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবেও তিনি দাঁড়িয়ে আছেন মাথা উঁচু করে। যেন অরণ্যের সবচেয়ে দীর্ঘ এক বৃক্ষ। যার মাথাটি দেখা যায় বহুদূর থেকেও। চেনা যায় অতি সহজে।
বিশাল বড় এক কবি। এ জন্যই তার দৃষ্টিতে আটকে যায় ঘাস, ফড়িং, সবুজ, ঋতুবৈচিত্র্য, ফসলের মাঠ, আকাশ, নদী, পাখি।Ñ
কী নেই সেখানে? তার দৃষ্টির সীমায়! সবই আছে। এমনকি তিনি এক মনে দেখেনÑ ‘বিষটি এল কাশবনে’ এবং তারপরই ‘জাগলো সাড়া ঘাস বনে’। আবার ‘বকের সারি’ কোথায় গেল, তারও খোঁজ করেন। অবশেষে পেয়ে যান ‘বাঁশ বনে’।
কুল কুল বৃষ্টি। ঝরছে মুষল ধারায়। সুতরাং এই সময় ‘নদীতে খেয়া’ না থাকারই কথা। বৃষ্টিতে দুর্ভোগ বাড়ে বটে কিন্তু মজাটাই বা কম কিসে? এজন্যই তো কবির হৃদয় আকুল হয়ে ওঠে। আর বলেন :
“মেঘের আঁধার মন টানে, / যায় সে ছুটে কোন্ খানে,/ আউশ ধানের মাঠ ছেড়ে / আমন ধানের দেশ পানে।”
প্রশ্নতো জাগতেই পারে, কবির দেখা সেই ‘আউশ’ আর ‘আমন ধানের দেশ’ কোন্টি? বলাই বাহুল্য, সেই সবুজ-সোনার দেশÑআমাদের প্রিয় বাংলাদেশ।
তিনি আমাদের শস্য-শ্যামল, সবুজভরা এই দেশটিকে বড় ভালোবাসতেন। ভালোবাসতেন এ দেশের মানুষ, প্রকৃতি আর আলো-বাতাসকে।
এমন ভালো তো সবাই বাসে। আপন দেশ আর তার দেশের মানুষকে কে না ভালোবাসে? কিন্তু তিনি যে এক স্বাপ্নিক কবি! তাই অন্য আর তার ভালোবাসার মধ্যে রয়ে গেছে বিস্তর ফারাক। তিনি শুধু মনে-প্রাণে ভালোই বাসেন না, বরং ‘নতুন মশাল’ জ্বালাবারও স্বপ্ন দেখেন। কী চমৎকার তার সেই স্বপ্ন! কী বিস্ময়কর তার সেই উচ্চারণ :
“পাখির সুরে হাল্কা পাখায়
নতুন দিনের গান গেয়ে যায়,
নতুন চোখের দৃষ্টি মেলে
যায় সে নতুন মশাল জ্বেলে।”
এই ‘নতুন চোখের দৃষ্টি’ কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নতুন ‘দৃষ্টি’ মানেই তো নতুন মানুষ। সবুজ ঘাসের মতো কোমল যাদের হৃদয়। কিন্তু দৃষ্টি শরতের আকাশের চেয়েও স্বচ্ছ, পরিষ্কার।
বড় কবি বলেই তো তিনি স্বপ্নের রাজ্যে বিচরণ করতে পারতেন। কিন্তু তার সেই স্বপ্নের মধ্যেও রয়ে গেছে পার্থক্য। তিনি মূলত আমাদের মত সবুজ প্রাণে স্বপ্ন দেখতেন। অনেক স্বপ্ন। সেই স্বপ্নটি কেমন? তোমার মত, আমার মত। যেমন :
“সবুজ প্রাণের পরশ লেগে
ফাল্গুনে ভাই বন্যাবেগে
পাতায় পাতায় সবুজ স্বপন
যায় সহজে ছড়িয়ে যেমন
দেয় মুছে সব মরা, মেকি;
তেমনি সবুজ স্বপ্ন দেখি ॥”
কবিদের ভালোবাসা হয় অকৃত্রিম। আর সেই ভালোবাসা যদি হয় ছোটদের প্রতি, তাহলে তো কথাই নেই। সে এক অন্যরকম ভালোবাসা। তিনিও আমাদেরকে ভালো বাসতেন প্রাণ দিয়ে। এ জন্যই তো তার অভিজ্ঞতা থেকে বলছেন কী অসীম দরদ দিয়ে :
“জামাত ছেড়ে থাকবে যে
ঘরের কোণে থাকবে সে,
রইবে হয়ে এক পেশে;
একলা থাকায় দুঃখ ভাই।”
আসলেই ‘একলা থাকায় দুঃখ’ অনেক। কবি তাই আহবান জানাচ্ছেন দলবদ্ধভাবে সামনে এগিয়ে যাবার জন্য!
“সবাই মিলে এক দলে / এক আশাতে যাই চলে / এক আশাতে যাই বলে / ‘ঈদগা’ হবে দুনিয়াটাই।”
প্রকৃত অর্থে তার প্রত্যাশা ছিল এই দুনিয়া ‘ঈদগা’ হয়ে যাক। ঈদের মাঠে যে শান্তি, শৃঙ্খলা, যে সৌহার্দ্য-ভালোবাসার স্নেহ-মমতা কিংবা মানবতা কাজ করে সকল প্রাণেÑ ঠিক সেই রকম যেন থাকে গোটা পৃথিবীতে, প্রতিদিন। প্রতিটি মুহূর্ত। এই মহান স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্যই তিনি অভয় দিচ্ছেনÑ
“নাইরে কাজে শঙ্কা যাদের, / নাইরে ভয়ের মানা, / তাদের হাতেই সবুজ নিশান / মেলে সবুজ ডানা ॥”
সেই শঙ্কাহীন কারা? নিশ্চয়ই তরুণ ও নবীনরাই। আর ‘তাদের হাতেই’ যে ‘সবুজ নিশান’ ‘সবুজ ডানা’ মেলবে, এ ব্যাপারে কবি ছিলেন অত্যন্ত আশাবাদী।
‘সবুজ ডানা’ মেলা ততোটা যে সহজ নয়, সে কথা কবি জানতেন বেশ ভালো করেই। কারণ এখানে আছে শত বাধা, শত কাঁটার আঘাত। তাতে কী! কবি বলছেন :
“ক্রমাগত বাধা, পাহাড় পারায়ে সূর্যোদয়,
যদিও এ পথে সহস্র ভয় নাইতো ভয়,
যদিও এ পথে মৃত্যুর ডর নাইতো ডর,
এপথের হাওয়া দিতেছে দিনের শুভ খবর,
নবজীবনের সাক্ষ্য দিতেছে মৃত কবর;”
‘দিনের শুভ খবর’ যে ‘নবজীবনের সাক্ষ্য’ দিচ্ছেÑকবির দৃষ্টিতে তা পরিষ্কার। এই জন্য তিনি অভয় দিচ্ছেন :
“তবুও থেম না, আজ এই পথে নাই বিরতি,
দু’ধারে মৃত্যু পাহাড়ের মাঝে প্রবল গতি,
এখানে আমার নাই অবসর। দিনের মত
আঁধার পর্দা কেটে যেতে হবে অনবরত।”
কী দুঃসাহসী উচ্চারণ! তিনি আমাদেরকে ‘আঁধার পর্দা কেটে যেতে’ বলছেন ‘অনবরত’। অর্থাৎ বাধা পেয়ে থেমে গেলে চলবে না। যারা ভিতু, যারা দুর্বলÑতারাই কেবল মেঘ দেখে ভয় পায়। আর যারা ভিতু, তাদের হাতে ‘সবুজ নিশান’ কিভাবে উড়বে? সুতরাং ভয় নয়। শঙ্কা বা দ্বিধাও নয়। ক্রমাগত সামনে এগিয়ে যাওয়াই হলো তারুণ্যের কাজ। কারণ :
“এখানে এখন রাত্রি এসেছে নেমে,
তবু দেখা যায় দূরে বহুদূরে হেরার রাজ-তোরণ,”
তাহলে আর শঙ্কা কিসের? সুতরাং
“তবে পাল খোলা, তবে নোঙর তোলা;
এবার অনেক পথশেষে সন্ধানী!
হেরার তোরণ মিলবে সম্মুখে জানি।
তবে নোঙর তোলা,
তবে তুমি পাল খোলা,”
এবং তারপরই কবির আহ্বান হলো :
“এস আমরা এক নতুন মিনার গড়ি
সেই সব অমর শহীদানের স্মরণে
যাদের দুর্জয় সঙ্কল্প কোনদিন প্রতিহত হয়নি”
আমাদের ‘নতুন মিনার’ গড়ার জন্য কবি ডাক দিয়ে যান বারবার। সেই ‘নতুন মিনার’-এর ভিত্তি কেমন হবে? কেমন হবে তার অবয়ব? এ ব্যাপারে কবির স্পষ্ট বক্তব্য হলো :
“এক আল্লাহর দাস ছাড়া কারো ভৃত্য নও,
হক ইনসাফ, সাম্য ন্যায়ের ঝাণ্ডা বও,
বনি আদমের ব্যূহ মাঝে তুমি জানাও আজ
নতুন চেতনা গড়ে নিতে তার নয়া সমাজ।”
‘নয়া সমাজ’ গড়ার জন্য চাই তেজোদীপ্ত কর্মীপ্রাণ। কবি সেই আহবানই জানাচ্ছেন আমাদেরকে :
“হে নকীব! জাগো, জাগাও সুপ্ত দিগন্তনীল,
সব বন্ধন মুক্তির সুর বাজাও আজ,
ইস্রাফিলের ‘সূরে’ ভেঙে দাও বিশ্ব নিখিল,
ইস্রাফিলের ‘সূরে’ পৃথিবীকে জাগাও আজ!”
এবং তারপর আবারও বলছেন :
“পাল তুলে দাও, ঝাণ্ডা ওড়াও; সিন্দাবাদ!
এল দুস্তর তরঙ্গ বাধা তিমিরময়ী।
কি হবে ব্যর্থ ক্লান্ত রাতের প্রহর গুনে?
নতুন সফরে হবে এ কিশতি দিগি¦জয়ী।”
কবি অত্যন্ত আশাবাদী। তিনি আশা এবং স্বপ্নের চাষবাস করেন। সেখানে তিনি দেখতে পান সোনালি ফসলে ভরে উঠেছে নবদিগন্তের মাঠ। দেখতে পান ‘নতুন সফরে’ নবীন-তরুণ এবং সাহসীদের ‘কিশতির’ দিগি¦জয়ীর সুনিশ্চিত আলোক রেখা। তিনি আমাদের দিকে তাকিয়ে প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছেন। আর বলছেন :
“পাঞ্জেরী!
জাগো বন্দরে কৈফিয়তের তীব্র ভ্রুকুটি হেরি;
জাগো অগণন ক্ষুধিত মুখের নীরব ভ্রুকুটি হেরি,
দেখ চেয়ে দেখ সূর্য ওঠার কত দেরি, কত দেরি ॥”
‘দেরি নয়। সেটা কবির জন্য প্রত্যাশিতও নয়। বরং বেদনার। এ জন্য তিনি আমাদেরকে আরও দুঃসাহসের সাথে এগিয়ে যাবার জন্য আহবান জানাচ্ছেন :
“ভেঙে ফেলো আজ খাকের মমতা আকাশে উঠেছে চাঁদ, / দরিয়ার বুকে দামাল জোয়ার ভাঙছে বালুর বাঁধ, / ছিঁড়ে ফেলে আজ আয়েশি রাতের মখমল-অবসাদ, / নতুন পানিতে হাল খুলে দাও, হে মাঝি সিন্দাবাদ!”
সত্যিই বটে, সবুজ নিশান উড়িয়ে ‘হেরার রাজ তোরণ’ স্পর্শ করার জন্য প্রয়োজন আমাদের অদম্য সাহস, ধৈর্য আর বিশ্বাসের অনড় পর্বত। কবি আমাদেরকে দেখতে চান তেমনটিই। এটাই ছিল তার আজীবনের লালিত স্বপ্ন।
বড় কবি, মহা কবি না হলে এমন ব্যাপক-বিশাল স্বপ্নের রাজ্য গড়ার প্রত্যাশাও করা যায় না। তিনি তেমনি বিশাল হৃদয়ের এক মহা কবি ছিলেন বলেই এমনি স্বপ্ন দেখতে পেরেছিলেন আমাদেরকে নিয়ে। এ জন্যই তো কবি তিনিÑ কথায়, কাজে, স্বভাবে, চরিত্রেÑসার্বিক মেলবন্ধনে এক বিরল পুরুষ, শক্ত খিলান।
এতক্ষণে নিশ্চয়ই বোঝা গেছে কোন্ কবির কথা বলছি! তিনি তো আর কেউ ননÑআমাদের প্রিয় কবি ফররুখ আহমদ। যিনি ছিলেন এক আলোর কবি, জ্যোতির কবি।

SHARE

Leave a Reply